সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৫.৪ — আসক্তি ছিন্ন করে পরম পদ অনুসন্ধানের আধ্যাত্মিক পথ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ততঃ পদং তৎপরিমার্গিতব্যংযস্মিন্ গতা ননিবর্তন্তি ভূয়ঃ।তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যেযতঃ প্রবৃত্তিঃ প…
ততঃ পদং তৎপরিমার্গিতব্যং
যস্মিন্ গতা ননিবর্তন্তি ভূয়ঃ।
তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে
যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী।।৪।।

অনুবাদঃ এই বৃক্ষের স্বরূপ এই জগতে উপলব্ধ হয় না। এর আদি, অন্ত ও স্থিতি যে কোথায় তা কেউই বুঝতে পারে না। তীব্র বৈরাগ্যরূপ অস্ত্রের দ্বারা দৃঢ়মূল এই বৃক্ষকে ছেদন করে সত্য বস্তুর অন্বেষণ করা কর্তব্য, যেখানে গমন করলে, পুনরায় ফিরে আসতে হয় না। স্মরণাতীত কাল হতে যাঁর থেকে সমস্ত কিছু প্রবর্তন ও বিস্তৃত হয়েছে, সেই আদি পুরুষের প্রতি শরণাগত হও।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকটি মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি অত্যন্ত গভীর নির্দেশনা বহন করে। এর আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সংসারকে একটি উল্টো অশ্বত্থ বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেই বৃক্ষের শিকড় ঊর্ধ্বে এবং শাখা প্রশাখা নিচের দিকে বিস্তৃত। তার অর্থ মানুষের দৃশ্যমান জীবন ও জগতের পেছনে রয়েছে একটি গভীর অদৃশ্য উৎস। কিন্তু মানুষ সাধারণত সেই উৎসকে অনুসন্ধান না করে জগতের শাখা প্রশাখার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকে। সম্পর্ক, সম্পদ, পরিচয়, সাফল্য, ব্যর্থতা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, আশা এবং অহংকারের অসংখ্য বন্ধন তাকে ক্রমাগত সংসারের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে সেই আসক্তির বন্ধন ছিন্ন করার কথা বলেছেন এবং তার পরেই বলেছেন ততঃ পদং তৎ পরিমার্গিতব্যম্। অর্থাৎ সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার পর মানুষের উচিত সেই পরম পদ অনুসন্ধান করা যেখানে পৌঁছালে আর পুনরায় সংসারের বন্ধন ও জন্ম মৃত্যুর চক্রে ফিরে আসতে হয় না।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ততঃ। সংস্কৃত তদ্ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি এবং এর অর্থ তারপর, সেই অবস্থার পর অথবা সেখান থেকে। কিন্তু এখানে ততঃ শব্দটি শুধু সময়ের ধারাবাহিকতা প্রকাশ করছে না। এর মধ্যে রয়েছে একটি আধ্যাত্মিক অগ্রগতির ইঙ্গিত। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে সংসারের বাহ্যিক আকর্ষণ স্থায়ী নয় এবং আসক্তিই তাকে বারবার একই চক্রের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, তখন তার জীবনে একটি নতুন অনুসন্ধানের সূচনা হয়। সেই উপলব্ধির পরেই আসে ততঃ। অর্থাৎ প্রথমে সংসারের প্রকৃতি উপলব্ধি করতে হবে, তারপর তার বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে এবং তার পরেই পরম সত্যের অনুসন্ধানে এগিয়ে যেতে হবে।

এরপর এসেছে পদং শব্দটি। পদ শব্দটির অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। সংস্কৃত ভাষায় পদ বলতে পা, পদক্ষেপ, স্থান, অবস্থান, গন্তব্য, মর্যাদা অথবা কোনো বিশেষ অবস্থাকে বোঝানো হয়। এর সঙ্গে গমন বা অগ্রসর হওয়ার ধারণার সম্পর্ক রয়েছে। তাই পদ কেবল কোনো ভৌত স্থান নয়। মানুষ কোনো অবস্থায় পৌঁছালেও সেটিকে একটি পদ বলা যায়। গীতার এই শ্লোকে পদ বলতে কোনো সাধারণ স্থানকে বোঝানো হয়নি। এখানে পদ হলো সেই পরম অবস্থান যেখানে পৌঁছালে আর সংসারের পরিবর্তনশীল চক্রে ফিরে আসতে হয় না। তাই পদ শব্দটি এখানে পরম সত্য, মোক্ষের অবস্থা, ঈশ্বরপ্রাপ্তির চূড়ান্ত অবস্থান অথবা আত্মস্বরূপ উপলব্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তৎ শব্দটি সেই পদকে আরও নির্দিষ্ট করে। তৎ অর্থ সেই। উপনিষদীয় দর্শনে তৎ একটি গভীর শব্দ। এটি এমন এক সত্যকে নির্দেশ করতে পারে যা সাধারণ ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির সীমার বাইরে। গীতার এই অংশে তৎ পদটি কোনো সাধারণ অর্জনকে নির্দেশ করছে না। এটি সেই পরম সত্যকে নির্দেশ করছে যা জগতের পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। তাই ততঃ পদং তৎ বলতে বোঝানো হচ্ছে সেই পরম পদ, যা মানুষের চূড়ান্ত অনুসন্ধানের বিষয় হওয়া উচিত।

এই অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে পরিমার্গিতব্যম্ শব্দটি। এর মধ্যে রয়েছে পরি উপসর্গ এবং মৃগ ধাতুর ভাব। পরি অর্থ চারদিকে, সম্পূর্ণভাবে বা সর্বতোভাবে এবং মৃগ ধাতুর সঙ্গে অনুসন্ধান বা সন্ধানের ধারণা যুক্ত। এর সঙ্গে তব্য প্রত্যয় যুক্ত হয়ে করণীয়তার অর্থ প্রকাশ করেছে। ফলে পরিমার্গিতব্যম্ অর্থ দাঁড়ায় অনুসন্ধান করতে হবে, গভীরভাবে খুঁজতে হবে অথবা সন্ধান করা কর্তব্য। এখানে শুধু কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়ার কথা বলা হয়নি। এটি অস্তিত্বের গভীরতম সত্যের অনুসন্ধান। মানুষকে নিজের জীবন, চেতনা, কর্ম, আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মপরিচয়কে প্রশ্ন করতে হবে। আমি কে, আমার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, যে জগতকে আমি এত বাস্তব মনে করছি তার প্রকৃতি কী এবং পরিবর্তনশীলতার পেছনে কি কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য রয়েছে, এই প্রশ্নগুলোর গভীরে প্রবেশ করাই পরিমার্গিতব্যম্ এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।

এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে যস্মিন্ গতা ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ। যস্মিন্ অর্থ যেখানে বা যে অবস্থায়। গতা এসেছে গম্ ধাতু থেকে যার অর্থ যাওয়া বা পৌঁছানো। কিন্তু এখানে এই যাওয়া কোনো শারীরিক ভ্রমণ নয়। এটি চেতনার একটি উচ্চতর অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রতীক। ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ অর্থ আর পুনরায় ফিরে আসে না। এই ফিরে আসা বলতে সাধারণ অর্থে কোনো স্থান থেকে ফিরে আসা বোঝানো হচ্ছে না। ভারতীয় দর্শনের প্রেক্ষাপটে এটি জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের সংসারচক্রের প্রতি ইঙ্গিত করে। মানুষ যতক্ষণ নিজের প্রকৃত স্বরূপকে না জানে ততক্ষণ সে কর্ম, বাসনা এবং আসক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। বাসনা থেকে কর্ম জন্মায়, কর্ম থেকে ফল আসে, ফল থেকে আবার নতুন বাসনা সৃষ্টি হয় এবং এইভাবে একটি অবিরাম চক্র চলতে থাকে। গীতার ভাষায় পরম পদ এমন এক অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে এই বন্ধনমূলক প্রত্যাবর্তনের অবসান ঘটে।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে। তমেব অর্থ তাঁকেই বা সেই একমাত্র পরম সত্তাকেই। এখানে এব শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি একান্ততা প্রকাশ করে। অর্থাৎ অনুসন্ধানের শেষ লক্ষ্য কোনো ক্ষণস্থায়ী বস্তু নয়। সেই এক পরম সত্যকেই অনুসন্ধানের চূড়ান্ত আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এরপর এসেছে আদ্যং পুরুষম্। আদ্য অর্থ প্রথম, আদি বা মূল এবং পুরুষ অর্থ চৈতন্যসত্তা, আত্মসত্তা, পরমাত্মা অথবা পরম পুরুষ। গীতার দার্শনিক পরিসরে আদিপুরুষ হলেন সেই পরম সত্তা যিনি সমস্ত সৃষ্টির উৎস এবং যাঁর অস্তিত্ব অন্য কোনো সৃষ্ট কারণের ওপর নির্ভরশীল নয়।

এই অংশের সবচেয়ে আবেগপূর্ণ শব্দ হলো প্রপদ্যে। এর অর্থ আমি শরণ গ্রহণ করি, আমি আশ্রয় গ্রহণ করি অথবা আমি আত্মসমর্পণ করি। এখানে শুধু ঈশ্বর সম্পর্কে জানা যথেষ্ট নয়। তাঁকে নিজের জীবনের পরম আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। এই শরণাগতি দুর্বলতার পরিচয় নয়। বরং সীমিত অহংকারের সীমা অতিক্রম করে অসীম সত্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করার নাম শরণাগতি। মানুষ যতক্ষণ মনে করে আমি নিজেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক, ততক্ষণ তার মধ্যে অহংকার ও পৃথকত্বের অনুভূতি প্রবল থাকে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে তার অস্তিত্ব বৃহত্তর কোনো সত্যের অংশ, তখন তার মধ্যে বিনয় জন্মায়। প্রপদ্যে সেই বিনয় ও আত্মসমর্পণেরই ভাষা।

শ্লোকের শেষ অংশে বলা হয়েছে যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী। যতঃ অর্থ যাঁর থেকে বা যেখান থেকে। প্রবৃত্তি শব্দটি এসেছে প্র এবং বৃত্ ধাতুর ভাব থেকে। এর অর্থ অগ্রসর হওয়া, কার্যপ্রবাহ, কর্মপ্রবণতা অথবা জগতের বহির্মুখী গতি। প্রসৃতা অর্থ বিস্তৃত হয়েছে বা প্রবাহিত হয়েছে। আর পুরাণী অর্থ প্রাচীন। ফলে পুরো অংশটির অর্থ হলো সেই আদিপুরুষের থেকেই এই প্রাচীন সৃষ্টিপ্রবাহ বিস্তৃত হয়েছে। এখানে প্রবৃত্তি বলতে কেবল ব্যক্তিগত কর্মপ্রবণতা বোঝানো হয় না। সমগ্র জগতের যে ক্রিয়াশীলতা, সৃষ্টি, পরিবর্তন, কর্ম এবং বহির্মুখী প্রবাহ তার কথাও বোঝানো হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃত্তি মানুষকে জগতের দিকে নিয়ে যায় এবং নিবৃত্তি মানুষকে জগতের বন্ধন থেকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। প্রবৃত্তি নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। মানুষের কর্তব্য, কর্ম, পরিবার, সমাজ এবং দায়িত্ব সবই জীবনের স্বাভাবিক অংশ। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন মানুষ প্রবৃত্তির মধ্যেই জীবনের চূড়ান্ত অর্থ খুঁজতে শুরু করে। তখন কর্ম হয়ে ওঠে পরিচয়ের ভিত্তি, সম্পদ হয়ে ওঠে নিরাপত্তার একমাত্র উৎস এবং বাহ্যিক সাফল্য হয়ে ওঠে আত্মমূল্যের মাপকাঠি। গীতা প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করছে না। বরং বলছে যে এই সমস্ত প্রবাহের উৎসকে চিনতে হবে। যে উৎস থেকে এই প্রাচীন প্রবাহ এসেছে সেই আদিপুরুষের সন্ধান করাই মানুষের চূড়ান্ত অনুসন্ধান।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের পরম পদ হলো ব্রহ্মস্বরূপ সত্য। মানুষ নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে ভুলে দেহ, মন, বুদ্ধি এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। এই ভুল পরিচয়ই বন্ধনের মূল। যখন জ্ঞান উদিত হয় এবং মানুষ উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত আত্মস্বরূপ পরিবর্তনশীল দেহ বা মন নয়, তখন অবিদ্যার অবসান ঘটে। এই দৃষ্টিতে ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ কোনো স্থানগত প্রত্যাবর্তনের বিষয় নয়। এটি অজ্ঞতার অবস্থায় আর ফিরে না যাওয়ার প্রতীক। সত্য উপলব্ধি হলে যে জ্ঞান জন্মায় তা মানুষের অস্তিত্বের দৃষ্টিভঙ্গিকেই পরিবর্তন করে দেয়।

বৈষ্ণব দর্শনের আলোকে এই শ্লোকের অর্থ আরও ব্যক্তিগত ও ভক্তিময় হয়ে ওঠে। এখানে আদিপুরুষ হলেন পরমেশ্বর এবং প্রপদ্যে শব্দটি তাঁর শরণ গ্রহণের শিক্ষা দেয়। জীব এবং ঈশ্বরের সম্পর্ককে এই দৃষ্টিতে নিত্য সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়। তাই মুক্তি শুধু কোনো বিমূর্ত সত্যের উপলব্ধি নয়। এটি পরম পুরুষের সঙ্গে জীবের নিত্য সম্পর্ক উপলব্ধি এবং তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়। এই কারণে জ্ঞান ও ভক্তি এখানে একে অপরের বিরোধী নয়। জ্ঞান মানুষকে সত্যের দিকে নিয়ে যায় এবং ভক্তি সেই সত্যের প্রতি হৃদয়ের আত্মসমর্পণ সম্পূর্ণ করে।

সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতেও পুরুষ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সেখানে পুরুষ হলো চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতি হলো পরিবর্তনশীল জগতের মূল উপাদান। মানুষ যখন প্রকৃতির পরিবর্তন, গুণ এবং বিকারকে নিজের প্রকৃত সত্তা বলে মনে করে তখন বন্ধন সৃষ্টি হয়। যখন সে পুরুষের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে তখন মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়। গীতার পুরুষ ধারণা সাংখ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও গীতায় তা আরও বিস্তৃত ঈশ্বরতাত্ত্বিক অর্থ লাভ করেছে।

আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের মানুষ অসংখ্য আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বাস করে। একটি লক্ষ্য পূর্ণ হলে আরেকটি লক্ষ্য সামনে আসে। একটি সাফল্য পাওয়ার পর আরও বড় সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর আরও স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়। মানুষ বাহ্যিক অর্জনের পেছনে ছুটতে ছুটতে অনেক সময় নিজের গভীরতম প্রশ্নগুলো ভুলে যায়। সে কী অর্জন করছে তা জানে, কিন্তু কেন অর্জন করছে সেই প্রশ্নটি অনেক সময় করে না। গীতার এই শ্লোক সেই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে আসে। জীবনের শেষ লক্ষ্য কি কেবল আরও কিছু পাওয়া, নাকি এমন একটি সত্যকে জানা যার পরে আর কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অবশিষ্ট থাকে না।

এই বিষয়টি একটি মরুভূমির উপমা দিয়ে সহজভাবে বোঝা যায়। একজন পথিক দূরে মরীচিকা দেখে তাকে জল মনে করে ছুটতে থাকে। কাছে গিয়ে দেখে সেখানে জল নেই। আবার দূরে আরেকটি মরীচিকা দেখা যায় এবং সে আবার ছুটতে শুরু করে। এভাবে তার দৌড়ের শেষ হয় না। একসময় সে বুঝতে পারে যে সমস্যা তার দৌড়ের গতিতে নয়, তার ভুল পরিচয়ে। সে মরীচিকাকে জল মনে করছে। তখন সে মরীচিকার পেছনে ছোটা বন্ধ করে প্রকৃত জলের উৎস খুঁজতে শুরু করে। মানুষের সংসারজীবনও অনেক সময় এমন। সম্পদ, সম্মান, ক্ষমতা, সাফল্য কিংবা বাহ্যিক স্বীকৃতিকে আমরা চূড়ান্ত সুখ মনে করি। কিন্তু সেগুলো অর্জন করার পরও অন্তরের অস্থিরতা থেকে যায়। পরিমার্গিতব্যম্ সেই অবস্থায় প্রকৃত উৎসের সন্ধানের আহ্বান।

এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সত্যকে কেবল গ্রহণ করা নয়, সত্যকে অনুসন্ধান করা। শ্রীকৃষ্ণ বলেননি যে কোনো বাহ্যিক বস্তু সংগ্রহ করতে হবে। তিনি বলেছেন পরিমার্গিতব্যম্। অর্থাৎ খুঁজতে হবে। অনুসন্ধান করতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে। নিজের জীবনকে পরীক্ষা করতে হবে। নিজের আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তিকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আমি কে এবং আমার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, এই প্রশ্নের গভীরে যেতে হবে। তাই আধ্যাত্মিকতা এখানে অন্ধ বিশ্বাস নয়। এটি একটি গভীর অনুসন্ধান।

শ্লোকটির মধ্যে মানবজীবনের একটি সুন্দর পরিবর্তনের পথও লুকিয়ে আছে। প্রথমে মানুষ সংসারের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। পরে সে সংসারের অনিত্যতা উপলব্ধি করে। তারপর সে আসক্তির প্রকৃতি বুঝতে শুরু করে। এরপর তার মধ্যে সত্যের অনুসন্ধান জন্ম নেয়। সেই অনুসন্ধান তাকে পরম পদ বা চূড়ান্ত সত্যের দিকে নিয়ে যায়। আর শেষ পর্যন্ত সে উপলব্ধি করে যে যে সত্যকে সে বাইরে খুঁজছিল সেই সত্যই তার অস্তিত্বের গভীরতম ভিত্তি।

সুতরাং ততঃ পদং তৎ পরিমার্গিতব্যম্ কেবল একটি সংস্কৃত বাক্য নয়। এটি মানুষের সমগ্র আত্মিক যাত্রার একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা। ততঃ আমাদের বলে পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপে যেতে। পদং আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। তৎ সেই পরম সত্যকে নির্দেশ করে। পরিমার্গিতব্যম্ আমাদের অনুসন্ধান করতে শেখায়। যস্মিন্ গতা ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ মুক্তির চূড়ান্ত অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে। তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে আমাদের পরম পুরুষের শরণ গ্রহণের শিক্ষা দেয়। আর যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সমগ্র সৃষ্টির বহুমুখী প্রবাহের পেছনে একটি গভীর উৎস রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত যাত্রা বাহ্যিক জগতের অসংখ্য অর্জনের দিকে নয়, বরং অস্তিত্বের উৎসের দিকে। মানুষ জীবনে অনেক কিছু অর্জন করতে পারে, কিন্তু সেই অর্জনের পরও যদি নিজের প্রকৃত স্বরূপকে না চিনতে পারে তাহলে তার অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। গীতা তাই মানুষকে বাহ্যিক সাফল্যের সীমা অতিক্রম করে সেই পরম পদ অনুসন্ধান করতে আহ্বান জানায়, যেখানে পৌঁছে আর কোনো অপূর্ণতার কারণে ফিরে আসতে হয় না। সেই অনুসন্ধানের শেষ প্রান্তে রয়েছে আদিপুরুষের উপলব্ধি এবং তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ। এই কারণেই শ্লোকটি একই সঙ্গে ভাষার দিক থেকে গভীর, দর্শনের দিক থেকে মহৎ এবং মানবজীবনের দিক থেকে চিরন্তনভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি