সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৪.২ — পরম জ্ঞানের আশ্রয়ে ঈশ্বরীয় স্বরূপলাভ ও জন্মমৃত্যুর বন্ধনমুক্তি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যমাগতাঃ।সর্গেহপি নোপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ।।২।।
ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যমাগতাঃ।
সর্গেহপি নোপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ।।২।।

অনুবাদঃ এই জ্ঞান আশ্রয় করলে জীব আমার পরা প্রকৃতি লাভ করে। তখন আর সে সৃষ্টির সময়ে জন্মগ্রহণ করে না এবং প্রলয়কালেও ব্যথিত হয় না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকটি মানবজীবনের পরম জ্ঞান, ঈশ্বরীয় স্বভাব এবং জন্ম মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকটি হল ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যমাগতাঃ সর্গেহপি নোপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ। এর সরল অর্থ হল এই জ্ঞানকে আশ্রয় করে যারা আমার সাধর্ম্য লাভ করেছে তারা সৃষ্টির সময়ও পুনরায় জন্মগ্রহণ করে না এবং প্রলয়ের সময়ও বিচলিত হয় না। কিন্তু এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ কেবল পুনর্জন্ম ও প্রলয়ের একটি ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে মানুষের প্রকৃত পরিচয়, আত্মস্বরূপ, ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক এবং পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যেও চিরস্থায়ী সত্যকে উপলব্ধি করার এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।

শ্লোকটির শুরুতে ব্যবহৃত ইদং শব্দের অর্থ এই। এখানে এই শব্দটি পূর্বে আলোচিত পরম জ্ঞানকে নির্দেশ করছে। জ্ঞানম্ শব্দটি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে। জ্ঞা অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। তবে গীতার দর্শনে জ্ঞান কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য অর্জন নয়। প্রকৃত জ্ঞান হল নিজের প্রকৃত স্বরূপকে জানা এবং পরিবর্তনশীল দেহ মন ও জগতের অন্তরালে অবস্থিত চৈতন্যসত্তাকে উপলব্ধি করা। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ হিসেবে মনে করে তখন জন্ম ও মৃত্যুকে নিজের জন্ম ও মৃত্যু বলে মনে করে। কিন্তু যখন সে আত্মার প্রকৃতি উপলব্ধি করে তখন তার দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। সে বুঝতে পারে যে দেহ পরিবর্তনশীল হলেও চৈতন্যের প্রকৃতি গভীরতর এবং তার পরিচয় কেবল দৃশ্যমান শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এরপর এসেছে উপাশ্রিত্য শব্দটি। এই শব্দের মধ্যে রয়েছে আশ্রয় গ্রহণের গভীর ভাব। এখানে কৃষ্ণ শুধু বলেননি যে এই জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তিনি বলেছেন এই জ্ঞানকে আশ্রয় করতে হবে। জানার সঙ্গে আশ্রয় করার পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ আত্মা সম্পর্কে অনেক শাস্ত্র পড়তে পারে, দর্শন সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারে এবং ঈশ্বর সম্পর্কে অসংখ্য ধারণা রাখতে পারে। কিন্তু সেই জ্ঞান যদি তার জীবনবোধ পরিবর্তন না করে তাহলে সেটি এখনও তার অস্তিত্বের আশ্রয় হয়ে ওঠেনি। জ্ঞানকে আশ্রয় করা মানে সেই জ্ঞানের আলোকে নিজের চিন্তা, কর্ম, সম্পর্ক, সুখ দুঃখ এবং জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে দেখতে শেখা। যেমন কেউ সাঁতার সম্পর্কে অনেক বই পড়তে পারে কিন্তু প্রকৃত সাঁতারের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হলে তাকে জলে নামতে হয়, তেমনি আত্মজ্ঞানও কেবল চিন্তার বিষয় নয়। তাকে জীবনের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে পরিণত করতে হয়।

এই জ্ঞানকে আশ্রয় করার ফল হিসেবে কৃষ্ণ বলেছেন মম সাধর্ম্যমাগতাঃ। এই পদটির মধ্যে শ্লোকটির অন্যতম গভীর দার্শনিক বক্তব্য নিহিত রয়েছে। মম অর্থ আমার এবং সাধর্ম্য অর্থ একই ধর্ম বা স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য। এখানে ধর্ম বলতে কোনো সম্প্রদায়গত ধর্ম বোঝানো হয় না। ধর্ম বলতে বোঝানো হয়েছে কোনো সত্তার মৌলিক স্বভাব বা প্রকৃতি। তাই মম সাধর্ম্যমাগতাঃ অর্থ যারা আমার সাধর্ম্য লাভ করেছে অথবা যারা আমার ঈশ্বরীয় স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বক্তব্যকে ঈশ্বরের সঙ্গে বাহ্যিক সাদৃশ্য হিসেবে বোঝা উচিত নয়। বরং এর অর্থ মানুষের চেতনা এমন এক অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া যেখানে সত্য, স্থিরতা, অনাসক্তি, পবিত্রতা এবং চৈতন্যের গভীর উপলব্ধি প্রকাশিত হয়।

সাধর্ম্য শব্দটির ব্যাখ্যা বিভিন্ন ভারতীয় দর্শনে বিভিন্নভাবে করা হয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ ব্রহ্মস্বরূপ এবং জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ নিজের সেই চিরন্তন স্বরূপ উপলব্ধি করে। এই উপলব্ধিতে আত্মা আর নিজেকে সীমাবদ্ধ দেহ ও অহংকারের সঙ্গে এক করে দেখে না। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব ও ঈশ্বরের মধ্যে গভীর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকলেও তাদের সম্পূর্ণ অভিন্ন বলা হয় না। সেখানে সাধর্ম্য ঈশ্বরীয় গুণের সঙ্গে সামঞ্জস্য লাভের অর্থ বহন করতে পারে। দ্বৈত দর্শনে জীব ও ঈশ্বর চিরকাল পৃথক সত্তা হলেও ঈশ্বরের কৃপায় জীব তাঁর নিকটবর্তী হয়ে ঈশ্বরীয় গুণের অংশীদার হতে পারে। ফলে সাধর্ম্য শব্দটি ভারতীয় দর্শনের মধ্যে ঐক্য, সাদৃশ্য, নৈকট্য এবং ঈশ্বরীয় স্বভাব লাভের একাধিক সূক্ষ্ম অর্থ বহন করে।

আগতাঃ শব্দের অর্থ যারা এসেছে, যারা লাভ করেছে বা যারা পৌঁছেছে। মম সাধর্ম্যমাগতাঃ একত্রে বোঝায় যারা আমার সাধর্ম্য লাভ করেছে। অর্থাৎ এই জ্ঞান তাদের কাছে কেবল কোনো তাত্ত্বিক ধারণা হয়ে থাকেনি। তারা সেই জ্ঞানের মাধ্যমে নিজেদের চেতনার পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং ঈশ্বরীয় স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য লাভ করেছে। এখানেই গীতার জ্ঞানের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। সত্য জ্ঞান মানুষের বাহ্যিক পরিচয়কে শুধু সমৃদ্ধ করে না, তার অন্তরের অবস্থাকেও রূপান্তরিত করে।

এরপর শ্লোকে এসেছে সর্গেহপি নোপজায়ন্তে। সর্গ অর্থ সৃষ্টি এবং নোপজায়ন্তে অর্থ জন্মগ্রহণ করে না। এর বাহ্যিক অর্থ হল সৃষ্টি যখন আবার প্রকাশিত হয় তখন এই জ্ঞানী সত্তাগণ পুনরায় জন্মগ্রহণ করেন না। গীতার পুনর্জন্ম তত্ত্বের আলোকে এর অর্থ হল তারা কর্মবন্ধন ও সংসারের পুনরাবর্তন থেকে মুক্ত হন। কিন্তু এর একটি গভীর অন্তর্মুখী অর্থও রয়েছে। মানুষের জীবনে প্রতিদিন অসংখ্য নতুন পরিচয় সৃষ্টি হয়। কখনো আমরা ছাত্র, কখনো কর্মী, কখনো পিতা, কখনো মাতা, কখনো নেতা, কখনো অধীনস্থ এবং কখনো সফল বা ব্যর্থ মানুষ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিই। এই পরিচয়গুলো সৃষ্টি হয় এবং আবার বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মস্বরূপকে উপলব্ধি করেছে সে বুঝতে পারে যে এই পরিবর্তনশীল পরিচয়গুলো তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়।

শ্লোকটির শেষ অংশ হল প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ। প্রলয় শব্দটি সংস্কৃত প্র এবং লী ধাতুর ভাব থেকে এসেছে। লী অর্থ লীন হওয়া বা বিলীন হওয়া। প্রলয় অর্থ প্রকাশিত জগতের প্রত্যাহার বা বিলয়। ধর্মীয় অর্থে এটি মহাজাগতিক সৃষ্টির একটি পর্যায়ের অবসানকে নির্দেশ করে। কিন্তু মানবজীবনের প্রতীকী অর্থে প্রলয় বলতে বোঝানো যেতে পারে কোনো পরিচয়ের বিলয়, সম্পর্কের সমাপ্তি, সম্পদের ক্ষয়, সাফল্যের পতন, শরীরের পরিবর্তন কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। ব্যথন্তি অর্থ ব্যথিত হয়, বিচলিত হয় বা গভীরভাবে কষ্ট পায়। কৃষ্ণ বলছেন যে জ্ঞানী ব্যক্তি প্রলয়ের মধ্যেও চূড়ান্ত অস্তিত্বগত ভয়ে বিচলিত হন না।

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সত্য প্রকাশ পায়। জ্ঞানী ব্যক্তি এমন নন যার জীবনে দুঃখ বা পরিবর্তন আসে না। বরং তিনি এমন একজন যিনি পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের অন্তর্গত সত্যকে হারিয়ে ফেলেন না। সাধারণ মানুষ কোনো কিছু হারালে মনে করে তার নিজের অস্তিত্বের একটি অংশ হারিয়ে গেছে। কারণ সে নিজের পরিচয়কে বাহ্যিক বস্তু, সম্পর্ক এবং অবস্থানের সঙ্গে এক করে ফেলেছে। কিন্তু আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে বাহ্যিক অবস্থার পরিবর্তন তার গভীরতম চৈতন্যসত্তাকে ধ্বংস করতে পারে না। তাই সৃষ্টির সময় তিনি মোহগ্রস্ত হন না এবং প্রলয়ের সময়ও অস্তিত্বের ভয়ে ভেঙে পড়েন না।

এই কারণে শ্লোকটির সৃষ্টি ও প্রলয় দুটি শব্দ অত্যন্ত প্রতীকী। সৃষ্টি হল আগমন এবং প্রলয় হল প্রত্যাগমন। সৃষ্টি হল প্রকাশ এবং প্রলয় হল বিলয়। সৃষ্টি হল নতুন রূপের আবির্ভাব এবং প্রলয় হল সেই রূপের অবসান। মানুষের জীবনেও এই দুই প্রক্রিয়া অবিরাম চলছে। শৈশব সৃষ্টি হয় এবং বিলীন হয়। যৌবন আসে এবং চলে যায়। সম্পর্ক তৈরি হয় এবং কখনো বিচ্ছিন্ন হয়। সাফল্য আসে এবং কখনো হারিয়ে যায়। শরীর জন্ম নেয় এবং একদিন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও যে চৈতন্য সবকিছুর সাক্ষী হয়ে থাকে তার অনুসন্ধানই গীতার জ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য।

এই সত্যকে বোঝার জন্য সমুদ্র ও ঢেউয়ের উপমা অত্যন্ত সুন্দর। সমুদ্রের উপর অসংখ্য ঢেউ সৃষ্টি হয় এবং আবার সমুদ্রেই বিলীন হয়ে যায়। একটি ঢেউয়ের জন্মকে সৃষ্টি এবং তার বিলীন হওয়াকে প্রলয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ঢেউয়ের আকার পরিবর্তিত হয় কিন্তু জল তার মৌলিক স্বভাব হারায় না। তেমনি মানুষের দেহ, মন, পরিচয় এবং জীবনের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও আত্মস্বরূপের অনুসন্ধান মানুষকে সেই গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায় যা পরিবর্তনের প্রত্যক্ষদর্শী।

আকাশের উপমাও এখানে প্রযোজ্য। আকাশে কখনো মেঘ আসে, কখনো ঝড় ওঠে, কখনো বৃষ্টি হয় এবং আবার আকাশ নির্মল হয়ে যায়। কিন্তু মেঘের আগমন বা প্রস্থানে আকাশের নিজস্ব বিস্তার নষ্ট হয় না। মানুষের মনও তেমনি কখনো আনন্দিত হয়, কখনো দুঃখিত হয়, কখনো আশাবাদী হয় এবং কখনো ভীত হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের গভীর চৈতন্যকে উপলব্ধি করতে শেখে সে বুঝতে পারে যে মনের পরিবর্তন তার চূড়ান্ত সত্তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।

এই শ্লোক মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত বাস্তব শিক্ষা বহন করে। জীবনে পরিবর্তন অনিবার্য। আমরা যতই কোনো অবস্থাকে স্থায়ী করতে চাই না কেন, সময় সবকিছুকে পরিবর্তিত করে। যে ব্যক্তি পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যে অপরিবর্তনীয় সত্য খুঁজে পায় না সে ক্রমাগত ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে থাকে। কিন্তু যে ব্যক্তি জ্ঞানকে আশ্রয় করে নিজের গভীরতম সত্তাকে অনুসন্ধান করে তার মধ্যে ধীরে ধীরে এক ধরনের অন্তর্গত স্থিরতা জন্ম নেয়। তখন সাফল্য তাকে অহংকারে অন্ধ করে না এবং ব্যর্থতা তাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে না। লাভ তাকে উন্মত্ত করে না এবং ক্ষতি তাকে অস্তিত্বহীনতার অনুভূতিতে নিমজ্জিত করে না।

এই দৃষ্টিতে ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য কেবল একটি শাস্ত্রীয় বাক্য নয়। এটি মানুষের অন্তর্জীবনের একটি আহ্বান। আমাদের জ্ঞানকে কেবল মস্তিষ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনযাপনের ভিত্তিতে পরিণত করতে হবে। নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে যত গভীর উপলব্ধি জন্মাবে ততই বাহ্যিক পরিবর্তনের প্রতি অন্ধ আসক্তি কমবে। মানুষ তখন বুঝতে শুরু করবে যে সে কেবল তার সম্পদ নয়, কেবল তার পেশা নয়, কেবল তার সামাজিক পরিচয় নয় এবং কেবল তার শরীরও নয়। তার অস্তিত্বের গভীরে এমন একটি চৈতন্য রয়েছে যা এই সমস্ত পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে।

সাধর্ম্য লাভের অর্থ তাই নিজের মধ্যে ঈশ্বরীয় গুণের বিকাশ ঘটানো। সত্যের প্রতি নিষ্ঠা, অন্তরের পবিত্রতা, অনাসক্তি, সমতা, করুণা, অহংকারের হ্রাস এবং পরিবর্তনের মধ্যেও স্থির থাকার ক্ষমতা এই ঈশ্বরীয় স্বভাবের প্রকাশ। মানুষ যখন নিজের সংকীর্ণ অহংকারকে অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে তখন তার জীবন ধীরে ধীরে একটি নতুন অর্থ লাভ করে। তখন জ্ঞান শুধু দর্শন থাকে না। তা হয়ে ওঠে জীবনযাপনের শক্তি।

এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হল মানুষ তার পরিবর্তনশীল পরিচয় নয়। জন্ম ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও প্রলয়, লাভ ও ক্ষতি, সুখ ও দুঃখ জীবনের পরিবর্তনশীল প্রকাশ। কিন্তু এই পরিবর্তনের অন্তরালে যে চৈতন্য সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে তার সন্ধানই আত্মজ্ঞান। এই জ্ঞানকে আশ্রয় করলে মানুষ ঈশ্বরীয় স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য লাভ করতে পারে এবং তখন সৃষ্টি তাকে নতুন বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে না, প্রলয়ও তাকে অস্তিত্বের ভয়ে বিচলিত করতে পারে না।

অতএব ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যমাগতাঃ শ্লোকাংশটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত মুক্তি বাহ্যিক জগতকে নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার মধ্যে নয়, বরং পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যেও নিজের চিরন্তন সত্যকে উপলব্ধি করার মধ্যে। যে জ্ঞান মানুষকে নিজের প্রকৃত সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যে জ্ঞান তাকে ঈশ্বরীয় স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন করতে শেখায় এবং যে জ্ঞান সৃষ্টি ও প্রলয়ের দ্বন্দ্বের মধ্যেও অন্তরের স্থিরতা রক্ষা করতে সাহায্য করে, সেই জ্ঞানই গীতার ভাষায় মুক্তির জ্ঞান। এই উপলব্ধির মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভয় থেকে স্বাধীনতা, আসক্তি থেকে মুক্তি এবং পরিবর্তনের মধ্যেও চিরন্তন শান্তির সন্ধান।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 23, 2026 August 23, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি