সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৫.১১ — যোগীর আত্মদর্শন, অন্তঃশুদ্ধি ও আত্মতত্ত্ব উপলব্ধির পথ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
যতন্তো যোগিনশ্চৈনং পশ্যন্ত্যাত্মন্যবস্থিতম্।যতন্তোহপ্যকৃত্মানো নৈনং পশ্যন্ত্যচেতসঃ।।১১।।
যতন্তো যোগিনশ্চৈনং পশ্যন্ত্যাত্মন্যবস্থিতম্।
যতন্তোহপ্যকৃত্মানো নৈনং পশ্যন্ত্যচেতসঃ।।১১।।

অনুবাদঃ আত্মজ্ঞানে অধিষ্ঠিত যত্মশীল যোগিগণ, এই তত্ত্ব দর্শন করতে পারেন। কিন্তু আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান রহিত অবিবেকী গণ যত্মপরায়ণ হয়েও এই তত্ত্ব অবগত হয় না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের একাদশ শ্লোক মানুষের আত্মজ্ঞান ও অন্তর্দর্শনের একটি অত্যন্ত গভীর সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। শ্লোকে বলা হয়েছে, যত্নশীল যোগীগণ নিজের অন্তরের মধ্যে অবস্থিত আত্মতত্ত্বকে উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু যারা চেষ্টা করেও নিজেদের অন্তঃকরণকে যথাযথভাবে পরিশুদ্ধ করতে পারেননি এবং যাদের চেতনা অস্থির ও অপ্রজ্ঞ, তারা চেষ্টা করেও সেই আত্মতত্ত্বকে উপলব্ধি করতে পারেন না। এই বক্তব্যের মধ্যে গীতার আত্মদর্শন, যোগসাধনা, মনসংযম এবং অন্তঃশুদ্ধির একটি সুসমন্বিত দর্শন প্রকাশিত হয়েছে।

এই শ্লোকের শুরুতেই এসেছে যতন্তো শব্দটি। সংস্কৃত যত্ ধাতুর সঙ্গে এই শব্দের সম্পর্ক। এর মধ্যে চেষ্টা করা, উদ্যোগ নেওয়া এবং কোনো উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করার ভাব রয়েছে। গীতার দৃষ্টিতে আত্মজ্ঞান কোনো অলস অপেক্ষার বিষয় নয়। এর জন্য আন্তরিক সাধনা, আত্মসংযম এবং সচেতন প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মানুষ যদি নিজের প্রকৃত সত্তাকে জানতে চায়, তবে তাকে নিজের মন ও জীবনের দিকে গভীরভাবে তাকাতে হবে। কিন্তু এই শ্লোক একই সঙ্গে আমাদের সতর্ক করে দেয় যে কেবল চেষ্টা করলেই আত্মদর্শন সম্ভব হয় না। চেষ্টা কোন পথে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেই চেষ্টার মাধ্যমে অন্তর কতটা পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর এসেছে যোগিনঃ শব্দটি। যোগী শব্দটির উৎস সংস্কৃত যুজ্ ধাতু। এর মধ্যে যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত করা এবং একত্রিত করার ভাব রয়েছে। গীতার যোগী কেবল কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক অনুশীলনকারী নন। যিনি নিজের মন, ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি এবং চেতনাকে একটি উচ্চতর সত্যের দিকে সংহত করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে যোগী। তাই যতন্তো যোগিনঃ বলতে এমন সাধকদের বোঝানো হয়েছে যারা আত্মতত্ত্ব উপলব্ধির উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবন ও চেতনাকে শৃঙ্খলিত করেছেন।

এরপর শ্লোকে এসেছে পশ্যন্তি শব্দটি। এটি সংস্কৃত দৃশ্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ দেখা। কিন্তু এখানে দেখা শব্দটি সাধারণ চোখে কোনো বস্তু দেখার অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। আত্মাকে চোখ দিয়ে দেখা যায় না। এখানে দেখা বলতে উপলব্ধি করা, প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করা এবং নিজের অস্তিত্বের গভীর সত্যকে চিনতে পারাকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ কোনো বিষয় সম্পর্কে পড়তে পারে, শুনতে পারে এবং বুদ্ধি দিয়ে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু আত্মদর্শন তার চেয়েও গভীর। এটি এমন এক উপলব্ধি যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বের প্রকৃত ভিত্তিকে অন্তর থেকে চিনতে শুরু করে।

এই কারণেই শ্লোকে বলা হয়েছে আত্মন্যবস্থিতম্। এর অর্থ আত্মার মধ্যে অবস্থিত। আত্মনি শব্দটি আত্মন্ শব্দ থেকে এসেছে এবং এর অর্থ আত্মায়, নিজের মধ্যে অথবা অন্তরে। অবস্থিতম্ এসেছে অব এবং স্থা ধাতুর সমন্বয় থেকে। এর অর্থ অবস্থান করা, প্রতিষ্ঠিত থাকা বা কোনো স্থানে স্থিত হওয়া। অর্থাৎ শ্লোকটি বলছে, যে আত্মতত্ত্বকে মানুষ খুঁজছে তা কোনো দূরবর্তী জগতে অনুপস্থিত নয়। তা নিজের অন্তরের মধ্যেই অবস্থিত। মানুষের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান তাই শেষ পর্যন্ত একটি অন্তর্মুখী যাত্রায় পরিণত হয়।

এখানে আত্মা শব্দটির গভীরতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ভারতীয় দর্শনে আত্মা কেবল শরীর বা ব্যক্তিত্বের নাম নয়। শরীর পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয় এবং জীবনের পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও যে চৈতন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে থাকে, আত্মতত্ত্বের আলোচনায় সেই গভীর সত্তার কথাই বলা হয়। গীতার ভাষায় আত্মাকে বাইরে কোনো বস্তু হিসেবে খুঁজে পাওয়ার বিষয় নয়। বরং নিজের অন্তরের আবরণ সরিয়ে তার স্বরূপ উপলব্ধি করার বিষয়।

এই প্রসঙ্গে শ্লোকটির দ্বিতীয় অংশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে বলা হয়েছে যতন্তোহপ্যকৃতাত্মানো নৈনং পশ্যন্ত্যচেতসঃ। অর্থাৎ চেষ্টা করেও যারা নিজেদের অন্তরকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে পারেনি এবং যাদের চেতনা অস্থির ও অপ্রজ্ঞ, তারা আত্মতত্ত্বকে উপলব্ধি করতে পারে না। এখানে অকৃতাত্মানঃ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ এমন ব্যক্তি যার অন্তঃকরণ যথাযথভাবে পরিশুদ্ধ, সংযত বা প্রস্তুত হয়নি। এটি এমন নয় যে আত্মা অসম্পূর্ণ। বরং মানুষের উপলব্ধির মাধ্যমই অসম্পূর্ণ ও অশুদ্ধ।

এই বিষয়টি বোঝার জন্য একটি আয়নার উদাহরণ অত্যন্ত সুন্দর। একটি আয়নায় মানুষের মুখের প্রতিবিম্ব স্বাভাবিকভাবেই পড়ে। কিন্তু আয়নাটি যদি ধুলোয় ঢাকা থাকে, তাহলে মুখ স্পষ্ট দেখা যায় না। তখন সমস্যাটি মুখের মধ্যে নয় এবং আয়নার সামনে থাকা ব্যক্তির অস্তিত্বের মধ্যেও নয়। সমস্যা হলো আয়নাটি পরিষ্কার নয়। একইভাবে আত্মতত্ত্ব মানুষের অন্তরে উপস্থিত থাকলেও মন যদি কামনা, আসক্তি, অহংকার, অস্থিরতা এবং অজ্ঞতার দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে, তবে সেই আত্মতত্ত্বকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অচেতসঃ শব্দটিও এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে। চেতস্ শব্দের সঙ্গে মন, চেতনা ও অন্তঃকরণের ধারণা যুক্ত। এর সঙ্গে অ উপসর্গ যুক্ত হয়ে অচেতসঃ হয়েছে। এখানে অচেতন বলতে শারীরিকভাবে জ্ঞানহীন মানুষ বোঝানো হয় না। বরং এমন মানুষকে বোঝানো হয়েছে যার অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত নয়, যার মন অস্থির এবং যে নিজের গভীর অস্তিত্বের সত্যকে উপলব্ধি করার মতো মানসিক প্রস্তুতি অর্জন করেনি। মানুষ চোখ খোলা রেখে অনেক কিছু দেখতে পারে, কিন্তু নিজের ভেতরের সত্য দেখতে না পারাও সম্ভব। এই পার্থক্যটিই শ্লোকটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরে।

গীতার এই শিক্ষা বেদান্ত দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে আত্মা কোনো নতুন বস্তু নয় যা সাধনার মাধ্যমে সৃষ্টি করতে হবে। আত্মা স্বপ্রকাশিত চৈতন্য। মানুষের সমস্যা আত্মার অনুপস্থিতি নয়, বরং আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতা। তাই আত্মজ্ঞান মূলত নতুন কিছু অর্জন নয়। বরং ভুল পরিচয় ও অজ্ঞতার আবরণ দূর করা। মানুষ যখন নিজেকে কেবল শরীর, মন, সামাজিক পরিচয়, সম্পদ, সাফল্য অথবা ব্যর্থতার সঙ্গে একাত্ম করে দেখে, তখন নিজের গভীরতর সত্তাকে ভুলে যায়। আত্মজ্ঞান সেই ভুল পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করার পথ।

সাংখ্য দর্শনের আলোতেও এই শ্লোকের অর্থ গভীর। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। শরীর, মন, বুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয় প্রকৃতির অন্তর্গত। মানুষ যখন পরিবর্তনশীল উপাদানগুলোকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় বলে মনে করে, তখন তার মধ্যে বন্ধনের সৃষ্টি হয়। আত্মদর্শন তাকে পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সাক্ষী চৈতন্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়। যোগদর্শনের ক্ষেত্রেও চিত্তের অস্থিরতা আত্মদর্শনের পথে একটি বড় বাধা। চিত্ত যত বেশি বিক্ষিপ্ত থাকে, সত্যের প্রতিফলন তত বেশি অস্পষ্ট হয়। তাই যোগসাধনার উদ্দেশ্য কেবল বাহ্যিক অনুশীলন নয়, চেতনার সংহতি ও অন্তরের স্বচ্ছতা অর্জন।

এই শ্লোকের একটি অসাধারণ শিক্ষা হলো চেষ্টা এবং অন্তঃশুদ্ধির পার্থক্য। মানুষ প্রায়ই মনে করে বেশি পরিশ্রম করলেই সবকিছু অর্জন করা যায়। কিন্তু আধ্যাত্মিক জীবনে গীতা একটি সূক্ষ্ম সংশোধন করে। শুধু প্রচেষ্টার পরিমাণ নয়, প্রচেষ্টার প্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ দীর্ঘ সময় সাধনা করেও যদি অহংকার, আসক্তি এবং অস্থিরতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তবে তার সাধনা আত্মদর্শনের দিকে এগিয়ে নাও যেতে পারে। অন্যদিকে একজন ব্যক্তি আন্তরিকভাবে নিজের মনকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, আসক্তিকে বুঝতে পারে এবং ধীরে ধীরে অন্তরকে শুদ্ধ করতে পারে। তার সাধনা হয়তো বাহ্যিকভাবে খুব বড় নয়, কিন্তু তার অন্তরের পরিবর্তন গভীর হতে পারে।

এই সত্য আধুনিক জীবনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ আজ অসংখ্য তথ্যের মধ্যে বাস করে। জ্ঞান অর্জনের সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই আত্মজ্ঞান বাড়ে না। একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে হাজারটি বই পড়তে পারে, অসংখ্য বক্তৃতা শুনতে পারে এবং বিভিন্ন দর্শন সম্পর্কে জানতে পারে। তবু সে নিজের ক্রোধ, অহংকার, ভয়, আসক্তি এবং দুর্বলতার প্রকৃত কারণ বুঝতে নাও পারে। কারণ বাইরের জ্ঞান এবং অন্তর্দৃষ্টি এক বিষয় নয়। বাইরের তথ্য আমাদের জানায় পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি আমাদের নিজের চেতনার প্রকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখায়।

এই কারণে শ্লোকটির আয়নার উপমাটি আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কার্যকর। আমাদের মন যদি সারাক্ষণ উদ্বেগ, তুলনা, প্রতিযোগিতা, আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মপ্রদর্শনের মধ্যে ব্যস্ত থাকে, তাহলে নিজের প্রকৃত অবস্থাকে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা অন্যদের জীবন দেখতে দেখতে নিজের জীবনকে ভুলে যেতে পারি। অন্যের সাফল্য দেখে নিজের মূল্য বিচার করতে পারি। সামাজিক পরিচয়কে নিজের প্রকৃত পরিচয় বলে ধরে নিতে পারি। গীতার শিক্ষা এই বাহ্যিক ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষকে নিজের অন্তরে ফিরে তাকাতে আহ্বান জানায়।

শ্লোকটির প্রতীকী অর্থ আরও গভীর। আত্মা যেন আকাশের সূর্যের মতো এবং মানুষের মন যেন একটি জলাধার। জল স্থির থাকলে আকাশের প্রতিফলন পরিষ্কার দেখা যায়। জল উত্তাল হলে প্রতিফলন ভেঙে যায়। আকাশের কোনো সমস্যা হয় না। সূর্যেরও কোনো পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তন ঘটে জলের অবস্থায়। একইভাবে আত্মতত্ত্বের কোনো পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তন দরকার মানুষের অন্তরের অবস্থায়। সাধনার মাধ্যমে মন যত শান্ত, সংযত এবং স্বচ্ছ হয়, আত্মতত্ত্বের উপলব্ধিও তত সহজ হয়।

এখানে পশ্যন্তি শব্দটির মধ্যেও একটি গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা রয়েছে। সাধারণ দৃষ্টি বাইরের দিকে যায়। আত্মদৃষ্টি ভিতরের দিকে ফিরে আসে। সাধারণ দৃষ্টিতে মানুষ বস্তু দেখে। আত্মদৃষ্টিতে মানুষ সেই চৈতন্যকে অনুসন্ধান করে যার উপস্থিতির কারণে দেখা, চিন্তা করা এবং অনুভব করা সম্ভব হয়। তাই আত্মদর্শন কোনো নতুন দৃশ্য দেখা নয়। এটি দর্শকের নিজের প্রকৃতি সম্পর্কে জাগরণ।

শ্লোকটির ভাষাগত গঠনও অত্যন্ত সুন্দর। প্রথম অংশে বলা হয়েছে যতন্তো যোগিনঃ এবং দ্বিতীয় অংশে আবার বলা হয়েছে যতন্তোহপি অকৃতাত্মানঃ। উভয় ক্ষেত্রেই চেষ্টা আছে। কিন্তু একদল আত্মতত্ত্বকে উপলব্ধি করতে পারে এবং অন্যদল পারে না। এই পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে গীতা আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য তুলে ধরে। শুধু চেষ্টা করাই যথেষ্ট নয়। চেষ্টার সঙ্গে অন্তরের পরিশুদ্ধি, মনসংযম, একাগ্রতা এবং সত্যের প্রতি আন্তরিকতা যুক্ত হতে হয়।

মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। আমরা অনেক সময় কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য বাইরের পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে চাই। কিন্তু কিছু সমস্যার মূল আমাদের নিজের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে থাকে। আমরা পৃথিবীকে যেমন দেখি, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমাদের নিজের মানসিক অবস্থার ওপর। তাই আত্মপরিবর্তন ছাড়া বাহ্যিক পরিবর্তন অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। গীতা মানুষকে নিজের ভেতরের দৃষ্টিকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা দেয়।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের প্রকৃত সৌন্দর্য তার সরল অথচ গভীর বক্তব্যে। আত্মতত্ত্ব দূরে নয়। তা নিজের মধ্যেই অবস্থিত। কিন্তু তার উপলব্ধির জন্য শুধু বাহ্যিক চেষ্টা যথেষ্ট নয়। মানুষের মনকে প্রস্তুত করতে হবে, চেতনাকে সংহত করতে হবে এবং অন্তরকে অজ্ঞতা ও আসক্তির আবরণ থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করতে হবে। যোগী সেই ব্যক্তি যিনি এই অন্তর্মুখী যাত্রায় নিজেকে প্রস্তুত করেন। আর অচেতস ব্যক্তি সেই মানুষ যিনি চেষ্টা করলেও নিজের চেতনার প্রকৃত অবস্থাকে পরিবর্তন করতে পারেননি।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শিক্ষা তাই কেবল আত্মজ্ঞান লাভের একটি পদ্ধতি নয়, বরং মানুষ কীভাবে সত্যকে দেখবে তার একটি গভীর দর্শন। সত্যকে দেখার আগে নিজের দৃষ্টিকে পরিষ্কার করতে হয়। আত্মাকে পাওয়ার আগে আত্মাকে আচ্ছন্ন করে রাখা ভুল পরিচয় ও অজ্ঞতার আবরণ সরাতে হয়। তাই এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো আত্মা আমাদের বাইরে কোনো দূরবর্তী সত্য নয়। আত্মা আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম ভিত্তি। কিন্তু সেই সত্য উপলব্ধি করতে হলে প্রচেষ্টাকে যোগে রূপান্তরিত করতে হবে, জ্ঞানকে অন্তর্দৃষ্টিতে রূপান্তরিত করতে হবে এবং জীবনের সাধনাকে অন্তঃশুদ্ধির পথে পরিচালিত করতে হবে। তখন মানুষ কেবল পৃথিবীকে দেখবে না, নিজের দেখার ক্ষমতার উৎসকেও চিনতে শুরু করবে। আর সেই মুহূর্তেই আত্মদর্শনের পথ সত্যিকার অর্থে উন্মুক্ত হয়ে যায়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি