সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৪.২২ — গুণের প্রকাশে দ্বেষহীনতা ও গুণের নিবৃত্তিতে আকাঙ্ক্ষাহীনতার শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


প্রকাশং চ প্রবৃত্তিং চ মোহমেব চ পান্ডব।
ন দ্বেষ্টি সংপ্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙ্ক্ষতি।।২২।।

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পান্ডব! ‍যিনি প্রকাশ, প্রবৃত্তি ও মোহ আবির্ভূত হলে দ্বেষ করেন না এবং সেগুলি নিবৃত্ত হলেও আকাঙ্ক্ষা করেন না; যিনি উদাসীনের মতো অবস্থিত থেকে গুণসমূহের দ্বারা বিচলিত হন না, কিন্তু গুণসমূহ স্বীয় কার্যে প্রবৃত্ত হয়, এভাবেই জেনে অবস্থান করেন এবং তার দ্বারা চঞ্চলতা প্রাপ্ত হন না; যিনি আত্মস্বরূপে অবস্থিত এব্ং সুখ ও দুঃখে সম-ভাবাপন্ন; যিনি মাটির ঢেলা, পাথর ও স্বর্ণে সমদৃষ্টি-সম্পন্ন; যিনি প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয়ে সম-ভাবাপন্ন; যিনি ধৈর্যশীল এবং নিন্দা, স্তুতি, মান ও অপমানে সম-ভাবাপন্ন; যিনি শত্রু ও মিত্র উভয়ের প্রতি সমভাব-সম্পন্ন এবং যিনি সমস্ত কর্মোদ্যম পরিত্যাগী- তিনিই গুণাতীত বলে কথিত হন।

ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃতির তিন গুণ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এবং মানুষের চেতনা ও আচরণের ওপর তাদের প্রভাব অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক হলো

এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ এমন এক ব্যক্তির মানসিক অবস্থার কথা বলেছেন যিনি তিন গুণের কার্যপ্রকাশকে অতিক্রম করেছেন। তাঁর মধ্যে যখন প্রকাশ, প্রবৃত্তি অথবা মোহের কোনো একটি প্রবল হয়ে ওঠে তখন তিনি তাকে ঘৃণা করেন না এবং যখন সেই অবস্থা নিবৃত্ত হয় তখন আবার তার প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও করেন না। এই শিক্ষার মধ্যে মানুষের অন্তর্জীবন, আত্মপরিচয়, মানসিক স্বাধীনতা এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।

এখানে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো প্রকাশ। সংস্কৃত প্রকাশ শব্দটি প্র এবং কাশ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। কাশ ধাতুর মূল অর্থ হলো জ্বলা, দীপ্ত হওয়া, আলো দেওয়া অথবা উজ্জ্বল হয়ে ওঠা। প্র উপসর্গ যুক্ত হয়ে প্রকাশ শব্দে বিশেষভাবে উদ্ভাসিত হওয়া, স্পষ্ট হয়ে ওঠা অথবা কোনো কিছু আলোয় নিয়ে আসার অর্থ প্রকাশ পায়। সাধারণ অর্থে প্রকাশ বলতে কোনো বিষয়ের প্রকাশিত হওয়া বা দৃশ্যমান হওয়াকে বোঝায়। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে প্রকাশের অর্থ আরও গভীর। এখানে প্রকাশ হলো জ্ঞানের আলো, চেতনার স্বচ্ছতা এবং সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতার উদ্ভাসন। সত্ত্বগুণ যখন প্রবল হয় তখন মানুষের বুদ্ধি অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার হয়, জ্ঞান লাভের আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং সত্য ও অসত্যের পার্থক্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা জাগ্রত হয়। তাই প্রকাশ এখানে শুধু বাহ্যিক আলো নয়, মানুষের অন্তরের আলোর প্রতীক।

এরপর এসেছে প্রবৃত্তি শব্দটি। প্রবৃত্তি সংস্কৃত প্র এবং বৃত ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। বৃত ধাতুর মধ্যে চলা, ঘোরা, কোনো কার্যধারায় প্রবেশ করা অথবা সক্রিয় হওয়ার ধারণা রয়েছে। প্র উপসর্গের মাধ্যমে এই শব্দে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে যাওয়া এবং কোনো কাজে প্রবৃত্ত হওয়ার ভাব প্রকাশিত হয়েছে। তাই প্রবৃত্তির সাধারণ অর্থ হলো কর্মপ্রবণতা, উদ্যোগ, সক্রিয়তা এবং কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা। গীতার আলোচনায় প্রবৃত্তি রজোগুণের সঙ্গে সম্পর্কিত। রজঃ মানুষের মধ্যে কর্মের তাড়না সৃষ্টি করে। মানুষ তখন কিছু অর্জন করতে চায়, পরিবর্তন আনতে চায়, সাফল্য পেতে চায় এবং নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে চায়। এই কর্মশক্তি না থাকলে জগতের কোনো কার্যক্রমই এগিয়ে চলত না। তাই প্রবৃত্তি নিজে কোনো অশুভ বিষয় নয়। কিন্তু যখন কর্মপ্রবণতার সঙ্গে অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা, ফলের প্রতি আসক্তি, প্রতিযোগিতা, অহংকার এবং অস্থিরতা যুক্ত হয় তখন রজোগুণ মানুষকে বন্ধনের দিকে নিয়ে যায়।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো মোহ। মোহ শব্দটি সংস্কৃত মুহ ধাতু থেকে উদ্ভূত। মুহ ধাতুর অর্থ বিভ্রান্ত হওয়া, অজ্ঞতায় আচ্ছন্ন হওয়া, বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান হারানো অথবা ভুল ধারণায় আবদ্ধ হওয়া। মোহের মধ্যে তাই শুধু কোনো ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণ বোঝায় না। এর গভীর অর্থ হলো এমন এক মানসিক আবরণ যার কারণে মানুষ বাস্তবতাকে যথাযথভাবে দেখতে পারে না। তমোগুণের প্রভাবে মানুষের চেতনা যখন আচ্ছন্ন হয়ে যায় তখন সে সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। তার মধ্যে অলসতা, জড়তা, উদাসীনতা, অজ্ঞতা এবং বিভ্রান্তি বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই মোহ হলো চেতনার অন্ধকারের প্রতীক।

এই তিনটি শব্দকে পাশাপাশি রাখলে মানবজীবনের একটি সম্পূর্ণ মানসিক চিত্র আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। প্রকাশ হলো চেতনার আলো, প্রবৃত্তি হলো কর্মের গতি এবং মোহ হলো চেতনার আবরণ। মানুষের জীবনে কখনো জ্ঞান ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়, কখনো কর্মের প্রবল তাড়না দেখা দেয় এবং কখনো ক্লান্তি, অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি তাকে আচ্ছন্ন করে। এই পরিবর্তনশীল অবস্থাগুলোকেই প্রকৃতির তিন গুণের কার্যপ্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।

শ্লোকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ন দ্বেষ্টি সংপ্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙ্ক্ষতি। এর অর্থ হলো গুণগুলোর প্রকাশ যখন ঘটে তখন গুণাতীত ব্যক্তি তাদের ঘৃণা করেন না এবং যখন সেই প্রকাশ নিবৃত্ত হয় তখন তিনি তার প্রত্যাবর্তন কামনা করেন না। সাধারণ মানুষের মানসিকতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। মানুষ সাধারণত আনন্দদায়ক অবস্থাকে ধরে রাখতে চায় এবং অপ্রিয় অবস্থাকে দ্রুত দূরে সরিয়ে দিতে চায়। জ্ঞান ও স্বচ্ছতা এলে সে চায় এই অবস্থা যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়। কর্মে সাফল্য এলে সে আরও সাফল্য কামনা করে। আবার অন্ধকার, ক্লান্তি বা বিভ্রান্তি এলে সে নিজের অবস্থাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। এর ফলে মন ক্রমাগত আকর্ষণ ও বিকর্ষণের মধ্যে দোলায়মান থাকে।

গুণাতীত মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো তিনি এই দোলাচলের ঊর্ধ্বে উঠতে শেখেন। তিনি জানেন যে প্রকৃতির গুণসমূহ পরিবর্তনশীল। কখনো সত্ত্ব প্রবল হবে, কখনো রজঃ এবং কখনো তমঃ। কিন্তু আত্মা এই পরিবর্তনের দ্বারা প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তিত হয় না। দেহ পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, আবেগ পরিবর্তিত হয় এবং কর্মপ্রবণতাও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যে চৈতন্য এই সমস্ত পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে তার প্রকৃতি পরিবর্তনশীল নয়। এই উপলব্ধিই গুণাতীত অবস্থার ভিত্তি।

এই কারণে শ্লোকটির মধ্যে সাক্ষীভাবের একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। সাক্ষীভাব বলতে বোঝায় নিজের মধ্যে যা ঘটছে তাকে সচেতনভাবে প্রত্যক্ষ করা, কিন্তু প্রতিটি অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে এক করে না ফেলা। মানুষের মনে রাগ এসেছে মানেই আমি রাগ। মনে অলসতা এসেছে মানেই আমি অলস। মনে অস্থিরতা এসেছে মানেই আমি অস্থির। এই ধরনের আত্মপরিচয় আসলে পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থাকে স্থায়ী পরিচয়ে পরিণত করে। গীতার দৃষ্টিতে মানুষ যদি উপলব্ধি করতে পারে যে এগুলো প্রকৃতির গুণের কার্যপ্রকাশ, তাহলে তার মধ্যে এক ধরনের অন্তর্গত স্বাধীনতা জন্ম নিতে পারে।

সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই শিক্ষার তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি তিন গুণের সমন্বয়ে গঠিত। সত্ত্ব প্রকাশ ও জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত, রজঃ কর্ম ও গতির সঙ্গে যুক্ত এবং তমঃ আচ্ছাদন ও জড়তার সঙ্গে যুক্ত। অপরদিকে পুরুষ হলো চৈতন্যস্বরূপ সাক্ষী। প্রকৃতির পরিবর্তন পুরুষের প্রকৃত স্বরূপকে পরিবর্তন করে না। মানুষ যখন প্রকৃতির গুণের সঙ্গে নিজের চৈতন্যকে এক করে দেখে তখন বন্ধন সৃষ্টি হয়। আর যখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে গুণসমূহ প্রকৃতির স্তরে কাজ করছে এবং আত্মা তাদের সাক্ষী তখন মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। দেহ, মন, বুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয় প্রকৃতির অধীন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন মানসিক অবস্থা উদ্ভূত হয় এবং বিলীন হয়। কিন্তু আত্মা এসব পরিবর্তনের প্রত্যক্ষকারী। যেমন আকাশের মধ্যে মেঘ আসে এবং চলে যায় কিন্তু আকাশ মেঘের দ্বারা প্রকৃতিগতভাবে পরিবর্তিত হয় না, তেমনই চৈতন্যের মধ্যে চিন্তা, আবেগ ও মানসিক অবস্থার প্রকাশ ঘটলেও চৈতন্য নিজে সেসব পরিবর্তনের দ্বারা আবদ্ধ হয় না। এই উপলব্ধিই মানুষকে নিজের গভীরতম সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শিক্ষার বিশেষ মূল্য রয়েছে। মানুষের মন কখনো অত্যন্ত পরিষ্কার ও সৃজনশীল থাকে, কখনো কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে এবং কখনো ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। যদি মানুষ প্রতিটি মানসিক অবস্থাকে নিজের স্থায়ী পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করে তবে সে নিজের মন দ্বারা সহজেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি সে বুঝতে শেখে যে মানসিক অবস্থা পরিবর্তনশীল এবং এগুলোকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় তাহলে তার মধ্যে মানসিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়। এই অর্থে গীতার সাক্ষীভাব আধুনিক আত্মসচেতনতার ধারণার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে অত্যন্ত স্বচ্ছ মন নিয়ে পড়াশোনা করছে। তার চিন্তা পরিষ্কার এবং শেখার আগ্রহ প্রবল। এটি প্রকাশের একটি প্রতীকী উদাহরণ। কিছু সময় পরে সে কঠোর পরিশ্রমে নিমগ্ন হলো এবং ভালো ফল পাওয়ার জন্য প্রবল উদ্যমে কাজ করতে লাগল। এটি প্রবৃত্তির প্রকাশ। দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের পরে তার মন ক্লান্ত হয়ে গেল এবং পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ ও বিভ্রান্তি দেখা দিল। এটি মোহের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সাধারণ মানুষ এই তিন অবস্থার মধ্যে প্রবলভাবে ওঠানামা করে এবং প্রতিটি অবস্থার সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। কিন্তু গুণাতীত মানুষ জানেন যে এগুলো আসছে এবং চলে যাচ্ছে। তিনি সচেতন থাকেন যে এগুলো তার অভিজ্ঞতা, কিন্তু তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়।

এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে আধ্যাত্মিকতা মানে জীবনের পরিবর্তনশীল অবস্থাকে জোর করে বন্ধ করে দেওয়া নয়। জ্ঞানী ব্যক্তি সবসময় আনন্দিত থাকবেন, কখনো ক্লান্ত হবেন না, কখনো কর্মচঞ্চল হবেন না অথবা কখনো বিভ্রান্ত হবেন না এমন নয়। বরং পার্থক্য হলো তিনি এসব অবস্থার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে এক করে দেখেন না। তিনি জানেন যে প্রকৃতির গুণসমূহ তাদের নিজস্ব নিয়মে কাজ করছে। তাই গুণের প্রকাশ ঘটলে তিনি অহংকারে ভেসে যান না এবং গুণের পরিবর্তন ঘটলে হতাশায় ভেঙে পড়েন না।

প্রকাশ এখানে জ্ঞানের প্রতীক, প্রবৃত্তি কর্মশক্তির প্রতীক এবং মোহ অজ্ঞতার প্রতীক। এই তিনটি প্রতীকের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের একটি গভীর সত্য প্রকাশ পায়। মানুষ কখনো আলোকিত হয়, কখনো কর্মের মধ্যে প্রবলভাবে নিমগ্ন হয় এবং কখনো নিজের অজ্ঞতা ও জড়তার মধ্যে হারিয়ে যায়। কিন্তু তার গভীরতম সত্তা এই পরিবর্তনের অতীত। তাই শ্লোকটি মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থাকে আঁকড়ে ধরতে নয়, বরং সমস্ত অবস্থার মধ্যেও নিজের চৈতন্যস্বরূপকে উপলব্ধি করতে আহ্বান জানায়।

এই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন জ্ঞান ও স্বচ্ছতা আসে তখন তাকে সৎ কাজে ব্যবহার করতে হবে। যখন কর্মশক্তি আসে তখন তাকে শুদ্ধ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করতে হবে। যখন তমসিক জড়তা আসে তখন সচেতনতার মাধ্যমে তা অতিক্রম করার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাই যেন অহংকার বা আত্মঘৃণার কারণ না হয়। নিজের মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটছে তাকে প্রত্যক্ষ করা এবং সেই পরিবর্তনের গভীরে অবস্থিত অপরিবর্তনীয় চৈতন্যকে উপলব্ধি করা হলো এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোকের গভীরতম বার্তা হলো মানুষ তার পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থা নয়। প্রকাশ আসে এবং চলে যায়। প্রবৃত্তি জাগে এবং স্তিমিত হয়। মোহ জন্মায় এবং দূর হয়ে যায়। কিন্তু যে চৈতন্য এই সমস্ত কিছুর আগমন ও প্রস্থান প্রত্যক্ষ করে তার সত্য স্বরূপ এই পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে। তাই গুণাতীত হওয়া মানে প্রকৃতির গুণকে ধ্বংস করা নয়, বরং তাদের কার্যকলাপকে জেনে তাদের দ্বারা নিজের আত্মপরিচয়কে আবদ্ধ না করা। যে ব্যক্তি প্রকাশকে ঘৃণা করে না, প্রবৃত্তিকে আঁকড়ে ধরে না এবং মোহের উপস্থিতিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে না, সেই ব্যক্তি ধীরে ধীরে অন্তরের স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হয়। এই কারণেই ভগবদ্গীতার এই শ্লোক কেবল তিনটি সংস্কৃত শব্দের ব্যাখ্যা নয়, বরং মানুষের অন্তর্জীবনের একটি গভীর মানচিত্র। এটি আমাদের শেখায় যে জীবনের আলো ও অন্ধকার, কর্ম ও স্থিরতা, জ্ঞান ও অজ্ঞতা সবই পরিবর্তনশীল। সত্যিকারের মুক্তি তখনই আসে যখন মানুষ এই পরিবর্তনের মাঝেও নিজের অন্তর্গত চৈতন্যকে চিনতে শেখে এবং উপলব্ধি করে যে সে প্রকৃতির গুণের দ্বারা পরিচালিত একটি পরিবর্তনশীল মানসিক সত্তা মাত্র নয়, বরং সেই সমস্ত পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 23, 2026 August 23, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি