সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৫.২ — গুণপ্রবৃদ্ধ সংসারবৃক্ষ, ইন্দ্রিয়বিষয় ও কর্মবন্ধনের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
অধশ্চোর্ধ্বং প্রসৃতাস্তস্য শাখাগুণপ্রবৃদ্ধা বিষয়প্রবালাঃ।অধশ্চ মূলান্যনুসন্ততানিকর্মানুবদ্ধীনি ম…
অধশ্চোর্ধ্বং প্রসৃতাস্তস্য শাখা
গুণপ্রবৃদ্ধা বিষয়প্রবালাঃ।
অধশ্চ মূলান্যনুসন্ততানি
কর্মানুবদ্ধীনি মনুষ্যলোকে।।২।।

অনুবাদঃ এই বৃক্ষের শাখাসমূহ জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা পুষ্ট হয়ে অধোদেশে ও ঊর্ধ্বদেশে বিস্তৃত। ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহই এই শাখাগণের পল্লব। এই বৃক্ষের মূলগুলি তধোদেশে প্রসারিত এবং সেগুলি মনুষ্যলোকে সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সংসারজীবনের একটি অত্যন্ত গভীর ও প্রতীকসমৃদ্ধ চিত্র তুলে ধরেছেন। প্রথম শ্লোকে তিনি সংসারকে এমন এক অশ্বত্থবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন যার মূল ঊর্ধ্বে এবং শাখা নিচে ও উপরে বিস্তৃত। দ্বিতীয় শ্লোকে সেই বৃক্ষের শাখাগুলি কীভাবে বিস্তার লাভ করে, কী দ্বারা পুষ্ট হয় এবং কীভাবে মানুষের কর্মের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শ্লোকটি হলো অধশ্চোর্ধ্বং প্রসৃতাস্তস্য শাখা গুণপ্রবৃদ্ধা বিষয়প্রবালাঃ অধশ্চ মূলান্যনুসন্ততানি কর্মানুবদ্ধীনি মনুষ্যলোকে। সহজ অর্থে বলা যায়, সেই সংসারবৃক্ষের শাখাগুলি নিচে এবং উপরে বিস্তৃত হয়েছে। প্রকৃতির তিন গুণের দ্বারা সেগুলি পুষ্ট হয়েছে এবং ইন্দ্রিয়বিষয়গুলি তার কোমল পল্লবের মতো। তার মূলগুলিও নিচের দিকে বিস্তৃত হয়ে মানবজগতে মানুষকে কর্মের সঙ্গে আবদ্ধ করে রেখেছে।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অধঃ। সংস্কৃত অধঃ শব্দের অর্থ নিচে, নিম্নদিকে অথবা অধস্তনে। এর বিপরীতে রয়েছে ঊর্ধ্বম্, যার অর্থ উপরে বা উচ্চতর দিকে। এই দুটি শব্দ পাশাপাশি ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ সংসারজীবনের দ্বিমুখী বিস্তারের একটি চিত্র এঁকেছেন। মানুষের জীবন কখনো উন্নতির দিকে এগিয়ে যায়, আবার কখনো অবনতির দিকে নেমে যায়। মানুষের চিন্তা, কর্ম, চরিত্র ও প্রবৃত্তি তাকে উচ্চতর চেতনার দিকে নিয়ে যেতে পারে, আবার একই সঙ্গে তাকে নিম্নতর প্রবৃত্তির মধ্যেও আবদ্ধ করতে পারে। তাই অধঃ এবং ঊর্ধ্বম্ শুধু স্থান নির্দেশকারী শব্দ নয়। এগুলোর মধ্যে মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রারও একটি ইঙ্গিত রয়েছে।

এরপর এসেছে প্রসৃতাঃ শব্দটি। এটি সংস্কৃত √সৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে চলা, প্রবাহিত হওয়া এবং বিস্তৃত হওয়ার ভাব রয়েছে। প্র উপসর্গের সংযোগে এর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার অর্থ আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রসৃতাঃ অর্থ প্রসারিত বা বিস্তৃত। সংসারকে একটি স্থির কাঠামো হিসেবে নয়, বরং ক্রমাগত বিস্তার লাভকারী একটি জীবন্ত ব্যবস্থারূপে দেখানো হয়েছে। মানুষের একটি আকাঙ্ক্ষা থেকে আরেকটি আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। একটি কর্ম থেকে আরেকটি কর্মের সূত্রপাত হয়। একটি সম্পর্ক থেকে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়। একটি সাফল্যের পর আরও বড় সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। এইভাবে জীবনের শাখা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

শাখা শব্দটি এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একটি বৃক্ষের শাখা যেমন মূল কাণ্ড থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত হয়, তেমনি মানুষের জীবনও অসংখ্য দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, পেশা, অর্থ, সম্মান, সম্পর্ক, ক্ষমতা, আকাঙ্ক্ষা এবং ভোগের নানা ক্ষেত্র মানুষের জীবনের এক একটি শাখার মতো। মানুষ জন্মের পর ধীরে ধীরে এই শাখাগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রথমে পরিবার, তারপর শিক্ষা, বন্ধুত্ব, পেশা, সামাজিক পরিচয় এবং নানা ধরনের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা তার জীবনকে বিস্তৃত করতে থাকে। ফলে একসময়ের সরল জীবন ধীরে ধীরে অসংখ্য সম্পর্ক ও দায়িত্বের জটিল বৃক্ষে পরিণত হয়।

এই শাখাগুলি কীভাবে পুষ্ট হয়, তার উত্তর দিয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ গুণপ্রবৃদ্ধা শব্দের মাধ্যমে। গুণ অর্থ প্রকৃতির তিন মৌলিক প্রবণতা সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ। প্রবৃদ্ধ অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া বা পুষ্ট হওয়া। সুতরাং গুণপ্রবৃদ্ধা অর্থ তিন গুণের দ্বারা পুষ্ট বা বিকশিত। সাংখ্য ও গীতার দর্শনে সত্ত্ব স্বচ্ছতা, জ্ঞান ও সামঞ্জস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। রজঃ কর্মপ্রবণতা, আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা ও অর্জনের তাগিদকে প্রকাশ করে। তমঃ জড়তা, অজ্ঞানতা, অলসতা ও বিভ্রান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের জীবনের বহুমুখী প্রকাশ এই তিন গুণের পারস্পরিক ক্রিয়ায় প্রভাবিত হয়। তাই সংসারবৃক্ষের শাখা শুধু বাহ্যিক ঘটনায় বৃদ্ধি পায় না। মানুষের অন্তর্গত প্রবণতাও তার বিস্তারকে ক্রমাগত পুষ্ট করে।

এরপর এসেছে বিষয়প্রবালাঃ শব্দটি, যা শ্লোকটির অন্যতম সুন্দর রূপক। বিষয় অর্থ ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির বস্তু এবং প্রবাল অর্থ কোমল পল্লব বা নতুন অঙ্কুর। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়বিষয়গুলি এই সংসারবৃক্ষের কোমল পল্লবের মতো। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস এবং গন্ধ মানুষের ইন্দ্রিয়কে আকর্ষণ করে। সুন্দর কিছু দেখলে আমরা তা আরও দেখতে চাই। মধুর শব্দ শুনলে তা আবার শুনতে ইচ্ছা করে। সুস্বাদু কোনো বস্তু গ্রহণ করলে তার প্রতি আবার আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। এই আকর্ষণ প্রথমে ছোট ও কোমল পল্লবের মতো মনে হলেও ধীরে ধীরে তা বড় আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হতে পারে। এখানেই এই রূপকের গভীরতা। ইন্দ্রিয়বিষয় নিজে অপরাধ বা সমস্যা নয়। কিন্তু তার প্রতি অচেতন আকর্ষণ এবং অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের বন্ধনের কারণ হতে পারে।

শ্লোকের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে অধশ্চ মূলান্যনুসন্ততানি। অর্থাৎ এই বৃক্ষের মূলও নিচের দিকে বিস্তৃত। একটি গাছের মূল সাধারণত চোখের আড়ালে থাকে। কিন্তু বৃক্ষের দৃশ্যমান অস্তিত্ব মূলের ওপরই নির্ভরশীল। মানুষের জীবনেও এমন অনেক অদৃশ্য কারণ রয়েছে যা বাইরে থেকে সহজে দেখা যায় না, কিন্তু তার আচরণকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। অভ্যাস, আসক্তি, ভয়, কামনা, অহংকার, পূর্বকর্ম এবং মানসিক সংস্কার মানুষের জীবনের সেই অদৃশ্য মূলের সঙ্গে তুলনীয়। বাইরে আমরা শুধু মানুষের কাজ দেখি। কিন্তু সেই কাজের গভীরে থাকে চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাস।

এই কারণেই কর্মানুবন্ধীনি শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্ম অর্থ কাজ এবং অনুবন্ধ অর্থ সংযোগ বা বন্ধন। কর্মানুবন্ধীনি অর্থ কর্মের সঙ্গে আবদ্ধকারী। মানুষ যে কাজ করে, সেই কাজ শুধু একটি মুহূর্তের ঘটনা হয়ে থাকে না। তার ফল মানুষের মনে এবং জীবনে নতুন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একটি কাজ থেকে একটি অভ্যাস তৈরি হয়। অভ্যাস থেকে প্রবণতা তৈরি হয়। প্রবণতা থেকে নতুন কর্মের জন্ম হয়। এইভাবে কর্ম এবং মানুষের মানসিক প্রবণতার মধ্যে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক তৈরি হয়। গীতার কর্মতত্ত্বে এই সম্পর্কই কর্মবন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এই কর্মবন্ধন বিশেষভাবে মনুষ্যলোকে বা মানবজগতে কার্যকর। মনুষ্যলোকে শব্দটি শুধু মানুষের বসবাসের স্থান বোঝায় না। এটি মানবজীবনকে একটি বিশেষ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে। মানুষ এমন এক জীব যে নিজের কর্ম সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে। সে নিজের প্রবৃত্তিকে প্রশ্ন করতে পারে। সে ভুল বুঝতে পারে এবং নিজেকে সংশোধন করতে পারে। সে বুঝতে পারে কোন আকাঙ্ক্ষা তাকে স্বাধীন করছে এবং কোন আকাঙ্ক্ষা তাকে আরও গভীর বন্ধনে নিয়ে যাচ্ছে। তাই মানবজীবন শুধু কর্মের ক্ষেত্র নয়। এটি আত্মসচেতনতারও ক্ষেত্র।

এই শ্লোককে আধুনিক জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন মানুষ হয়তো প্রথমে শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করল। পরে অন্যের প্রতিক্রিয়া তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। তারপর প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্মাল। ধীরে ধীরে অনুসারীর সংখ্যা, জনপ্রিয়তা এবং অন্যের মতামত তার মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে শুরু করল। একসময়ের ছোট আকর্ষণ তখন একটি বড় মানসিক বন্ধনে পরিণত হলো। একই ঘটনা অর্থ, খ্যাতি, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা এবং ভোগের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। মানুষ কোনো একটি জিনিস অর্জন করার পর মনে করে সেটিই তাকে সুখী করবে। কিন্তু অর্জনের পর আবার নতুন কিছু চাওয়া শুরু হয়। এভাবেই শাখা বাড়তে থাকে এবং মূল আরও গভীরে প্রবেশ করে।

এই রূপকের মধ্যে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্যও রয়েছে। মানুষের বাহ্যিক জীবন যতটা দৃশ্যমান, তার অভ্যন্তরীণ জীবন তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। মানুষ কী করছে তা দেখা যায়, কিন্তু কেন করছে তা সবসময় দেখা যায় না। একজন ব্যক্তি অর্থ উপার্জন করছে। কিন্তু তার অন্তরে হয়তো নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। কেউ সম্মান চাইছে। কিন্তু তার গভীরে হয়তো স্বীকৃতির তীব্র প্রয়োজন রয়েছে। কেউ ক্ষমতা চাইছে। তার অন্তরে হয়তো নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করার বাসনা রয়েছে। বাহ্যিক শাখাগুলি তাই অদৃশ্য মূলের ওপর নির্ভরশীল।

বেদান্তের দৃষ্টিতে এই সংসারবৃক্ষের গভীরতম সমস্যা হলো আত্মপরিচয়ের ভুল। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, সম্পদ, সম্পর্ক এবং সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখে, তখন পরিবর্তনশীল বিষয়ের সঙ্গে নিজের স্থায়ী পরিচয় তৈরি করে ফেলে। কিন্তু দেহ পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় এবং সামাজিক পরিচয়ও পরিবর্তিত হয়। আত্মস্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞান তখন মানুষকে এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও একটি গভীর স্থিতি উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং সংসারের প্রকৃতি বুঝে তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে সঠিকভাবে স্থাপন করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই কারণে এই শ্লোকের দর্শন আমাদের জীবনের প্রতি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। বস্তু নিজে বন্ধন নয়। সম্পর্ক নিজে বন্ধন নয়। কর্ম নিজে বন্ধন নয়। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন মানুষ কোনো পরিবর্তনশীল বিষয়কে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র ভিত্তি মনে করে এবং তার প্রতি অন্ধ আসক্ত হয়ে পড়ে। অর্থ থাকবে, কিন্তু অর্থ যেন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ না করে। সম্মান থাকবে, কিন্তু সম্মান যেন আত্মপরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি না হয়। সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সম্পর্ক যেন স্বাধীন বিচারবোধকে সম্পূর্ণ গ্রাস না করে। কর্ম থাকবে, কিন্তু কর্মের ফল যেন মানুষের অন্তরের শান্তিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না করে।

সাহিত্যিক দিক থেকেও এই শ্লোক অসাধারণ। সংসার, কর্মবন্ধন, ত্রিগুণ এবং ইন্দ্রিয়াসক্তির মতো বিমূর্ত ধারণাগুলোকে একটি বৃক্ষের দৃশ্যমান রূপ দেওয়া হয়েছে। ফলে দর্শন এখানে কেবল তত্ত্ব হয়ে থাকেনি। তা একটি জীবন্ত ছবিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যেন চোখের সামনে একটি বিশাল বৃক্ষ দেখতে পাই। তার শাখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তার পল্লব আকর্ষণীয়। তার মূল গভীরে প্রবেশ করেছে। আর সেই মূলের সঙ্গে মানুষের কর্মজীবন জড়িয়ে আছে। এই দৃশ্যকল্পের মধ্যেই গীতার কাব্যিক শক্তি এবং দার্শনিক গভীরতা একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।

সবচেয়ে গভীর অর্থে এই শ্লোক মানুষকে নিজের জীবনের বৃক্ষটি দেখতে শেখায়। আমরা সাধারণত শুধু শাখা দেখি। আমরা দেখি আমাদের কাজ, সম্পর্ক, সাফল্য, ব্যর্থতা, সম্পদ এবং সামাজিক পরিচয়। কিন্তু গীতা আমাদের শাখার নিচে থাকা মূলের দিকে তাকাতে বলে। কেন আমি এই কাজ করছি। কেন আমি এই জিনিসটি এত বেশি চাই। কেন অন্যের স্বীকৃতি আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। কেন কোনো একটি বিষয় হারানোর ভয় আমাকে অস্থির করে তোলে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই মানুষ নিজের অন্তর্গত মূলের কাছে পৌঁছাতে পারে।

অতএব অধশ্চোর্ধ্বং প্রসৃতাস্তস্য শাখা দিয়ে শুরু হওয়া এই শ্লোক শুধু একটি মহাজাগতিক বৃক্ষের বর্ণনা নয়। এটি মানুষের জীবন, মন, কর্ম, আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মপরিচয়ের একটি গভীর প্রতিচ্ছবি। শাখাগুলি আমাদের বহুমুখী জীবনকে প্রকাশ করে। গুণগুলি আমাদের প্রকৃতির প্রবণতাকে নির্দেশ করে। বিষয়প্রবাল আমাদের ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণের কথা বলে। মূল আমাদের অদৃশ্য আসক্তি ও সংস্কারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কর্মানুবন্ধন আমাদের দেখায় কীভাবে কাজ এবং তার পরিণাম মানুষকে একের পর এক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে। আর মনুষ্যলোক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই বন্ধনের মধ্যেই আত্মজ্ঞান অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এই শ্লোকের সারকথা তাই মানুষের বাইরের জগতকে অস্বীকার করা নয়, বরং সেই জগতের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে গভীরভাবে বোঝা। সংসারবৃক্ষের শাখা যতই বিস্তৃত হোক, তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে অদৃশ্য মূলের মধ্যে। তেমনি মানুষের জীবনের বাহ্যিক ঘটনাগুলোর গভীরে থাকে তার চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার, কর্ম এবং আত্মপরিচয়ের ধারণা। যে মানুষ নিজের সেই অদৃশ্য মূলকে চিনতে শুরু করে, সে ধীরে ধীরে নিজের জীবনের প্রকৃত স্বরূপও উপলব্ধি করতে শুরু করে। এই আত্মসচেতনতার মধ্যেই গীতার এই শ্লোকের চিরন্তন শিক্ষা নিহিত।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি