ভগবদ্গীতা ১৪.২১ — গুণাতীত ব্যক্তির লক্ষণ, আচরণ ও তিন গুণ অতিক্রমের উপায়
অর্জুন উবাচ
কৈর্লিঙ্গৈস্ত্রীন্ গুণানেতানতীতো ভবতি প্রভো।
কিমাচারঃ কথং চৈতাংস্ত্রীন্ গুণানতিবর্ততে।।২১।।
অনুবাদঃ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- হে প্রভু! যিনি এই তিন গুণের অতীত, তিনি কি কি লক্ষণ দ্বারা জ্ঞাত হন? তাঁর আচরণ কি রকম? এবং তিনি কিভাবে এই তিন গুণ অতিক্রম করেন?।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের একুশতম শ্লোকটি মানুষের আত্মপরিচয়, মানসিক প্রকৃতি এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির এক গভীর অনুসন্ধানকে সামনে নিয়ে আসে। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করেন, কোন লক্ষণের দ্বারা বোঝা যায় যে একজন মানুষ সত্ত্ব, রজস ও তমস এই তিন গুণকে অতিক্রম করেছেন, তাঁর আচরণ কেমন হয় এবং কীভাবে একজন মানুষ এই তিন গুণের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন। প্রশ্নটি বাহ্যিকভাবে একজন গুণাতীত মানুষের পরিচয় জানার জন্য হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ আরও গভীর। এখানে মানুষের নিজের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে অনুসন্ধান রয়েছে। মানুষ কি তার মন, আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, কর্মপ্রবণতা এবং মানসিক পরিবর্তনের সমষ্টি, নাকি তার মধ্যে এমন কোনো গভীর চৈতন্য রয়েছে যা এসব পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করতে পারে, এই প্রশ্নের দিকে শ্লোকটি আমাদের নিয়ে যায়।
শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো কৈর্লিঙ্গৈঃ। এটি কৈঃ এবং লিঙ্গৈঃ এর সমন্বয়ে গঠিত। কৈঃ অর্থ কোন কোন দ্বারা এবং লিঙ্গৈঃ অর্থ লক্ষণ, চিহ্ন বা নিদর্শন দ্বারা। এখানে লিঙ্গ বলতে শারীরিক অর্থ বোঝানো হয়নি। কোনো অন্তর্গত সত্যকে যে লক্ষণের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়, সেই অর্থে লিঙ্গ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্জুন জানতে চাইছেন এমন কোন লক্ষণ আছে যার মাধ্যমে একজন মানুষের অন্তর্গত আধ্যাত্মিক অবস্থাকে বোঝা যায়। অর্থাৎ সত্যিকারের জ্ঞান কেবল মানুষের মুখের কথায় প্রকাশ পায় না, তার জীবনযাপন ও আচরণের মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটে।
এরপর এসেছে ত্রীন্ গুণান্। ত্রীন্ অর্থ তিন এবং গুণান্ অর্থ গুণসমূহ। গীতার দর্শনে এই তিন গুণ হলো সত্ত্ব, রজস ও তমস। সত্ত্বের মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, সাম্য, শান্তি ও আলোর প্রবণতা। রজসের মধ্যে রয়েছে কর্মচাঞ্চল্য, আকাঙ্ক্ষা, ভোগপ্রবণতা, প্রতিযোগিতা, অস্থিরতা ও অর্জনের তীব্র বাসনা। তমসের মধ্যে রয়েছে জড়তা, অজ্ঞান, অলসতা, মোহ, উদাসীনতা ও অবচেতনতার প্রবণতা। মানুষের দেহ ও মন প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই তিন গুণ তার চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশিত হয়। কখনো মানুষ শান্ত ও জ্ঞানময় হয়, কখনো কর্মচঞ্চল ও আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ হয়, আবার কখনো অলসতা ও অজ্ঞানের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়। এই পরিবর্তনশীল অবস্থাগুলোকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে না করাই গুণাতীততার দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
অতীত শব্দটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে অতিক্রম করে যাওয়া বা কোনো সীমার ঊর্ধ্বে ওঠার ভাব রয়েছে। গুণাতীত হওয়া মানে গুণগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা নয় এবং মানুষের স্বাভাবিক মানসিক কার্যকলাপ বন্ধ করে দেওয়াও নয়। এর অর্থ হলো গুণের কার্যকলাপকে জেনে তার দ্বারা সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ না থাকা। যেমন একজন মানুষ রাগ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু রাগকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে না করেও তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারেন। তিনি আনন্দ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু আনন্দের সঙ্গে এমনভাবে আটকে না যেতে পারেন যাতে আনন্দ চলে গেলে তাঁর অস্তিত্বও অর্থহীন হয়ে পড়ে। তিনি দুঃখ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু দুঃখকে নিজের চূড়ান্ত সত্তা মনে না করতে পারেন। এই অবস্থায় মানুষ অনুভূতিকে অস্বীকার করে না, বরং অনুভূতির সাক্ষী হয়ে ওঠে।
প্রভো শব্দটি প্রভু শব্দের সম্বোধন রূপ। অর্জুন শ্রদ্ধার সঙ্গে কৃষ্ণকে প্রভু বলে সম্বোধন করছেন। এর মধ্যে কেবল ভক্তি নেই, জ্ঞান লাভের জন্য নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার মনোভাবও রয়েছে। অর্জুন বুঝতে পারছেন যে প্রকৃতির গুণত্রয়ের প্রকৃতি এবং তার অতীত সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য এমন একজন জ্ঞানীর নির্দেশ প্রয়োজন যিনি নিজে সেই সত্যে প্রতিষ্ঠিত। তাই তাঁর প্রশ্নের মধ্যে আত্মসমর্পণ, অনুসন্ধান এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।
শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ কিমাচারঃ। এটি কিম্ এবং আচারঃ এর সমন্বয়ে গঠিত। কিম্ অর্থ কী এবং আচার অর্থ আচরণ, চলন, জীবনযাপন বা ব্যবহার। আচার শব্দের সঙ্গে চলার ধারণা যুক্ত। তাই কিমাচারঃ এর অর্থ হলো তাঁর আচরণ কেমন। অর্জুনের প্রশ্নের এই অংশটি অত্যন্ত গভীর কারণ তিনি শুধু জানতে চাননি একজন গুণাতীত মানুষ কী চিন্তা করেন। তিনি জানতে চেয়েছেন তাঁর জীবনযাপন কেমন হয়। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক উপলব্ধির সত্যতা মানুষের দৈনন্দিন আচরণে কীভাবে প্রকাশ পায়, সেটিও এই প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত।
কথং শব্দের অর্থ কীভাবে। এই একটি শব্দ শ্লোকটির অনুসন্ধানকে আরও ব্যবহারিক করে তোলে। অর্জুন শুধু জানতে চান না গুণাতীত মানুষকে কীভাবে চেনা যায়। তিনি জানতে চান কীভাবে সেই অবস্থায় পৌঁছানো যায়। এখানে জ্ঞান ও সাধনার মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনো সত্যকে জানা এক বিষয় এবং সেই সত্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা আরেক বিষয়। গীতার শিক্ষা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়। তা জীবনের বাস্তব পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।
গুণাতীত হওয়ার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে হলে তিন গুণের প্রকৃতিকে বুঝতে হয়। সত্ত্ব মানুষের মধ্যে জ্ঞান, স্বচ্ছতা ও শান্তি সৃষ্টি করে। কিন্তু সত্ত্বের মধ্যেও সূক্ষ্ম আসক্তি থাকতে পারে। একজন ব্যক্তি নিজের জ্ঞান, পবিত্রতা বা শান্তির প্রতি অহংকারবোধ করতে পারেন। রজস মানুষকে কর্মের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু কর্মের সঙ্গে ফলের আকাঙ্ক্ষা যুক্ত হলে বন্ধন সৃষ্টি হয়। তমস মানুষকে জড়তা ও অজ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। ফলে সে নিজের সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে পারে না। গুণাতীত ব্যক্তি এই তিন অবস্থাকেই পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি সত্ত্বকে পছন্দ করেন এবং রজস বা তমসকে ঘৃণা করেন এমন নয়। বরং তিনি উপলব্ধি করেন যে এগুলো প্রকৃতির বিভিন্ন কার্যপ্রবাহ।
এই শিক্ষা মানুষের মনোজগতের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মধ্যে প্রতিদিন নানা ধরনের চিন্তা ও অনুভূতি আসে। কখনো মন অত্যন্ত শান্ত থাকে, কখনো প্রবল আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হয়, আবার কখনো কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করে না। সাধারণত মানুষ বলে আমি শান্ত, আমি অস্থির, আমি অলস, আমি রাগী বা আমি দুঃখী। কিন্তু গীতার গভীর দৃষ্টিতে এই পরিচয়গুলো সবই পরিবর্তনশীল। আজ যে মানুষ অস্থির, কাল সে শান্ত হতে পারে। যে ব্যক্তি আজ দুর্বল বোধ করছে, আগামীকাল সে প্রবল শক্তির অনুভূতি লাভ করতে পারে। তাহলে এই পরিবর্তনশীল অবস্থাগুলোর মধ্যে কোনটি তার প্রকৃত পরিচয়। এই প্রশ্ন থেকেই সাক্ষীচেতনার ধারণা উদ্ভাসিত হয়।
একজন মানুষ যখন নিজের মধ্যে রাগের উদয়কে লক্ষ্য করে বলতে পারেন যে আমার মধ্যে এখন রাগের একটি প্রবল প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে, তখন তিনি রাগের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম না হয়ে রাগকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। একইভাবে আকাঙ্ক্ষা, ভয়, অলসতা, আনন্দ, দুঃখ বা অহংকারের ক্ষেত্রেও সচেতন পর্যবেক্ষণ একটি দূরত্ব তৈরি করে। এই দূরত্ব কোনো নিষ্ঠুর বিচ্ছিন্নতা নয়। বরং এটি সচেতন স্বাধীনতা। গুণাতীততার পথে এই সাক্ষীভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে শ্লোকটি প্রকৃতি এবং পুরুষের পার্থক্যকে সামনে আনে। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং তার মধ্যে গুণত্রয়ের কার্যকলাপ ঘটে। আত্মা বা পুরুষ সেই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষদর্শী। মানুষ যখন নিজের সত্য পরিচয়কে কেবল দেহ ও মনের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে তখন সে প্রকৃতির গুণের সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে চিন্তা পরিবর্তিত হচ্ছে, অনুভূতি পরিবর্তিত হচ্ছে, শরীর পরিবর্তিত হচ্ছে এবং জীবনের পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন সে সেই পরিবর্তনের সাক্ষীস্বরূপ চেতনার দিকে ফিরে তাকাতে শুরু করে। গীতার আধ্যাত্মিক দর্শনে এই প্রত্যাবর্তনই আত্মজিজ্ঞাসার অন্যতম প্রধান পথ।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিতেও তিন গুণকে মানুষের অন্তর্জগতের তিন শক্তি হিসেবে দেখা যায়। সত্ত্ব যেন অন্তরের আলো, রজস যেন প্রবল গতি এবং তমস যেন অন্ধকার ও স্থবিরতা। মানুষের জীবন কখনো আলোয় পূর্ণ হয়, কখনো আকাঙ্ক্ষার প্রবল স্রোতে ছুটে চলে, আবার কখনো অন্ধকার ও জড়তার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। কিন্তু মানুষ যদি এই তিন অবস্থার পরিবর্তনকে সচেতনভাবে দেখতে শেখে, তাহলে সে বুঝতে পারে যে তার অন্তর্জগতের কোনো একটি সাময়িক অবস্থা তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়। যেমন আকাশে কখনো মেঘ থাকে, কখনো বৃষ্টি হয়, কখনো আকাশ পরিষ্কার হয়, কিন্তু আকাশ নিজে কোনো একটি মেঘের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়, তেমনি চেতনার গভীরতাও কোনো একটি সাময়িক মানসিক অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অসংখ্য প্রয়োগ রয়েছে। একজন মানুষ কোনো কাজে ব্যর্থ হয়ে যদি মনে করেন আমি ব্যর্থ, আমি অযোগ্য, আমার জীবনের কোনো মূল্য নেই, তাহলে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয়কে এক করে ফেলেন। কিন্তু তিনি যদি উপলব্ধি করতে পারেন যে আমার জীবনে এখন ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা এসেছে এবং এই অভিজ্ঞতাও পরিবর্তনশীল, তাহলে তাঁর মধ্যে একটি গভীর মানসিক স্বাধীনতা জন্ম নিতে পারে। একইভাবে সাফল্যের ক্ষেত্রেও যদি কেউ মনে করেন আমার সাফল্যই আমার সম্পূর্ণ পরিচয়, তাহলে সাফল্যের প্রতি আসক্তি জন্ম নেয়। গুণাতীততার শিক্ষা মানুষকে সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়ের মধ্যেই অন্তরের ভারসাম্য খুঁজে নিতে আহ্বান জানায়।
এই শ্লোকের একটি বিশেষ সৌন্দর্য হলো অর্জুনের প্রশ্নের মধ্যে আধ্যাত্মিক জীবনের তিনটি মৌলিক অনুসন্ধান একত্রিত হয়েছে। প্রথমত তিনি জানতে চান গুণাতীত মানুষকে কীভাবে চেনা যায়। দ্বিতীয়ত তিনি জানতে চান তাঁর আচরণ কেমন হয়। তৃতীয়ত তিনি জানতে চান কীভাবে একজন মানুষ নিজেই গুণত্রয় অতিক্রম করতে পারে। অর্থাৎ পরিচয়, আচরণ এবং সাধনা এই তিনটি স্তর এখানে একই আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের অংশ হয়ে উঠেছে।
গীতার দৃষ্টিতে গুণাতীততা কোনো কৃত্রিম ব্যক্তিত্ব তৈরি করা নয়। এটি নিজের প্রকৃত স্বরূপের দিকে প্রত্যাবর্তন। মানুষ যখন বুঝতে শুরু করে যে তার মধ্যে যে রাগ আসে তা পরিবর্তনশীল, যে আকাঙ্ক্ষা আসে তাও পরিবর্তনশীল, যে দুঃখ আসে সেটিও পরিবর্তনশীল এবং যে আনন্দ আসে সেটিও পরিবর্তনশীল, তখন সে পরিবর্তনের পেছনে থাকা অপরিবর্তনীয় সত্যের সন্ধান করতে পারে। এই অনুসন্ধান তাকে ধীরে ধীরে বাহ্যিক পরিচয় থেকে অন্তরের গভীর পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়।
অতএব শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক কেবল একটি আধ্যাত্মিক ব্যক্তির লক্ষণ সম্পর্কে প্রশ্ন নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের নিজের সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন। আমি কে। আমার চিন্তাই কি আমি। আমার আবেগই কি আমি। আমার সাফল্য ও ব্যর্থতাই কি আমি। আমার আনন্দ ও দুঃখই কি আমার সম্পূর্ণ পরিচয়। নাকি এই সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও এমন এক চেতনা রয়েছে যা সবকিছুকে প্রত্যক্ষ করছে। গীতার শিক্ষা মানুষকে সেই গভীরতর পরিচয়ের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে চায়।
শেষ পর্যন্ত গুণাতীত হওয়ার অর্থ প্রকৃতি থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রকৃতির কার্যকলাপকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করে তার দ্বারা নিজের অন্তর্গত স্বাধীনতাকে নির্ধারিত হতে না দেওয়া। সত্ত্বের আলো, রজসের গতি এবং তমসের অন্ধকার মানুষের জীবনে আসবে এবং যাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি এই ওঠানামার মধ্যে থেকেও নিজের অন্তরের সাক্ষীসত্তাকে উপলব্ধি করতে শেখেন, তাঁর মধ্যে ধীরে ধীরে এক গভীর সমতা জন্ম নেয়। তখন আনন্দ তাঁকে অন্ধ করে না, দুঃখ তাঁকে ভেঙে দেয় না, সাফল্য তাঁকে অহংকারী করে না এবং ব্যর্থতা তাঁকে নিজের মূল্য ভুলিয়ে দেয় না। তিনি জীবনের পরিবর্তনশীলতার মধ্যে থেকেও একটি গভীর অন্তর্গত স্বাধীনতার স্বাদ পান। এই কারণেই অর্জুনের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একজন গুণাতীত মানুষের পরিচয় জানার প্রশ্নের চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে। এটি মানুষের নিজের অন্তর্নিহিত স্বাধীন সত্তাকে আবিষ্কারের প্রশ্ন। গীতার এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গুণের প্রবাহকে থামানোই মুক্তি নয়, বরং গুণের প্রবাহকে জেনে তার ঊর্ধ্বে নিজের চৈতন্যস্বরূপকে উপলব্ধি করাই প্রকৃত মুক্তির পথ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!