ভগবদ্গীতা ১৪.৪ — প্রকৃতি মহাগর্ভ, ঈশ্বর বীজপ্রদাতা ও সমগ্র জীবসৃষ্টির ঐক্য
সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ।
তাসাং ব্রহ্ম মহদযোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা।।৪।।
অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! সকল যোনিতে যে সমস্ত মূর্তি প্রকাশিত হয়, ব্রহ্মরূপী যোনিই তাদের জননী-স্বরূপা এবং আমি তাদের বীজ প্রদানকারী পিতা।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের এই শ্লোকটি সমগ্র জীবজগতের উৎপত্তি এবং তার অন্তর্নিহিত ঐক্য সম্পর্কে এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, হে কৌন্তেয়, জগতে যত প্রকার জীবরূপ বিভিন্ন যোনিতে প্রকাশিত হয়, তাদের সকলের মহৎ যোনি বা সৃষ্টির মহাগর্ভ হলো প্রকৃতি এবং আমি সেই সমস্ত জীবের বীজপ্রদানকারী পিতা। এই বক্তব্যের মধ্যে সৃষ্টি, প্রকৃতি, চৈতন্য, ঈশ্বর এবং জীবের পারস্পরিক সম্পর্ক এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা একই সঙ্গে ভাষাগত, দার্শনিক, আধ্যাত্মিক এবং মানবিক দৃষ্টিতে গভীর তাৎপর্য বহন করে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সর্বযোনিষু। সর্ব অর্থ সমস্ত বা সকল এবং যোনি অর্থ জন্মস্থান, গর্ভ, উৎপত্তির স্থান, আশ্রয় অথবা কোনো কিছুর প্রকাশের আধার। যোনি শব্দটি এখানে কেবল জৈবিক গর্ভ অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এর অর্থ আরও বিস্তৃত। যে কোনো জীব যে উপায়ে বা যে আধারের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, সেই উৎপত্তিক্ষেত্রকেও যোনি বলা যায়। তাই সর্বযোনিষু অর্থ হলো সকল প্রকার জন্মের ক্ষেত্রে, সমস্ত জীবের উৎপত্তিক্ষেত্রে অথবা সব ধরনের জীবপ্রকাশের আধারে। এর মাধ্যমে কৃষ্ণ কোনো বিশেষ জাতি, প্রজাতি বা জীবকে আলাদা না করে সমগ্র জীবজগতকে একই সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
এরপর এসেছে কৌন্তেয় শব্দটি। কুন্তীর পুত্র হওয়ার কারণে অর্জুনকে কৌন্তেয় বলা হয়েছে। এই সম্বোধনের মধ্যেও একটি সূক্ষ্ম তাৎপর্য রয়েছে। অর্জুন যেমন মাতৃগর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন, তেমনি সমগ্র জীবজগতও এক মহাজাগতিক প্রকৃতির গর্ভে প্রকাশিত হয়। ব্যক্তিগত মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা থেকে কৃষ্ণ এখানে মহাজাগতিক মাতৃত্বের ধারণার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। মানুষ নিজের জন্মের সঙ্গে পরিচিত বলেই প্রকৃতির মহাগর্ভের ধারণাটিও তার কাছে সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।
মূর্তয়ঃ শব্দটি মূর্তি শব্দের বহুবচন। মূর্তি বলতে রূপ, অবয়ব, প্রকাশিত দেহ অথবা নির্দিষ্ট আকৃতিতে প্রকাশিত সত্তাকে বোঝায়। এই শ্লোকে মূর্তি কোনো পাথরের প্রতিমা নয়, বরং জীবের বিভিন্ন দেহরূপকে নির্দেশ করে। মানুষ, পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ, উদ্ভিদ এবং অসংখ্য জীবের যে বিচিত্র দেহরূপ আমরা দেখি, সেগুলো প্রকৃতির বহুরূপী প্রকাশ। বাহ্যিক রূপের এই বৈচিত্র্যের অন্তরালে যে এক বৃহত্তর সৃষ্টিসূত্র রয়েছে, মূর্তয়ঃ শব্দটি সেই বহুরূপী প্রকাশকে ধারণ করে।
সম্ভবন্তি শব্দটি সম্ এবং ভূ ধাতুর ভাব থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো উৎপন্ন হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা, প্রকাশিত হওয়া বা জন্মগ্রহণ করা। এখানে জীবের প্রকাশকে কোনো বিচ্ছিন্ন বা অর্থহীন ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়নি। প্রত্যেক জীবের প্রকাশ একটি বৃহত্তর কারণসম্পর্কের মধ্যে ঘটে। প্রকৃতি জীবের দেহরূপ প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে এবং ঈশ্বর সেই সৃষ্টির বীজ প্রদান করেন। ফলে জীবের বহুরূপী প্রকাশ একটি মহাজাগতিক সম্পর্কের অংশ।
