ভগবদ্গীতা ১৪.২৩ — গুণের ক্রিয়ায় অবিচলতা ও উদাসীন সাক্ষীভাবের শিক্ষা
উদাসীনবদাসীনো গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে।
গুণা বর্তন্ত ইত্যেবং যোহবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে।।২৩।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পান্ডব! যিনি প্রকাশ, প্রবৃত্তি ও মোহ আবির্ভূত হলে দ্বেষ করেন না এবং সেগুলি নিবৃত্ত হলেও আকাঙ্ক্ষা করেন না; যিনি উদাসীনের মতো অবস্থিত থেকে গুণসমূহের দ্বারা বিচলিত হন না, কিন্তু গুণসমূহ স্বীয় কার্যে প্রবৃত্ত হয়, এভাবেই জেনে অবস্থান করেন এবং তার দ্বারা চঞ্চলতা প্রাপ্ত হন না; যিনি আত্মস্বরূপে অবস্থিত এব্ং সুখ ও দুঃখে সম-ভাবাপন্ন; যিনি মাটির ঢেলা, পাথর ও স্বর্ণে সমদৃষ্টি-সম্পন্ন; যিনি প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয়ে সম-ভাবাপন্ন; যিনি ধৈর্যশীল এবং নিন্দা, স্তুতি, মান ও অপমানে সম-ভাবাপন্ন; যিনি শত্রু ও মিত্র উভয়ের প্রতি সমভাব-সম্পন্ন এবং যিনি সমস্ত কর্মোদ্যম পরিত্যাগী- তিনিই গুণাতীত বলে কথিত হন।
ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের তেইশতম শ্লোক মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর সত্যকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্লোকটি হলো, উদাসীনবদাসীনো গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে। গুণা বর্তন্ত ইত্যেবং যোহবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে। এর মূল শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি প্রকৃতির তিন গুণের ক্রিয়ায় বিচলিত হন না, যিনি নিরপেক্ষ দর্শকের মতো নিজের অন্তরে স্থির থাকেন এবং উপলব্ধি করেন যে গুণসমূহই নিজেদের স্বভাব অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করছে, তিনি সেই স্থিতি থেকে বিচ্যুত হন না। এখানে উদাসীন শব্দটি সাধারণ অর্থে অনুভূতিহীন বা দায়িত্বহীন হওয়া বোঝায় না। বরং এর অর্থ হলো আসক্তি ও পক্ষপাত থেকে মুক্ত হয়ে প্রত্যক্ষ করা। যেমন আকাশের সামনে মেঘ আসে এবং চলে যায়, কিন্তু আকাশ নিজে মেঘের আগমন বা প্রস্থানে পরিবর্তিত হয় না, তেমনই আত্মসচেতন মানুষ নিজের মধ্যে উদিত সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, আকাঙ্ক্ষা ভয়, রাগ শান্তি এবং নানা মানসিক অবস্থাকে প্রত্যক্ষ করেন, কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে নিজের প্রকৃত সত্তাকে এক করে দেখেন না।
এই শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো গুণ। সংস্কৃত গুণ শব্দের সাধারণ অর্থ বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব হলেও গীতার দর্শনে এর তাৎপর্য অনেক গভীর। প্রকৃতির তিন মৌলিক প্রবণতা হলো সত্ত্ব, রজস এবং তমস। সত্ত্ব মানুষের মধ্যে জ্ঞান, স্বচ্ছতা, শান্তি, সাম্য এবং আলোকিত বোধ সৃষ্টি করে। রজস প্রকাশ করে গতি, আকাঙ্ক্ষা, কর্মপ্রবণতা, আবেগ, প্রতিযোগিতা এবং অস্থিরতা। তমস প্রকাশ করে জড়তা, মোহ, অলসতা, অজ্ঞতা এবং স্থবিরতা। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণে এই তিন প্রবণতা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়। কখনো মানুষ শান্ত ও জ্ঞানমুখী হয়, কখনো প্রবল আকাঙ্ক্ষায় কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে, আবার কখনো ক্লান্তি ও জড়তার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। সাধারণ মানুষ এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে নিজের পরিচয়কে এমনভাবে যুক্ত করে যে সে বলে আমি সুখী, আমি দুঃখী, আমি রাগী, আমি ব্যর্থ, আমি সফল। কিন্তু গীতার শিক্ষা মানুষকে আরও গভীর একটি উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। সেখানে বলা হচ্ছে, প্রকৃতির গুণসমূহ তাদের নিজস্ব স্বভাব অনুযায়ী ক্রিয়া করছে। মন রাগ অনুভব করতে পারে, কিন্তু রাগই মানুষের সম্পূর্ণ সত্তা নয়। মন দুঃখ পেতে পারে, কিন্তু দুঃখই আত্মার পরিচয় নয়। শরীর ক্লান্ত হতে পারে, কিন্তু ক্লান্তি চৈতন্যের প্রকৃতি নয়।
উদাসীনবৎ শব্দটির মধ্যেও এই গভীর সত্য নিহিত আছে। উদাসীন শব্দের সঙ্গে উদ এবং আসীন এই ভাবগত উপাদানের সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে এমন একজনের ধারণা প্রকাশ পায় যিনি কোনো কিছুর মধ্যে পক্ষপাতপূর্ণভাবে নিমজ্জিত না হয়ে এক ধরনের উচ্চতর অবস্থান থেকে প্রত্যক্ষ করেন। এর সঙ্গে বৎ যুক্ত হয়ে উদাসীনবৎ অর্থ দাঁড়ায় উদাসীনের মতো বা নিরপেক্ষ দর্শকের ন্যায়। এখানে উদাসীনতা কখনোই হৃদয়হীনতা নয়। একজন জ্ঞানী মানুষের মধ্যে সহানুভূতি থাকতে পারে, ভালোবাসা থাকতে পারে, কর্তব্যবোধ থাকতে পারে, কিন্তু তিনি নিজের আবেগের দ্বারা এমনভাবে আবিষ্ট হন না যে সত্যকে দেখতে অক্ষম হয়ে পড়েন। তাঁর মন অনুভব করে, কিন্তু অনুভূতি তাঁকে টেনে নিয়ে যায় না। তিনি কাজ করেন, কিন্তু কর্মের ফলের সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে ফেলেন না। এই অনাসক্ত সচেতনতাই উদাসীনবৎ অবস্থানের প্রকৃত অর্থ।
আসীন শব্দটি এসেছে সংস্কৃত আস ধাতু থেকে, যার অর্থ বসা বা অবস্থান করা। কিন্তু এই শ্লোকে আসীন হওয়া কেবল কোনো স্থানে বসে থাকা নয়। এটি একটি অন্তর্গত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রতীক। মানুষ যখন নিজের মন ও ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে ভেসে যায়, তখন তার কোনো স্থির কেন্দ্র থাকে না। কিন্তু আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি নিজের অন্তর্গত চৈতন্যে প্রতিষ্ঠিত থাকেন। বাইরের পৃথিবীতে কর্ম চলতে থাকে, জীবনের উত্থান পতন চলতে থাকে, প্রশংসা ও নিন্দা আসে, লাভ ও ক্ষতি ঘটে, তবুও তাঁর অন্তরের কেন্দ্র অচঞ্চল থাকে। এই কারণেই শ্লোকে বলা হয়েছে ন বিচাল্যতে। বিচাল্যতে শব্দের মধ্যে চল ধাতুর ভাব রয়েছে, যার অর্থ চলা বা নড়া। বিচালিত হওয়া মানে নিজের স্থির অবস্থান থেকে সরে যাওয়া। যে ব্যক্তি গুণের দ্বারা বিচলিত হন না, তিনি বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের অন্তর্গত সাম্য হারান না।
শ্লোকটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গুণা বর্তন্ত ইত্যেবং। এর অর্থ গুণসমূহই কার্যরত বা গুণসমূহ নিজেদের স্বভাব অনুযায়ী ক্রিয়া করছে। এই একটি ধারণার মধ্যে গীতার সাংখ্য ও বেদান্ত দর্শনের একটি গভীর ভিত্তি নিহিত রয়েছে। মানুষের শরীর, ইন্দ্রিয়, মন এবং প্রকৃতির বিভিন্ন কার্যকলাপ প্রকৃতির অধীন। সত্ত্ব, রজস ও তমস বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়ে মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎকে গঠন করে। অজ্ঞানের কারণে মানুষ মনে করে আমিই সবকিছুর কর্তা এবং আমার মধ্যেই এই সমস্ত পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি উপলব্ধি করেন যে প্রকৃতি তার স্বভাব অনুযায়ী কাজ করছে। তিনি নিজের চৈতন্যস্বরূপকে প্রকৃতির পরিবর্তনশীল ক্রিয়ার সঙ্গে এক করে দেখেন না। এই উপলব্ধিই আসক্তি থেকে মুক্তির একটি প্রধান পথ।
অবতিষ্ঠতি শব্দটিও এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি স্থা ধাতুর সঙ্গে অব উপসর্গের সম্পর্কযুক্ত এবং এর মধ্যে কোনো অবস্থায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার ভাব রয়েছে। গুণাতীত মানুষ কেবল গুণের প্রকৃতি সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞান রাখেন না। তিনি এমন এক জ্ঞানস্থিতিতে প্রতিষ্ঠিত হন যেখানে গুণের উত্থান পতন তাঁর অন্তর্গত পরিচয়কে পরিবর্তিত করতে পারে না। তিনি জানেন যে সুখ আসবে এবং চলে যাবে, দুঃখ আসবে এবং চলে যাবে, প্রশংসা আসবে এবং চলে যাবে, নিন্দাও স্থায়ী নয়। কিন্তু যে চৈতন্য এসব পরিবর্তনের সাক্ষী, তার প্রকৃতি এই পরিবর্তনগুলোর মতো নয়। তাই শ্লোকের শেষের নেঙ্গতে শব্দটি একটি অচঞ্চল অবস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে। বাহ্যিক জগৎ চলমান, মন পরিবর্তনশীল, প্রকৃতি ক্রিয়াশীল, কিন্তু আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি সেই পরিবর্তনের প্রবাহে নিজের সত্য পরিচয় হারান না।
এই শিক্ষা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যখন প্রশংসা পায় তখন সে নিজেকে অসাধারণ মনে করতে পারে এবং যখন সমালোচিত হয় তখন নিজের মূল্য নিয়ে সন্দেহ করতে পারে। সাফল্যের সময় সে অহংকারে ভরে উঠতে পারে এবং ব্যর্থতার সময় হতাশায় নিমজ্জিত হতে পারে। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো এই সমস্ত অবস্থাকে প্রত্যক্ষ করা। সাফল্যকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই এবং ব্যর্থতাকেও অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং বুঝতে হবে যে এগুলো জীবনের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা। একইভাবে রাগকে দমন করারও কথা বলা হচ্ছে না। বরং রাগকে দেখা, তার উদয় উপলব্ধি করা এবং তার দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত না হওয়াই সচেতনতার পথ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন মানুষ বলতে পারেন আমার মনে রাগের উদয় হয়েছে। এই বাক্যটি আমি রেগে আছি এই ধারণা থেকে গভীরভাবে পৃথক। প্রথম অবস্থায় মানুষ রাগকে পর্যবেক্ষণ করছে, দ্বিতীয় অবস্থায় সে রাগের সঙ্গে নিজের পরিচয় এক করে ফেলছে।
সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের অর্থ আরও গভীর। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ হলো চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতি হলো পরিবর্তনশীল জগতের মূল কারণ। প্রকৃতির মধ্যে সত্ত্ব, রজস এবং তমসের পারস্পরিক ক্রিয়ায় বহুবিধ প্রকাশ ঘটে। পুরুষ নিজে মূলত সাক্ষীস্বরূপ। কিন্তু অজ্ঞানের কারণে পুরুষ প্রকৃতির বিকারকে নিজের সঙ্গে এক করে দেখে। ফলে সুখ দুঃখ, জন্ম মৃত্যু, লাভ ক্ষতি এবং নানা পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে। যখন প্রকৃতি ও চৈতন্যের পার্থক্য উপলব্ধি হয়, তখন মানুষ বুঝতে পারে যে পরিবর্তনশীল প্রকৃতি এক জিনিস এবং সেই পরিবর্তনের সাক্ষী চৈতন্য অন্য জিনিস। এই জ্ঞানই তাকে গুণের প্রভাব থেকে মুক্তির পথে নিয়ে যায়।
বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। আত্মা পরিবর্তনশীল শরীর বা মনের সমার্থক নয়। শরীর পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, আবেগ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু চৈতন্য এই পরিবর্তনগুলোর প্রকাশক। তাই আত্মজ্ঞান মানে কোনো নতুন বস্তু অর্জন করা নয়। বরং নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে সে কেবল নিজের চিন্তা নয়, নিজের আবেগ নয়, নিজের সাফল্য নয়, নিজের ব্যর্থতাও নয়, তখন তার মধ্যে একটি সাক্ষীসত্তার জাগরণ ঘটে। এই সাক্ষীসত্তা জীবনের পরিবর্তনকে অস্বীকার করে না, কিন্তু তার দ্বারা নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করে না।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একটি নদীর কথা ভাবা যায়। নদীর জলে ঢেউ ওঠে, স্রোত পরিবর্তিত হয়, কখনো জল শান্ত হয়, কখনো প্রবল হয়ে ওঠে, কিন্তু নদীর গভীরতার একটি স্তর থাকে যেখানে উপরিভাগের অস্থিরতা একইভাবে অনুভূত হয় না। মানুষের মনও তেমন। তার উপরিভাগে চিন্তা, আবেগ, আকাঙ্ক্ষা এবং ভয়ের ঢেউ উঠতে পারে। কিন্তু অন্তরের গভীরে এমন একটি চৈতন্যস্তর রয়েছে যেখানে মানুষ নিজেকে কেবল এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে না। আবার আকাশের উপমাও এখানে প্রযোজ্য। মেঘ আকাশকে ঢেকে দিতে পারে, কিন্তু মেঘ আকাশের প্রকৃতি পরিবর্তন করে না। তেমনি তমসের অন্ধকার, রজসের অস্থিরতা বা সত্ত্বের প্রশান্তি চৈতন্যের প্রকৃত স্বরূপকে পরিবর্তন করে না।
এই শিক্ষা হৃদয়হীন অনাসক্তির শিক্ষা নয়, বরং সচেতন অনাসক্তির শিক্ষা। একজন মানুষ অন্যের দুঃখে সহানুভূতিশীল হতে পারেন, কিন্তু সেই দুঃখে এমনভাবে ডুবে যেতে হবে না যে তিনি সাহায্য করার শক্তিই হারিয়ে ফেলেন। একজন কর্মী নিজের কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করতে পারেন, কিন্তু ফলাফলকে নিজের আত্মমূল্যের একমাত্র মাপকাঠি বানানোর প্রয়োজন নেই। একজন পিতা বা মাতা সন্তানকে ভালোবাসতে পারেন, কিন্তু সন্তানের প্রতিটি সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলতে হবে না যে নিজের শান্তি সম্পূর্ণভাবে অন্যের আচরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই ভারসাম্যই গীতার অনাসক্তির সৌন্দর্য।
মানবজীবনের গভীর সংকটের একটি কারণ হলো পরিবর্তনশীল জিনিসের মধ্যে স্থায়িত্ব খোঁজা। মানুষ চায় সাফল্য স্থায়ী হোক, সম্পর্ক স্থায়ী হোক, শরীর স্থায়ী থাকুক, সুখ স্থায়ী হোক, প্রশংসা স্থায়ী হোক। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম হলো পরিবর্তন। সত্ত্ব, রজস ও তমসের প্রবাহ কখনো একই থাকে না। তাই পরিবর্তনশীল জগতে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা খুঁজতে গেলে মানুষ বারবার হতাশ হয়। গীতার শিক্ষা তখন দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়। পরিবর্তনকে থামানোর চেষ্টা না করে পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের চৈতন্যস্বরূপকে চিনতে শেখো। তখন বাহ্যিক জগতের পরিবর্তন থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ক পাল্টে যাবে।
এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা তাই হলো আত্মপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার। মানুষ যদি নিজের সমস্ত চিন্তা, আবেগ, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং সামাজিক পরিচয়কে নিজের একমাত্র সত্তা মনে করে, তবে সে গুণের ওঠানামার সঙ্গে ক্রমাগত দোলায়িত হবে। কিন্তু যদি সে উপলব্ধি করতে পারে যে প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলছে এবং নিজের অন্তরে একটি সাক্ষীস্বরূপ চৈতন্য রয়েছে, তবে ধীরে ধীরে তার মধ্যে স্থিরতা জন্ম নেবে। তখন আনন্দ এলে সে আনন্দকে গ্রহণ করবে, কিন্তু তাতে নিজেকে হারাবে না। দুঃখ এলে সে দুঃখকে অনুভব করবে, কিন্তু দুঃখের মধ্যেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় খুঁজবে না। রাগ এলে সে রাগকে দেখবে, কিন্তু রাগের দাস হবে না। আকাঙ্ক্ষা এলে সে আকাঙ্ক্ষাকে বুঝবে, কিন্তু আকাঙ্ক্ষাই তাকে পরিচালনা করবে না।
সবশেষে বলা যায়, উদাসীনবদাসীনো গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে এই শ্লোক মানুষের সামনে এমন এক অন্তর্গত স্বাধীনতার আদর্শ স্থাপন করে যেখানে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং জীবনের সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের গভীরতম সত্তায় প্রতিষ্ঠিত থাকা হলো মুক্তির পথ। গুণেরা তাদের স্বভাব অনুযায়ী চলবে, মন কখনো শান্ত হবে, কখনো অস্থির হবে, কখনো জড়তায় আচ্ছন্ন হবে, জীবনে কখনো সাফল্য আসবে, কখনো ব্যর্থতা আসবে, কখনো প্রশংসা আসবে, কখনো নিন্দা আসবে। কিন্তু যে ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে এসবই প্রকৃতির পরিবর্তনশীল প্রবাহ এবং নিজের গভীরে তিনি সেই প্রবাহের সাক্ষী, তিনি আর প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে দোলায়িত করেন না। তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় সমতা, অনাসক্তি, আত্মসচেতনতা এবং অন্তরের স্বাধীনতা। এই কারণেই গীতার এই শ্লোক কেবল একজন গুণাতীত যোগীর পরিচয় নয়, বরং প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি গভীর আত্মজাগরণের আহ্বান। প্রকৃতি চলমান, কিন্তু চৈতন্য সাক্ষী। জীবন পরিবর্তনশীল, কিন্তু আত্মস্বরূপের উপলব্ধিই মানুষকে সেই পরিবর্তনের মধ্যেও অচঞ্চল শান্তির সন্ধান দেয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!