ভগবদ্গীতা ১৫.১৫ — হৃদয়ে পরমেশ্বরের অবস্থান, স্মৃতি-জ্ঞান-বিস্মৃতি ও বেদজ্ঞানের পরম লক্ষ্য
সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো
মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ।
বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো
বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্।।১৫।।
অনুবাদঃ আমি সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত এবং আমর থেকেই স্মৃতি, জ্ঞান ও বিলোপ হয়। আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য এবং আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ এবং মানুষের অন্তর্জগতের সম্পর্ককে এক অসাধারণ গভীরতায় প্রকাশ করেছে। এখানে কৃষ্ণ এমন এক সত্যের কথা বলছেন, যা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব, চেতনা, জ্ঞান এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শ্লোকটির শুরুতেই তিনি ঘোষণা করছেন যে তিনি সকল জীবের হৃদয়ে অবস্থান করছেন। মানুষের স্মৃতি, জ্ঞান এবং বিস্মৃতির পেছনেও তাঁরই উপস্থিতি রয়েছে। আবার সমস্ত বেদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাঁকে জানা। তিনি বেদান্তের কর্তা এবং বেদের প্রকৃত জ্ঞাতা। ফলে এই একটি শ্লোকের মধ্যে ঈশ্বরতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক সাধনার একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন প্রকাশিত হয়েছে।
“সর্বস্য” শব্দের অর্থ সকলের বা প্রত্যেকের। এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কৃষ্ণ এখানে কোনো বিশেষ মানুষ বা সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজের উপস্থিতিকে সীমাবদ্ধ করেননি। তিনি বলেন সকলের হৃদয়ে তিনি অবস্থান করছেন। যে মানুষ তাঁকে ভালোবাসে তার হৃদয়ে যেমন তাঁর উপস্থিতি আছে, তেমনি যে মানুষ তাঁকে উপলব্ধি করতে পারে না তার মধ্যেও সেই অন্তর্যামী সত্তা উপস্থিত। এর অর্থ হলো ঈশ্বরের উপস্থিতি মানুষের বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল নয়। মানুষ ঈশ্বরকে চিনতে পারে বা না পারে, ঈশ্বর তার অন্তরের গভীরে অবস্থান করেন। এই ধারণা ঈশ্বরের সর্বজনীনতার একটি শক্তিশালী প্রকাশ।
এরপর আসে “অহম্” শব্দটি। সাধারণ অর্থে অহম্ হলো আমি। কিন্তু কৃষ্ণের এই আমি সাধারণ মানুষের অহংকারের আমি নয়। মানুষের আমি সীমাবদ্ধ এবং পরিবর্তনশীল। মানুষ কখনও নিজেকে শরীর দিয়ে চেনে, কখনও নিজের নাম, পরিচয়, পরিবার, পেশা, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে। কিন্তু কৃষ্ণের অহম্ কোনো সীমাবদ্ধ ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ নয়। এটি পরম সত্তার আত্মপ্রকাশ। তিনি সেই চৈতন্যের কথা বলছেন যার উপস্থিতির কারণে মানুষ জানতে পারে, স্মরণ করতে পারে, চিন্তা করতে পারে এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। তাই এই অহম্ অহংকার নয়, বরং পরম সত্যের আত্মপরিচয়।
“হৃদি” শব্দের অর্থ হৃদয়ে। কিন্তু এখানে হৃদয় বলতে শুধু শরীরের একটি অঙ্গ বোঝানো হয়নি। ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় হৃদয় মানুষের অন্তর্জগতের কেন্দ্র। মানুষের অনুভূতি, চিন্তা, উপলব্ধি এবং আত্মসচেতনতার গভীরতর স্তরকে হৃদয়ের প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তাই কৃষ্ণ যখন বলেন তিনি হৃদয়ে অবস্থান করছেন, তখন তিনি বোঝাতে চান যে ঈশ্বর মানুষের অন্তরের বাইরে কোনো দূরবর্তী সত্তা নন। তাঁর উপস্থিতি জীবনের গভীরতম স্তরে। মানুষ তাঁকে খুঁজতে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে পারে, কিন্তু গীতার এই বক্তব্য তাকে নিজের অন্তরের দিকে ফিরে তাকাতে শেখায়।
“সন্নিবিষ্টো” শব্দটি এই ধারণাকে আরও গভীর করে। এর মূল ধাতু সংস্কৃত “বিশ্”, যার অর্থ প্রবেশ করা বা অবস্থান করা। উপসর্গের প্রভাবে “সন্নিবিষ্ট” অর্থ হয়েছে গভীরভাবে প্রবেশ করে অবস্থান করা বা প্রতিষ্ঠিত থাকা। তাই “হৃদি সন্নিবিষ্টো” শুধু হৃদয়ের কাছে থাকার কথা নয়। এটি হৃদয়ের গভীরে প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা বলে। কৃষ্ণের উপস্থিতি যেন এমন এক উপস্থিতি, যা মানুষের অস্তিত্বের ভেতরের স্তরে প্রবেশ করে আছে। এই কারণেই কৃষ্ণকে গীতায় অন্তর্যামী বলা হয়। তিনি বাইরে থেকে শুধু নির্দেশ দেন না, জীবের অন্তরে অবস্থান করেও তার অস্তিত্বকে ধারণ করেন।
এরপর কৃষ্ণ বলেন “মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ”। “মত্তঃ” অর্থ আমার থেকে। অর্থাৎ মানুষের স্মৃতি, জ্ঞান এবং বিস্মৃতির গভীরতম উৎসও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত। “স্মৃতি” শব্দটি এসেছে “স্মৃ” ধাতু থেকে, যার অর্থ মনে রাখা বা স্মরণ করা। মানুষের জীবনে স্মৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা অতীত অভিজ্ঞতা মনে রাখি, পূর্বে শেখা বিষয় মনে করি এবং সেই স্মৃতির ভিত্তিতে বর্তমান জীবনের সিদ্ধান্ত নিই। স্মৃতি শুধু তথ্য সংরক্ষণ নয়। এটি মানুষের ব্যক্তিত্ব, পরিচয় এবং জীবনবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন মানুষ তার অতীতকে মনে রেখেই নিজের বর্তমানকে বুঝতে পারে।
“জ্ঞানম্” শব্দটি এসেছে “জ্ঞা” ধাতু থেকে। এর অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা চিনতে পারা। স্মৃতি এবং জ্ঞান এক নয়। স্মৃতি পূর্বে জানা বিষয়কে মনে রাখতে সাহায্য করে, আর জ্ঞান কোনো বিষয়ের সত্যতা বা প্রকৃতিকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। মানুষ শুধু তথ্য সংগ্রহ করে না, সেই তথ্যের অর্থও বোঝে। এই বোঝাপড়াই জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। আর জ্ঞানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মানুষ নিজের অস্তিত্ব এবং পরম সত্য সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করে। সেই কারণেই কৃষ্ণ স্মৃতি ও জ্ঞানের কথা পাশাপাশি বলেছেন।
“অপোহনম্” শব্দটির অর্থ অপসারণ বা দূরে সরিয়ে দেওয়া। শ্লোকের প্রেক্ষাপটে এটি বিস্মৃতি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ কৃষ্ণ বলছেন মানুষের স্মৃতি যেমন তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনি বিস্মৃতিও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় বোঝা জরুরি। কৃষ্ণ মানুষের অন্যায় বা ভুল কাজের নৈতিক কারণ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন না। বরং তিনি মানুষের চেতনার সামগ্রিক কার্যপ্রক্রিয়ার পরম ভিত্তির কথা বলছেন। মানুষ সবকিছু মনে রাখতে পারে না এবং সবকিছু মনে রাখা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়ও নয়। অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয় সময়ের সঙ্গে মুছে যায়। এই অর্থে বিস্মৃতি মানুষের মানসিক জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ। আধ্যাত্মিক অর্থে অপোহন আরও গভীর। সত্য উপলব্ধির জন্য যেমন নতুন জ্ঞান গ্রহণ করতে হয়, তেমনি ভুল ধারণা এবং অজ্ঞতাকেও সরিয়ে দিতে হয়।
এরপর শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগত থেকে বৈদিক জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হয়। “বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো” অর্থ সমস্ত বেদের দ্বারা আমিই জ্ঞাতব্য। “বেদ” শব্দটি এসেছে “বিদ্” ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা। অর্থাৎ বেদের মূল ধারণার মধ্যেই জ্ঞান নিহিত রয়েছে। কিন্তু কৃষ্ণ বলছেন সমস্ত বেদের চূড়ান্ত জ্ঞাতব্য তিনিই। এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবীর অন্যান্য জ্ঞান অর্থহীন। বরং এখানে বলা হচ্ছে সমস্ত জ্ঞানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য পরম সত্যকে উপলব্ধি করা। বাহ্যিক জ্ঞান মানুষকে পৃথিবী সম্পর্কে জানায়, কিন্তু আত্মজ্ঞান মানুষকে নিজের অস্তিত্বের গভীরতা সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।
“বেদ্য” শব্দের অর্থ যাকে জানা উচিত বা যাকে জ্ঞাতব্য বলা হয়। এর সঙ্গে “এব” শব্দ যুক্ত হয়ে হয়েছে “অহমেব বেদ্যঃ”। অর্থাৎ আমিই জ্ঞাতব্য। এখানে কৃষ্ণ জ্ঞানসাধনার সর্বোচ্চ লক্ষ্য নির্দেশ করছেন। মানুষ পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে। বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি এবং প্রকৃতি সম্পর্কে অসংখ্য জ্ঞান অর্জন করতে পারে। কিন্তু গীতার প্রশ্ন আরও গভীরে যায়। মানুষ নিজেকে কি জানে। সে কি জানে তার অস্তিত্বের প্রকৃত ভিত্তি কী। সে কি জানে তার চেতনার উৎস কোথায়। পরম জ্ঞানের অর্থ হলো এই গভীরতম প্রশ্নগুলোর দিকে অগ্রসর হওয়া।
শ্লোকের শেষ অংশ “বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্” অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। “বেদান্তকৃত্” শব্দটি বেদান্ত এবং কৃত্ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। বেদান্ত বলতে বেদের অন্ত বা বেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বোঝানো হয়। আবার ভারতীয় দর্শনের একটি প্রধান শাস্ত্রধারা হিসেবেও বেদান্ত পরিচিত। কৃষ্ণ নিজেকে বেদান্তকৃত্ বলেছেন। অর্থাৎ তিনি বেদের চূড়ান্ত জ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা বা কর্তা। তারপর তিনি বলেন “বেদবিত্”, অর্থাৎ তিনিই বেদজ্ঞ। এখানে একটি গভীর দার্শনিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি শুধু জ্ঞানের বিষয় নন। তিনি জ্ঞানের উৎস, জ্ঞানের লক্ষ্য এবং জ্ঞানের প্রকৃত অধিকারী।
বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনের আলোকে এই শ্লোকের ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য দেখা গেলেও এর কেন্দ্রীয় বক্তব্য অত্যন্ত শক্তিশালী। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে হৃদয়ে অবস্থানকারী পরম সত্তাকে চৈতন্যের পরম ভিত্তি হিসেবে দেখা যায়। মানুষ নিজের গভীরতম চেতনার অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরম সত্যের উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যায়। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর জীবের অন্তর্যামী এবং জীব তাঁর ওপর নির্ভরশীল। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীব পৃথক সত্তা হলেও ঈশ্বর জীবের অন্তরে অবস্থান করেন এবং জীবের জ্ঞান ও অস্তিত্ব তাঁর ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিভিন্ন দর্শনের ভাষা আলাদা হলেও এই শ্লোক ঈশ্বরের অন্তর্নিহিত উপস্থিতিকে একটি কেন্দ্রীয় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। এখানে হৃদয় একটি অন্তর্মন্দিরের প্রতীক। মানুষ বাইরের মন্দিরে ঈশ্বরের সন্ধান করে, কিন্তু কৃষ্ণ তাকে নিজের হৃদয়ের গভীরে তাকাতেও আহ্বান করছেন। “স্মৃতি” এখানে শুধু অতীত মনে রাখার ক্ষমতা নয়। এটি নিজের প্রকৃত স্বরূপকে স্মরণ করার প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। মানুষ নিজের আসল পরিচয় ভুলে গিয়ে শরীর, সম্পদ, ক্ষমতা, সাফল্য এবং সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে। আত্মজ্ঞান সেই বিস্মৃত সত্যকে পুনরায় স্মরণ করার পথ। এই দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক সাধনা এক ধরনের স্মরণযাত্রা।
অন্যদিকে “অপোহন” মানুষের ভেতরের অজ্ঞতা এবং ভ্রান্ত ধারণা দূর করার প্রতীক হতে পারে। মানুষ নিজের সম্পর্কে বহু ভুল ধারণা পোষণ করতে পারে। সে মনে করতে পারে তার পরিচয় শুধু তার বাহ্যিক অবস্থান বা সামাজিক পরিচয়। কিন্তু গভীর আত্মজিজ্ঞাসা তাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। আমি কে। আমার প্রকৃত পরিচয় কী। আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী। আমার জ্ঞান কোথা থেকে আসে। এই প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতরের অজ্ঞতা ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে। তাই জ্ঞান শুধু নতুন কিছু যোগ করার নাম নয়। অনেক সময় জ্ঞান মানে ভুল কিছু সরিয়ে সত্যকে প্রকাশ করা।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের মানুষ তথ্যের অভাবে ভুগছে না। বরং অতিরিক্ত তথ্যের মধ্যে বাস করছে। তার হাতে অসংখ্য তথ্য, মতামত এবং সংবাদ রয়েছে। কিন্তু তথ্যের আধিক্য সবসময় জ্ঞানের জন্ম দেয় না। অনেক সময় তা বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করে। তাই আজকের মানুষের জন্য এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো তথ্যের বাইরে জ্ঞানের সন্ধান করা এবং জ্ঞানের বাইরে আত্মবোধের সন্ধান করা। মানুষ কত কিছু জানে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সে নিজের জীবন সম্পর্কে কতটা সচেতন এবং সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য কতটা প্রস্তুত।
এই শ্লোককে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি কম্পিউটারে অসংখ্য তথ্য জমা থাকতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য কার্যকর করার জন্য একটি সক্রিয় ব্যবস্থা দরকার। মানুষের মস্তিষ্কেও অসংখ্য তথ্য থাকে। কিন্তু চেতনার উপস্থিতি ছাড়া সেই তথ্য অর্থপূর্ণ অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয় না। স্মৃতি তথ্য ধরে রাখে, জ্ঞান তথ্যকে উপলব্ধিতে রূপ দেয় এবং বিস্মৃতি অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে সরিয়ে দেয়। গীতার ভাষায় এই সমগ্র চেতনার গভীরে যে পরম ভিত্তি রয়েছে, কৃষ্ণ সেই অন্তর্নিহিত সত্যের দিকে নির্দেশ করছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই শ্লোক মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে ফিরে তাকাতে শেখায়। মানুষ সাধারণত সুখের সন্ধান করে বাইরের জগতে। সে সম্পদ চায়, সম্মান চায়, সাফল্য চায় এবং অন্যের স্বীকৃতি চায়। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই স্থায়ী নয়। গীতার এই শ্লোক মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরায়। কৃষ্ণ যেন বলছেন, তুমি যে সত্যের সন্ধান করছ তা শুধু বাইরের জগতে নেই। তোমার নিজের হৃদয়ের গভীরেও সেই সত্যের উপস্থিতি রয়েছে। নিজের অন্তরকে জানা তাই ঈশ্বরকে জানার পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই শ্লোকের মধ্যে একটি সুন্দর জ্ঞানতাত্ত্বিক যাত্রাও রয়েছে। প্রথমে আছে হৃদয়। তারপর স্মৃতি ও জ্ঞান। এরপর বেদ। তারপর বেদ্য। সবশেষে বেদান্ত ও বেদজ্ঞের কথা এসেছে। অর্থাৎ মানুষের অন্তরের চেতনা থেকে শুরু করে বৈদিক জ্ঞানের সর্বোচ্চ পরিণতি পর্যন্ত একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। মানুষ নিজের ভেতর থেকে প্রশ্ন করে। প্রশ্ন থেকে জ্ঞান অনুসন্ধান শুরু হয়। জ্ঞান তাকে শাস্ত্রের কাছে নিয়ে যায়। শাস্ত্র তাকে পরম সত্যের সন্ধান দেয়। আর সেই অনুসন্ধানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সেই সত্যকে উপলব্ধি করা, যিনি সর্বত্র এবং অন্তরেও অবস্থান করছেন।
অতএব “সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো” শুধু একটি শ্লোকের বাক্য নয়। এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের একটি গভীর প্রশ্ন। আমরা কে, আমাদের চেতনার উৎস কী, জ্ঞান কোথা থেকে আসে এবং সমস্ত জ্ঞানের শেষ লক্ষ্য কোথায়, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ নিজের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে। কৃষ্ণ সেই অন্তর্জগতের গভীরে নিজের উপস্থিতির কথা ঘোষণা করছেন। তিনি বলছেন তিনি সকলের হৃদয়ে অবস্থান করছেন। স্মৃতি, জ্ঞান এবং বিস্মৃতির পেছনেও তাঁরই পরম উপস্থিতি রয়েছে। সমস্ত বেদের চূড়ান্ত জ্ঞাতব্য তিনিই। তিনি বেদান্তের কর্তা এবং বেদের জ্ঞাতা।
সবশেষে এই শ্লোকের সারকথা এক গভীর সত্যে এসে মিলিত হয়। মানুষ যে জ্ঞানকে বাইরে খুঁজছে, সেই জ্ঞানের আলো তার অন্তরেও প্রতিফলিত হচ্ছে। যে সত্যকে শাস্ত্রের পাতায় খোঁজা হয়, সেই সত্যের উপস্থিতি মানুষের হৃদয়ের গভীরেও রয়েছে। আর যে পরম বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার জন্য মানুষ দীর্ঘ সাধনা করে, শ্রীকৃষ্ণ সেই পরম সত্যকেই নিজের স্বরূপ হিসেবে প্রকাশ করেছেন। তাই এই শ্লোক আমাদের শুধু ঈশ্বরকে জানতে বলে না। এটি আমাদের নিজের অন্তরকে জানতে শেখায়। নিজের চেতনার গভীরে প্রবেশ করতে শেখায়। ভুল ধারণা সরিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়। এবং শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করায় যে জ্ঞানের প্রকৃত পরিণতি কেবল আরও তথ্য অর্জন নয়, বরং সেই পরম সত্যকে জানা, যিনি সকলের হৃদয়ে নীরবে, গভীরভাবে এবং অবিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছেন।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!