দ্বিতীয় পংক্তিতে তাসাং শব্দের অর্থ হলো তাদের সকলের। অর্থাৎ প্রথম পংক্তিতে যে অসংখ্য জীবরূপের কথা বলা হয়েছে, তাদের সকলের ক্ষেত্রেই কৃষ্ণ একটি অভিন্ন সৃষ্টিতত্ত্বের কথা বলছেন। এরপর এসেছে ব্রহ্ম মহদ্যোনি। এখানে ব্রহ্ম শব্দটি এই প্রসঙ্গে মহৎ প্রকৃতি বা সৃষ্টির মূল উপাদানগত আধার হিসেবে ব্যাখ্যাত হয়। মহৎ অর্থ মহান বা বিশাল এবং যোনি অর্থ গর্ভ, উৎপত্তিস্থান বা প্রকাশের আধার। তাই মহদ্যোনি অর্থ মহৎ গর্ভ বা মহাজাগতিক সৃষ্টির বিশাল আধার। প্রকৃতিকে এখানে সেই মহাগর্ভ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে অসংখ্য জীবরূপের প্রকাশ ঘটে।
এই বক্তব্যের সবচেয়ে গভীর অংশ হলো অহং বীজপ্রদঃ পিতা। অহং অর্থ আমি। কৃষ্ণ এখানে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন বীজপ্রদানকারী পিতা হিসেবে। বীজ হলো এমন একটি কারণ যার মধ্যে ভবিষ্যৎ প্রকাশের সম্ভাবনা নিহিত থাকে। একটি ক্ষুদ্র বীজের মধ্যে যেমন একটি বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তেমনি বীজ এখানে সৃষ্টির সম্ভাবনা, চৈতন্যের প্রেরণা এবং জীবপ্রকাশের অন্তর্নিহিত কারণের প্রতীক। প্রদ অর্থ প্রদানকারী। তাই বীজপ্রদ অর্থ বীজ প্রদানকারী। পিতা অর্থ জন্মদাতা। কিন্তু এখানে পিতা শব্দটি কেবল জৈবিক অর্থে নয়, মহাজাগতিক সৃষ্টির কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এইভাবে শ্লোকটির একটি গভীর প্রতীকী কাঠামো তৈরি হয়। প্রকৃতি হলো মহামাতা এবং কৃষ্ণ হলেন মহাপিতা। প্রকৃতি ধারণ করে, রূপ দেয় এবং প্রকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। ঈশ্বর বীজ প্রদান করেন এবং সেই সৃষ্টির অন্তর্নিহিত চৈতন্য ও কারণের উৎস হিসেবে অবস্থান করেন। মাতা ও পিতার এই প্রতীক মানুষের পারিবারিক অভিজ্ঞতাকে মহাজাগতিক সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। আমরা যেমন পিতা ও মাতার মাধ্যমে দেহ লাভ করি, তেমনি গীতার মহাজাগতিক ভাষায় সমস্ত জীব প্রকৃতির মহাগর্ভে ঈশ্বরীয় বীজের প্রভাবে প্রকাশিত হয়।
এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য আরও গভীর। ভারতীয় দর্শনে প্রকৃতি এবং পুরুষের সম্পর্ক একটি মৌলিক বিষয়। প্রকৃতি হলো পরিবর্তনশীল জগতের উপাদানগত ভিত্তি এবং পুরুষ হলো চৈতন্যস্বরূপ সত্য। গীতায় কৃষ্ণ এই সম্পর্ককে ঈশ্বরকেন্দ্রিক উচ্চতর ব্যাখ্যার মধ্যে স্থাপন করেছেন। প্রকৃতি একা জড়, কিন্তু ঈশ্বরীয় চৈতন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে সেই প্রকৃতি অসংখ্য জীবরূপে প্রকাশিত হয়। ফলে প্রকৃতি ও ঈশ্বরকে বিচ্ছিন্ন বা পরস্পরবিরোধী শক্তি হিসেবে নয়, সৃষ্টির প্রকাশে পরস্পর সম্পর্কিত নীতি হিসেবে দেখা যায়।
বিভিন্ন বেদান্ত দর্শন এই শ্লোককে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলেও একটি মৌলিক সত্য সেখানে উপস্থিত থাকে। জীবের অস্তিত্ব ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কহীন নয়। অদ্বৈত দৃষ্টিতে প্রকৃতি বা মায়া ব্রহ্মের শক্তিরূপে নাম ও রূপের জগত প্রকাশ করে। বিশিষ্টাদ্বৈত দৃষ্টিতে ঈশ্বর, জীব এবং প্রকৃতির মধ্যে বাস্তব ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। দ্বৈত দৃষ্টিতে ঈশ্বর সর্বোচ্চ স্বাধীন সত্তা এবং জীব ও প্রকৃতি তাঁর অধীন। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই কৃষ্ণের বীজপ্রদানকারী পিতা রূপটি ঈশ্বরের মহাজাগতিক কারণত্ব ও নিয়ামক অবস্থাকে প্রকাশ করে।
শ্লোকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। পৃথিবীতে জীবের রূপ অসংখ্য। তাদের দেহ আলাদা, জীবনধারা আলাদা, জন্মের পদ্ধতি আলাদা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্কও আলাদা। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এই বহুরূপী জীবজগতের অন্তরালে একটি অভিন্ন সৃষ্টিসূত্র রয়েছে। প্রত্যেক জীব একই মহাজাগতিক প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত এবং একই ঈশ্বরীয় কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই উপলব্ধি মানুষের মধ্যে অহংকার ও বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য ও সহমর্মিতার জন্ম দিতে পারে।
এই শ্লোককে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি উর্বর জমির কথা ভাবা যায়। মাটি হলো ধারণকারী ক্ষেত্র এবং বীজ হলো সম্ভাবনার বাহক। বীজ মাটির মধ্যে প্রবেশ করে এবং উপযুক্ত পরিবেশে তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা প্রকাশ করে। গীতার ভাষায় প্রকৃতি হলো সেই মহাজাগতিক ক্ষেত্র এবং ঈশ্বর বীজপ্রদানকারী। অবশ্য এই উপমা কেবল ধারণাটি বোঝানোর জন্য। ঈশ্বরীয় সৃষ্টি মানুষের কৃষিকাজের মতো সরল কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এখানে বীজ মূলত সৃষ্টির অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ও চৈতন্যের প্রতীক।
মানবজীবনের দিক থেকেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষ যদি উপলব্ধি করে যে তার অস্তিত্ব প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং তার জীবন একটি বৃহত্তর মহাজাগতিক সৃষ্টির অংশ, তাহলে তার মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা কমতে পারে। সে অন্য মানুষ, পশু, পাখি, বৃক্ষ এবং সমগ্র জীবজগতের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হতে পারে। কারণ বাহ্যিক দেহ ও রূপের পার্থক্য যতই থাকুক, সৃষ্টির গভীরতর স্তরে সকলেই একই মহাজাগতিক উৎসের সন্তান।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক আমাদের নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি কেবল একটি দেহ, একটি নাম এবং একটি ব্যক্তিগত পরিচয়, নাকি আমাদের অস্তিত্বের পেছনে আরও গভীর কোনো চৈতন্যগত সত্য রয়েছে। কৃষ্ণের বক্তব্য মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে অস্তিত্বের মূল উৎসের দিকে তাকাতে আহ্বান করে। দেহ প্রকৃতির অংশ, কিন্তু চৈতন্যের প্রশ্ন মানুষকে ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যায়। এই উপলব্ধি আত্মজিজ্ঞাসার পথ খুলে দেয়।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর। অল্প কয়েকটি শব্দের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ সৃষ্টিতত্ত্ব প্রকাশ করা হয়েছে। সর্বযোনিষু সমগ্র জীবজগতকে ধারণ করেছে। মূর্তয়ঃ জীবের বহুরূপী প্রকাশকে নির্দেশ করেছে। মহদ্যোনি প্রকৃতিকে মহামাতার রূপ দিয়েছে এবং বীজপ্রদঃ পিতা কৃষ্ণকে মহাজাগতিক পিতার প্রতীকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে শ্লোকটি একই সঙ্গে সংক্ষিপ্ত, কাব্যময় এবং দার্শনিকভাবে গভীর।
সবশেষে বলা যায়, সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ তাসাং ব্রহ্ম মহদ্যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা শ্লোকটি কেবল জীবসৃষ্টির একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয়। এটি প্রকৃতি, চৈতন্য, ঈশ্বর এবং জীবের পারস্পরিক সম্পর্কের এক গভীর দর্শন। এখানে প্রকৃতি মহামাতা, ঈশ্বর মহাপিতা এবং অসংখ্য জীব সেই মহাজাগতিক সৃষ্টির সন্তান। বাহ্যিকভাবে আমরা যতই পৃথক হই না কেন, আমাদের অস্তিত্বের গভীরে একটি অভিন্ন উৎসের সম্পর্ক রয়েছে। এই উপলব্ধি মানুষের মধ্যে বিনয়, সহমর্মিতা, সর্বজীবের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আধ্যাত্মিক ঐক্যবোধ সৃষ্টি করতে পারে। শ্লোকটির অন্তর্নিহিত বার্তা তাই এই যে জীবনের বহুরূপী প্রকাশের আড়ালে এক গভীর ঐক্য বিরাজমান এবং সেই ঐক্যকে উপলব্ধি করাই মানুষকে নিজের অস্তিত্বের গভীরতর সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!