সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৫.৩ — অসঙ্গের দৃঢ় অস্ত্রে সংসারবৃক্ষ ছেদনের আধ্যাত্মিক শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতেনাস্তো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা।অশ্বত্থমেনং সুবিরূঢ়মূলম্অসঙ্গশস্ত্রেণ দৃঢ়েন…
ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে
নাস্তো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা।
অশ্বত্থমেনং সুবিরূঢ়মূলম্
অসঙ্গশস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা।।৩।।

অনুবাদঃ এই বৃক্ষের স্বরূপ এই জগতে উপলব্ধ হয় না। এর আদি, অন্ত ও স্থিতি যে কোথায় তা কেউই বুঝতে পারে না। তীব্র বৈরাগ্যরূপ অস্ত্রের দ্বারা দৃঢ়মূল এই বৃক্ষকে ছেদন করে সত্য বস্তুর অন্বেষণ করা কর্তব্য, যেখানে গমন করলে, পুনরায় ফিরে আসতে হয় না। স্মরণাতীত কাল হতে যাঁর থেকে সমস্ত কিছু প্রবর্তন ও বিস্তৃত হয়েছে, সেই আদি পুরুষের প্রতি শরণাগত হও।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায় পুরুষোত্তম যোগের তৃতীয় শ্লোক মানবজীবনের এক গভীর সত্যকে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। কৃষ্ণ এখানে সংসারকে একটি অশ্বত্থবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই বৃক্ষের প্রকৃত রূপ সাধারণ দৃষ্টিতে সহজে উপলব্ধ হয় না। তার শুরু কোথায়, শেষ কোথায় এবং তার প্রকৃত ভিত্তিই বা কোথায়, তা নির্ণয় করা কঠিন। তাই কৃষ্ণ এমন এক অস্ত্রের কথা বলেছেন যা বাহ্যিক কোনো অস্ত্র নয়। সেই অস্ত্র হলো অসঙ্গ। অর্থাৎ অনাসক্তি। এই অসঙ্গের দৃঢ় অস্ত্র দিয়েই গভীরভাবে প্রোথিত সংসারবৃক্ষকে ছেদন করতে হবে।

শ্লোকটির শুরুতে বলা হয়েছে ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে। এখানে রূপ শব্দের অর্থ শুধু বাহ্যিক আকৃতি নয়। এর মধ্যে কোনো কিছুর প্রকৃত স্বরূপ, প্রকৃতি এবং অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত প্রকাশের ধারণা রয়েছে। অস্য অর্থ এর এবং ইহ অর্থ এখানে বা এই জাগতিক অবস্থায়। উপলভ্যতে শব্দটি উপ এবং লভ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। লভ্ ধাতুর অর্থ লাভ করা বা পাওয়া এবং উপসর্গ যুক্ত হলে তার মধ্যে কোনো কিছুকে যথাযথভাবে উপলব্ধ করার ভাব প্রকাশ পায়। ফলে পুরো বাক্যটির অর্থ দাঁড়ায় এই যে সংসারবৃক্ষের প্রকৃত স্বরূপ জাগতিক দৃষ্টিতে সহজে উপলব্ধ করা যায় না।

এরপর বলা হয়েছে নান্তো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা। অন্ত অর্থ শেষ এবং আদি অর্থ শুরু বা উৎস। সংপ্রতিষ্ঠা শব্দের মধ্যে প্রতিষ্ঠা, ভিত্তি এবং স্থিতির ধারণা রয়েছে। অর্থাৎ সংসারের প্রকৃত শেষ কোথায়, তার শুরু কোথায় এবং কোন চূড়ান্ত ভিত্তির ওপর তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত, তা সাধারণ মানুষের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিতে সহজে নির্ণয় করা যায় না। এখানে কৃষ্ণ মানুষের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আমরা জীবনের অসংখ্য ঘটনা দেখতে পাই, কিন্তু অস্তিত্বের সম্পূর্ণ রহস্যকে একসঙ্গে উপলব্ধ করতে পারি না।

এই প্রসঙ্গে অশ্বত্থ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অশ্বত্থ সাধারণ অর্থে পিপুল বৃক্ষের নাম। কিন্তু গীতার ভাষায় এটি কেবল একটি বৃক্ষ নয়। এটি সমগ্র সংসারজীবনের প্রতীক। ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যায় অশ্বত্থ শব্দের সঙ্গে অনিত্যতার ধারণা যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ যা আজ আছে, আগামীকাল একই অবস্থায় থাকবে না। এই অনিত্যতাই সংসারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। মানুষ প্রতিদিন পরিবর্তনের মধ্যে বাস করেও স্থায়িত্বের আকাঙ্ক্ষা করে। সে সম্পর্ককে চিরস্থায়ী ভাবতে চায়, সম্পদকে স্থায়ী নিরাপত্তা মনে করতে চায়, সম্মানকে নিজের পরিচয়ের অংশ করে নিতে চায় এবং নিজের বর্তমান অবস্থাকে স্থায়ী বলে ধরে নিতে চায়। কিন্তু সময়ের প্রবাহ তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে পরিবর্তনই জগতের স্বাভাবিক নিয়ম।

কৃষ্ণ এই অশ্বত্থবৃক্ষকে বলেছেন সুবিরূঢ়মূল। সু অর্থ অত্যন্ত বা ভালোভাবে এবং বিরূঢ় শব্দটি বৃদ্ধি পাওয়া ও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ধারণা বহন করে। মূল অর্থ শিকড়। তাই সুবিরূঢ়মূল অর্থ যার শিকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। কিন্তু এখানে শিকড় মাটির নিচে থাকা কোনো সাধারণ শিকড় নয়। এটি মানুষের চেতনার গভীরে প্রোথিত বাসনা, মোহ, অহংকার, কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা এবং আসক্তির প্রতীক। মানুষের অনেক বন্ধন এত গভীরে থাকে যে সে নিজেই অনেক সময় বুঝতে পারে না কোন আকাঙ্ক্ষা তাকে পরিচালনা করছে। সে মনে করে সে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, অথচ তার সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের অভ্যাস, ভয়, লোভ, প্রত্যাশা কিংবা স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা।

এই কারণেই পরবর্তী শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণ বলেছেন অসঙ্গশস্ত্রেণ। অসঙ্গ শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং সঙ্গের সমন্বয়ে। সঙ্গের মধ্যে যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত থাকা এবং আসক্ত হওয়ার ধারণা রয়েছে। তার সঙ্গে অ যুক্ত হলে অর্থ দাঁড়ায় আসক্তিহীনতা বা অনাসক্তি। শস্ত্র অর্থ অস্ত্র। ফলে অসঙ্গশস্ত্র অর্থ অনাসক্তির অস্ত্র। এই অস্ত্র বাহ্যিক নয়। এটি মানুষের অন্তরের এক বিশেষ শক্তি। যে শক্তি মানুষকে বলে তুমি কাজ করবে, ভালোবাসবে, দায়িত্ব পালন করবে এবং জীবনকে গ্রহণ করবে, কিন্তু কোনো পরিবর্তনশীল বস্তু বা ফলাফলের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে বেঁধে ফেলবে না।

অসঙ্গকে অনেক সময় ভুলভাবে উদাসীনতা বা সম্পর্কহীনতা হিসেবে বোঝা হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে অসঙ্গ তার চেয়ে অনেক গভীর। অসঙ্গ মানে ভালোবাসা ত্যাগ করা নয়। পরিবার ত্যাগ করা নয়। কর্ম ত্যাগ করা নয়। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াও নয়। অসঙ্গ হলো সম্পর্কের মধ্যে থেকেও অন্ধ অধিকারবোধ থেকে মুক্ত থাকা। কাজের মধ্যে থেকেও ফলাফলের প্রতি এমন নির্ভরতা তৈরি না করা যাতে ফলাফল বদলে গেলেই নিজের অস্তিত্ব অর্থহীন বলে মনে হয়। মানুষ তার কর্তব্য পালন করবে, কিন্তু নিজের আত্মমূল্যকে কেবল সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করবে না। সে ভালোবাসবে, কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে নিজের সম্পত্তি ভাববে না। সে সম্পদ ব্যবহার করবে, কিন্তু সম্পদকে নিজের পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি বানাবে না।

দৃঢ়েন শব্দটি এই শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করেছে। শুধু অসঙ্গের কথা জানা যথেষ্ট নয়। অসঙ্গকে দৃঢ় করতে হয়। কারণ মানুষের আসক্তির শিকড় খুব গভীরে। একটি অভ্যাস বহু বছর ধরে তৈরি হতে পারে। একটি অহংকার দীর্ঘদিনের সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিতে পারে। কোনো কিছু হারানোর ভয় মানুষের চেতনার গভীরে বসে যেতে পারে। তাই একদিনের উপলব্ধি দিয়ে সব বন্ধন ছিন্ন হয় না। দরকার সচেতনতা, আত্মসংযম, বিচারবোধ এবং দীর্ঘস্থায়ী অনুশীলন। দৃঢ় অসঙ্গ সেই অন্তর্গত শক্তির প্রতীক।

ছিত্বা শব্দটি এসেছে ছিদ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত ভাব থেকে। অর্থ ছেদন করে বা কেটে। কিন্তু এখানে ছেদন বলতে জগতকে ধ্বংস করার কথা বলা হয়নি। ছেদন করতে হবে সেই বন্ধনকে যা মানুষকে জগতের পরিবর্তনশীল বিষয়ের সঙ্গে এমনভাবে আবদ্ধ করে যে সে নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলে যায়। অর্থাৎ ছেদন করতে হবে অহংকার, মোহ, অন্ধ আসক্তি এবং কর্মফলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা। বাহ্যিক সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং সংসারের প্রতি নিজের ভেতরের ভুল সম্পর্ককে পরিবর্তন করাই এই শিক্ষার মূল কথা।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই সংসারবৃক্ষকে অবিদ্যা বা অজ্ঞানের প্রকাশ হিসেবে বোঝা যায়। মানুষ নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে না জেনে শরীর, মন, ইন্দ্রিয় এবং জাগতিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। এই ভুল পরিচয় থেকেই আসক্তি জন্ম নেয়। আত্মজ্ঞান সেই ভুল পরিচয়কে ভেঙে দেয়। তাই অসঙ্গের অস্ত্র শেষ পর্যন্ত জ্ঞানের অস্ত্রেও পরিণত হয়। যখন মানুষ বুঝতে শুরু করে যে পরিবর্তনশীল বস্তু তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়, তখন তার আসক্তির শক্তি ধীরে ধীরে কমে আসে।

ভক্তির দৃষ্টিতে অসঙ্গের আরেকটি গভীর অর্থ রয়েছে। সংসারের প্রতি অন্ধ আসক্তি কমিয়ে পরম সত্যের প্রতি চিত্ত নিবদ্ধ করা। অর্থাৎ শুধু বিচ্ছেদ নয়, বরং চেতনার উচ্চতর অভিমুখ পরিবর্তন। মানুষ যদি কেবল সবকিছু থেকে দূরে সরে যেতে চায়, তবে তার মন শূন্য হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি সে অনিত্যতার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমিয়ে নিত্য সত্যের প্রতি মন নিবদ্ধ করে, তাহলে অসঙ্গ একটি ইতিবাচক আধ্যাত্মিক শক্তিতে পরিণত হয়।

কর্মযোগের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের গুরুত্ব অসাধারণ। মানুষকে কাজ থেকে পালাতে বলা হয়নি। বরং কাজ করতে করতে আসক্তির বন্ধন অতিক্রম করতে বলা হয়েছে। একজন ছাত্র মন দিয়ে পড়বে। একজন কর্মী নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে। একজন মানুষ তার পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু নিজের সমস্ত সুখ, আত্মসম্মান এবং অস্তিত্বকে ফলাফলের হাতে তুলে দেবে না। সাফল্য এলে অহংকারে ভেসে যাবে না এবং ব্যর্থতা এলে নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনে করবে না। কর্ম থাকবে, কিন্তু কর্মের সঙ্গে অন্ধ আত্মপরিচয় থাকবে না।

আধুনিক জীবনে এই শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের পরিচয় অনেক সময় অন্যের প্রশংসা ও স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। কত মানুষ নিজের মূল্যকে অনুসারীর সংখ্যা, প্রশংসা, জনপ্রিয়তা কিংবা সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলছে। অর্থ, চাকরি, পদমর্যাদা এবং বাহ্যিক সাফল্যও মানুষের মনে গভীর আসক্তি সৃষ্টি করতে পারে। কেউ যদি মনে করে পদোন্নতি না হলে তার জীবনের মূল্য নেই, তাহলে সে ফলের সঙ্গে নিজের পরিচয় বেঁধে ফেলেছে। কেউ যদি অন্যের প্রশংসা ছাড়া নিজের মূল্য অনুভব করতে না পারে, তবে তার শিকড়ও বাইরের জগতে প্রোথিত হয়েছে। গীতার অসঙ্গশস্ত্র সেই মানসিক বন্ধনকে চিনতে শেখায়।

একজন ছাত্রের উদাহরণ নেওয়া যায়। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পরিশ্রম করা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু যদি সে মনে করে প্রথম না হলে সে মূল্যহীন, তাহলে ফলাফলের সঙ্গে তার আত্মপরিচয় যুক্ত হয়ে গেছে। অন্যদিকে সে যদি সর্বশক্তি দিয়ে পড়ে এবং ফলাফলকে নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বের মূল্য নির্ধারণ করতে না দেয়, তাহলে তার মধ্যে অসঙ্গের সূচনা ঘটে। একইভাবে একজন কর্মজীবী মানুষ পদোন্নতির জন্য চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু পদোন্নতি না হলে যদি তিনি নিজের জীবনকে ব্যর্থ বলে মনে করেন, তাহলে তিনি ফলাফলের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলেছেন। কর্মযোগী মন বলে আমি আমার কর্তব্য করব এবং ফলাফলকে গ্রহণ করব, কিন্তু ফলাফল আমার সমগ্র সত্তার সংজ্ঞা নয়।

এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অত্যন্ত গভীর। একদিকে আছে সুবিরূঢ়মূল অশ্বত্থবৃক্ষ। অন্যদিকে আছে দৃঢ় অসঙ্গশস্ত্র। একদিকে বিস্তার, অন্যদিকে ছেদন। একদিকে বন্ধন, অন্যদিকে মুক্তি। বৃক্ষ যত গভীরভাবে শিকড় বিস্তার করুক, মানুষের চেতনার মধ্যে এমন একটি শক্তি রয়েছে যা তাকে সেই বন্ধন অতিক্রম করতে সাহায্য করতে পারে। সেই শক্তির নাম অসঙ্গ। এই প্রতীকের মধ্যেই গীতার আধ্যাত্মিক কাব্যিকতা প্রকাশ পেয়েছে।

এই শ্লোক আমাদের আরও একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। মানুষ কি সংসার ত্যাগ করলেই মুক্ত হবে, নাকি সংসারের প্রতি নিজের মানসিক সম্পর্ক পরিবর্তন করলেই মুক্তির পথে এগোতে পারবে। গীতার সামগ্রিক দর্শন দ্বিতীয় পথটিকেই অধিক গুরুত্ব দেয়। বাহ্যিক জগতকে ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। পরিবর্তনশীল জগতের প্রতি অন্ধ আসক্তি এবং মোহের বন্ধনকে ছেদন করাই প্রকৃত সাধনা। সংসারের মধ্যে থেকেও মানুষ মুক্তচিত্ত হতে পারে। দায়িত্ব পালন করেও অনাসক্ত হতে পারে। ভালোবাসার মধ্যেও স্বাধীন থাকতে পারে।

অশ্বত্থ তাই শুধু একটি বৃক্ষ নয়। এটি মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি। এর শিকড় আমাদের বাসনা ও আসক্তিতে, এর শাখা আমাদের কর্ম ও সম্পর্কের বিস্তারে এবং এর পরিবর্তনশীল প্রকৃতি আমাদের অনিত্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ যতদিন পরিবর্তনশীল জিনিসকে চিরস্থায়ী ধরে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তার মধ্যে ভয়, মোহ ও অস্থিরতা থাকবে। আর যখন সে বুঝতে শিখবে যে কোনো বাহ্যিক বস্তুই তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়, তখন অসঙ্গের শক্তি তার মধ্যে জাগ্রত হবে।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোকের শিক্ষা হলো সংসারকে ঘৃণা করা নয়, সংসারের প্রকৃতি বুঝতে শেখা। সম্পর্ককে অস্বীকার করা নয়, সম্পর্কের মধ্যে অন্ধ অধিকারবোধ থেকে মুক্ত হওয়া। কর্মকে ত্যাগ করা নয়, কর্মের ফলের সঙ্গে নিজের আত্মপরিচয়কে বেঁধে না ফেলা। সম্পদকে পরিত্যাগ করা নয়, সম্পদের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকা। সম্মানকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, সম্মান হারালেও নিজের অন্তর্গত মূল্যকে অক্ষুণ্ণ রাখা। এই উপলব্ধিই অসঙ্গের প্রকৃত শক্তি।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই একটি শ্লোক তাই মানুষের সামনে মুক্তির এক গভীর পথ উন্মুক্ত করে। সংসাররূপ অশ্বত্থবৃক্ষের প্রকৃত রূপ সহজে উপলব্ধ হয় না। তার শিকড় বহুদূর বিস্তৃত এবং তার বন্ধন বহুস্তরীয়। কিন্তু মানুষ অসহায় নয়। তার হাতে রয়েছে জ্ঞান, বিবেক, আত্মসংযম এবং অনাসক্তির শক্তি। সেই শক্তিকে দৃঢ় করে জীবনের মধ্যে প্রয়োগ করতে পারলেই ধীরে ধীরে মোহের বন্ধন আলগা হয়। তখন মানুষ বুঝতে পারে যে স্বাধীনতা কোনো বাহ্যিক অবস্থার নাম নয়। স্বাধীনতা হলো এমন এক অন্তর্গত অবস্থা যেখানে মানুষ জগতের মধ্যে থেকেও জগতের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ থাকে না। এই কারণেই গীতার ভাষায় অসঙ্গ শুধু একটি ধারণা নয়। এটি মুক্তির এক শক্তিশালী অস্ত্র।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি