সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৫.১৬ — ক্ষর ও অক্ষর পুরুষ, পরিবর্তনশীল জগত ও অবিনশ্বর সত্যের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ। ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থোহক্ষর উচ্যতে।।১৬।।
দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ। 
ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থোহক্ষর উচ্যতে।।১৬।।

অনুবাদঃ ক্ষর ও অক্ষর দুই প্রকার জীব রয়েছে। এই জড় জগতের সমস্ত জীবকে ক্ষর এবং চিৎ-জগতের সমস্ত জীবকে অক্ষর বলা হয়।

ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোক মানুষের অস্তিত্ব এবং জগতের প্রকৃতি সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলেছেন, এই জগতে দুই প্রকার পুরুষ বা সত্তার কথা বলা হয়। একজন ক্ষর এবং অন্যজন অক্ষর। সমস্ত পরিবর্তনশীল সৃষ্ট জীব ও জগতের প্রকাশকে ক্ষর বলা হয় এবং যিনি কূটস্থ অর্থাৎ পরিবর্তনের মধ্যেও স্থির ও অবিচল, তাঁকে অক্ষর বলা হয়। শ্লোকটি খুব সংক্ষিপ্ত হলেও এর মধ্যে মানুষের জীবন, দেহ, মন, আত্মপরিচয়, জগতের পরিবর্তন এবং পরম সত্য সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। মানুষের চোখের সামনে যে জগত প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, সেই পরিবর্তনের অন্তরালে কোনো স্থায়ী সত্য আছে কি না, এই শ্লোক আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

এর সহজ অর্থ হলো এই জগতে দুই প্রকার পুরুষ বা অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। একজন ক্ষর এবং অন্যজন অক্ষর। সমস্ত সৃষ্ট জীব ক্ষর এবং যিনি কূটস্থ অর্থাৎ পরিবর্তনের মধ্যেও স্থির, তাঁকে অক্ষর বলা হয়। এখানে পুরুষ শব্দটি আধুনিক বাংলায় ব্যবহৃত পুরুষ শব্দের সীমিত অর্থে নেওয়া উচিত নয়। সংস্কৃত দর্শনে পুরুষ বলতে চৈতন্যসত্তা, সচেতন অস্তিত্ব, আত্মসত্তা অথবা ব্যক্তিসত্তার গভীর ধারণাকে বোঝানো হয়। তাই এই শ্লোক মূলত মানুষের অস্তিত্বের দুটি ভিন্ন মাত্রা সম্পর্কে কথা বলছে।

ক্ষর শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ক্ষর ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ধাতুর মধ্যে প্রবাহিত হওয়া, ঝরে পড়া, নিঃসৃত হওয়া, ক্ষয় হওয়া এবং পরিবর্তিত হওয়ার ভাব রয়েছে। তাই ক্ষর বলতে বোঝায় যা স্থির নয়, যা পরিবর্তিত হয়, যা সময়ের প্রবাহে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং যা এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় চলে যায়। এখানে ক্ষয় বলতে কেবল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া বোঝানো হয়নি। পরিবর্তনও ক্ষয়ের একটি অংশ। একটি শিশু যখন বড় হয়ে যুবকে পরিণত হয়, তখন শিশুর রূপটি আর থাকে না। একটি পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি তৈরি হলে পুরোনো রূপটি বিলীন হয়ে যায়। একটি গাছ বীজ থেকে বৃক্ষে পরিণত হয় এবং পরে আবার ক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রূপ বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনশীলতাই ক্ষরতার মূল বৈশিষ্ট্য।

মানুষের নিজের জীবনও ক্ষরের একটি জীবন্ত উদাহরণ। জন্মের পর শরীর প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। শৈশবের শরীর কৈশোরে বদলে যায়, কৈশোরের শরীর যৌবনে পরিবর্তিত হয় এবং যৌবনের শরীর একসময় বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যায়। শুধু শরীর নয়, মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, অভ্যাস, পছন্দ, সম্পর্ক, সামাজিক পরিচয় এবং জীবনের পরিস্থিতিও বদলে যায়। আজ যে মানুষ একজন শিক্ষার্থী, ভবিষ্যতে সে একজন কর্মজীবী হতে পারে। আজ যে মানুষ কোনো একটি মতকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, কয়েক বছর পর তার চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। আজ যে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে তার রূপ পরিবর্তিত হতে পারে। এই সবকিছুই ক্ষর জগতের অন্তর্ভুক্ত।

শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি, তখন ভূত শব্দটির প্রকৃত অর্থও বোঝা প্রয়োজন। ভূত শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতু থেকে এসেছে। ভূ ধাতুর অর্থ হলো হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা অথবা প্রকাশিত হওয়া। তাই এখানে ভূত বলতে কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা বোঝানো হয়নি। সমস্ত সৃষ্ট এবং প্রকাশিত জীবসত্তাকে ভূত বলা হয়েছে। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং জগতের অসংখ্য প্রকাশিত রূপ এই অর্থে ভূত। যা প্রকাশিত হয়েছে তা পরিবর্তনের অধীন। কারণ প্রকাশিত জগতের ধর্মই হলো রূপান্তর। এই কারণে কৃষ্ণ সমস্ত ভূতকে ক্ষর বলেছেন।

ক্ষরকে বোঝার জন্য প্রকৃতির দিকে তাকালেই যথেষ্ট। নদীর জল প্রবাহিত হচ্ছে। এক মুহূর্তের জল পরের মুহূর্তে আর একই জায়গায় নেই। গাছের পাতা জন্ম নিচ্ছে এবং ঝরে যাচ্ছে। মেঘ তৈরি হচ্ছে এবং আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। ঋতু পরিবর্তিত হচ্ছে। দিন রাতের মধ্যে পরিণত হচ্ছে এবং রাত আবার দিনে ফিরে আসছে। মানুষের জীবনেও একই প্রবাহ দেখা যায়। জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন এবং ক্ষয়ের মধ্য দিয়েই জীবন এগিয়ে চলে। অর্থাৎ পরিবর্তন কোনো দুর্ঘটনা নয়। পরিবর্তনই প্রকাশিত জগতের স্বাভাবিক ধর্ম।

এর বিপরীতে রয়েছে অক্ষর। অক্ষর শব্দটি অ এবং ক্ষর এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে অ নিষেধ বোঝায়। তাই অক্ষর অর্থ যা ক্ষর নয়। অর্থাৎ যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা বিনষ্ট হয় না এবং যা পরিবর্তনের সাধারণ প্রবাহে বিলীন হয়ে যায় না। বাংলা ভাষায় অক্ষর শব্দটি আমরা সাধারণত বর্ণ বোঝাতে ব্যবহার করি। কিন্তু সংস্কৃত দর্শনে অক্ষর শব্দের অর্থ অনেক গভীর। এখানে অক্ষর এমন এক স্থায়ী সত্যের ধারণা প্রকাশ করে যা পরিবর্তনশীল জগতের বিপরীতে অবস্থান করে।

অক্ষরকে বোঝার জন্য মানুষের নিজের অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো যায়। আমাদের শরীর বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। শৈশবের শরীর আর আজকের শরীর এক নয়। আমাদের চিন্তা বদলেছে। অনুভূতি বদলেছে। অভ্যাস বদলেছে। জীবনের পরিস্থিতি বদলেছে। তবু আমরা আমাদের শৈশবের জীবনকে নিজের জীবন বলেই মনে করি। আমরা বলি আমি ছোটবেলায় এমন ছিলাম, আমি তখন এমন ভাবতাম, আমি তখন সেখানে থাকতাম। অর্থাৎ পরিবর্তনের মধ্যেও একটি ধারাবাহিকতার অনুভূতি আমাদের মধ্যে কাজ করে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের গভীরতর আত্মপরিচয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।

এই জায়গাতেই কূটস্থ শব্দটির গুরুত্ব প্রকাশ পায়। কূটস্থ বলতে এমন কিছুকে বোঝানো হয় যা দৃঢ়ভাবে স্থিত এবং চারপাশে পরিবর্তন ঘটলেও নিজে সেই পরিবর্তনের মতো পরিবর্তিত হয় না। স্থ শব্দটি সংস্কৃত স্থা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ দাঁড়ানো, অবস্থান করা বা স্থির থাকা। কূটস্থ তাই পরিবর্তনের মধ্যে স্থিত থাকার একটি গভীর ধারণা বহন করে। কৃষ্ণ অক্ষরকে কূটস্থ বলেছেন। অর্থাৎ অক্ষরের মধ্যে এমন এক স্থিতির ধারণা রয়েছে যা পরিবর্তনশীল জগতের প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলে না।

একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন কামার একটি লোহার টুকরোর ওপর বারবার আঘাত করছেন। প্রতিটি আঘাতে লোহার আকৃতি বদলাচ্ছে। কিন্তু যে শক্ত ভিত্তির ওপর লোহাটি রাখা হয়েছে, সেটি সেই লোহার পরিবর্তনের মতো পরিবর্তিত হচ্ছে না। কূটস্থ ধারণার মধ্যে এমন এক স্থিরতার প্রতীকী অর্থ পাওয়া যায়। আরেকটি উপমা হতে পারে সিনেমার পর্দা। পর্দায় কখনো আনন্দের দৃশ্য আসে, কখনো দুঃখের দৃশ্য আসে, কখনো যুদ্ধের দৃশ্য আসে, আবার কখনো শান্ত প্রকৃতির দৃশ্য আসে। দৃশ্যগুলো একের পর এক বদলে যায়, কিন্তু পর্দা সেই দৃশ্যগুলোর মতো পরিবর্তিত হয় না। অবশ্য এটি কেবল একটি উপমা। কূটস্থকে কোনো ভৌত পর্দা হিসেবে ভাবা উচিত নয়। উপমাটি কেবল পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্থিতির পার্থক্য বোঝাতে সাহায্য করে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মানুষ যেন ক্ষর জগতের কোনো একটি পরিবর্তনশীল অবস্থাকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে না করে। আমরা প্রায়ই বলি আমার শরীর, আমার সম্পদ, আমার চাকরি, আমার পরিবার, আমার সাফল্য, আমার ব্যর্থতা। কিন্তু এখানে একটি গভীর প্রশ্ন আছে। যে জিনিসকে আমি আমার বলছি, আমি কি কেবল সেটিই। শরীর যদি আমার হয়, তাহলে আমি শরীরের পরিবর্তনকে লক্ষ্য করছি কে। চিন্তা যদি আমার হয়, তাহলে সেই চিন্তার পরিবর্তনকে লক্ষ্য করছে কে। অনুভূতি যদি আমার হয়, তাহলে অনুভূতির পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে কে। এই প্রশ্নের মধ্যেই আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা।

মানুষের দুঃখের একটি বড় কারণ হলো পরিবর্তনশীল জিনিসকে স্থায়ী মনে করা। মানুষ চায় তার সৌন্দর্য একই থাকুক, সম্পদ একই থাকুক, সম্পর্ক একই থাকুক, সামাজিক মর্যাদা একই থাকুক এবং জীবনের পরিস্থিতি একই থাকুক। কিন্তু জগতের স্বভাবই পরিবর্তন। তাই যা পরিবর্তনশীল তাকে চিরস্থায়ী করে ধরে রাখার চেষ্টা করলে অস্থিরতা তৈরি হয়। গীতার ক্ষর ধারণা মানুষকে এই সত্য গ্রহণ করতে শেখায়। যা ক্ষর, তাকে ক্ষর হিসেবেই দেখতে হবে। তার পরিবর্তনকে অস্বীকার না করে তার প্রকৃতি বুঝতে হবে।

অক্ষরের ধারণা তখন মানুষের কাছে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসে। বাহ্যিক জগতের সবকিছু পরিবর্তিত হলেও মানুষ তার গভীরতম অস্তিত্ব সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পারে। সে জানতে পারে যে তার জীবনের বাহ্যিক পরিচয়গুলো পরিবর্তনশীল। সে তার পদ নয়, তার সম্পদ নয়, তার সাফল্য নয়, তার ব্যর্থতাও নয়। এগুলো জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা। নিজের গভীরতম সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য তাকে এই অভিজ্ঞতাগুলোর বাইরে তাকাতে হবে।

ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন ধারায় ক্ষর ও অক্ষরের ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতির প্রকাশিত রূপগুলো পরিবর্তনশীল এবং পুরুষ চৈতন্যসত্তা হিসেবে বিবেচিত। অদ্বৈত বেদান্তে নাম ও রূপকে পরিবর্তনশীল বলে দেখা হয় এবং পরম সত্যের অনুসন্ধান করা হয় ব্রহ্মের উপলব্ধির মাধ্যমে। ভক্তিমূলক বেদান্তের বিভিন্ন ধারায় ক্ষর, অক্ষর, জীব, জগত এবং পরমেশ্বরের পারস্পরিক সম্পর্ককে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও গীতার এই শ্লোক মানুষের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে। পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরালে যে স্থায়িত্বের সন্ধান মানুষ করে, তার প্রকৃতি কী।

ক্ষর এবং অক্ষরকে শুধু দার্শনিক ধারণা হিসেবে দেখলে শ্লোকটির জীবনঘনিষ্ঠতা বোঝা কঠিন হতে পারে। বাস্তব জীবনে একজন মানুষ যখন পরীক্ষায় ভালো ফল করে, তখন সে নিজেকে সফল মনে করে। আবার ফল খারাপ হলে নিজেকে ব্যর্থ মনে করতে পারে। কিন্তু সাফল্য এবং ব্যর্থতা দুটিই ক্ষর। এগুলো আসে এবং চলে যায়। একজন মানুষ আজ সম্মানিত হতে পারে, কাল সমালোচিত হতে পারে। আজ তার অর্থ থাকতে পারে, ভবিষ্যতে অর্থের পরিমাণ কমে যেতে পারে। আজ সে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হতে পারে, ভবিষ্যতে অন্য কেউ সেই দায়িত্ব নিতে পারে। যদি মানুষ নিজের সম্পূর্ণ পরিচয়কে এসব পরিবর্তনশীল অবস্থার সঙ্গে এক করে ফেলে, তাহলে তার অন্তরের স্থিরতা বারবার ভেঙে পড়বে।

এই কারণেই গীতার শিক্ষা আধুনিক মানুষের জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পেশাগত সাফল্য, অর্থনৈতিক অবস্থান এবং অন্যের স্বীকৃতির মাধ্যমে নিজের মূল্য নির্ধারণ করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসবই ক্ষর। এগুলো প্রয়োজনীয় হতে পারে, জীবনের অংশ হতে পারে, কিন্তু এগুলো মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। মানুষের গভীরতর সত্যকে জানতে হলে তাকে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে হবে।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। ক্ষর হলো সময়ের প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সবকিছু পরিবর্তিত হবে। অক্ষর হলো স্থায়িত্বের প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরিবর্তনের মধ্যেও স্থায়ী সত্যের অনুসন্ধান করা সম্ভব। কূটস্থ হলো সেই গভীর স্থিতির প্রতীক যেখানে মানুষ বাহ্যিক ওঠানামার মধ্যেও নিজের অন্তরের সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।

এই শ্লোকের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এটি পরবর্তী পুরুষোত্তম তত্ত্বের জন্য ভূমিকা তৈরি করে। পঞ্চদশ অধ্যায়ের পরের শ্লোকে কৃষ্ণ ক্ষর এবং অক্ষরের অতীত এক উত্তম পুরুষের কথা বলেন। পরে তাঁকেই পুরুষোত্তম বলা হয়। তাই ক্ষর এবং অক্ষরকে বুঝে নেওয়া আসলে পুরুষোত্তম তত্ত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। এখানে একটি গভীর ধারাবাহিকতা দেখা যায়। প্রথমে মানুষ পরিবর্তনশীল জগতকে চিনতে শেখে। তারপর পরিবর্তনের অতীত স্থায়ী সত্যের সন্ধান করে। এরপর সেই স্থায়ী সত্যেরও পরম ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চায়।

এই অর্থে ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানুষের অন্তর্জীবনের একটি মানচিত্রের মতো। মানুষ প্রথমে জগতকে দেখে। তারপর জগতের পরিবর্তন দেখে। তারপর পরিবর্তনের অনিত্যতা উপলব্ধি করে। এরপর সে প্রশ্ন করে, এই পরিবর্তনের মধ্যে কি কোনো স্থায়ী সত্য আছে। সেই প্রশ্ন তাকে অক্ষরের দিকে নিয়ে যায়। আর অক্ষরের অনুসন্ধান তাকে পরম সত্যের সন্ধানে নিয়ে যায়।

ক্ষর আমাদের শেখায় যে জগত পরিবর্তনশীল। অক্ষর আমাদের শেখায় যে মানুষের অনুসন্ধান শুধু পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কূটস্থ আমাদের পরিবর্তনের মধ্যে স্থিতির কথা ভাবতে শেখায়। পুরুষ আমাদের চৈতন্যের প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আর পরবর্তী পুরুষোত্তম তত্ত্ব এই অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে যায়।

সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোক মানুষের জীবনের একটি মৌলিক সত্যকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাষায় প্রকাশ করেছে। আমরা এমন এক জগতে বাস করি যেখানে সবকিছু পরিবর্তিত হচ্ছে। দেহ পরিবর্তিত হচ্ছে, মন পরিবর্তিত হচ্ছে, সম্পর্ক পরিবর্তিত হচ্ছে, সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ইতিহাসও পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল জগতই ক্ষর। কিন্তু মানুষের চেতনা যখন এই পরিবর্তনের প্রকৃতি বুঝে নিজের গভীরতর অস্তিত্বের অনুসন্ধান শুরু করে, তখন অক্ষরের ধারণা সামনে আসে।

ক্ষর আমাদের অনিত্যতার সত্য উপলব্ধি করায়। অক্ষর আমাদের স্থায়িত্বের সন্ধান করতে শেখায়। কূটস্থ আমাদের পরিবর্তনের মধ্যে স্থিত সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর এই উপলব্ধি মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে আত্মজিজ্ঞাসার পথে নিয়ে যায়। তাই এই শ্লোকের প্রকৃত শিক্ষা শুধু এতটুকু নয় যে পৃথিবী পরিবর্তনশীল। এর গভীর শিক্ষা হলো পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও মানুষ যেন নিজের গভীরতম সত্যকে খুঁজে নেয়।

সময়ের স্রোতে মানুষের দেহ বদলাবে, পরিস্থিতি বদলাবে, সম্পর্ক বদলাবে, ক্ষমতা বদলাবে এবং পৃথিবীর রূপও বদলাবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেই যে মানুষ নিজের অন্তরের সত্যকে অনুসন্ধান করতে শেখে, তার কাছে জীবন আর শুধু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা থাকে না। জীবন তখন হয়ে ওঠে সত্যের অনুসন্ধান। ক্ষর থেকে অক্ষরের দিকে এবং অক্ষর থেকে পরম সত্যের দিকে এই অন্তর্জাগতিক যাত্রাই ভগবদ্গীতার এই শ্লোককে এক গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক তাৎপর্য প্রদান করে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি