ভগবদ্গীতা ১৫.৮ — দেহান্তরে জীবের গমন, মন-ইন্দ্রিয়ের ধারাবাহিকতা ও পুনর্জন্মের তত্ত্ব
শরীরং যদবাপ্নোতি যচ্চাপ্যুৎক্রামতীশ্বরঃ
গৃহীত্বৈতানি সংযাতি বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ।।৮।।
অনুবাদঃ বায়ু যেমন ফুলের গন্ধ নিয়ে অন্যত্র গমন করে, তেমনই এই জড় জগতে দেহের ঈশ্বর জীব এক শরীর থেকে অন্য শরীরে তার জীবনের বিভিন্ন ধারণাগুলি নিয়ে যায়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকটি মানুষের অস্তিত্ব, শরীর, আত্মা এবং মৃত্যুর পর জীবনের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য তুলে ধরে। শ্লোকে বলা হয়েছে, শরীরং যদবাপ্নোতি যচ্চাপ্যুৎক্রামতীশ্বরঃ, গৃহীত্বৈতানি সংযাতি বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ। সহজ অর্থে বলা যায়, জীবসত্তা যখন একটি শরীর লাভ করে এবং যখন সেই শরীর ত্যাগ করে, তখন সে মন ও ইন্দ্রিয়সমূহকে সঙ্গে নিয়ে অন্যত্র গমন করে। যেমন বায়ু কোনো স্থান থেকে গন্ধকে গ্রহণ করে অন্যত্র বহন করে নিয়ে যায়, তেমনি জীবসত্তাও এক দেহ থেকে অন্য দেহে গমনকালে তার সঙ্গে যুক্ত সূক্ষ্ম উপাদানসমূহকে বহন করে নিয়ে যায়। মাত্র দুটি পঙ্ক্তির এই শ্লোকের মধ্যে গীতার আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, পুনর্জন্মতত্ত্ব এবং মানুষের অন্তর্জগত সম্পর্কে এক বিস্ময়কর গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো শরীরং। সংস্কৃত শরীর শব্দের অর্থ দেহ বা শরীর। সাধারণ মানুষের কাছে শরীরই যেন তার সম্পূর্ণ পরিচয়। আমরা বলি আমার শরীর, আমার মুখ, আমার হাত, আমার চোখ। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এই শরীরটি প্রকৃত আত্মপরিচয় নয়। শরীর হলো আত্মার একটি অস্থায়ী আধার। মানুষের শরীর জন্মের সঙ্গে আসে এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। শিশুকালের শরীর, কৈশোরের শরীর এবং পরিণত বয়সের শরীর এক নয়। শরীরের কোষ, আকৃতি, শক্তি এবং ক্ষমতা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। তবুও মানুষের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের একটি ধারাবাহিক অনুভূতি থাকে। গীতা এই ধারাবাহিকতার গভীরে আত্মাকে দেখতে চায়। তাই শরীর এখানে মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়, বরং আত্মার অভিজ্ঞতার একটি সাময়িক ক্ষেত্র।
এরপর এসেছে অবাপ্নোতি শব্দটি। এর মূল ধাতু আপ্, যার অর্থ লাভ করা, অর্জন করা বা প্রাপ্ত হওয়া। অব উপসর্গের সংযোগে অবাপ্নোতি অর্থ দাঁড়ায় লাভ করে বা প্রাপ্ত হয়। শ্লোকের ভাষায় জীবসত্তা শরীরকে নিজের প্রকৃত সত্তা হিসেবে সৃষ্টি করে না, বরং একটি শরীর লাভ করে। এই একটি শব্দের মধ্যেই গীতার দেহতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রকাশিত হয়েছে। শরীর যেন এমন একটি আধার যা জীবসত্তা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহণ করে এবং পরে ত্যাগ করে। এর ফলে শরীরের সঙ্গে আত্মার সম্পর্কটি মালিক এবং ব্যবহারের সম্পর্কের মতো হয়ে ওঠে। শরীর আত্মা নয়। শরীর আত্মার প্রকাশের একটি মাধ্যম।
শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ উৎক্রামতি। এই শব্দটি গঠিত হয়েছে উৎ উপসর্গ এবং ক্রম্ ধাতুর সমন্বয়ে। ক্রম্ ধাতুর অর্থ পদক্ষেপ করা বা অগ্রসর হওয়া এবং উৎ উপসর্গের মধ্যে বাইরে যাওয়া বা পৃথক হওয়ার ভাব রয়েছে। উৎক্রামতি অর্থ তাই বেরিয়ে যায়, অতিক্রম করে বা এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় গমন করে। গীতার ভাষায় মৃত্যুকে শুধুমাত্র শেষ হয়ে যাওয়া বলা হয়নি। বলা হয়েছে উৎক্রমণ। এই শব্দচয়নের মধ্যে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণ দৃষ্টিতে মৃত্যু হলো জীবনের সমাপ্তি। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে মৃত্যু মূলত একটি দেহের সমাপ্তি এবং জীবসত্তার অন্য অবস্থায় গমন। অর্থাৎ যে দেহটি শেষ হয়ে যায় সেটি জীবনের সম্পূর্ণ সমাপ্তি নয়। দেহের পরিবর্তনের মধ্যেও জীবসত্তার একটি ধারাবাহিক যাত্রা রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে আসে ঈশ্বর শব্দটি। ঈশ্বর শব্দের মূল ধাতু ঈশ্, যার অর্থ শাসন করা, অধিকার করা, নিয়ন্ত্রণ করা বা প্রভুত্ব করা। প্রচলিত অর্থে ঈশ্বর বলতে আমরা পরমেশ্বর বা সর্বশক্তিমান সত্তাকে বুঝি। কিন্তু এই শ্লোকে শব্দটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গনির্ভর। এর ঠিক আগের শ্লোকেই বলা হয়েছে যে জীবসত্তা পরম সত্তার সনাতন অংশস্বরূপ। সেই ধারাবাহিকতায় অষ্টম শ্লোকে ঈশ্বর শব্দটি দেহের অধিষ্ঠাতা জীবসত্তাকে বোঝায়। অর্থাৎ যে জীবসত্তা শরীরকে ধারণ করে, ইন্দ্রিয় ও মনকে ব্যবহার করে এবং দেহ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়, তাকে এখানে দেহের অধিষ্ঠাতা হিসেবে দেখা হয়েছে। এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে ঈশ্বর শব্দকে সরাসরি সর্বোচ্চ পরমেশ্বর হিসেবে নিলে শ্লোকটির প্রসঙ্গগত অর্থ অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এরপর এসেছে গৃহীত্বা শব্দটি। এর মূল ধাতু গ্রহ্, যার অর্থ গ্রহণ করা, ধরা বা নিজের সঙ্গে নেওয়া। গৃহীত্বা অর্থ গ্রহণ করে বা সঙ্গে নিয়ে। এই শব্দটি শ্লোকের দর্শনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। জীবসত্তা যখন শরীর ত্যাগ করে তখন সবকিছু যেন সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায় না। সে কিছু উপাদানকে সঙ্গে নিয়ে যায়। কী সেই উপাদান। এর উত্তর আগের শ্লোকেই রয়েছে। সেখানে মনসহ ইন্দ্রিয়সমূহের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ জীবসত্তা দেহ পরিবর্তনের সময় মন এবং ইন্দ্রিয়গত সূক্ষ্ম উপাদানকে সঙ্গে নিয়ে অগ্রসর হয়। গীতার এই ধারণার সঙ্গে কর্ম, বাসনা এবং সংস্কারের ধারাবাহিকতা গভীরভাবে যুক্ত।
এখানে এতানি শব্দটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ এইগুলি। কিন্তু এইগুলি বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা আগের শ্লোকের সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে হয়। সেখানে মন এবং পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের কথা বলা হয়েছে। ফলে এখানে এতানি বলতে সেই মন ও ইন্দ্রিয়সমূহকেই বোঝানো হয়েছে। এর মাধ্যমে গীতা মানুষের অস্তিত্বকে শুধু দৃশ্যমান দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না। দেহের পাশাপাশি একটি সূক্ষ্ম মানসিক ও ইন্দ্রিয়গত স্তরের কথাও বলা হচ্ছে। মানুষ কেবল তার হাড়, মাংস, রক্ত এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নয়। তার চিন্তা, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, অভ্যাস এবং প্রবণতাও তার অস্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংযাতি শব্দটি এসেছে যা ধাতু থেকে। যা ধাতুর অর্থ যাওয়া বা গমন করা। সম্ উপসর্গের সংযোগে সংযাতি অর্থ গমন করে বা অগ্রসর হয়। এই শব্দের মাধ্যমে জীবসত্তার গতিশীল প্রকৃতি প্রকাশ পেয়েছে। জীবন এখানে স্থির কোনো বস্তু নয়। জীবসত্তা একটি অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় অগ্রসর হচ্ছে। জন্ম থেকে মৃত্যু এবং মৃত্যু থেকে পুনরায় জন্মের ধারায় তার যাত্রা চলছে। গীতার পুনর্জন্মতত্ত্বকে বোঝার ক্ষেত্রে এই গমন বা যাত্রার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর আসে শ্লোকটির সবচেয়ে সুন্দর উপমা। বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ। এখানে বায়ু শব্দটি এসেছে বা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে প্রবাহিত হওয়া বা বয়ে যাওয়ার ভাব রয়েছে। বায়ু যেমন নিজে দৃশ্যমান নয়, তেমনি তার বহন করা গন্ধও দৃশ্যমান নয়। কিন্তু গন্ধের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। কোনো ফুল চোখের সামনে না থাকলেও তার সুগন্ধ বাতাসের মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনাকে গীতা একটি অসাধারণ আধ্যাত্মিক উপমায় রূপান্তর করেছে।
গন্ধ শব্দটি এখানে শুধু সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ বোঝায় না। গন্ধ হলো এমন একটি বিষয় যা দেখা যায় না, কিন্তু তার প্রভাব অনুভব করা যায়। বায়ু তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। ঠিক তেমনি জীবসত্তার সঙ্গে যুক্ত মন, ইন্দ্রিয় এবং সূক্ষ্ম প্রবণতাগুলিও দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তাদের প্রভাব জীবনের মধ্যে প্রকাশ পায়। এই কারণেই বায়ু এবং গন্ধের উপমাটি এত গভীর। আত্মার গমন চোখে দেখা যায় না। কিন্তু গীতার দর্শন বলে, দেহের পরিবর্তনের মধ্যেও জীবসত্তার একটি সূক্ষ্ম ধারাবাহিকতা রয়েছে।
আশয় শব্দের অর্থ আধার, অবস্থানস্থল, আশ্রয় বা সংরক্ষণস্থল। আশয়াত্ অর্থ সেই আধার থেকে। এখানে বায়ু যেন কোনো স্থানে থাকা গন্ধকে গ্রহণ করে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্যমান উদাহরণের মাধ্যমে গীতা একটি অদৃশ্য আধ্যাত্মিক সত্যকে বোঝাচ্ছে। মানুষের ভেতরের প্রবণতা, সংস্কার, অভ্যাস এবং আকাঙ্ক্ষাও অনেকটা গন্ধের মতো। এগুলোকে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এগুলোর প্রভাব আচরণে প্রকাশিত হয়। মানুষ কেন একই পরিস্থিতিতে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, কেন কারও মধ্যে কোনো বিশেষ প্রবণতা সহজে প্রকাশ পায় এবং কেন মানুষের চরিত্র দীর্ঘদিনের অভ্যাস দ্বারা গঠিত হয়, এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে ভারতীয় দর্শনের সংস্কার ধারণার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর দার্শনিক বক্তব্য হলো মানুষ তার শরীরের চেয়ে বড় কিছু। শরীর পরিবর্তিত হয়, কিন্তু আত্মসত্তার প্রশ্নটি শরীরের পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ যদি নিজেকে কেবল শরীর হিসেবে দেখে তাহলে জন্ম তার শুরু এবং মৃত্যু তার শেষ বলে মনে হয়। কিন্তু আত্মাকে যদি অস্তিত্বের গভীরতর ভিত্তি হিসেবে দেখা হয় তাহলে জন্ম ও মৃত্যু হয়ে ওঠে একটি বৃহত্তর যাত্রার দুটি পর্যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মৃত্যুভয়কে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। মৃত্যু তখন সম্পূর্ণ বিনাশের প্রতীক নয়, বরং একটি দেহ থেকে অন্য অবস্থায় গমনের প্রতীক।
এই শ্লোকের সঙ্গে কর্ম ও সংস্কারের ধারণারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের প্রতিটি কর্ম তার মানসিক জগতে একটি ছাপ তৈরি করে। বারবার করা কর্ম অভ্যাসে পরিণত হয়। অভ্যাস চরিত্রকে গঠন করে এবং চরিত্র ভবিষ্যৎ কর্মকে প্রভাবিত করে। এইভাবে মানুষের জীবন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলে। গীতার পুনর্জন্মতত্ত্বে এই ধারাবাহিকতাই আরও বৃহৎ মাত্রা লাভ করে। জীবসত্তা দেহ পরিবর্তন করলেও তার সঙ্গে যুক্ত সূক্ষ্ম প্রবণতা ও কর্মসংস্কারের ধারাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয় না। বায়ু যেমন গন্ধকে বহন করে নিয়ে যায়, তেমনি জীবনের অদৃশ্য ছাপগুলোও অস্তিত্বের ধারায় একটি ভূমিকা রাখে।
এই শ্লোককে আধুনিক মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও একটি প্রতীকী অর্থে পড়া যায়। অবশ্যই গীতার পুনর্জন্মতত্ত্বকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা উচিত নয়। তবে মানুষের অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা বোঝার ক্ষেত্রে একটি তুলনা করা যায়। মানুষ তার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে স্মৃতি অর্জন করে। স্মৃতি থেকে প্রবণতা তৈরি হয়। প্রবণতা থেকে অভ্যাস জন্মায়। অভ্যাস থেকে চরিত্র গড়ে ওঠে। এই চরিত্র আবার ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ মানুষের দৃশ্যমান আচরণের পেছনে অদৃশ্য মানসিক উপাদান কাজ করে। গীতার বায়ু ও গন্ধের উপমা এই অদৃশ্য প্রভাবের ধারণাকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করে।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অনন্য। একটি জটিল অধিবিদ্যাগত ধারণাকে বোঝানোর জন্য গীতা প্রকৃতির একটি সহজ দৃশ্য ব্যবহার করেছে। বায়ু দেখা যায় না। গন্ধও দেখা যায় না। অথচ বায়ুর উপস্থিতি আমরা গন্ধের মাধ্যমে অনুভব করতে পারি। এই দৃশ্যমান পৃথিবীর অভিজ্ঞতা থেকে অদৃশ্য আত্মার যাত্রাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে দার্শনিক বক্তব্যটি কঠিন তত্ত্ব হয়ে না থেকে পাঠকের অনুভবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এটাই গীতার কাব্যিক শক্তি।
মানবজীবনের জন্য এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো নিজের পরিচয় সম্পর্কে নতুন করে ভাবা। আমরা সাধারণত বলি আমি একজন ছাত্র, আমি একজন কর্মী, আমি একজন পিতা, আমি একজন সন্তান, আমি এই শরীর, আমি এই নাম বা এই সামাজিক পরিচয়। কিন্তু এগুলো সবই পরিবর্তনশীল পরিচয়। গীতা মানুষকে আরও গভীরে তাকাতে বলে। যে সত্তা এই পরিচয়গুলোর পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করছে, সেই সত্তা কে। যে শরীর শৈশব থেকে বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে, সেই পরিবর্তনের মধ্যে যে আমি নিজেকে একই ব্যক্তি হিসেবে অনুভব করছি, সেই আমি কে। এই প্রশ্ন থেকেই আত্মঅনুসন্ধানের সূচনা হয়।
শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো আসক্তির প্রকৃতি বোঝা। শরীর অস্থায়ী জেনেও মানুষ শরীরকেন্দ্রিক অহংকারে আবদ্ধ থাকে। সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য, সামাজিক মর্যাদা এবং বাহ্যিক পরিচয়কে স্থায়ী মনে করে। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এগুলো সবই পরিবর্তনশীল। যে দেহ আজ নিজের বলে মনে হচ্ছে, একদিন সেটিই পরিত্যক্ত হবে। তাই জ্ঞানী ব্যক্তি শরীরের যত্ন নেন, কিন্তু শরীরকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করেন না।
সবশেষে বলা যায়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোক মানুষের অস্তিত্বকে একটি গভীর যাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করে। শরীর হলো একটি অস্থায়ী আধার। জীবসত্তা হলো তার অধিষ্ঠাতা। মন ও ইন্দ্রিয় তার অভিজ্ঞতার সূক্ষ্ম উপকরণ। দেহান্তর হলো সেই যাত্রার একটি পর্যায়। আর বায়ু ও গন্ধের উপমা সেই অদৃশ্য যাত্রাকে আমাদের চোখের সামনে অনুভবযোগ্য করে তোলে। এই শ্লোক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দৃশ্যমান শরীরের পরিবর্তনের পেছনে একটি গভীরতর অস্তিত্বের প্রশ্ন রয়েছে। মানুষ কে, তার প্রকৃত পরিচয় কোথায় এবং জীবনের ধারাবাহিকতা কীভাবে বোঝা যায়, এই প্রশ্নগুলোর দিকে শ্লোকটি আমাদের নিয়ে যায়। তাই এটি কেবল পুনর্জন্মের একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়। এটি মানুষের আত্মপরিচয় সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক আহ্বান। শরীর বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, পরিচয় বদলায়, কিন্তু আত্মস্বরূপের অনুসন্ধান মানুষকে বাহ্যিক পরিবর্তনের ওপারে নিয়ে যেতে পারে। বায়ু যেমন অদৃশ্য হয়েও গন্ধকে বহন করে, তেমনি জীবনের গভীরতম সত্যও সবসময় চোখে দেখা যায় না। তাকে উপলব্ধি করতে হয় অন্তর্দৃষ্টি, আত্মজিজ্ঞাসা এবং জ্ঞানের মাধ্যমে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!