সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৪.২৬ — অব্যভিচারী ভক্তিযোগে গুণাতীততা ও ব্রহ্মভাব লাভ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
মাং চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে। ম গুণান্ সমতীতৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।২৬।।
মাং চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে। 
ম গুণান্ সমতীতৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।২৬।।

অনুবাদঃ যিনি ঐকান্তিক ভক্তিযোগ সহকারে আমার সেবা করেন, তিনি প্রকৃতির সমস্ত গুণকে অতিক্রম করে ব্রহ্মভূত স্তরে উন্নীত হন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের এই শ্লোকটি মানুষের আত্মিক উত্তরণের এক গভীর ও মহৎ পথ নির্দেশ করে। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, মাং চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অবিচল ও একনিষ্ঠ ভক্তিযোগের মাধ্যমে আমাকে সেবা ও আশ্রয় করে, সে প্রকৃতির এই তিন গুণকে অতিক্রম করে ব্রহ্মভাব লাভের যোগ্য হয়ে ওঠে। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে ভক্তি, আত্মসমর্পণ, গুণাতীততা এবং ব্রহ্মস্বরূপ উপলব্ধির এক গভীর আধ্যাত্মিক সূত্র নিহিত রয়েছে। এখানে ভক্তিকে কেবল ধর্মীয় আচার বা আবেগ হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং ভক্তিকে মানুষের অন্তরকে রূপান্তরিত করার একটি শক্তিশালী সাধনাপথ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

শ্লোকটির প্রথম শব্দ মাং। এর অর্থ আমাকে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে নিজের প্রতি নির্দেশ করে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু গীতার দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতে এই আমি কেবল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব কৃষ্ণের ব্যক্তিগত সত্তাকে নির্দেশ করে না। এর মধ্যে পরমেশ্বর, পরম চৈতন্য এবং সর্বব্যাপী সত্যের ধারণাও নিহিত রয়েছে। চ শব্দের অর্থ এবং। এটি শ্লোকের ভাবকে সংযুক্ত করেছে। এরপর এসেছে যঃ, যার অর্থ যে ব্যক্তি। অর্থাৎ এখানে এমন এক সাধকের কথা বলা হচ্ছে যিনি একটি নির্দিষ্ট অন্তর্গত অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ঈশ্বরের আশ্রয় গ্রহণ করেন।

এই শ্লোকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো অব্যভিচারেণ। অব্যভিচার শব্দের মধ্যে রয়েছে বিচ্যুতিহীনতার ধারণা। যে ভক্তির মধ্যে দ্বিধা নেই, স্বার্থের পরিবর্তনে যার অভিমুখ পরিবর্তিত হয় না এবং সুখ দুঃখের ওঠানামায় যার ঈশ্বরনিষ্ঠা ভেঙে পড়ে না, সেই ভক্তিই অব্যভিচারী ভক্তি। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অনেক সময় পরিস্থিতিনির্ভর হয়। সুখের সময় মানুষ ঈশ্বরকে স্মরণ করে এবং দুঃখের সময়ও তাঁর কাছে আশ্রয় চায়, কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবার সেই স্মরণ দুর্বল হয়ে যায়। অব্যভিচারী ভক্তির ক্ষেত্রে এমন বিচ্যুতি নেই। এখানে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক কোনো পার্থিব সুবিধার ওপর নির্ভর করে না। বরং ঈশ্বর নিজেই হয়ে ওঠেন জীবনের চূড়ান্ত আশ্রয়।

ভক্তি শব্দটির মূল সংস্কৃত ভজ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভজ্ এর মধ্যে সেবা করা, অংশ গ্রহণ করা, আরাধনা করা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে আশ্রয় নেওয়ার ভাব রয়েছে। তাই ভক্তি কেবল আবেগ নয়। ভক্তির মধ্যে প্রেম আছে, শ্রদ্ধা আছে, আত্মনিবেদন আছে এবং সেবার মানসিকতা আছে। যখন এই ভক্তি যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন তা হয়ে ওঠে ভক্তিযোগ। যোগ শব্দটি যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর মূল অর্থ সংযোগ বা মিলন। ভক্তিযোগ তাই এমন এক অন্তর্গত সাধনা যার মাধ্যমে মানুষের চেতনা পরম সত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়। এই যোগ মানুষকে পৃথিবী থেকে পালিয়ে যেতে শেখায় না। বরং পৃথিবীর মধ্যেই থেকে নিজের কর্ম, চিন্তা ও অনুভূতিকে পরম সত্যের দিকে পরিচালিত করতে শেখায়।

সেবতে শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। এর সাধারণ অর্থ সেবা করা হলেও আধ্যাত্মিক অর্থে এর মধ্যে ঈশ্বরকে আশ্রয় করা, তাঁর প্রতি আত্মনিবেদন করা এবং তাঁর উদ্দেশ্যে জীবন পরিচালনার ভাব নিহিত রয়েছে। এখানে সেবা মানে কেবল বাহ্যিক পূজা নয়। একজন মানুষ যখন নিজের কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে, নিজের অহংকারকে শিথিল করে এবং জীবনের কেন্দ্র হিসেবে পরম সত্যকে গ্রহণ করে, তখন তার জীবন নিজেই এক ধরনের সেবায় পরিণত হয়। এই অবস্থায় কর্ম আর শুধু ব্যক্তিগত লাভের জন্য সম্পাদিত হয় না। কর্ম হয়ে ওঠে আত্মনিবেদনের প্রকাশ।

শ্লোকের পরবর্তী অংশে এসেছে স গুণান্ সমতীত্যৈতান্। এখানে গুণ বলতে প্রকৃতির তিনটি মৌলিক শক্তি সত্ত্ব, রজস ও তমসকে বোঝানো হয়েছে। সত্ত্ব মানুষের মধ্যে জ্ঞান, স্বচ্ছতা, শান্তি ও পবিত্রতার প্রবণতা সৃষ্টি করে। রজস মানুষকে কর্ম, আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা ও অর্জনের দিকে পরিচালিত করে। তমস সৃষ্টি করে জড়তা, অজ্ঞানতা, অলসতা, মোহ ও অবসাদ। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এই তিন প্রবণতা নানা মাত্রায় প্রকাশ পায়। কখনো মন পরিষ্কার ও শান্ত থাকে, কখনো আকাঙ্ক্ষা ও কর্মব্যস্ততায় অস্থির হয়ে ওঠে, আবার কখনো জড়তা ও উদাসীনতায় আচ্ছন্ন হয়। গীতার শিক্ষা হলো এই তিন গুণই প্রকৃতির কার্যপ্রকাশ এবং মানুষকে শেষ পর্যন্ত এদের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।

গুণাতীত হওয়া মানে সত্ত্বকে ধ্বংস করা বা রজস ও তমসকে ঘৃণা করা নয়। এর গভীর অর্থ হলো নিজের প্রকৃত চেতনাকে এই পরিবর্তনশীল প্রবৃত্তিগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে না দেখা। একজন মানুষ যখন বলে আমি রাগ, আমি আকাঙ্ক্ষা, আমি অলসতা, আমি আনন্দ অথবা আমি দুঃখ, তখন সে নিজের চেতনাকে মানসিক অবস্থার সঙ্গে এক করে ফেলছে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করতে শেখে যে রাগ এসেছে, আকাঙ্ক্ষা এসেছে, দুঃখ এসেছে এবং এগুলো পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থা, তখন তার মধ্যে এক ধরনের সাক্ষীচেতনা জন্ম নেয়। ভক্তিযোগ সেই সাক্ষীচেতনাকে আরও গভীর করে এবং তাকে পরম সত্তার সঙ্গে যুক্ত করে।

সমতীত্য শব্দের অর্থ অতিক্রম করে যাওয়া। এই অতিক্রম বাহ্যিক স্থান পরিবর্তনের মতো নয়। এটি চেতনার পরিবর্তন। মানুষ একই পরিবারে থাকতে পারে, একই সমাজে কাজ করতে পারে এবং একই দায়িত্ব পালন করতে পারে, কিন্তু তার অন্তরের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হতে পারে। আগে সে কর্ম করত নিজের অহংকার ও লাভের জন্য। পরে সে একই কর্ম করতে পারে কর্তব্য ও ঈশ্বরনিবেদনের চেতনায়। আগে প্রশংসা পেলে সে আনন্দিত এবং নিন্দা পেলে ভেঙে পড়ত। পরে সে উভয়কেই সাম্যবোধের সঙ্গে গ্রহণ করতে শেখে। এই পরিবর্তনই গুণের বন্ধন থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হওয়ার লক্ষণ।

শ্লোকের শেষ অংশ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে অত্যন্ত গভীর। ব্রহ্ম শব্দটি বৃহ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে বিস্তার, মহত্ত্ব ও সর্বব্যাপিতার ভাব রয়েছে। ব্রহ্মভূয়ায় অর্থ ব্রহ্মভাব লাভের জন্য। কল্পতে অর্থ যোগ্য হয়ে ওঠে বা উপযুক্ত অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে বলা হচ্ছে না যে সাধারণ ভক্ত হঠাৎ কোনো বাহ্যিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্য কোনো সত্তায় পরিণত হয়ে যায়। বরং তার চেতনা ব্রহ্মস্বরূপ সত্য উপলব্ধির উপযোগী হয়ে ওঠে। তার মন পরিশুদ্ধ হয়, অহংকার ক্ষীণ হয়, আকাঙ্ক্ষার দাসত্ব কমে যায় এবং নিজের সীমাবদ্ধ পরিচয়ের বাইরে এক বৃহত্তর সত্যের অনুভব জন্ম নেয়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। সাংখ্য ভাবনায় প্রকৃতি তিন গুণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ সাক্ষী। গীতার আলোচনায় গুণাতীত হওয়ার অর্থ হলো প্রকৃতির পরিবর্তনশীল কার্যকলাপের সঙ্গে নিজের চূড়ান্ত পরিচয়কে এক করে না দেখা। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে ব্রহ্ম সর্বোচ্চ সত্য এবং আত্মস্বরূপ উপলব্ধির জন্য অন্তরের শুদ্ধতা প্রয়োজন। সেই অর্থে ভক্তি মনকে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করে যে জ্ঞান উপলব্ধির পথ উন্মুক্ত হয়। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ভক্তি পরম পুরুষোত্তমের প্রতি আত্মনিবেদন ও প্রেমপূর্ণ সম্পর্কের পথ। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের ভেদ স্বীকার করে ঈশ্বরের সেবাকে মুক্তির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই দর্শনগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও সকলের মধ্যেই একনিষ্ঠ ঈশ্বরাশ্রয় এবং আত্মিক উত্তরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত সুন্দর। অব্যভিচারী ভক্তিকে একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। নদী তার উৎস থেকে যাত্রা শুরু করে নানা বাঁক অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়। পথে তার গতি কখনো দ্রুত হয়, কখনো ধীর হয়, কিন্তু তার সামগ্রিক প্রবাহ সমুদ্রের দিকেই থাকে। তেমনি ভক্তের জীবনে দুঃখ, আনন্দ, সাফল্য, ব্যর্থতা, সম্মান ও অপমান আসতে পারে। তার মন কখনো দুর্বলও হতে পারে। কিন্তু তার অন্তরের চূড়ান্ত অভিমুখ যদি পরম সত্যের দিকে স্থির থাকে তবে সেই ভক্তি অব্যভিচারী হয়ে ওঠে।

পদ্মফুলও এই শিক্ষার একটি সুন্দর প্রতীক। পদ্ম জলের মধ্যে জন্ম নেয়, জলের ওপরেই অবস্থান করে, কিন্তু জল তাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করতে পারে না। তেমনি গুণাতীত হওয়ার সাধনা সংসার ত্যাগের কথা অপরিহার্যভাবে বলে না। মানুষ সংসারের মধ্যেই থেকে সংসারের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ না হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। সে কর্ম করবে, সম্পর্ক রক্ষা করবে, দায়িত্ব পালন করবে এবং জীবনের আনন্দ ও দুঃখের মুখোমুখি হবে, কিন্তু তার অন্তরের স্বাধীনতা যেন বাহ্যিক পরিবর্তনের হাতে সম্পূর্ণভাবে সমর্পিত না হয়।

বাস্তব জীবনে এই শ্লোকের প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যদি প্রতিটি কাজের ফলকে নিজের অস্তিত্বের মাপকাঠি বানায়, তবে সাফল্য তার অহংকার বাড়াবে এবং ব্যর্থতা তাকে হতাশ করবে। কিন্তু যদি সে নিজের কর্মকে পরম সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে শেখে, তবে তার কর্মের মধ্যে নতুন ভারসাম্য আসে। সে চেষ্টা করবে, কিন্তু ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হবে না। সে সাফল্য পেলে কৃতজ্ঞ হবে এবং ব্যর্থ হলে শিক্ষা গ্রহণ করবে। এই মানসিকতা ধীরে ধীরে রজসের অস্থিরতা ও তমসের হতাশাকে অতিক্রম করে সত্ত্বের স্বচ্ছতার দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং পরিশেষে সেই স্বচ্ছতারও ঊর্ধ্বে এক গভীর আত্মিক স্বাধীনতার অনুভূতি জন্মাতে পারে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা সম্ভবত এই যে মানুষের মুক্তি কেবল বাহ্যিক জগত পরিবর্তনের মধ্যে নেই। মানুষ নিজের পরিবেশ বদলাতে পারে, কর্ম বদলাতে পারে, জীবনযাত্রা বদলাতে পারে, কিন্তু যদি তার অন্তরের কেন্দ্র অপরিবর্তিত থাকে তবে প্রকৃত বন্ধন থেকেই যায়। বিপরীতে একজন মানুষ একই সংসারে থেকে নিজের চেতনার কেন্দ্র পরিবর্তন করতে পারে। যখন তার জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে পরম সত্য, তখন ব্যক্তিগত অহংকারের জায়গা ধীরে ধীরে আত্মনিবেদন গ্রহণ করে। আকাঙ্ক্ষার জায়গায় কর্তব্য আসে। অস্থিরতার জায়গায় স্থিরতা আসে। ভয় ও অনিশ্চয়তার জায়গায় আশ্রয়ের অনুভূতি জন্ম নেয়।

অব্যভিচারী ভক্তি তাই কোনো সাময়িক আবেগ নয়। এটি একটি জীবনদৃষ্টি। এর অর্থ হলো পরিস্থিতি বদলালেও অন্তরের আশ্রয় যেন না বদলায়। মানুষ যখন সুখে ঈশ্বরকে স্মরণ করে এবং দুঃখে তাঁকে ভুলে যায়, তখন তার ভক্তি এখনও পরিস্থিতিনির্ভর। কিন্তু যখন সে সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থায় পরম সত্তার আশ্রয় অনুভব করতে শেখে, তখন তার ভক্তি গভীর হয়। এই ভক্তি মানুষের মধ্যে এক ধরনের অন্তর্গত সাহস সৃষ্টি করে। কারণ তখন সে জানে তার জীবনের মূল্য কেবল বাহ্যিক সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে না।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের এমন এক আধ্যাত্মিক যাত্রার কথা বলে যেখানে ভক্তি শুরু হলেও তার পরিণতি আত্মিক স্বাধীনতায়। মানুষ প্রথমে ঈশ্বরকে ভালোবাসে, তারপর ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করতে শেখে, এরপর নিজের কর্ম ও জীবনকে তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদন করে এবং ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত পরিচয় কেবল শরীর, মন, আকাঙ্ক্ষা বা সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তখন সে প্রকৃতির তিন গুণের ওঠানামাকে প্রত্যক্ষ করতে শেখে এবং তাদের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়ে পরম সত্যের দিকে স্থির থাকে।

এই কারণেই মাং চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে শ্লোকটি ভক্তির একটি অসাধারণ দর্শন প্রকাশ করে। এখানে ভক্তি দুর্বলতার প্রতীক নয়, বরং আত্মিক শক্তির প্রতীক। সেবা কেবল বাহ্যিক আচার নয়, বরং আত্মনিবেদনের প্রতীক। গুণাতীততা কোনো জগতবিমুখতা নয়, বরং প্রকৃতির কার্যপ্রবাহের মধ্যেও অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন। আর ব্রহ্মভাব কোনো দূরবর্তী রহস্য নয়, বরং চেতনার এমন পরিশুদ্ধ অবস্থা যেখানে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধ অহংকে অতিক্রম করে পরম সত্যের দিকে উন্মুক্ত হয়ে ওঠে। এই শ্লোক তাই মানুষকে শেখায় যে একনিষ্ঠ ভক্তি যখন সত্যিকার আত্মনিবেদনে পরিণত হয়, তখন তা কেবল ধর্মীয় সাধনা থাকে না। তা হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের পরিবর্তন, চেতনার পরিশুদ্ধি এবং সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অসীম সত্যের দিকে মানুষের গভীর অন্তরযাত্রা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 23, 2026 August 23, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি