সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৪.৫ — সত্ত্ব, রজ ও তমোগুণের বন্ধন এবং অবিনশ্বর আত্মার প্রকৃত স্বরূপ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ। নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম্।।৫।।
সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ। 
নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম্।।৫।।

অনুবাদঃ হে মহাবাহো! জড়া প্রকৃতি থেকে জাত সত্ত্ব, রজ ও তম-এই তিনটি গুণ এই দেহের মধ্যে অবস্থিত অব্যয় জীবকে আবদ্ধ করে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোক মানবজীবনের অন্তর্গত প্রকৃতি, মন, কর্ম এবং আত্মার সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে প্রকাশ করেছে। শ্লোকে বলা হয়েছে, সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ। নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম্। অর্থাৎ হে মহাবাহু, সত্ত্ব, রজ ও তম এই তিন গুণ প্রকৃতি থেকে উৎপন্ন হয়ে দেহের মধ্যে অবস্থানকারী অবিনশ্বর দেহীকে আবদ্ধ করে রাখে। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের সমগ্র মানসিক জীবন, তার কর্মপ্রবণতা, আকাঙ্ক্ষা, অজ্ঞতা, সুখ, দুঃখ, জ্ঞান এবং বন্ধনের একটি গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা নিহিত রয়েছে। এখানে প্রথমেই যে বিষয়টি উপলব্ধি করা প্রয়োজন তা হলো আত্মা এবং প্রকৃতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য। দেহ পরিবর্তনশীল, মন পরিবর্তনশীল, চিন্তা পরিবর্তনশীল, অনুভূতি পরিবর্তনশীল এবং মানুষের আচরণও পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনের অন্তরালে যে চৈতন্যসত্তা প্রত্যক্ষ করে, গীতার ভাষায় সেই দেহী অবিনশ্বর। প্রকৃতির তিন গুণ সেই আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে পরিবর্তন করতে পারে না, কিন্তু আত্মা যখন দেহ ও মনের সঙ্গে নিজের পরিচয়কে এক করে ফেলে, তখন সে গুণের প্রভাবে আবদ্ধ জীব হিসেবে নিজেকে অনুভব করে।

সত্ত্ব শব্দের মধ্যে সত্য, অস্তিত্ব, বিশুদ্ধতা, স্বচ্ছতা এবং আলোর ধারণা নিহিত রয়েছে। সত্ত্বগুণ মানুষের চেতনার মধ্যে জ্ঞান, শান্তি, সংযম, পবিত্রতা, সত্যবোধ এবং সাম্যের প্রকাশ ঘটায়। যে মন নির্মল, স্থির এবং সত্য উপলব্ধির জন্য প্রস্তুত, সেখানে সত্ত্বের প্রাধান্য দেখা যায়। স্বচ্ছ জলের মধ্যে যেমন আকাশের প্রতিবিম্ব স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তেমনি সত্ত্বময় মনে বাস্তবতার প্রকৃতি তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কিন্তু গীতার শিক্ষা অনুযায়ী সত্ত্বও চূড়ান্ত মুক্তির অবস্থান নয়। কারণ সত্ত্বও প্রকৃতির একটি গুণ এবং গুণের প্রকৃতিই হলো জীবকে কোনো না কোনোভাবে আবদ্ধ রাখা। সত্ত্ব মানুষকে জ্ঞান ও সুখের প্রতি আকৃষ্ট করে। ফলে অন্ধকারের তুলনায় আলো যতই উচ্চতর হোক, আলোর প্রতিও যদি আসক্তি সৃষ্টি হয়, তবে সেই আসক্তিও বন্ধনের কারণ হতে পারে।

রজ শব্দের মধ্যে গতি, কর্মচাঞ্চল্য, আকাঙ্ক্ষা, আবেগ, প্রচেষ্টা এবং পরিবর্তনের শক্তি নিহিত রয়েছে। রজোগুণ মানুষকে কর্মের দিকে পরিচালিত করে। জীবনের উন্নতি, সৃষ্টিশীলতা, উদ্যোগ, সংগ্রাম এবং অর্জনের পেছনে রজের শক্তি কার্যকর হতে পারে। একজন মানুষ যখন কিছু অর্জন করতে চায়, নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে চায়, সাফল্য লাভ করতে চায় অথবা নিজের কর্মের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রভাব সৃষ্টি করতে চায়, তখন তার মধ্যে রজোগুণের প্রকাশ ঘটে। কিন্তু রজ যখন অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা এবং কর্মফলের প্রতি আসক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন মানুষ ক্রমাগত অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। সে যা পেয়েছে তাতে সন্তুষ্ট হতে পারে না এবং যা পায়নি তার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ফলে কর্ম তার মুক্তির পথ না হয়ে বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তম শব্দের অর্থ অন্ধকার, আচ্ছাদন, জড়তা এবং অপ্রকাশ। তমোগুণ মানুষের চেতনার উপর এমন একটি আবরণ সৃষ্টি করে যার ফলে সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। অলসতা, অতিনিদ্রা, উদাসীনতা, বিভ্রান্তি, অবিবেচনা, অজ্ঞতা এবং পরিবর্তনের প্রতি অনীহা তমোগুণের বিভিন্ন প্রকাশ। অন্ধকার যেমন কোনো বস্তুকে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে রাখে, তেমনি তম মানুষের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তমের প্রভাবে মানুষ অনেক সময় নিজের দুর্বলতাকে শক্তি, নিজের অজ্ঞতাকে জ্ঞান এবং নিজের জড়তাকে স্বাভাবিক জীবন বলে মনে করতে পারে। তাই তমোগুণের বন্ধন সবচেয়ে গভীর কারণ এটি অনেক সময় মানুষকে নিজের বন্ধনের বিষয়টিই উপলব্ধি করতে দেয় না।

শ্লোকে এই তিন প্রবণতাকে গুণ বলা হয়েছে। এখানে গুণ শব্দের অর্থ কেবল ভালো বৈশিষ্ট্য নয়। সাংখ্য দর্শনের পরিভাষায় সত্ত্ব, রজ এবং তম প্রকৃতির মৌলিক কার্যধারা। সত্ত্ব প্রকাশের শক্তি, রজ গতির শক্তি এবং তম আচ্ছাদনের শক্তি হিসেবে কাজ করে। প্রকৃতির সমস্ত পরিবর্তনশীল প্রকাশের মধ্যে এই তিন শক্তির বিভিন্ন সমন্বয় দেখা যায়। মানুষের মনেও একইভাবে কখনো সত্ত্ব প্রবল হয়, কখনো রজ এবং কখনো তম। তাই একজন মানুষকে কেবল সত্ত্বময়, রজোময় অথবা তমোময় বলে সম্পূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। বরং তার মধ্যে তিন গুণই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রায় কার্যকর থাকে। কোনো সময়ে মানুষ শান্ত, জ্ঞানী ও সংযত থাকে, কোনো সময়ে প্রবল কর্মচাঞ্চল্য ও আকাঙ্ক্ষায় পরিচালিত হয় এবং কোনো সময়ে জড়তা ও অজ্ঞতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়।

প্রকৃতিসম্ভবাঃ শব্দটি এই শ্লোকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রকাশ করে। এর অর্থ হলো প্রকৃতি থেকে উৎপন্ন। এর মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সত্ত্ব, রজ এবং তম আত্মার স্বরূপ নয়। এগুলো প্রকৃতির ধর্ম। এই পার্থক্যটি উপলব্ধি করা আত্মজ্ঞান লাভের জন্য অপরিহার্য। মানুষ যখন বলে আমি রাগান্বিত, আমি দুঃখী, আমি ব্যর্থ, আমি সফল, আমি সুখী অথবা আমি অজ্ঞ, তখন সে নিজের চৈতন্যসত্তার সঙ্গে মানসিক অবস্থাকে এক করে ফেলছে। গীতার দৃষ্টিতে রাগ, দুঃখ, সুখ, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং অজ্ঞতা প্রকৃতির বিভিন্ন অবস্থার প্রকাশ। আত্মা এসব অবস্থার সাক্ষী। এই সাক্ষীসত্তাকে উপলব্ধি করাই আত্মজিজ্ঞাসার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

নিবধ্নন্তি শব্দটি বন্ধনের ধারণাকে প্রকাশ করে। এর অর্থ হলো আবদ্ধ করে বা বেঁধে রাখে। কিন্তু এখানে একটি গভীর প্রশ্ন দেখা দেয়। আত্মা যদি অবিনশ্বর হয়, তাহলে প্রকৃতির গুণ তাকে কীভাবে আবদ্ধ করতে পারে। এর উত্তর হলো আত্মা প্রকৃতপক্ষে কখনো আবদ্ধ হয় না। বন্ধন ঘটে আত্মপরিচয়ের স্তরে। মানুষ যখন নিজের দেহকে আমি মনে করে, নিজের মনকে আমি মনে করে, নিজের আকাঙ্ক্ষাকে নিজের প্রকৃত ইচ্ছা বলে মনে করে এবং নিজের মানসিক অবস্থাকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সে গুণের সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলে। এই ভুল পরিচয় থেকেই বন্ধনের অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়। যেমন আকাশ ধোঁয়ায় প্রকৃতপক্ষে কালো হয়ে যায় না, কিন্তু ধোঁয়ার মধ্যে তাকালে আকাশকে আচ্ছন্ন মনে হয়, তেমনি আত্মা গুণ দ্বারা প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তিত না হলেও গুণের সঙ্গে পরিচয়ের কারণে জীব নিজেকে সুখী, দুঃখী, কর্তা এবং ভোক্তা বলে অনুভব করে।

মহাবাহো শব্দটি অর্জুনের উদ্দেশে ব্যবহৃত এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সম্বোধন। এর আক্ষরিক অর্থ শক্তিশালী বাহুবিশিষ্ট ব্যক্তি। কিন্তু এর মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক ইঙ্গিতও রয়েছে। অর্জুন যেমন বাহ্যিক যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তেমনি প্রত্যেক মানুষ নিজের অন্তর্জগতের মধ্যেও একটি যুদ্ধের সম্মুখীন হয়। মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও অজ্ঞতা, স্থিরতা ও অস্থিরতা, কর্মপ্রবণতা ও জড়তা, আত্মসচেতনতা ও আত্মবিস্মৃতির মধ্যে যে সংঘাত চলে, সেটিও এক ধরনের অন্তর্যুদ্ধ। তাই মহাবাহো সম্বোধন যেন মানুষকে নিজের অন্তরের যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানায়।

দেহে দেহিনম্ অব্যয়ম্ এই অংশে গীতার আত্মতত্ত্বের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ পেয়েছে। দেহ হলো পরিবর্তনশীল এবং দেহী হলো সেই চৈতন্যসত্তা যে দেহের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা লাভ করে। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্যে দেহের রূপ ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। চিন্তা ও অনুভূতিও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু পরিবর্তনের মধ্যেও মানুষ নিজের অস্তিত্বের একটি ধারাবাহিকতা অনুভব করে। গীতার দর্শন এই ধারাবাহিকতার গভীরে অবিনশ্বর আত্মার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। অব্যয় শব্দটি সেই আত্মার অপরিবর্তনীয় এবং অবিনশ্বর প্রকৃতিকে নির্দেশ করে। দেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে, কিন্তু আত্মার প্রকৃত সত্তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না।

সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। প্রকৃতির মধ্যেই সত্ত্ব, রজ এবং তম বিদ্যমান। পুরুষ নিজে গুণাতীত হলেও প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের কারণে জীবের মধ্যে গুণের কার্যকলাপের অভিজ্ঞতা প্রকাশ পায়। বেদান্তীয় দৃষ্টিতেও আত্মা চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতির পরিবর্তনশীল উপাদান থেকে পৃথক। অবিদ্যার কারণে মানুষ দেহ ও মনকে নিজের প্রকৃত পরিচয় বলে মনে করে। যখন জ্ঞান উদিত হয়, তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে মন পরিবর্তিত হচ্ছে, শরীর পরিবর্তিত হচ্ছে, অনুভূতি পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু যে চৈতন্য এই পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে তার প্রকৃতি অন্যরকম।

মানবজীবনের বাস্তব ক্ষেত্রেও এই তিন গুণকে নানা উপায়ে দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যখন ভোরে উঠে মনকে শান্ত রেখে জ্ঞানচর্চা করেন, সত্য কথা বলেন, সংযতভাবে জীবনযাপন করেন এবং অন্যের কল্যাণের কথা ভাবেন, তখন সত্ত্বের প্রকাশ দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যখন সাফল্য, অর্থ, ক্ষমতা, সম্মান এবং অর্জনের জন্য নিরন্তর ছুটে চলেন এবং কর্মফলের সঙ্গে নিজের পরিচয়কে যুক্ত করেন, তখন রজের প্রকাশ ঘটে। আবার একজন ব্যক্তি যখন নিজের কর্তব্য সম্পর্কে উদাসীন থাকেন, পরিবর্তনের প্রয়োজন বুঝেও চেষ্টা করেন না, অজ্ঞতা ও অলসতার মধ্যে নিমজ্জিত থাকেন, তখন তমের প্রাধান্য দেখা যায়। তবে মানুষের মধ্যে এই তিন গুণই বিভিন্ন সময়ে কাজ করতে পারে। একজন কর্মব্যস্ত মানুষের মধ্যেও সত্ত্বের মুহূর্ত থাকতে পারে এবং একজন শান্ত মানুষের মধ্যেও রজ বা তমের প্রবলতা দেখা দিতে পারে।

এই তিন গুণকে একটি আয়নার উপমার মাধ্যমে সহজে বোঝা যায়। একটি আয়না যদি সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে তবে সেখানে প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট দেখা যায়। এটি সত্ত্বের প্রতীক। আয়নার সামনে যদি ক্রমাগত নড়াচড়া চলতে থাকে তবে প্রতিচ্ছবি স্থির থাকে না। এটি রজের সঙ্গে তুলনীয়। আর আয়না যদি ধুলো ও অন্ধকারে ঢাকা থাকে তবে প্রতিচ্ছবি দেখা যায় না। এটি তমের প্রতীক। কিন্তু আয়নার স্বরূপ কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তিত হয় না। একইভাবে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ গুণের ওঠানামায় পরিবর্তিত হয় না। পরিবর্তন ঘটে দেহ ও মনের স্তরে।

এই শ্লোকের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যও গভীর। মানুষ যদি নিজের মধ্যে কোন গুণটি সক্রিয় রয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করতে শেখে, তবে আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি পায়। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে বুঝতে পারে তার সিদ্ধান্তটি শান্ত জ্ঞান থেকে আসছে, নাকি অস্থির আকাঙ্ক্ষা থেকে, নাকি অলসতা ও বিভ্রান্তি থেকে। এই আত্মপর্যবেক্ষণ মানুষকে নিজের প্রবণতার দাস না হয়ে তাদের সাক্ষী হতে শেখায়। তখন সে বুঝতে পারে যে তার মধ্যে রাগ আছে, কিন্তু সে কেবল রাগ নয়। তার মধ্যে দুঃখ আছে, কিন্তু সে কেবল দুঃখ নয়। তার মধ্যে আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সে কেবল আকাঙ্ক্ষা নয়। এই উপলব্ধিই ধীরে ধীরে আত্মপরিচয়ের গভীর স্তরে নিয়ে যায়।

শ্লোকটির আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো মানুষকে প্রথমে তমের অন্ধকার থেকে জ্ঞানের দিকে উঠতে হবে, তারপর রজের অস্থিরতা অতিক্রম করে সত্ত্বের নির্মলতায় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত সত্ত্বের প্রতিও আসক্তি ত্যাগ করে গুণাতীত অবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে। কারণ মুক্তি কেবল ভালো অবস্থার প্রতি আসক্ত হওয়ার নাম নয়। মুক্তি হলো সমস্ত পরিবর্তনশীল অবস্থার সাক্ষী নিজের অবিনশ্বর স্বরূপকে উপলব্ধি করা। সত্ত্ব আলো দেয়, রজ গতি দেয় এবং তম আচ্ছাদন সৃষ্টি করে। কিন্তু আত্মা এই তিনেরই অতীত।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির দৃষ্টিতেও সত্ত্ব, রজ এবং তম মানুষের চরিত্র ও জীবনসংগ্রামের তিনটি প্রতীকী শক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে। আলো, নির্মল আকাশ, শান্ত নদী এবং প্রস্ফুটিত পদ্ম সত্ত্বের প্রতীক হতে পারে। আগুন, ঝড়, গতি, আকাঙ্ক্ষা এবং সংগ্রাম রজের প্রতীক হতে পারে। অন্ধকার, ঘুম, কুয়াশা, স্থবিরতা এবং বন্ধ দরজা তমের প্রতীক হতে পারে। মানুষের জীবনের গল্প আসলে অনেক সময় এই তিন শক্তির পারস্পরিক টানাপোড়েনের গল্প। কখনো মানুষ নিজের অজ্ঞতার অন্ধকারে থাকে, কখনো আকাঙ্ক্ষার আগুনে দৌড়ায় এবং কখনো জ্ঞানের আলোয় নিজের অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করে।

সবশেষে বলা যায়, সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ এই শ্লোকাংশ মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি গভীর সত্য প্রকাশ করে। মানুষের দেহ প্রকৃতির অংশ, মন প্রকৃতির অংশ, চিন্তা ও আবেগ প্রকৃতির অংশ এবং সত্ত্ব, রজ ও তমও প্রকৃতির অংশ। কিন্তু দেহে অবস্থানকারী দেহী অব্যয়। তার প্রকৃত সত্তা পরিবর্তনশীল গুণের অতীত। গুণসমূহ তাকে প্রকৃতপক্ষে ধ্বংস বা পরিবর্তন করতে পারে না। কিন্তু গুণের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের কারণে জীব বন্ধনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। তাই গীতার এই শিক্ষা আমাদের বাহ্যিক জগতের পরিবর্তন বোঝার পাশাপাশি নিজের অন্তর্জগতকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখায়। আমরা যখন বুঝতে পারি যে আমাদের মধ্যে যে শান্তি, অস্থিরতা, আকাঙ্ক্ষা, জড়তা, সুখ ও দুঃখের ওঠানামা ঘটছে সেগুলো প্রকৃতির গুণের কার্যকলাপ, তখন আমরা ধীরে ধীরে তাদের থেকে এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে সাক্ষীর মতো দেখতে শিখি। সেই সাক্ষীভাব থেকেই আত্মজ্ঞান জন্ম নেয়। আর আত্মজ্ঞান গভীর হলে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত পরিচয় কোনো সাময়িক মানসিক অবস্থা নয়, কোনো পরিবর্তনশীল দেহ নয় এবং কোনো গুণের সীমাবদ্ধ প্রকাশও নয়। তার গভীরে রয়েছে সেই অবিনশ্বর চৈতন্যসত্তা, যা প্রকৃতির সমস্ত পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী। এই উপলব্ধিই শ্লোকটির সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং মুক্তির দিকে মানুষের অন্তর্জাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বার।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 23, 2026 August 23, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি