ভগবদ্গীতা ১৫.১৭ — উত্তম পুরুষ, পরমাত্মা ও সমগ্র জগতের পরম আশ্রয়ের তত্ত্ব
উত্তমঃ পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃতঃ।
যো লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্তব্যয় ঈশ্বরঃ।।১৭।।
অনুবাদঃ এই উভয় থেকে ভিন্ন উত্তম পুরুষকে বলা হয় পরমাত্মা, যিনি ঈশ্বর ও অব্যয় এবং ত্রিজগতের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে পালন করছেন।
ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের সপ্তদশ শ্লোকটি মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর একটি সামনে নিয়ে আসে। মানুষ কে, এই জগতের প্রকৃত ভিত্তি কোথায় এবং পরিবর্তনশীল জীবনের অন্তরালে কি কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য রয়েছে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে এই শ্লোকের তাৎপর্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, উত্তম পুরুষ নামে এক পরম সত্তা আছেন, যিনি পরমাত্মা নামে পরিচিত। তিনি অব্যয় ঈশ্বর এবং তিন লোকের মধ্যে প্রবেশ করে সমগ্র জগতকে ধারণ ও পালন করেন। এই বক্তব্যের মধ্যে ঈশ্বরতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব এবং বিশ্বতত্ত্ব একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।
এই শ্লোকটি বুঝতে হলে তার আগের শ্লোকের দিকে তাকাতে হয়। পঞ্চদশ অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ক্ষর এবং অক্ষর এই দুই পুরুষের কথা বলেছেন। ক্ষর হলো পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। শরীর, ইন্দ্রিয়, মন, বস্তুজগৎ এবং জীবনের বাহ্যিক প্রকাশ ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে অক্ষর শব্দের মধ্যে এমন এক স্থায়ী সত্তার ধারণা রয়েছে যা ক্ষয়ের ঊর্ধ্বে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি সপ্তদশ শ্লোকে বলেন, এই দুইয়ের ঊর্ধ্বে আরও এক উত্তম পুরুষ আছেন। এই উত্তম পুরুষই পরমাত্মা। ফলে শ্লোকটি অস্তিত্বের একটি গভীর স্তরবিন্যাস প্রকাশ করে। যা পরিবর্তিত হয়, যা তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত এবং যে পরম সত্তা উভয়েরই ঊর্ধ্বে থেকে তাদের ধারণ করে, এই তিনটি স্তরকে একসঙ্গে না দেখলে শ্লোকটির পূর্ণ অর্থ উপলব্ধি করা কঠিন।
উত্তম শব্দটি সাধারণভাবে শ্রেষ্ঠ, সর্বোচ্চ এবং উৎকৃষ্ট অর্থ প্রকাশ করে। কিন্তু এখানে উত্তম শব্দের অর্থ কেবল অন্যদের তুলনায় ভালো নয়। এখানে এটি অস্তিত্বের সর্বোচ্চ অবস্থাকে নির্দেশ করে। পুরুষ শব্দটিও সাধারণ অর্থে কেবল মানব পুরুষকে বোঝায় না। ভারতীয় দর্শনে পুরুষ বলতে চৈতন্যসত্তা, আত্মসত্তা কিংবা মহাজাগতিক চেতনাকে বোঝানো হয়। তাই উত্তম পুরুষ বলতে এমন এক সর্বোচ্চ চৈতন্যসত্তাকে বোঝানো হয়েছে যিনি সীমাবদ্ধ জীবনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। তিনি কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন। তিনি এমন এক পরম বাস্তবতা যাঁর মধ্যে চেতনা, অস্তিত্ব এবং সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণের ধারণা একত্রিত হয়েছে।
শ্লোকে তু শব্দটির ব্যবহারও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তু অর্থ কিন্তু বা তবে। এই ছোট্ট শব্দটি আগের বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী বক্তব্যের পার্থক্য তৈরি করে। যেন শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ক্ষর ও অক্ষর এই দুই পুরুষের কথা সত্য হলেও তাদের ঊর্ধ্বে আরও এক পরম পুরুষ রয়েছেন। এর পরেই এসেছে অন্য শব্দ। অন্য অর্থ ভিন্ন বা অতিরিক্ত। তবে এখানে অন্য বলতে এমন কোনো সত্তাকে বোঝানো হয় না যিনি জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কারণ পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে যে তিনি লোকত্রয়ের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের ধারণ করেন। অর্থাৎ তিনি জগতের ঊর্ধ্বে থেকেও জগতের অন্তরে অবস্থান করেন। এই ধারণার মধ্যেই ভারতীয় ঈশ্বরতত্ত্বের এক গভীর রহস্য প্রকাশ পায়। পরম সত্তা একই সঙ্গে অতীন্দ্রিয় এবং অন্তর্নিহিত।
পরমাত্মা শব্দটি গঠিত হয়েছে পরম এবং আত্মা এই দুই শব্দের সমন্বয়ে। পরম অর্থ সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত, সীমার অতীত এবং সর্বোত্তম। আত্মা অর্থ নিজের সত্তা, অন্তর্সত্তা, চৈতন্য বা জীবনের গভীরতম পরিচয়। তাই পরমাত্মা বলতে বোঝায় সর্বোচ্চ আত্মসত্তা। এটি কোনো বৃহৎ ব্যক্তিগত আত্মার ধারণা নয়। বরং এটি এমন এক সর্বজনীন পরম সত্তার ধারণা যা ব্যক্তিগত জীবনের গভীরে অবস্থান করে। মানুষ নিজেকে সাধারণত শরীর, মন, নাম, পরিচয়, পেশা, সম্পর্ক এবং সামাজিক অবস্থানের মাধ্যমে চিনতে শেখে। কিন্তু এই সব পরিচয় পরিবর্তনশীল। শৈশবের শরীর এবং বর্তমানের শরীর এক নয়। আজকের চিন্তা আগামী দিনের চিন্তার মতো নয়। সামাজিক অবস্থানও চিরস্থায়ী নয়। তবু মানুষ নিজের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতার অনুভূতি পায়। এই ধারাবাহিকতার গভীরে কী আছে, সেই অনুসন্ধানই আত্মতত্ত্বের সূচনা।
ইত্যুদাহৃতঃ শব্দটির অর্থ এই নামে অভিহিত বা এইভাবে উল্লেখিত। অর্থাৎ উত্তম পুরুষকে পরমাত্মা নামে অভিহিত করা হয়েছে। এখানে নামটি কেবল একটি পরিচয় নয়। নামের মধ্যেই তাঁর স্বরূপের একটি বিশেষ দিক প্রকাশিত হয়েছে। যখন তাঁকে সকলের অন্তর্নিহিত সর্বোচ্চ আত্মসত্তা হিসেবে দেখা হয় তখন তিনি পরমাত্মা। আর যখন তাঁকে সমগ্র জগতের অধিপতি ও নিয়ন্তা হিসেবে দেখা হয় তখন তিনি ঈশ্বর। একই পরম সত্যকে উপলব্ধির দুটি দিক এখানে একত্রিত হয়েছে।
এরপর শ্লোকে এসেছে লোকত্রয় শব্দটি। লোক অর্থ জগত বা অস্তিত্বের ক্ষেত্র এবং ত্রয় অর্থ তিনের সমষ্টি। প্রচলিত ব্যাখ্যায় লোকত্রয় বলতে স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতালকে বোঝানো হয়। আবার দার্শনিকভাবে এটিকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, এই উত্তম পুরুষ লোকত্রয়ের মধ্যে প্রবেশ করেন। এখানে আবিশ্য শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ প্রবেশ করে বা অন্তরে অবস্থান করে। ঈশ্বরকে এখানে কোনো দূরবর্তী শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়নি। তিনি সৃষ্টির বাইরে অবস্থান করলেও সৃষ্টির অন্তরে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। তিনি জীবনের গভীরে অবস্থান করেন এবং সমগ্র অস্তিত্বের ধারক শক্তি হিসেবে কাজ করেন।
বিভর্তি শব্দটি এই বক্তব্যকে আরও গভীর করে। এর মধ্যে ধারণ করা, বহন করা, পালন করা এবং রক্ষা করার অর্থ রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, উত্তম পুরুষ তিন লোকের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের ধারণ করেন। অর্থাৎ ঈশ্বর শুধু সৃষ্টি করেছেন এমন নয়। তিনি সৃষ্টির ধারাবাহিক অস্তিত্বের ভিত্তিও। একটি গাছের কথা ভাবলে দেখা যায়, তার দৃশ্যমান অংশ হলো কাণ্ড, পাতা, ফুল এবং ফল। কিন্তু তার অস্তিত্বের পেছনে রয়েছে মাটি, জল, সূর্যালোক, বায়ু এবং অসংখ্য অদৃশ্য প্রক্রিয়া। তেমনি গীতার দৃষ্টিতে সমগ্র জগতের দৃশ্যমান বৈচিত্র্যের পেছনে রয়েছে এমন এক পরম ভিত্তি যিনি সবকিছুকে ধারণ করে রেখেছেন।
অব্যয় শব্দটি সেই পরম সত্তার অক্ষয় প্রকৃতি প্রকাশ করে। ব্যয় অর্থ ক্ষয়, নিঃশেষ বা হ্রাস এবং অ অর্থ তার অনুপস্থিতি। তাই অব্যয় অর্থ যার ক্ষয় নেই। এই জগতে সবকিছু পরিবর্তিত হয়। মানুষ জন্মগ্রহণ করে, বেড়ে ওঠে, বার্ধক্যে পৌঁছায় এবং একদিন শরীর ত্যাগ করে। সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং আবার বিলীন হয়। সম্পদ আসে এবং চলে যায়। ক্ষমতা স্থায়ী হয় না। সম্পর্কও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু গীতা এমন এক সত্যের কথা বলে যার অস্তিত্ব এই পরিবর্তনের দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। অব্যয় সেই অক্ষয় বাস্তবতার প্রতীক।
শেষে এসেছে ঈশ্বর শব্দটি। ঈশ্বর শব্দের মধ্যে শাসন, অধিকার এবং নিয়ন্ত্রণের ধারণা রয়েছে। তাই ঈশ্বর অর্থ প্রভু, অধিপতি, নিয়ন্তা এবং সর্বাধিপতি। পরমাত্মা হিসেবে তিনি সকলের অন্তরে অবস্থানকারী পরম সত্তা। ঈশ্বর হিসেবে তিনি সমগ্র সৃষ্টির ধারক ও নিয়ন্তা। এই দুই পরিচয় একত্রে দেখলে শ্লোকটির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। ঈশ্বর কোনো দূরবর্তী ক্ষমতার প্রতীক মাত্র নন। তিনি একই সঙ্গে অন্তরের নিকটতম এবং অস্তিত্বের সর্বোচ্চ বাস্তবতা।
বিভিন্ন বেদান্ত দর্শন এই শ্লোককে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছে। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে পরমাত্মা ধারণাকে সর্বোচ্চ চৈতন্যের উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত করা যায়। মানুষের সীমাবদ্ধ পরিচয়ের গভীরে অনুসন্ধান করলে সে এমন এক চৈতন্যের সন্ধান পেতে পারে যা পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সাক্ষী। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে উত্তম পুরুষ ব্যক্তিগত পরমেশ্বর, যিনি জীব ও জগতের অন্তর্যামী। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর জীব এবং জগতের থেকে স্বতন্ত্র হলেও তাঁদের সর্বোচ্চ নিয়ন্তা। ব্যাখ্যার এই পার্থক্যগুলো দেখায় যে গীতার একটি শ্লোকের মধ্যেই ভারতীয় দর্শনের কত গভীর চিন্তাধারা বিকশিত হয়েছে।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থ মানবজীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের বাহ্যিক পরিচয় প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। আজ যে মানুষ ছাত্র, কাল সে কর্মজীবী হতে পারে। আজ যে ব্যক্তি কোনো একটি পরিচয়ে পরিচিত, ভবিষ্যতে তার পরিচয় সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। কিন্তু এই সব পরিবর্তনের মধ্যে মানুষ নিজের অস্তিত্বের একটি ধারাবাহিক অনুভূতি বহন করে। গীতা সেই অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করতে বলে। আমি কি শুধু আমার শরীর। আমি কি শুধু আমার মন। আমি কি শুধু আমার সামাজিক পরিচয়। নাকি এসবের গভীরে এমন কোনো চৈতন্য রয়েছে যা সব পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে। পরমাত্মার ধারণা সেই আত্মঅনুসন্ধানের সর্বোচ্চ প্রতীক।
এই সত্য বোঝাতে সমুদ্র এবং ঢেউয়ের উপমা দেওয়া যায়। একটি ঢেউকে আলাদা বলে মনে হয়। তার জন্ম হয়, সে কিছু সময় থাকে এবং পরে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু ঢেউয়ের অস্তিত্ব সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আবার একটি প্রদীপের আলোও নিজেকে আলাদা বলে মনে হলেও আলোকে সম্ভব করে এমন শক্তি তার বাইরে বৃহত্তর কোনো ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই উপমাগুলো পরমাত্মার ধারণা বোঝার জন্য সহায়ক। তবে এগুলো কেবল বোঝানোর মাধ্যম। জীব এবং পরমাত্মার সম্পর্ক সম্পর্কে বিভিন্ন দর্শনের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে।
আধুনিক জীবনে এই শ্লোকের শিক্ষা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। মানুষ সাধারণত বাহ্যিক সাফল্যকে জীবনের চূড়ান্ত অর্থ বলে মনে করে। অর্থ, ক্ষমতা, সম্মান এবং পরিচয়কে কেন্দ্র করে জীবন সাজাতে গিয়ে সে নিজের অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নগুলো ভুলে যায়। গীতা সেই ভুলে যাওয়া প্রশ্নগুলো আবার সামনে নিয়ে আসে। মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে শেখায়, আমি আসলে কে এবং আমার অস্তিত্ব কোন বৃহত্তর সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যখন মানুষ নিজের পরিবর্তনশীল পরিচয়ের বাইরে নিজের গভীরতর সত্তাকে অনুসন্ধান করতে শুরু করে তখন তার জীবনে আত্মজিজ্ঞাসা জন্ম নেয়। সেই আত্মজিজ্ঞাসাই আধ্যাত্মিকতার পথ খুলে দেয়।
এই শ্লোকের আরেকটি শিক্ষা হলো মানুষের অস্তিত্ব কখনোই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। আমরা প্রকৃতির ওপর নির্ভর করি, সমাজের ওপর নির্ভর করি, খাদ্য, জল এবং বায়ুর ওপর নির্ভর করি। আমাদের জীবন অসংখ্য দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত। গীতা এই নির্ভরতার প্রশ্নকে আরও গভীরে নিয়ে যায় এবং জানতে চায়, সমগ্র অস্তিত্বকে ধারণকারী চূড়ান্ত ভিত্তি কী। উত্তম পুরুষ সেই চূড়ান্ত ভিত্তির প্রতীক। তিনি সকলের অন্তরে প্রবেশ করে সকলকে ধারণ করেন এবং নিজে অব্যয় থাকেন।
পঞ্চদশ অধ্যায়ের ষোড়শ, সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শ্লোক একসঙ্গে পড়লে এই দর্শনের পূর্ণতা আরও পরিষ্কার হয়। প্রথমে ক্ষর এবং অক্ষরের কথা বলা হয়েছে। এরপর তাদের ঊর্ধ্বে উত্তম পুরুষের কথা বলা হয়েছে। তারপর অষ্টাদশ শ্লোকে সেই উত্তম পুরুষকে পুরুষোত্তম নামে অভিহিত করা হয়েছে। তাই সপ্তদশ শ্লোকটি পুরুষোত্তম তত্ত্বের একটি কেন্দ্রীয় ভিত্তি। এখানে ঈশ্বরকে এমন এক পরম সত্তা হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে যিনি পরিবর্তনশীল জগতের ঊর্ধ্বে থেকেও জগতের অন্তরে অবস্থান করেন। তিনি অবিনশ্বর অথচ বিশ্বধারক। তিনি অতীন্দ্রিয় অথচ অন্তর্যামী।
সবশেষে বলা যায়, উত্তম পুরুষ ধারণাটি মানুষের সামনে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক গভীর অনুসন্ধানের আহ্বান রাখে। ক্ষর আমাদের চোখে দেখা পরিবর্তনশীল জীবনকে নির্দেশ করে। অক্ষর আমাদের সামনে তুলনামূলকভাবে স্থায়ী চৈতন্যের ধারণা উপস্থিত করে। আর উত্তম পুরুষ সেই পরম বাস্তবতার কথা বলে যিনি উভয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সমগ্র অস্তিত্বকে ধারণ করেন। তিনি পরমাত্মা হিসেবে সকলের অন্তর্নিহিত সর্বোচ্চ আত্মসত্তা, অব্যয় হিসেবে অক্ষয় সত্য এবং ঈশ্বর হিসেবে সর্বাধিপতি। তাই গীতা ১৫.১৭ কেবল ঈশ্বরের একটি পরিচয় দেয় না। এটি মানুষকে বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনের গভীরে প্রবেশ করে নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তিকে অনুসন্ধান করতে শেখায়। এই অনুসন্ধানের শেষ প্রান্তে যে পরম সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়, গীতা তাকে উত্তম পুরুষ, পরমাত্মা এবং অব্যয় ঈশ্বর নামে অভিহিত করেছে। জীবনের পরিবর্তনশীল দৃশ্যের আড়ালে যে চিরন্তন সত্য বিরাজমান, সেই সত্যের দিকে মানুষের অন্তরকে ফিরিয়ে দেওয়াই এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!