সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৫.৭ — জীবের সনাতন স্বরূপ, পরমেশ্বরের অংশত্ব ও মন-ইন্দ্রিয়ের বন্ধন

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ।মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি।।৭।।
মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ।
মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি।।৭।।

অনুবাদঃ এই জড় জগতে বদ্ধ জীবসমূহ আমার সনাতন বিভিন্নাংশ। জড়া প্রকৃতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলে তারা মন সহ ছয়টি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রকৃতিরূপ ক্ষেত্রে কঠোর সংগ্রাম করছে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকটি মানুষের প্রকৃত পরিচয়, জীবের সঙ্গে পরমেশ্বরের সম্পর্ক এবং মন ও ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সংসারের সঙ্গে মানুষের বন্ধন সম্পর্কে এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ। মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি। এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ প্রথমেই মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা অন্তর্নিহিত সত্তার দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরান। মানুষ নিজেকে সাধারণত দেহ, নাম, পরিচয়, পেশা, পরিবার, সম্পদ, সাফল্য কিংবা সামাজিক অবস্থানের মাধ্যমে চিনতে শেখে। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এগুলো মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। মানুষের মধ্যে এমন এক সত্তা রয়েছে যার সঙ্গে পরম সত্যের একটি গভীর এবং চিরন্তন সম্পর্ক বিদ্যমান। সেই কারণেই কৃষ্ণ বলেন মমৈবাংশো, অর্থাৎ জীব আমারই অংশস্বরূপ।

মম শব্দের অর্থ আমার এবং এব শব্দের অর্থই, অবশ্যই বা বিশেষভাবে। এই দুটি শব্দের মিলনে মমৈব হয়েছে। এর মধ্যে কৃষ্ণ জীবের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপর এসেছে অংশ শব্দটি। সংস্কৃত অংশ শব্দের সাধারণ অর্থ হলো ভাগ, অংশ বা অংশবিশেষ। কিন্তু গীতার এই বক্তব্যকে কেবল বস্তুগত অর্থে বোঝা ঠিক নয়। জীব ঈশ্বরের কোনো ভৌত টুকরো নয় যে ঈশ্বরের একটি অংশ কেটে পৃথক হয়ে জীব সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনে অংশ শব্দটির ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে জীবের অস্তিত্ব পরমেশ্বরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যেমন সূর্যের আলো সূর্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বহন করে, অথচ সূর্য নিজে অসংখ্য টুকরো হয়ে যায় না, তেমনি জীবের মধ্যে ঈশ্বরীয় উৎসের সঙ্গে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই অর্থে মমৈবাংশো মানুষের অস্তিত্বকে নিছক জড় ও আকস্মিক ঘটনা হিসেবে না দেখে তাকে একটি বৃহত্তর চৈতন্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে শেখায়।

এরপর কৃষ্ণ বলেন জীবলোকে জীবভূতঃ। জীব শব্দের অর্থ প্রাণী বা জীবিত সত্তা এবং লোক শব্দের অর্থ জগৎ বা অবস্থানের ক্ষেত্র। জীবলোক বলতে জীবের জগতকে বোঝায়। জীবভূত শব্দের মধ্যে ভূ ধাতুর ভাব রয়েছে, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। অর্থাৎ যে সনাতন জীবসত্তা এই জীবজগতে জীবরূপে প্রকাশিত হয়েছে, কৃষ্ণ তার কথাই বলছেন। মানুষ এই জগতে জন্মগ্রহণ করে, বেড়ে ওঠে, সম্পর্ক গড়ে, স্বপ্ন দেখে, সংগ্রাম করে, আনন্দ পায়, দুঃখ ভোগ করে এবং শেষ পর্যন্ত দেহের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। কিন্তু এই পরিবর্তনশীল জীবনের পেছনে যে গভীরতর আত্মসত্তা রয়েছে, গীতা সেই সত্তাকে দেহের সঙ্গে এক করে দেখতে নিষেধ করে।

এই কারণেই শ্লোকে এসেছে সনাতন শব্দটি। সনাতন অর্থ চিরন্তন, নিত্য, অনাদি এবং কালকে অতিক্রম করে থাকা। কৃষ্ণ জীবকে শুধু নিজের অংশ বলেননি, তাকে সনাতন অংশ বলেছেন। এর মধ্যে গভীর একটি দার্শনিক বক্তব্য রয়েছে। মানুষের দেহ পরিবর্তিত হয়। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্য আসে। শরীরের অসংখ্য কোষ পরিবর্তিত হয়। চিন্তা পরিবর্তিত হয়। পছন্দ পরিবর্তিত হয়। সামাজিক পরিচয় পরিবর্তিত হয়। কিন্তু পরিবর্তনের মধ্যেও মানুষের মধ্যে একটি ধারাবাহিক আত্মপরিচয়ের অনুভূতি থাকে। গীতা সেই গভীরতর সত্তার দিকেই ইঙ্গিত করে। তাই সনাতন শব্দটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে তার প্রকৃত পরিচয় কেবল বর্তমান দেহ বা সাময়িক জীবনের ঘটনাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এই শ্লোকের দ্বিতীয় অংশ মানুষের সংসারজীবনের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোকে সামনে নিয়ে আসে। কৃষ্ণ বলেন মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি। এখানে মনকে পাঁচ ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে ষষ্ঠ হিসেবে গণনা করা হয়েছে। মানুষের পাঁচটি প্রধান জ্ঞানেন্দ্রিয় হলো চোখ, কান, নাক, জিহ্বা এবং ত্বক। চোখ দৃশ্য গ্রহণ করে, কান শব্দ গ্রহণ করে, নাক গন্ধ গ্রহণ করে, জিহ্বা স্বাদ গ্রহণ করে এবং ত্বক স্পর্শ অনুভব করে। কিন্তু এই পাঁচ ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতাগুলোকে একত্রিত করে অর্থপূর্ণ করে তোলে মন। তাই মনকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলা হয়েছে। মানুষ শুধু চোখ দিয়ে দেখে না, মন দিয়ে সেই দেখা বিষয়ের অর্থও তৈরি করে। মানুষ শুধু কান দিয়ে শব্দ শোনে না, মন সেই শব্দকে আনন্দ, অপমান, প্রশংসা কিংবা ভয়ের অর্থ দিতে পারে। এই কারণে ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে মনের সম্পর্ক মানুষের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে প্রকৃতি শব্দটিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রকৃতি বলতে গীতার দর্শনে সেই শক্তিকে বোঝানো হয় যার মাধ্যমে জগতের পরিবর্তনশীল ও বস্তুগত প্রকাশ ঘটে। শরীর, ইন্দ্রিয়, মন এবং জগতের নানা অভিজ্ঞতা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। জীব যখন এই প্রকৃতির ক্ষেত্রে অবস্থান করে তখন সে মন ও ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই সম্পর্কের গতিশীলতাকে কৃষ্ণ কর্ষতি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কর্ষতি এসেছে কৃষ্ ধাতু থেকে। এর মধ্যে টানা, আকর্ষণ করা কিংবা নিজের দিকে টেনে নেওয়ার ভাব রয়েছে। এই একটি শব্দ মানুষের মানসিক জীবনের একটি গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। মানুষ শুধু পৃথিবীকে দেখে না, পৃথিবীর বিষয়গুলোও মানুষকে আকর্ষণ করে।

একটি সুন্দর দৃশ্য চোখকে আকর্ষণ করে। একটি প্রশংসা মনকে আনন্দ দেয়। একটি অপমান মনে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যেতে পারে। কোনো বস্তু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে তার দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা মানুষকে বারবার অন্যের প্রশংসা খুঁজতে বাধ্য করতে পারে। অর্থ, ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা কিংবা ভোগের আকর্ষণ মানুষের মনকে বাইরের জগতের দিকে ক্রমাগত টেনে নিয়ে যেতে পারে। এখানেই কর্ষতি শব্দটির আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব রয়েছে। মানুষ কখনো কখনো মনে করে সে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, অথচ তার সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ, মনের অভ্যাস এবং পুরনো আসক্তি।

আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে এই শিক্ষাটি আরও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। একজন মানুষ যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রশংসাসূচক মন্তব্য দেখে তখন চোখ সেই শব্দকে গ্রহণ করে। মন সেটিকে অর্থ দেয়। এরপর মনে আরও প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা জন্মাতে পারে। আবার সমালোচনা দেখলে একই মন কষ্ট, রাগ কিংবা প্রতিশোধের ইচ্ছা তৈরি করতে পারে। একটি নোটিফিকেশন ছোট একটি শব্দ বা ছবি হলেও তা মানুষের মনকে বারবার নিজের দিকে টেনে নিতে পারে। গীতার কর্ষতি শব্দটি তাই শুধু প্রাচীন আধ্যাত্মিক ধারণা নয়। এটি মানুষের আকর্ষণ, আসক্তি এবং মানসিক নির্ভরতার প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মমৈবাংশো শব্দবন্ধটি মানুষের আত্মপরিচয়ের একটি বিপ্লবী ধারণা সামনে আনে। আমরা সাধারণত নিজেদের সম্পর্কে বলি আমি একজন ছাত্র, আমি একজন কর্মজীবী, আমি একজন পিতা, আমি একজন মাতা, আমি সফল, আমি ব্যর্থ, আমি ধনী কিংবা আমি দরিদ্র। কিন্তু এগুলো সবই পরিবর্তনশীল পরিচয়। গীতা আরও গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করে, এসব পরিচয়ের পরিবর্তনের পরেও যে সত্তা নিজের অস্তিত্ব অনুভব করে সে কে। এই প্রশ্নই আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা। আত্মজিজ্ঞাসা মানে নিজের বাহ্যিক পরিচয়কে অস্বীকার করা নয়। বরং বাহ্যিক পরিচয়ের গভীরে থাকা সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা।

বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনে মমৈবাংশো শব্দটির ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে করা হয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে পরম সত্য এক এবং অদ্বিতীয় ব্রহ্ম। সেই দৃষ্টিতে জীবের পৃথকত্ব মূলত অবিদ্যা ও উপাধির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অংশকে ঈশ্বরের কোনো বস্তুগত টুকরো হিসেবে দেখা যায় না। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব বাস্তব এবং ঈশ্বরের সঙ্গে তার গভীর নির্ভরশীল সম্পর্ক রয়েছে। দ্বৈত দর্শনে জীব ও ঈশ্বর চিরকাল পৃথক সত্তা হলেও জীব ঈশ্বরের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এই বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেখায় যে একটি ছোট শব্দের মধ্যেও ভারতীয় দর্শনের বহু শতাব্দীর গভীর চিন্তা নিহিত রয়েছে।

এই শ্লোককে বোঝার জন্য একটি সূর্য ও সূর্যের আলোর উপমা অত্যন্ত সহায়ক। সূর্যের আলো অসংখ্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। আলো সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু সূর্য নিজে অসংখ্য টুকরো হয়ে যায় না। তেমনিভাবে জীবের মধ্যে যে চৈতন্যের প্রকাশ দেখা যায় তাকে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বাস্তবতা হিসেবে গীতা দেখছে না। আবার এটিও বলা হচ্ছে না যে পরমেশ্বর কোনো বৃহৎ বস্তু এবং জীব তার একটি কাটা অংশ। বরং এখানে সম্পর্ক, নির্ভরতা এবং চৈতন্যের গভীর উৎসগত সত্যকে সামনে আনা হয়েছে।

শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। জীবকে যদি একজন যাত্রী হিসেবে ধরা হয়, তাহলে প্রকৃতি তার যাত্রার ক্ষেত্র। মন তার অভ্যন্তরীণ পরিচালনাকেন্দ্র এবং ইন্দ্রিয়গুলো বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের দরজা। জীব এই জগতে এসে অসংখ্য অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। কখনো সে আনন্দ পায়, কখনো দুঃখ পায়, কখনো সাফল্য অর্জন করে, কখনো ব্যর্থ হয়। কিন্তু যাত্রাপথের অভিজ্ঞতাগুলো যেন তার প্রকৃত পরিচয়কে আড়াল না করে ফেলে, গীতা সেই সতর্কতাই দেয়। মানুষ পথের দৃশ্যকে নিজের পরিচয় মনে করলে যাত্রার উদ্দেশ্য ভুলে যেতে পারে।

এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মনকে দমন করা নয়, মনকে বোঝা। ইন্দ্রিয় মানুষের শত্রু নয়। চোখ দিয়ে দেখা, কান দিয়ে শোনা, জিহ্বা দিয়ে স্বাদ নেওয়া কিংবা পৃথিবীর সৌন্দর্য অনুভব করা মানবজীবনের স্বাভাবিক অংশ। সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন মানুষ ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণকে নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্র করে ফেলে। তখন মানুষ যা দেখে তার পেছনে ছুটতে থাকে, যা শুনে তার দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যা পেতে চায় তা না পাওয়া পর্যন্ত অস্থির থাকে। গীতার শিক্ষা হলো মানুষ যেন ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেও নিজের গভীরতর সত্তাকে ভুলে না যায়।

মানবজীবনের বহু সংকটের মূলেও এই পরিচয়ের ভুল থাকতে পারে। একজন মানুষ যদি নিজের সাফল্যকেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করে, তাহলে ব্যর্থতা তার কাছে অস্তিত্বের সংকট হয়ে উঠতে পারে। কেউ যদি অন্যের প্রশংসাকেই নিজের মূল্যবোধের ভিত্তি বানায়, তাহলে সমালোচনা তাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিতে পারে। কেউ যদি সম্পদকেই নিজের পরিচয়ের কেন্দ্র করে, তাহলে সম্পদের পরিবর্তন তার মানসিক স্থিতি নষ্ট করতে পারে। গীতা তখন আমাদের একটি গভীরতর পরিচয়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তুমি যা অর্জন করেছ তা তুমি নও। তুমি যে ভূমিকা পালন করছ তা তোমার সম্পূর্ণ সত্তা নয়। তোমার মধ্যে এমন এক সনাতন মাত্রা রয়েছে যা এই পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার চেয়ে গভীর।

এই কারণে পঞ্চদশ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোক শুধু আত্মতত্ত্বের একটি ঘোষণা নয়। এটি মানুষের মনস্তত্ত্বেরও একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। প্রথমে বলা হচ্ছে জীবের গভীর পরিচয় কী। তারপর বলা হচ্ছে সে প্রকৃতির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হয়। এরপর দেখানো হচ্ছে মন ও ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কীভাবে বাইরের জগতের আকর্ষণ জীবনের অভিজ্ঞতাকে পরিচালিত করতে পারে। অর্থাৎ শ্লোকটি একদিকে আত্মার পরিচয় দেয় এবং অন্যদিকে সংসারী জীবনের মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটিও প্রকাশ করে।

সবকিছু মিলিয়ে মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ এই বাক্যটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক গভীর আহ্বান। এটি আমাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখায় আমরা আসলে কে। আমরা কি শুধু পরিবর্তনশীল শরীর, নাকি তার চেয়েও গভীর কোনো সত্তা রয়েছে। আমরা কি কেবল বাইরের জগতের আকর্ষণে পরিচালিত হব, নাকি নিজের অন্তর্নিহিত সত্যকে চিনতে পারব। কৃষ্ণের বক্তব্যে জীবের একটি সনাতন পরিচয় রয়েছে এবং সেই পরিচয় পরমেশ্বরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু প্রকৃতির জগতে অবস্থান করার কারণে মন ও ইন্দ্রিয় তাকে বিভিন্ন বিষয়ের দিকে আকর্ষণ করে। তাই গীতার পথ হলো নিজের প্রকৃত পরিচয়কে স্মরণ করা, মনের গতিকে বোঝা এবং ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণের মধ্যেও অন্তরের সত্যকে হারিয়ে না ফেলা।

এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে মানুষ তার বাহ্যিক জীবনের চেয়ে অনেক বড়। তার জীবনে পরিবর্তন আসবে, সম্পর্ক বদলাবে, দেহ বদলাবে, চিন্তা বদলাবে, সাফল্য ও ব্যর্থতা আসবে এবং চলে যাবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের গভীরতম সত্তাকে অনুসন্ধান করার সুযোগ তার সামনে থাকবে। মমৈবাংশো আমাদের উৎসের কথা মনে করায়। সনাতনঃ আমাদের চিরন্তনতার কথা মনে করায়। মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি আমাদের মানসিক ও ইন্দ্রিয়গত জীবনের কথা মনে করায়। আর কর্ষতি আমাদের সতর্ক করে যে আকর্ষণের শক্তি কত গভীর। এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই গীতা মানুষের পরিচয়, প্রকৃতি, মন, ইন্দ্রিয়, আসক্তি এবং আত্মজাগরণের এক অসাধারণ দর্শনকে সংক্ষেপে ধারণ করেছে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি