সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৬.১ — দৈবী গুণাবলি, অভয়, আত্মশুদ্ধি ও জ্ঞাননিষ্ঠ জীবনের আধ্যাত্মিক পথ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
 শ্রীভগবানুবাচঅভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্।…
 শ্রীভগবানুবাচ
অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।
দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্।।১।।

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন-হে ভারত! ভয়শূন্যতা, সত্তার পবিত্রতা, পারমার্থিক জ্ঞানের অনুশীলন, দান, আত্মসংযম, যজ্ঞ অনুষ্ঠান, বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়ন, তপশ্চর্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্যবাদিতা, ক্রোধশূন্যতা, বৈরাগ্য, শান্তি, অন্যের দোষ দর্শন না করা, সমস্ত জীবে দয়া, লোভহীনতা, মৃদুতা, লজ্জা, অপচলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, শৌচ, মাৎসর্য শূন্যতা, অভিমান শূন্যতা- এই সমস্ত গুণগুলি দিব্যভাব সমন্বিত ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়।

ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান দৈবী গুণাবলির একটি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিচয় দিয়েছেন। শ্লোকটি হলো অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্। এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে মানুষের চরিত্র গঠন, আত্মশুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা, ইন্দ্রিয়সংযম, পরোপকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সত্যনিষ্ঠ জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন নিহিত রয়েছে। এটি কেবল ধর্মীয় আচরণের একটি তালিকা নয়, বরং মানুষের অন্তরকে অশান্তি, ভয়, লোভ, অহংকার ও কপটতা থেকে মুক্ত করে সত্য, জ্ঞান ও কল্যাণের পথে নিয়ে যাওয়ার একটি আধ্যাত্মিক নির্দেশনা।

শ্লোকটির প্রথম শব্দ অভয়ং। অভয় শব্দটি অভয় এই গঠন থেকে এসেছে। এখানে অ অর্থ অনুপস্থিতি এবং ভয় অর্থ ভীতি বা আশঙ্কা। তাই অভয় শব্দের আক্ষরিক অর্থ ভয়হীনতা। তবে গীতার অভয় কেবল বাহ্যিক বিপদের সামনে সাহসী হওয়াকে বোঝায় না। এর গভীর অর্থ হলো সত্য ও ধর্মের পথে প্রতিষ্ঠিত এমন একটি অন্তর, যা অন্যায়ের ভয়ে সত্যকে ত্যাগ করে না এবং জীবনের অনিত্যতার কারণে নিজের আত্মিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে না। মানুষের জীবনে ভয়ের অসংখ্য রূপ রয়েছে। সম্পদ হারানোর ভয়, সম্মান হারানোর ভয়, ব্যর্থতার ভয়, প্রিয়জনকে হারানোর ভয় এবং সর্বোপরি মৃত্যুর ভয় মানুষের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করে। আত্মজ্ঞান যখন গভীর হয়, তখন মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তার অস্তিত্ব কেবল ক্ষণস্থায়ী দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই প্রকৃত অভয়ের জন্ম হয়।

এরপর এসেছে সত্ত্বসংশুদ্ধিঃ। সত্ত্ব অর্থ অস্তিত্ব, অন্তঃপ্রকৃতি এবং মানসিক স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধারণা। সংশুদ্ধি অর্থ সম্পূর্ণ পরিশুদ্ধি বা নির্মলতা। তাই সত্ত্বসংশুদ্ধি বলতে অন্তরের নির্মলতাকে বোঝায়। বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা মানুষের চরিত্রের প্রকৃত পরিচয় নয়। একজন মানুষ বাইরে অত্যন্ত সুন্দর আচরণ করলেও তার অন্তরে যদি হিংসা, লোভ, প্রতারণা ও অহংকার থাকে, তাহলে তার অন্তর প্রকৃত অর্থে নির্মল নয়। সত্ত্বসংশুদ্ধি হলো এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষের চিন্তা, উদ্দেশ্য, আকাঙ্ক্ষা এবং আচরণের মধ্যে পবিত্রতা আসে। এটিকে একটি স্বচ্ছ আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। ময়লা আয়নায় যেমন নিজের মুখ স্পষ্ট দেখা যায় না, তেমনি কামনা, ক্রোধ, লোভ ও অহংকারে আচ্ছন্ন মনে আত্মসত্যও পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয় না। তাই আত্মজ্ঞান লাভের জন্য অন্তরের শুদ্ধি অপরিহার্য।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ। এই শব্দের মধ্যে জ্ঞান, যোগ এবং ব্যবস্থিতি এই তিনটি ভাব নিহিত রয়েছে। জ্ঞান কেবল তথ্য জানা নয়। গীতার জ্ঞান হলো নিজের প্রকৃতি, আত্মা, কর্ম, জগৎ এবং পরম সত্য সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি। যোগ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা সংযুক্ত হওয়ার ধারণা রয়েছে। মানুষের মন, বুদ্ধি, ইচ্ছা এবং কর্ম যখন পরস্পরের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন জীবনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। জ্ঞান মানুষকে সত্যকে চিনতে সাহায্য করে এবং যোগ সেই জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে। ব্যবস্থিতি অর্থ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা। তাই জ্ঞানযোগব্যবস্থিতি বলতে বোঝায় জ্ঞান ও যোগের সত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা। কেবল শাস্ত্র পড়ে জ্ঞান অর্জন করাই যথেষ্ট নয়। সেই জ্ঞান যদি মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও চরিত্রে প্রকাশ না পায়, তাহলে তা এখনও জীবনের গভীরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এরপর এসেছে দানং। দান শব্দের মূল ভাব হলো দেওয়া। কিন্তু গীতার দান কেবল অর্থসম্পদ অন্যকে দিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের অর্থ, সময়, জ্ঞান, শ্রম, সামর্থ্য, সহানুভূতি এবং ভালোবাসার একটি অংশ অন্যের কল্যাণে উৎসর্গ করাও দানের অন্তর্ভুক্ত। দানের মাধ্যমে মানুষের স্বার্থকেন্দ্রিকতা ধীরে ধীরে কমে আসে। লোভ বলে যা কিছু আছে সবই আমার জন্য, আর দান বলে আমার কাছে যা আছে তার একটি অংশ অন্যের কল্যাণেও ব্যবহার হতে পারে। এই পরিবর্তন মানুষের হৃদয়কে প্রসারিত করে। তাই দান কেবল একজন দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করার কাজ নয়, এটি নিজের সংকীর্ণ অহংবোধকে অতিক্রম করার একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন।

এরপর এসেছে দমশ্চ। দম শব্দের অর্থ সংযম বা নিয়ন্ত্রণ। গীতার প্রেক্ষাপটে এটি প্রধানত ইন্দ্রিয়সংযমকে বোঝায়। মানুষের চোখ দেখতে চায়, কান শুনতে চায়, জিহ্বা স্বাদ গ্রহণ করতে চায় এবং মন অসংখ্য বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মানুষ যদি প্রতিটি ইচ্ছার পেছনে অন্ধভাবে ছুটতে থাকে, তাহলে সে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রক থাকে না। বরং তার ইন্দ্রিয় ও আকাঙ্ক্ষাই তাকে পরিচালনা করতে শুরু করে। দম হলো সেই ক্ষমতা যার মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রবৃত্তিকে ধ্বংস না করে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে শেখে। একটি রথের ঘোড়াকে যেমন লাগাম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তেমনি দম মানুষের ইন্দ্রিয়শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল রাখে।

যজ্ঞশ্চ শব্দের মধ্যে যজ্ঞের ধারণা রয়েছে। যজ্ঞ শব্দের মূল অর্থ পূজা, সম্মান এবং উৎসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রচলিত অর্থে যজ্ঞ বলতে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করার বৈদিক অনুষ্ঠান বোঝানো হলেও গীতার দর্শনে যজ্ঞের অর্থ অনেক বিস্তৃত। নিজের কর্ম, শ্রম, জ্ঞান, সম্পদ এবং সামর্থ্যকে বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা যজ্ঞভাবের প্রকাশ। একজন শিক্ষক যখন নিজের জ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থীর জীবন গড়ে দেন, একজন চিকিৎসক যখন মানুষের সেবায় নিজের দক্ষতা ব্যবহার করেন এবং একজন মানুষ যখন সমাজের কল্যাণে নিজের সময় ও শ্রম দেন, তখন তাদের কর্মের মধ্যে যজ্ঞের চেতনা প্রকাশ পায়। যজ্ঞ মানুষের জীবনকে কেবল ভোগের কেন্দ্র থেকে সেবার কেন্দ্রে নিয়ে যায়।

এরপর এসেছে স্বাধ্যায়ঃ। স্বাধ্যায় শব্দের মধ্যে স্ব এবং অধ্যয়নের ভাব রয়েছে। স্ব অর্থ নিজের এবং অধ্যয়ন অর্থ জ্ঞানচর্চা বা পাঠ। প্রচলিত অর্থে স্বাধ্যায় বলতে পবিত্র শাস্ত্র ও জ্ঞানগ্রন্থ অধ্যয়ন বোঝানো হয়। কিন্তু এর একটি আরও গভীর অর্থ হলো নিজেকেও অধ্যয়ন করা। মানুষ শুধু গ্রন্থ পড়বে না, সেই জ্ঞানের আলোয় নিজের চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, দুর্বলতা, অভ্যাস ও আচরণকেও পর্যবেক্ষণ করবে। এই অর্থে স্বাধ্যায় হলো গ্রন্থের পাশাপাশি নিজের জীবনকে পড়া। একজন মানুষ যখন নিজের ক্রোধকে লক্ষ্য করেন, নিজের লোভকে বুঝতে চেষ্টা করেন এবং নিজের ভুলের কারণ অনুসন্ধান করেন, তখন তিনিও এক ধরনের স্বাধ্যায়ের মধ্যে প্রবেশ করেন।

এরপর এসেছে তপ। তপ শব্দের মূল ভাব উত্তাপ বা তাপের সঙ্গে যুক্ত। আগুন যেমন ধাতুর অশুদ্ধি দূর করতে পারে, তেমনি তপস্যা মানুষের চরিত্রের অশুদ্ধতা দূর করতে পারে। তপস্যা মানে কেবল শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয়। এর গভীর অর্থ হলো আত্মশাসন, শৃঙ্খলা, সংযম এবং উচ্চতর উদ্দেশ্যের জন্য নিম্নতর প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। যে মানুষ নিজের আরামের সীমা অতিক্রম করে সত্য, জ্ঞান ও কল্যাণের জন্য নিয়মিত সাধনা করেন, তার জীবনে তপস্যার প্রকাশ ঘটে। তবে কোনো কষ্ট যদি অহংকার বাড়ায় বা অন্যের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে, তাহলে সেটি প্রকৃত তপস্যা নয়। তপস্যার উদ্দেশ্য হলো পরিশুদ্ধি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ।

শ্লোকটির শেষ শব্দ আর্জবম্। এই শব্দের মধ্যে ঋজু বা সোজা থাকার ধারণা নিহিত রয়েছে। আর্জব অর্থ সরলতা, অকপটতা এবং কপটতাহীনতা। মানুষের চিন্তা, কথা এবং কাজের মধ্যে যখন সামঞ্জস্য থাকে, তখন আর্জব প্রকাশ পায়। মানুষ মনে এক কথা ভাববে, মুখে অন্য কথা বলবে এবং কাজে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু করবে, তাহলে তার মধ্যে কপটতা রয়েছে। কিন্তু যে ব্যক্তি অন্তরে যা সত্য বলে জানেন, কথায় তা প্রকাশ করেন এবং কর্মেও তার প্রতিফলন ঘটান, তিনি আর্জবের পথে প্রতিষ্ঠিত। এই কারণে আর্জব কেবল সরল স্বভাব নয়, এটি চরিত্রের গভীর সত্যনিষ্ঠা।

এই নয়টি গুণকে একসঙ্গে দেখলে শ্লোকটির প্রকৃত সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভয় মানুষকে ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করে। সত্ত্বসংশুদ্ধি অন্তরকে নির্মল করে। জ্ঞানযোগব্যবস্থিতি মানুষকে সত্যজ্ঞান ও যোগের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে। দান হৃদয়কে প্রসারিত করে। দম ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে। যজ্ঞ কর্মকে উৎসর্গে রূপান্তরিত করে। স্বাধ্যায় জ্ঞান ও আত্মপর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি করে। তপস্যা চরিত্রকে দৃঢ় ও শৃঙ্খলিত করে। আর আর্জব মানুষকে অন্তর, বাক্য ও কর্মের মধ্যে সত্যনিষ্ঠ সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের আত্মবিকাশের একটি পূর্ণাঙ্গ পথ নির্দেশ করে। অদ্বৈত ভাবনার দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ আত্মা এবং অজ্ঞানের কারণে মানুষ নিজেকে দেহ ও অহংকারের সঙ্গে এক করে দেখে। অন্তরের শুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা এবং আত্মসংযম সেই অজ্ঞানের আবরণ দূর করতে সাহায্য করে। যোগের দৃষ্টিতে মনকে বিক্ষিপ্ততা থেকে সরিয়ে স্থির ও নিয়ন্ত্রিত করা প্রয়োজন। ভক্তির দৃষ্টিতে দান, যজ্ঞ, স্বাধ্যায় এবং তপস্যা সবই ঈশ্বরমুখী জীবনের প্রকাশ হতে পারে। অর্থাৎ দর্শনের বিভিন্ন পথ থেকে দেখলেও এই গুণগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে সত্য ও বৃহত্তর কল্যাণের দিকে মানুষের অগ্রসর হওয়া।

আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষাগুলোর গুরুত্ব অসীম। বর্তমান সময়ে মানুষ নানা ধরনের ভয়, প্রতিযোগিতা, ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং মানসিক অস্থিরতার মধ্যে বসবাস করে। দম আমাদের তাৎক্ষণিক আকাঙ্ক্ষার দাস না হতে শেখায়। স্বাধ্যায় আমাদের নিজের মানসিক অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখায়। দান আমাদের অন্যের দুঃখের প্রতি সংবেদনশীল করে। তপ আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের জন্য নিয়মিত পরিশ্রম করতে শেখায়। আর্জব আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। আর অভয় আমাদের সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।

এই শ্লোককে মানুষের অন্তর্জগতের একটি প্রতীকী যাত্রা হিসেবেও দেখা যায়। ভয় হলো অন্তরের অন্ধকার, সত্ত্বসংশুদ্ধি হলো সেই অন্ধকারের মধ্যে স্বচ্ছতার জন্ম, জ্ঞান হলো আলোর আবির্ভাব, যোগ হলো বিচ্ছিন্নতার অবসান, দান হলো হৃদয়ের প্রসার, দম হলো শক্তির সঠিক নিয়ন্ত্রণ, যজ্ঞ হলো নিজের কর্মকে বৃহত্তর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা, স্বাধ্যায় হলো নিজের দিকে ফিরে তাকানো, তপ হলো অন্তরের পরিশোধনের আগুন এবং আর্জব হলো সত্যের সরল পথে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এইভাবে শ্লোকটি বাহ্যিক ধর্মাচরণের চেয়ে মানুষের অন্তরের রূপান্তরকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

একজন মানুষকে যদি এই শিক্ষার আলোকে বিচার করা হয়, তাহলে তার সম্পদ, পদমর্যাদা বা বাহ্যিক সাফল্যই তার প্রকৃত পরিচয় হয়ে ওঠে না। বরং সে কতটা ভয়হীন, কতটা নির্মল, কতটা জ্ঞাননিষ্ঠ, কতটা দানশীল, কতটা সংযমী, কতটা আত্মনিবেদিত, কতটা আত্মসচেতন, কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং কতটা অকপট, তার মধ্যেই তার প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ পায়। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা আজও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ এবং আত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

সবশেষে বলা যায়, অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্ এই শ্লোকটি মানুষের চরিত্র নির্মাণের এক গভীর দর্শন। এখানে ভয় থেকে অভয়ের দিকে, অশুদ্ধতা থেকে নির্মলতার দিকে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে, ভোগ থেকে সংযমের দিকে, স্বার্থ থেকে দানের দিকে, সাধারণ কর্ম থেকে উৎসর্গের দিকে, বাহ্যিক জ্ঞান থেকে আত্মজ্ঞানচর্চার দিকে, দুর্বলতা থেকে তপস্যার দিকে এবং কপটতা থেকে সরল সত্যনিষ্ঠার দিকে মানুষের অন্তর্জাগরণের পথ দেখানো হয়েছে। তাই এই শ্লোকের প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষের মহত্ত্ব বাইরে নয়, তার অন্তরে। যে মানুষ নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করে, ইন্দ্রিয়কে সংযত করে, জ্ঞানকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে, অন্যের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে এবং চিন্তা, কথা ও কাজে সত্যনিষ্ঠ থাকে, সেই মানুষই প্রকৃত অর্থে দৈবী সম্পদের অধিকারী।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি