ভগবদ্গীতা ১৪.২৪ — সুখ-দুঃখে সমভাব, প্রিয়-অপ্রিয় ও নিন্দা-প্রশংসায় স্থিরতার শিক্ষা
সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরস্তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ।।২৪।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পান্ডব! যিনি প্রকাশ, প্রবৃত্তি ও মোহ আবির্ভূত হলে দ্বেষ করেন না এবং সেগুলি নিবৃত্ত হলেও আকাঙ্ক্ষা করেন না; যিনি উদাসীনের মতো অবস্থিত থেকে গুণসমূহের দ্বারা বিচলিত হন না, কিন্তু গুণসমূহ স্বীয় কার্যে প্রবৃত্ত হয়, এভাবেই জেনে অবস্থান করেন এবং তার দ্বারা চঞ্চলতা প্রাপ্ত হন না; যিনি আত্মস্বরূপে অবস্থিত এব্ং সুখ ও দুঃখে সম-ভাবাপন্ন; যিনি মাটির ঢেলা, পাথর ও স্বর্ণে সমদৃষ্টি-সম্পন্ন; যিনি প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয়ে সম-ভাবাপন্ন; যিনি ধৈর্যশীল এবং নিন্দা, স্তুতি, মান ও অপমানে সম-ভাবাপন্ন; যিনি শত্রু ও মিত্র উভয়ের প্রতি সমভাব-সম্পন্ন এবং যিনি সমস্ত কর্মোদ্যম পরিত্যাগী- তিনিই গুণাতীত বলে কথিত হন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের এই শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের এমন এক উচ্চতর অবস্থার কথা প্রকাশ করে যেখানে সুখ ও দুঃখ, প্রিয় ও অপ্রিয়, নিন্দা ও প্রশংসা এবং মূল্যবান ও মূল্যহীন বস্তুর পার্থক্য মানুষের অন্তরের স্থিরতাকে আর সহজে বিচলিত করতে পারে না। শ্লোকটির মূল শিক্ষা বাহ্যিক জগতের পার্থক্য অস্বীকার করা নয়, বরং সেই পার্থক্যের মধ্যেও অন্তরের সমতা ও আত্মসচেতনতা অক্ষুণ্ণ রাখা। এখানে শ্রীকৃষ্ণ এমন এক ধীর মানুষের চিত্র তুলে ধরেছেন যিনি জীবনের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার দ্বারা নিজের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করেন না এবং নিজের অন্তর্নিহিত সত্তায় প্রতিষ্ঠিত থেকে জীবনকে প্রত্যক্ষ করেন।
সমদুঃখসুখঃ শব্দটি সম, দুঃখ এবং সুখ এই তিনটি ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। সম অর্থ সমান, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পক্ষপাতহীন। দুঃখ অর্থ বেদনা, কষ্ট বা অপ্রিয় অভিজ্ঞতা এবং সুখ অর্থ আনন্দ, তৃপ্তি বা প্রীতিকর অনুভূতি। তাই সমদুঃখসুখঃ বলতে সেই মানুষকে বোঝানো হয়েছে যিনি সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থার মধ্যেই অন্তরের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন। এর অর্থ এই নয় যে তিনি সুখ অনুভব করেন না অথবা দুঃখে তাঁর হৃদয় স্পর্শিত হয় না। বরং তিনি সুখ ও দুঃখকে জীবনের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন এবং কোনো একটির সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে এক করে ফেলেন না। সাধারণ মানুষ সুখ এলে বলে আমি সুখী এবং দুঃখ এলে বলে আমি দুঃখী। কিন্তু আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে মানুষ উপলব্ধি করতে শেখে যে সুখ ও দুঃখ মনের মধ্যে উদিত ও বিলীন হওয়া অবস্থা এবং এর গভীরে এমন একটি চৈতন্য রয়েছে যা এই পরিবর্তনগুলোর সাক্ষী।
এরপর এসেছে স্বস্থঃ শব্দটি। স্বস্থ শব্দের মধ্যে স্ব এবং স্থ এই দুই ভাব নিহিত রয়েছে। স্ব অর্থ নিজের এবং স্থ অর্থ অবস্থান করা বা প্রতিষ্ঠিত থাকা। সেই অর্থে স্বস্থঃ হলেন তিনি যিনি নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। এই শব্দটির গভীর তাৎপর্য শারীরিক সুস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে নিজের প্রকৃত সত্তায় প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা বলা হয়েছে। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয় গড়ে তোলে পরিবার, সম্পদ, পেশা, সামাজিক মর্যাদা, অন্যের প্রশংসা কিংবা নিজের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু যখন এসব বাহ্যিক পরিচয়ের পরিবর্তনেও মানুষের অন্তরের সত্য পরিচয় অটুট থাকে, তখন সে নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন একটি গাছের পাতা বাতাসে আন্দোলিত হয় কিন্তু তার মূল মাটির গভীরে স্থির থাকে, তেমনই জ্ঞানীর মন জীবনের নানা ঘটনার দ্বারা আলোড়িত হলেও তাঁর অস্তিত্বের গভীরতম ভিত্তি স্থির থাকে।
সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ পদটি আরও গভীর প্রতীক বহন করে। সম অর্থ সমান, লোষ্ট্র অর্থ মাটির ঢেলা, অশ্ম অর্থ পাথর এবং কাঞ্চন অর্থ সোনা। আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ যাঁর কাছে মাটির ঢেলা, পাথর ও সোনা সমান। বাস্তব জীবনে অবশ্যই সোনা ও মাটির ঢেলার ব্যবহারিক মূল্য এক নয়। গীতার বক্তব্যও এই ব্যবহারিক পার্থক্য অস্বীকার করা নয়। এখানে বোঝানো হয়েছে যে বাহ্যিক বস্তুর মূল্য যেন মানুষের অন্তর্গত মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ না করে। সোনা এখানে কেবল একটি ধাতু নয়। এটি সম্পদ, ভোগ, ক্ষমতা, মর্যাদা ও লোভের প্রতীক। মাটির ঢেলা ও পাথর তুলনামূলকভাবে সাধারণ ও মূল্যহীন বস্তুর প্রতীক। যে ব্যক্তি সোনার প্রতি এমন আকর্ষণ অনুভব করেন না যে তার শান্তি, বিবেক ও আত্মপরিচয় সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তিনিই এই সমদৃষ্টির দিকে অগ্রসর হন। তিনি বস্তু ব্যবহার করেন কিন্তু বস্তুর দ্বারা নিজের মূল্য নির্ধারণ করেন না।
এরপর বলা হয়েছে তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ঃ। তুল্য অর্থ সমান, প্রিয় অর্থ যা ভালো লাগে এবং অপ্রিয় অর্থ যা অপছন্দনীয়। মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণ ও বিকর্ষণের মধ্যে চলমান থাকে। যা ভালো লাগে মানুষ তার কাছে যেতে চায় এবং যা ভালো লাগে না তা থেকে দূরে সরে যেতে চায়। কিন্তু এই আকর্ষণ ও বিকর্ষণ যখন অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে তখন মানুষ নিজের স্বাধীনতা হারায়। প্রিয় বস্তু না পেলে অশান্ত হয় এবং অপ্রিয় বস্তু সামনে এলে ক্রোধ, বিরক্তি বা বিদ্বেষে আক্রান্ত হয়। গীতার ধীর ব্যক্তি এই দাসত্ব থেকে মুক্ত। তিনি প্রিয়কে প্রিয় হিসেবে এবং অপ্রিয়কে অপ্রিয় হিসেবে উপলব্ধি করেন, কিন্তু কোনো একটি অভিজ্ঞতাকেই নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্র বানান না। তাঁর সমতা অনুভূতিহীনতা নয়, বরং অনুভূতির ওপর স্বাধীনতা।
এই অবস্থার পরিপূর্ণ প্রতীক হলো ধীর শব্দটি। ধীর মানে স্থিরবুদ্ধি, বিচক্ষণ, সংযত এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি। ধীর ব্যক্তি কেবল বাহ্যিক বিপদের সামনে সাহসী নন। তাঁর প্রকৃত শক্তি হলো তিনি পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেন না। সুখ তাঁকে অহংকারে ভাসিয়ে নিয়ে যায় না এবং দুঃখ তাঁকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেয় না। প্রশংসা তাঁর অহংকে অসীম করে তোলে না এবং নিন্দা তাঁর আত্মমূল্যকে ধ্বংস করে না। তাঁর বুদ্ধি পরিস্থিতির অধীন নয়। বরং তাঁর সচেতনতা পরিস্থিতিকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম।
শ্লোকের শেষ অংশ তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ মানুষের সামাজিক জীবনের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম সত্য প্রকাশ করে। নিন্দা অর্থ সমালোচনা বা দোষারোপ এবং সংস্তুতি অর্থ প্রশংসা বা স্তুতি। সাধারণ মানুষ অন্যের মতামতের ওপর নিজের আত্মমূল্য স্থাপন করে। কেউ প্রশংসা করলে সে নিজেকে মূল্যবান মনে করে এবং কেউ নিন্দা করলে নিজের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধীর ব্যক্তি প্রশংসাকে প্রয়োজনীয় হলে গ্রহণ করেন এবং সমালোচনা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেন, অথচ কোনোটিকেই নিজের প্রকৃত পরিচয়ের চূড়ান্ত বিচার বলে মনে করেন না। প্রশংসা তাঁকে অহংকারী করে না এবং নিন্দা তাঁকে আত্মঘৃণায় নিমজ্জিত করে না। এই অবস্থাই অন্তর্গত স্বাধীনতার একটি গভীর লক্ষণ।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকটি সমত্বের দর্শনকে প্রকাশ করে। মানুষের জীবন পরিবর্তনশীল। সুখ আসে এবং চলে যায়, দুঃখ আসে এবং চলে যায়, সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাস পায়, মানুষের প্রশংসা কখনো পাওয়া যায় আবার কখনো নিন্দার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও মানুষের মধ্যে এমন একটি চৈতন্য রয়েছে যা পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করতে পারে। গীতার আধ্যাত্মিক দর্শনে মানুষ যখন নিজেকে কেবল পরিবর্তনশীল দেহ, মন ও আবেগ হিসেবে না দেখে সেই গভীর চৈতন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে, তখন তার মধ্যে সমত্ব জন্ম নেয়। তখন জীবনের ঘটনাগুলো তার অভিজ্ঞতার অংশ থাকে কিন্তু তার অস্তিত্বের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে না।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। একজন মানুষ যদি প্রশংসা পেলেই অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হন এবং সমালোচনা পেলেই সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন, তাহলে তাঁর আত্মমূল্য বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের মূল্য সম্পর্কে অন্তর্গতভাবে সচেতন, সে প্রশংসা ও সমালোচনা উভয়কেই তথ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। প্রশংসা থেকে উৎসাহ নেওয়া যায় এবং সমালোচনা থেকে নিজের ভুল সংশোধন করা যায়, কিন্তু কোনোটির ওপর নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় নির্ভর করতে হয় না। এই মানসিক স্থিতিই গীতার ধীরতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই শ্লোকে মাটি, পাথর ও সোনা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীক। মাটি সাধারণতার প্রতীক, পাথর দৃঢ়তা ও জড়তার প্রতীক এবং সোনা সম্পদ, আকর্ষণ ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। এই তিনটি বস্তু মানুষের বস্তুজগতের প্রতি বিভিন্ন ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়াকে নির্দেশ করে। মানুষ কখনো কোনো বস্তুকে তুচ্ছ করে, কখনো কোনো বস্তুর প্রতি নিরপেক্ষ থাকে এবং কখনো কোনো বস্তুকে অতিরিক্ত মূল্যবান মনে করে তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। জ্ঞানীর সমদৃষ্টি বস্তুগত ব্যবহারিক পার্থক্যকে অস্বীকার করে না, কিন্তু অন্তরের শান্তিকে কোনো বস্তুর মূল্যের কাছে সমর্পণ করে না।
বাস্তব জীবনে একজন কর্মীর কথা ভাবা যায়। তিনি দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পর একদিন প্রশংসা পেলেন এবং অন্যদিন কোনো ভুলের কারণে সমালোচিত হলেন। সাধারণ মানুষ প্রথম ঘটনায় অহংকারে ভেসে যেতে পারেন এবং দ্বিতীয় ঘটনায় হতাশায় ডুবে যেতে পারেন। কিন্তু ধীর ব্যক্তি প্রশংসা থেকে প্রয়োজনীয় উৎসাহ গ্রহণ করবেন এবং সমালোচনা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করবেন। তিনি কোনোটিকেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় বানাবেন না। একইভাবে একজন ব্যবসায়ী লাভের সময় নিজেকে অসাধারণ মনে করতে পারেন এবং ক্ষতির সময় নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনে করতে পারেন। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো লাভ ও ক্ষতি জীবনের ঘটনা মাত্র। মানুষের প্রকৃত মূল্য এই পরিবর্তনশীল ফলাফলের চেয়ে গভীর।
এই অবস্থাকে সমুদ্রের উপমা দিয়ে সহজে বোঝা যায়। সমুদ্রের উপরিভাগে কখনো ছোট ঢেউ ওঠে, কখনো প্রবল ঝড় আসে। কিন্তু গভীর সমুদ্রের স্তর তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকে। মানুষের মনও সুখ, দুঃখ, লাভ, ক্ষতি, প্রিয়, অপ্রিয়, নিন্দা ও প্রশংসার ঢেউয়ে আন্দোলিত হয়। সাধারণ মানুষ নিজের অস্তিত্বকে সেই ঢেউয়ের সঙ্গে এক করে ফেলে। কিন্তু ধীর ব্যক্তি নিজের চেতনাকে সমুদ্রের গভীরতার মতো স্থির অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর জীবনে অনুভূতি থাকে, কিন্তু অনুভূতির দাসত্ব থাকে না।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের গুরুত্ব আরও গভীর। চতুর্দশ অধ্যায়ে প্রকৃতির তিন গুণের প্রভাব এবং সেই গুণগুলোর ঊর্ধ্বে ওঠার পথ আলোচনা করা হয়েছে। মানুষের মন কখনো স্বচ্ছতা ও জ্ঞানে উজ্জ্বল হয়, কখনো আকাঙ্ক্ষা ও কর্মচাঞ্চল্যে আন্দোলিত হয় এবং কখনো জড়তা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি এই পরিবর্তনগুলিকে প্রত্যক্ষ করতে শেখেন এবং নিজেকে কেবল পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থার সঙ্গে অভিন্ন মনে করেন না, তাঁর মধ্যে গুণাতীত সমত্বের উদ্ভব হয়। তাই সমদুঃখসুখতা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়। এটি আত্মজ্ঞান ও অন্তর্গত স্বাধীনতার একটি লক্ষণ।
মানবজীবনের জন্য এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত বাস্তব। সুখকে উপভোগ করতে হবে কিন্তু সুখের দাস হওয়া যাবে না। দুঃখকে অনুভব করতে হবে কিন্তু দুঃখের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় স্থাপন করা যাবে না। সম্পদকে ব্যবহার করতে হবে কিন্তু সম্পদকে নিজের মূল্যবোধের একমাত্র মাপকাঠি বানানো যাবে না। প্রশংসা শুনতে হবে কিন্তু প্রশংসার ওপর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। সমালোচনা গ্রহণ করতে হবে কিন্তু অন্যের নিন্দাকে নিজের সত্য পরিচয় বলে মেনে নেওয়া যাবে না। জীবন পরিবর্তনশীল হলেও অন্তরের সচেতনতা ক্রমে এমন এক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে মানুষ বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের কেন্দ্রকে হারায় না।
সবকিছু মিলিয়ে সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্ট্রাশ্মকাঞ্চনঃ তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরস্তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ শ্লোকটি মানুষের অন্তর্গত মুক্তির এক গভীর দর্শন প্রকাশ করে। সুখ ও দুঃখের মধ্যে সমতা, নিজের স্বরূপে প্রতিষ্ঠা, বস্তুগত আকর্ষণের ঊর্ধ্বে ওঠা, প্রিয় ও অপ্রিয়ের প্রতি ভারসাম্য, স্থিরবুদ্ধি এবং নিন্দা ও প্রশংসার প্রতি সমভাব এই সমস্ত গুণ একত্রে এমন এক মানবসত্তার পরিচয় দেয় যে বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের অন্তরের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে পারে। এই মানুষ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন নন, বরং পৃথিবীর মধ্যেই অবস্থান করে পৃথিবীর দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হন না। তিনি সুখকে প্রত্যাখ্যান করেন না, দুঃখকে অস্বীকার করেন না, সম্পদকে তুচ্ছ করেন না, প্রশংসাকে অপমান মনে করেন না এবং নিন্দাকে নিজের সত্য পরিচয় বলে গ্রহণ করেন না। তিনি প্রত্যেক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজের অন্তর্গত সত্যকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। এই সমতা, আত্মপ্রতিষ্ঠা ও সচেতনতার মধ্যেই গীতার ধীর মানুষের মহিমা নিহিত এবং এই অবস্থার মধ্য দিয়েই মানুষ ধীরে ধীরে বাহ্যিক নির্ভরতা অতিক্রম করে নিজের অন্তর্নিহিত চৈতন্যের স্বাধীনতা উপলব্ধি করতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!