ভগবদ্গীতা ১৫.১৮ — ক্ষর ও অক্ষরের অতীত পুরুষোত্তম তত্ত্বের মহিমা
যস্মাৎ ক্ষরমতীতোহহমক্ষরাদপি চোত্তমঃ।
অতোহস্মিন লোকে বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ।।১৮।।
অনুবাদঃ যেহেতু আমি ক্ষরের অতীত এবং অক্ষর থেকেও উত্তম, সেই হেতু জগতে ও বেদে আমি পুরুষোত্তম নামে বিখ্যাত।
ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকটি পুরুষোত্তম তত্ত্বের এক অসাধারণ দার্শনিক ঘোষণা। শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, যেহেতু তিনি ক্ষর অর্থাৎ নশ্বর জগতের অতীত এবং অক্ষর অর্থাৎ অবিনশ্বর সত্তারও ঊর্ধ্বে, তাই তিনি জগতে এবং বেদে পুরুষোত্তম নামে পরিচিত। এই বক্তব্যের মধ্যে কেবল ঈশ্বরের একটি মহিমান্বিত নামের পরিচয় নেই। এর মধ্যে মানুষের অস্তিত্ব, জগতের প্রকৃতি, আত্মার স্বরূপ এবং পরম সত্য সম্পর্কে গীতার গভীরতম চিন্তার একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশ রয়েছে।
পুরুষোত্তম শব্দটি সংস্কৃত পুরুষ এবং উত্তম এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। পুরুষ শব্দটির অর্থ এখানে কেবল সাধারণ অর্থে পুরুষ মানুষ নয়। বৈদিক ও দার্শনিক সাহিত্যে পুরুষ শব্দটি ব্যক্তি সত্তা, চৈতন্যসত্তা, আত্মা, মহাজাগতিক সত্তা এবং পরম সত্তা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে উত্তম শব্দের অর্থ সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ, উৎকৃষ্ট অথবা ঊর্ধ্বতম। ফলে পুরুষোত্তমের সরল অর্থ দাঁড়ায় সর্বোচ্চ পুরুষ অথবা পরম সত্তা। কিন্তু গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ে এই শব্দের অর্থ আরও গভীর। এখানে পুরুষোত্তম হলেন সেই পরম পুরুষ যিনি ক্ষর এবং অক্ষর উভয়ের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন।
এই অর্থটি বুঝতে হলে প্রথমে ক্ষর শব্দটির তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হয়। ক্ষর শব্দের মধ্যে ক্ষয়, পরিবর্তন এবং প্রবাহের ধারণা রয়েছে। যে জিনিস পরিবর্তিত হয়, ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থায় চলে যায় তাকে ক্ষর বলা যায়। মানুষের শরীর ক্ষর। জাগতিক সম্পদ ক্ষর। ক্ষমতা ক্ষর। সামাজিক মর্যাদা ক্ষর। এমনকি মানুষের চিন্তা, অনুভূতি এবং বাহ্যিক পরিচয়ও পরিবর্তনশীল। আজ যা আছে কাল তা নাও থাকতে পারে। জন্মের সঙ্গে শরীরের যে রূপ শুরু হয়, সময়ের প্রবাহে তা পরিবর্তিত হয় এবং একদিন শেষ হয়ে যায়। এই পরিবর্তনশীলতার জগতই ক্ষর তত্ত্বের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে।
এর বিপরীতে রয়েছে অক্ষর। অক্ষর শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং ক্ষর এই দুই অংশের মাধ্যমে। এখানে অ একটি নিষেধসূচক অংশ এবং ক্ষর অর্থ ক্ষয়শীল বা পরিবর্তনশীল। তাই অক্ষর অর্থ এমন যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা বিনষ্ট হয় না, যা স্থায়িত্বের ধারণা বহন করে। তবে গীতার দর্শনে অক্ষরের ব্যাখ্যা বিভিন্ন বেদান্ত পরম্পরায় বিভিন্নভাবে করা হয়েছে। কোথাও এটি অবিনশ্বর আত্মতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, কোথাও প্রকৃতির সূক্ষ্ম কারণের সঙ্গে এবং কোথাও জীবের মুক্ত অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো ক্ষর ও অক্ষর উভয়ের তুলনায় কৃষ্ণ নিজেকে আরও উচ্চতর অবস্থানে স্থাপন করছেন।
এইখানেই পুরুষোত্তম শব্দটির প্রকৃত মহিমা প্রকাশ পায়। কৃষ্ণ বলেন তিনি ক্ষরের অতীত। অর্থাৎ পরিবর্তনশীল জগত তাঁকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। আবার তিনি অক্ষরেরও উত্তম। অর্থাৎ অবিনশ্বরতার যে ধারণা আমরা উপলব্ধি করি, তারও ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান। তাই পুরুষোত্তম শব্দটি কেবল শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ নয়। এটি অতিক্রমণের ধারণা প্রকাশ করে। তিনি নশ্বরতার দ্বারা সীমাবদ্ধ নন এবং অবিনশ্বরতার কোনো সীমিত ধারণার মধ্যেও আবদ্ধ নন। তিনি উভয়ের পরম ভিত্তি ও ঊর্ধ্বতন সত্য।
এই কারণে পুরুষোত্তম শব্দের মধ্যে এক গভীর অস্তিত্বতাত্ত্বিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয়কে শরীর, পরিবার, পেশা, সম্পদ, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা অথবা ব্যক্তিগত সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু এসবই পরিবর্তনশীল। একজন মানুষ আজ যে অবস্থানে রয়েছে কাল সে সেখানে নাও থাকতে পারে। তার শরীর পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় এবং জীবনের পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়। গীতা তখন আমাদের সামনে আরও গভীর একটি প্রশ্ন রাখে। যদি সবকিছু পরিবর্তিত হয়, তাহলে সেই পরিবর্তনের সাক্ষী কে। মানুষের প্রকৃত পরিচয় কি কেবল পরিবর্তনশীল বাহ্যিক সত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি তার গভীরে আরও কোনো চৈতন্যসত্তা রয়েছে।
পুরুষোত্তম তত্ত্ব এই আত্মঅনুসন্ধানের পথকে আরও গভীর করে। মানুষ যখন নিজের পরিচয়কে বাহ্যিক পরিবর্তনের সঙ্গে এক করে দেখে, তখন তার সুখ ও দুঃখও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে ওঠানামা করে। সাফল্য এলে সে নিজেকে সফল মনে করে এবং ব্যর্থতা এলে নিজেকে ব্যর্থ মনে করে। সম্মান এলে আনন্দিত হয় এবং অপমান এলে ভেঙে পড়ে। কিন্তু গীতার দর্শন মানুষকে এই পরিবর্তনশীল পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তাকাতে শেখায়। নিজের অস্তিত্বকে বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে শেখায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষোত্তম কেবল ঈশ্বরের একটি নাম নয়। এটি মানুষের আত্মজিজ্ঞাসারও একটি গভীর প্রতীক।
পুরুষোত্তম শব্দটির মধ্যে ভক্তির একটি অসাধারণ মাত্রাও রয়েছে। দর্শনের ভাষায় পরম সত্যকে নিরাকার বা চৈতন্যের সর্বোচ্চ ভিত্তি হিসেবে উপলব্ধি করা যেতে পারে। কিন্তু ভক্তির ক্ষেত্রে সেই পরম সত্য একজন পরম ব্যক্তিত্ব হিসেবেও অনুভূত হন। তিনি কেবল একটি বিমূর্ত সত্য নন। তিনি ভক্তের আশ্রয়, প্রেমের কেন্দ্র এবং আত্মসমর্পণের পরম গন্তব্য। তাই পুরুষোত্তম নামের মধ্যে একদিকে অসীম পরম সত্যের ধারণা রয়েছে এবং অন্যদিকে একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের সম্পর্কের গভীরতাও রয়েছে।
এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো প্রথিত। কৃষ্ণ বলেন তিনি লোকে এবং বেদে পুরুষোত্তম নামে প্রথিত। প্রথিত অর্থ প্রসিদ্ধ, প্রতিষ্ঠিত বা সুপরিচিত। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যে পুরুষোত্তম কোনো আকস্মিক উপাধি নয়। এটি বৈদিক আধ্যাত্মিক চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি পরিচয়। বেদের জ্ঞানধারা এবং মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার মধ্যে পরম পুরুষের ধারণা বহু যুগ ধরে বিকশিত হয়েছে। গীতায় সেই ধারণা কৃষ্ণের শিক্ষার মধ্যে একটি সুসংহত দার্শনিক রূপ লাভ করেছে।
পুরুষোত্তম শব্দটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। প্রথমে আসে ক্ষর। তারপর অক্ষর। তারপর উত্তম। শেষে পুরুষোত্তম। যেন চিন্তার একটি ক্রমাগত ঊর্ধ্বগমন ঘটছে। পরিবর্তনশীল জগত থেকে অবিনশ্বরতার দিকে এবং সেখান থেকে পরম পুরুষের দিকে। শব্দের এই বিন্যাসের মধ্যেই গীতার দর্শনের একটি সুন্দর প্রতীকী কাঠামো তৈরি হয়েছে। মানুষ প্রথমে জগতকে দেখে। তারপর জগতের পরিবর্তনশীলতার সীমা উপলব্ধি করে। এরপর সে অবিনশ্বর সত্যের সন্ধান করে। এবং শেষ পর্যন্ত পরম সত্যের উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যায়।
আধুনিক জীবনেও পুরুষোত্তম তত্ত্বের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। আজকের মানুষ প্রযুক্তি, অর্থ, পেশা, প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত। কিন্তু বাহ্যিক অর্জন যতই বৃদ্ধি পাক, মানুষের ভিতরের প্রশ্নটি থেকে যায়। আমি কে। আমার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী। যে পরিচয় নিয়ে আমি এত গর্ব করি তা যদি একদিন পরিবর্তিত হয়ে যায়, তাহলে আমার প্রকৃত অস্তিত্ব কোথায়। গীতার পুরুষোত্তম তত্ত্ব এই প্রশ্নগুলির সামনে মানুষকে দাঁড় করায়। এটি তাকে বাহ্যিক সাফল্যের ঊর্ধ্বে আত্মসত্যের সন্ধান করতে আহ্বান জানায়।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। নদীর ঢেউ ক্রমাগত জন্ম নিচ্ছে এবং বিলীন হচ্ছে। এক মুহূর্তের ঢেউ আরেক মুহূর্তে থাকে না। এই পরিবর্তনশীলতা ক্ষর তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। নদীর গভীর স্রোত তুলনামূলকভাবে স্থায়ী। এটি অক্ষরের ধারণা বোঝাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু নদী, ঢেউ এবং স্রোতের অস্তিত্বের পেছনে যে বৃহত্তর জলতত্ত্ব রয়েছে, তার দিকে তাকালে আমরা পরম ভিত্তির একটি প্রতীকী ধারণা পাই। অবশ্য এটি গীতার সরাসরি সংজ্ঞা নয়। এটি কেবল বোঝার সুবিধার জন্য একটি উপমা।
পুরুষোত্তমের গভীরতম শিক্ষা তাই অন্যকে পরাজিত করে শ্রেষ্ঠ হওয়া নয়। এর প্রকৃত শিক্ষা হলো সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা। ক্ষয়ের ঊর্ধ্বে ওঠা, পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে ওঠা এবং নিজের সীমিত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পরম সত্যের সন্ধান করা। উত্তমতা এখানে প্রতিযোগিতার ফল নয়। এটি আত্মবিকাশের চূড়ান্ত পরিণতি। মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ, অহংকার এবং সীমিত পরিচয়ের বাইরে বৃহত্তর সত্যকে উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখন তার জীবনও নতুন অর্থ পেতে শুরু করে।
ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোক তাই একটি নামের ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। পুরুষোত্তম শব্দের মধ্যে ক্ষর জগতের অনিত্যতা, অক্ষর সত্যের স্থায়িত্ব এবং তারও ঊর্ধ্বে পরম পুরুষের ধারণা একত্রিত হয়েছে। এটি একই সঙ্গে ভাষার একটি সুন্দর নির্মাণ, দর্শনের একটি গভীর সিদ্ধান্ত, ভক্তির একটি পরম আশ্রয় এবং আত্মঅনুসন্ধানের একটি পথ। কৃষ্ণ যখন বলেন তিনি পুরুষোত্তম, তখন তিনি মানুষকে শুধু তাঁর মহিমা উপলব্ধি করতে বলেন না। তিনি মানুষকে নিজের অস্তিত্বের গভীরে তাকাতে আহ্বান করেন।
শেষ পর্যন্ত পুরুষোত্তম শব্দটি আমাদের একটি গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায়। যা পরিবর্তিত হয় তা আমাদের জীবনের অংশ, কিন্তু তা আমাদের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। যা অবিনশ্বর তার সন্ধান আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার পথে নিয়ে যায়। আর সেই সমস্ত সীমা অতিক্রম করে যে পরম সত্যকে গীতা পুরুষোত্তম নামে অভিহিত করেছে, তার উপলব্ধিই মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার এক চূড়ান্ত লক্ষ্য। তাই পুরুষোত্তম শুধু কৃষ্ণের একটি মহিমান্বিত নাম নয়। এটি সেই পরম সত্তার প্রতীক, যাঁর মধ্যে নশ্বর ও অবিনশ্বরের সীমা অতিক্রম করে মানুষ অস্তিত্বের সর্বোচ্চ সত্যের সন্ধান পেতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!