ভগবদ্গীতা ১৪.২০ — গুণত্রয় অতিক্রম করে জন্ম-মৃত্যু-জরা-দুঃখ থেকে মুক্তি ও অমৃতত্ব
গুণানেতানতীত্য ত্রীন্ দেহী দেহসমুদ্ভবান্।
জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈর্বিমুক্তোহমৃতমশ্নুতে।।২০।।
অনুবাদঃ দেহধারী জীব এই তিন গুণ অতিক্রম করে জন্ম, মৃত্যু, জরা ও দুঃখ থেকে বিমুক্ত হয়ে অমৃত ভোগ করেন।
গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের বিংশতম শ্লোকের এই গভীর বাণী মানুষের আত্মপরিচয়, প্রকৃতির গুণত্রয় এবং মুক্তির পথকে এক অনন্য দার্শনিক দৃষ্টিতে প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলেন, দেহধারী জীব যখন প্রকৃতির সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়, তখন সে জন্ম, মৃত্যু, বার্ধক্য এবং দুঃখের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে অমৃতত্ব লাভ করে। এই বাণীর অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করতে হলে প্রথমেই গুণের প্রকৃতি বুঝতে হয়। গুণ শব্দের সাধারণ অর্থ গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্য হলেও সাংখ্য ও গীতার দর্শনে গুণ হলো প্রকৃতির সেই তিন মৌলিক প্রবণতা, যার মাধ্যমে সমগ্র জড়জগত এবং মানুষের মনোজগত পরিচালিত হয়। সত্ত্ব মানুষের মধ্যে জ্ঞান, স্বচ্ছতা, শান্তি ও সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। রজঃ তাকে আকাঙ্ক্ষা, কর্মপ্রবণতা, অস্থিরতা এবং অর্জনের বাসনার দিকে পরিচালিত করে। তমঃ সৃষ্টি করে অজ্ঞানতা, জড়তা, মোহ, অবসাদ এবং নিষ্ক্রিয়তার প্রবণতা। মানুষ সাধারণত এই তিন গুণের প্রভাবেই চিন্তা করে, অনুভব করে এবং কাজ করে। ফলে সে নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলে গিয়ে গুণের কার্যকলাপকেই নিজের পরিচয় বলে মনে করতে শুরু করে।
শ্লোকে ব্যবহৃত অতীত্য শব্দটি এই শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। অতীত্য অর্থ অতিক্রম করে বা পার হয়ে। এখানে গুণকে ধ্বংস করার কথা বলা হয়নি, আবার গুণ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে তাদের অতিক্রম করতে। এর অর্থ হলো গুণের কার্যকলাপকে প্রত্যক্ষ করেও তার দ্বারা নিজের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত না হতে দেওয়া। মানুষের মনে কখনো রাগ আসে, কখনো আকাঙ্ক্ষা জাগে, কখনো অলসতা আসে, আবার কখনো শান্তি ও জ্ঞান উদ্ভাসিত হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি উপলব্ধি করতে শেখে যে এগুলো তার চেতনার মধ্যে উদিত হওয়া পরিবর্তনশীল অবস্থা মাত্র, সে ধীরে ধীরে গুণের সঙ্গে নিজের অভিন্নতা ভাঙতে পারে। যেমন আকাশে কখনো কালো মেঘ জমে, কখনো ঝড় হয়, আবার কখনো নির্মল নীল আকাশ দেখা যায়, কিন্তু কোনো মেঘই আকাশের প্রকৃত সত্তাকে পরিবর্তন করতে পারে না, তেমনি মানুষের অন্তর্জগতের সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ পরিবর্তিত হলেও আত্মার গভীরতম স্বরূপ সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকে।
দেহী শব্দটিও এই শ্লোকের গভীর অর্থ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেহী অর্থ দেহধারী। এখানে দেহ এবং দেহীর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য নির্দেশ করা হয়েছে। দেহ পরিবর্তনশীল। শিশুকাল থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্য, সুস্থতা থেকে অসুস্থতা এবং অবশেষে মৃত্যু পর্যন্ত দেহ ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। মনও পরিবর্তিত হয়। চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা এবং মানসিক অবস্থাও স্থায়ী নয়। কিন্তু যে চেতনা এই সমস্ত পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে, গীতার আত্মতত্ত্বে সেই চৈতন্যসত্তাই দেহীর গভীরতর অর্থের দিকে নির্দেশ করে। আমরা যখন বলি আমার দেহ, আমার মন, আমার চিন্তা এবং আমার অনুভূতি, তখন ভাষার মধ্যেই একটি গভীর সত্য প্রকাশ পায়। যে সত্তা দেহ ও মনকে আমার বলে অভিহিত করছে, সে কেবল দেহ বা মন নয়। এই আত্মবোধের পরিবর্তনই গীতার মুক্তির দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
দেহসমুদ্ভবান্ শব্দটি দেহের উৎপত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়কে নির্দেশ করে। দেহ প্রকৃতির কার্যধারার অন্তর্গত এবং প্রকৃতির গুণত্রয় দেহ ও জগতের প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দেহের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে থাকা মানে পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সঙ্গে নিজের পরিচয়কে আবদ্ধ করে রাখা। এই পরিচয়ের ফলেই জন্মকে নিজের চূড়ান্ত সূচনা এবং মৃত্যুকে নিজের চূড়ান্ত বিনাশ বলে মনে হয়। বার্ধক্য তখন নিজের অস্তিত্বের ক্ষয় বলে প্রতীয়মান হয় এবং দুঃখকে নিজের প্রকৃত সত্তার ওপর আঘাত বলে মনে হয়। কিন্তু যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে দেহ পরিবর্তনশীল এবং আত্মস্বরূপ তার প্রত্যক্ষকারী চৈতন্য, তখন জন্ম, মৃত্যু, জরা ও দুঃখের অর্থও তার কাছে পরিবর্তিত হতে থাকে।
জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈঃ শব্দবন্ধে মানবজীবনের অস্তিত্বগত বাস্তবতার চারটি গুরুত্বপূর্ণ দিক একত্রিত হয়েছে। জন্ম জীবনের সূচনাকে নির্দেশ করে। মৃত্যু দেহের অবসানকে নির্দেশ করে। জরা পরিবর্তনশীলতা ও ক্ষয়ের প্রতীক। আর দুঃখ মানুষের সীমাবদ্ধ অস্তিত্বের অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করে। গীতার দৃষ্টিতে এগুলোকে অস্বীকার করা হয় না। বরং এগুলোর প্রকৃতি উপলব্ধি করে এগুলোর সঙ্গে আমাদের ভুল আত্মপরিচয়কে অতিক্রম করার কথা বলা হয়। মানুষ যখন মনে করে আমি এই দেহ, তখন দেহের প্রতিটি পরিবর্তন তার নিজের পরিবর্তন বলে মনে হয়। যখন সে মনে করে আমি আমার সাফল্য, তখন ব্যর্থতা তার অস্তিত্বকে আঘাত করে। যখন সে মনে করে আমি আমার সম্পর্ক, তখন সম্পর্কের বিচ্ছেদ তার আত্মপরিচয়কে ভেঙে দেয়। কিন্তু আত্মস্বরূপ সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি জন্মালে বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেও অন্তর্গত স্থিতি সম্ভব হয়।
বিমুক্তঃ শব্দের মধ্যে তাই মুক্তির একটি গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে। মুক্তি এখানে কেবল বাহ্যিক স্বাধীনতা নয়। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হয়েও আকাঙ্ক্ষা, ভয়, অহংকার, ক্রোধ, আসক্তি এবং পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারে। গীতার মুক্তি হলো এই অন্তর্গত বন্ধন থেকে মুক্তি। যখন মানুষ নিজের সুখকে বাহ্যিক অর্জনের ওপর নির্ভরশীল মনে করে না, যখন নিজের মূল্যকে অন্যের প্রশংসা বা নিন্দার দ্বারা নির্ধারিত হতে দেয় না, যখন কর্ম করে কিন্তু কর্মফলের প্রতি অন্ধ আসক্ত হয় না, তখন তার মধ্যে এক গভীর স্বাধীনতা জন্ম নিতে শুরু করে। এই স্বাধীনতাই গুণাতীততার দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষণ।
শ্লোকের শেষ শব্দ অমৃতমশ্নুতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অমৃত অর্থ যা মৃত্যুর অধীন নয়। অশ্নুতে অর্থ লাভ করে, উপলব্ধি করে বা আস্বাদন করে। এখানে অমৃতত্বকে কেবল অনন্তকাল শারীরিকভাবে বেঁচে থাকার অর্থে বোঝা উচিত নয়। গীতার আধ্যাত্মিক দর্শনে অমৃতত্ব হলো সেই আত্মস্বরূপের উপলব্ধি যা দেহের জন্ম ও মৃত্যুর পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে। দেহ জন্মগ্রহণ করে এবং ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। মন পরিবর্তিত হয়। অনুভূতি আসে এবং চলে যায়। কিন্তু আত্মস্বরূপকে যদি এই পরিবর্তনগুলোর সাক্ষী হিসেবে উপলব্ধি করা যায়, তখন মৃত্যুভয় তার পূর্বের সর্বময় শক্তি হারাতে শুরু করে। অমৃতত্ব তখন ভবিষ্যতে অর্জন করার কোনো বস্তু নয়, বরং নিজের গভীরতম স্বরূপ সম্পর্কে একটি জাগরণ।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোক সাংখ্য দর্শনের পুরুষ ও প্রকৃতির পার্থক্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং গুণময়। পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ ও সাক্ষী। মানুষের বন্ধনের মূল কারণ হলো এই দুইয়ের মধ্যে ভুল অভিন্নতা। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই উপলব্ধি আরও গভীর হয়ে আত্মা ও ব্রহ্মের অভিন্নতার দিকে নিয়ে যায়। সেখানে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ কোনো গুণের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। ভক্তিমূলক দর্শনে আবার ঈশ্বরের প্রতি গভীর আত্মসমর্পণ ও ভক্তির মাধ্যমে গুণের বন্ধন অতিক্রম করার শিক্ষা পাওয়া যায়। দর্শনের বিভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যেও একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ নিজের প্রকৃত পরিচয়কে যতক্ষণ পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সঙ্গে অভিন্ন মনে করে, ততক্ষণ সে বন্ধনের মধ্যে থাকে। আর যখন সে পরিবর্তনশীলতার সাক্ষী নিজের চৈতন্যস্বরূপকে উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন মুক্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়।
এই শিক্ষার একটি গভীর মনোবৈজ্ঞানিক দিকও রয়েছে। মানুষ প্রায়ই নিজের আবেগের সঙ্গে এমনভাবে একাত্ম হয়ে যায় যে সে বলে আমি রাগান্বিত, আমি ব্যর্থ, আমি ভীত, আমি অসহায়। কিন্তু সচেতন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সে বুঝতে পারে রাগ একটি মানসিক অবস্থা, ভয় একটি অনুভূতি এবং ব্যর্থতা একটি ঘটনা। এগুলো তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়। এই উপলব্ধি তাকে নিজের মানসিক প্রবণতার ওপর স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য করে। একজন মানুষ অপমানিত হয়ে রাগ অনুভব করতে পারে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশোধ না নিয়ে নিজের রাগকে প্রত্যক্ষ করতে পারে। একজন মানুষ ব্যর্থ হয়ে দুঃখিত হতে পারে, কিন্তু ব্যর্থতাকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় বানিয়ে ফেলতে হবে না। একজন মানুষ সাফল্য পেয়ে আনন্দিত হতে পারে, কিন্তু সেই সাফল্যকে অহংকারের ভিত্তি না বানিয়েও থাকতে পারে। এই প্রত্যক্ষদর্শী চেতনার বিকাশই গুণের ওপর স্বাধীনতার সূচনা।
প্রতীকীভাবে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃকে অন্ধকার, আন্দোলন এবং আলোর তিন প্রবাহ হিসেবেও দেখা যায়। তমঃ হলো অচেতনতার অন্ধকার। রজঃ হলো আকাঙ্ক্ষা ও গতির প্রবাহ। সত্ত্ব হলো জ্ঞান ও স্বচ্ছতার আলো। কিন্তু গীতার শিক্ষা এখানেও থেমে থাকে না। কারণ সত্ত্বও প্রকৃতির একটি গুণ। তাই আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা কেবল অন্ধকার থেকে আলোতে আসা নয়, আলো ও অন্ধকার উভয়ের সাক্ষী হয়ে ওঠা। এই কারণেই গুণাতীত মানুষকে আকাশের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আকাশ মেঘকে ধারণ করে কিন্তু মেঘ হয়ে যায় না। তেমনি আত্মস্বরূপ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃকে প্রত্যক্ষ করে কিন্তু তাদের দ্বারা নিজের চূড়ান্ত পরিচয় নির্ধারণ করে না।
এই শ্লোকের সার্বিক শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা বাহ্যিক জগতকে নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার মধ্যে নয়, বরং নিজের অন্তর্জগতের বন্ধনকে অতিক্রম করার মধ্যে। গুণের প্রভাব জীবনে থাকবে, দেহ পরিবর্তিত হবে, মন কখনো শান্ত হবে আবার কখনো অশান্ত হবে, সাফল্য ও ব্যর্থতা আসবে, জন্ম ও মৃত্যু জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে উপস্থিত থাকবে। কিন্তু মানুষ যদি নিজের গভীরতম চৈতন্যস্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যেও তার মধ্যে এক অটল শান্তি জন্ম নিতে পারে। গুণানতীত্য ত্রীন্ দেহী দেহসমুদ্ভবান্ জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈর্বিমুক্তোহমৃতমশ্নুতে তাই কেবল একটি ধর্মীয় শ্লোক নয়। এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের এক গভীর আহ্বান। এটি শেখায় যে আমরা কেবল দেহ নই, কেবল মন নই, কেবল আবেগ নই এবং কেবল পরিবর্তনশীল জীবনের ঘটনাবলিও নই। আমাদের গভীরতম সত্তাকে যখন এই পরিবর্তনের সাক্ষী হিসেবে উপলব্ধি করা যায়, তখন গুণের বন্ধন শিথিল হয়, জন্ম ও মৃত্যুর ভয় নতুন অর্থ লাভ করে এবং মানুষ অন্তরের সেই স্বাধীনতার স্বাদ পায় যাকে গীতা অমৃতত্ব বলে অভিহিত করেছে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!