ভগবদ্গীতা ১৬.১০ — অতৃপ্ত কামনা, দম্ভ, অহংকার, মোহ ও আসুরী জীবনের অবক্ষয়
কামমাশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভানমদান্বিতাঃ।
মোহাদ্ গৃহীত্বাসদগ্রাহান্ প্রবর্তন্তেহশুচিব্রতাঃ।।১০।।
অনুবাদঃ সেই আসুরিক ব্যক্তিগণ দুষ্পরণীয় কামকে আশ্রয় করে দম্ভ, মান ও মদমত্ত হয়ে অশুচি কার্যে ব্রতী হয় এবং মোহবশত অসৎ বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়।
ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের দশম শ্লোক মানবমনের এক গভীর ও সূক্ষ্ম অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমন মানুষের মানসিকতা বিশ্লেষণ করেছেন, যে অসীম কামনা ও ভোগলালসাকে জীবনের ভিত্তি করে নিয়েছে এবং সেই কামনার প্রভাবে ধীরে ধীরে দম্ভ, অহংকার, গর্ব, মোহ ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। শ্লোকটি হলো কামমাশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভমানমদান্বিতাঃ মোহাদ্ গৃহীত্বাসদগ্রাহান্ প্রবর্তন্তেহশুচিব্রতাঃ। এর সহজ অর্থ হলো যারা কখনো পূর্ণ হয় না এমন কামনাকে আশ্রয় করে, যারা দম্ভ, অহংকার ও গর্বে পরিপূর্ণ, যারা মোহবশত অসত্য ধারণাকে গ্রহণ করে এবং সেই ভ্রান্ত ধারণার দ্বারা পরিচালিত হয়ে অপবিত্র আচরণে প্রবৃত্ত হয়, তারা নিজেদের পতনের পথ নিজেরাই নির্মাণ করে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো কামমাশ্রিত্য। কাম শব্দটি সংস্কৃত কম্ ধাতু থেকে উৎপন্ন এবং এর মূল অর্থ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, বাসনা বা ভোগের আকুলতা। সাধারণ অর্থে কামনা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তি। মানুষ কোনো কিছু অর্জন করতে চায়, কোনো আনন্দ লাভ করতে চায়, কোনো অভাব পূরণ করতে চায়। তাই কামনা নিজে সবসময় নেতিবাচক নয়। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে কাম বলতে এমন এক অতৃপ্ত বাসনাকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের বিবেক ও আত্মসংযমের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আশ্রিত্য শব্দটি আ এবং শ্রি ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ আশ্রয় করে, অবলম্বন করে বা নির্ভর করে। ফলে কামমাশ্রিত্য বলতে বোঝায় কামনাকে আশ্রয় করে জীবন পরিচালনা করা। অর্থাৎ ব্যক্তি যখন সত্য, কর্তব্য, নৈতিকতা ও আত্মজ্ঞানকে জীবনের ভিত্তি না করে নিজের আকাঙ্ক্ষা ও ভোগলালসাকেই জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলে, তখন কামনা তার জীবনের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
এর পরেই এসেছে দুষ্পূরং শব্দটি। দুঃ এবং পূর ভাবের সমন্বয়ে গঠিত এই শব্দের অর্থ এমন কিছু যা পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন অথবা সহজে পরিতৃপ্ত হয় না। কামনার প্রকৃতি বোঝাতে এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের একটি ইচ্ছা পূরণ হলে অনেক সময় তার পরিবর্তে আরও একটি ইচ্ছা জন্ম নেয়। একটি সম্পদ অর্জনের পর আরও সম্পদের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। একটি সাফল্যের পর আরও বড় সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা জাগে। একটি ভোগের পর আরও নতুন ভোগের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। ফলে বাহ্যিক অর্জন বাড়লেও অন্তরের তৃষ্ণা শেষ হয় না। এই কারণেই কামকে দুষ্পূর বলা হয়েছে। কামনার সমস্যা কেবল তার পরিমাণে নয়, তার অন্তহীন প্রকৃতিতে। মানুষ যদি মনে করে যে আরও কিছু পেলে সে সম্পূর্ণ তৃপ্ত হবে, তাহলে সে ক্রমাগত ভবিষ্যতের কোনো একটি অর্জনের দিকে ছুটতে থাকে। কিন্তু সেই অর্জন যখন এসে যায়, তখনও তার অন্তরের শূন্যতা সম্পূর্ণভাবে দূর হয় না।
এই ভাবটি বোঝাতে একটি সহজ উপমা দেওয়া যায়। আগুনে কাঠ দিলে আগুন যেমন নিভে যায় না বরং আরও জ্বলে ওঠে, তেমনি অসংযত ভোগের মাধ্যমে কামনা অনেক সময় কমে না বরং আরও বৃদ্ধি পায়। মানুষের বাহ্যিক সম্পদ যত বাড়তে থাকে, তার আকাঙ্ক্ষাও তত বিস্তৃত হতে পারে। তাই গীতার দৃষ্টিতে কামনার প্রকৃত সমাধান কেবল কাম্য বস্তু অর্জনের মধ্যে নেই। আত্মসংযম, বিবেক, কর্তব্যবোধ এবং আত্মজ্ঞান ছাড়া কামনার অন্তহীন প্রবাহ মানুষকে শান্তি দিতে পারে না।
এরপর শ্লোকে এসেছে দম্ভ, মান এবং মদ। এই তিনটি শব্দ মানুষের অহংকেন্দ্রিক মানসিকতার তিনটি ভিন্ন প্রকাশকে নির্দেশ করে। দম্ভ হলো নিজেকে প্রকৃত অবস্থার চেয়ে বড় করে দেখানোর প্রবণতা। বাহ্যিকভাবে নিজেকে ধার্মিক, জ্ঞানী, ক্ষমতাবান, নীতিবান অথবা সফল হিসেবে উপস্থাপন করা কিন্তু অন্তরে তার বিপরীত হওয়া দম্ভের একটি রূপ। দম্ভের মধ্যে সত্যের চেয়ে প্রদর্শনের গুরুত্ব বেশি। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত অবস্থাকে গ্রহণ করতে পারে না, তখন সে নিজের একটি কৃত্রিম পরিচয় তৈরি করে এবং সেই পরিচয় অন্যদের সামনে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
মান শব্দটি আত্মগরিমা ও নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারণার সঙ্গে যুক্ত। নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সুস্থ সচেতনতা এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অহংকার এক বিষয় নয়। সুস্থ আত্মসম্মান মানুষকে দৃঢ় করে, কিন্তু অতিরিক্ত মান মানুষকে অন্যকে তুচ্ছ করতে শেখায়। তখন ব্যক্তি নিজের মতামতকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করতে শুরু করে। অন্যের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা অধিকার তার কাছে গুরুত্ব হারায়।
মদ শব্দের আক্ষরিক অর্থের সঙ্গে নেশার ধারণা যুক্ত। গীতার এই প্রসঙ্গে মদ বলতে ক্ষমতা, অর্থ, জ্ঞান, সৌন্দর্য, বংশ, পদমর্যাদা বা সাফল্যের গর্ব বোঝানো যায়। মদের মতোই অহংকার মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে। একজন মানুষ যখন নিজের সম্পদ বা ক্ষমতার দ্বারা অভিভূত হয়ে পড়ে, তখন সে নিজের সীমাবদ্ধতা দেখতে পায় না। সে মনে করতে পারে যে তার ইচ্ছাই আইন এবং তার ক্ষমতাই সত্যের প্রমাণ। এই কারণেই দম্ভ, মান ও মদ একসঙ্গে মানুষের নৈতিক পতনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো মোহ। সংস্কৃত মুহ্ ধাতুর সঙ্গে মোহের সম্পর্ক রয়েছে এবং এর মধ্যে বিভ্রান্তি, অজ্ঞতা ও বাস্তব সত্য সম্পর্কে ভুল ধারণার ভাব নিহিত। মোহ এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ সত্যকে সত্য হিসেবে এবং অসত্যকে অসত্য হিসেবে দেখতে পারে না। কামনা যখন অতিরিক্ত প্রবল হয়, তখন মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষাকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করার জন্য যুক্তি তৈরি করতে শুরু করে। তখন তার বিচারবুদ্ধি কামনার অধীন হয়ে পড়ে। এই অবস্থাই মোহের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
শ্লোকে বলা হয়েছে মোহাদ্ গৃহীত্বাসদগ্রাহান্। অসদগ্রাহ শব্দটি অসৎ এবং গ্রাহ ভাবের সঙ্গে যুক্ত। অসৎ অর্থ সত্য নয় এমন কিছু, আর গ্রাহ অর্থ গ্রহণ করা বা আঁকড়ে ধরা। ফলে অসদগ্রাহ বলতে মিথ্যা বা ভ্রান্ত ধারণাকে সত্য বলে গ্রহণ করা এবং তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকা বোঝায়। এখানে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ অনেক সময় সত্যের কারণে নয়, নিজের আকাঙ্ক্ষার কারণে কোনো বিশ্বাস গ্রহণ করে। প্রথমে সে কিছু চায়, তারপর সেই চাওয়াকে ন্যায্য প্রমাণ করার জন্য একটি মতবাদ তৈরি করে এবং শেষে সেই মতবাদকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। অর্থাৎ কামনা থেকে মোহ, মোহ থেকে ভ্রান্ত ধারণা এবং ভ্রান্ত ধারণা থেকে অনৈতিক আচরণের জন্ম হয়।
এই পর্যায়ে শ্লোকের শেষ অংশ প্রবর্তন্তেহশুচিব্রতাঃ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রবর্তন্তে অর্থ প্রবৃত্ত হয় বা কোনো কাজে এগিয়ে যায়। অশুচি অর্থ অপবিত্র এবং ব্রত শব্দের মধ্যে আচরণ, সংকল্প বা জীবনপদ্ধতির ভাব রয়েছে। ফলে অশুচিব্রতাঃ বলতে অপবিত্র আচরণে অভ্যস্ত অথবা অনৈতিক জীবনপদ্ধতিতে প্রবৃত্ত মানুষকে বোঝানো হয়েছে। এখানে পাপ বা অনৈতিকতা হঠাৎ জন্ম নেয় না। তার পেছনে একটি দীর্ঘ মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে। প্রথমে অসংযত কামনা জন্মায়, তারপর কামনা পূরণের জন্য অহংকার ও দম্ভ তাকে শক্তিশালী করে, এরপর মোহ সত্যকে আড়াল করে এবং মানুষ ভ্রান্ত ধারণাকে গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত সেই ভ্রান্ত ধারণা আচরণে প্রকাশিত হয়।
এই শ্লোককে তাই মানুষের নৈতিক পতনের একটি ধারাবাহিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হিসেবেও দেখা যায়। কামনা যখন সংযত নয়, তখন তা তৃষ্ণায় পরিণত হয়। তৃষ্ণা যখন তীব্র হয়, তখন মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি কৃত্রিম জগত তৈরি করে। সেই জগতকে রক্ষা করার জন্য দম্ভ ও অহংকার জন্ম নেয়। অহংকার সত্যকে গ্রহণ করতে বাধা দেয়। সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার ফলে মোহ বৃদ্ধি পায়। মোহ থেকে মানুষ অসৎ ধারণাকে গ্রহণ করে। তারপর সেই ধারণা তার কর্মকে পরিচালিত করে। ফলে অন্তরের বিকৃতি একসময় বাহ্যিক আচরণের বিকৃতিতে পরিণত হয়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেদান্তের আলোকে কামনা মানুষের আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ যখন নিজের পূর্ণতার উৎসকে বাহ্যিক বস্তুতে খুঁজতে থাকে, তখন তার মধ্যে অভাববোধ জন্মায়। সে মনে করে বাহ্যিক কোনো বস্তু অর্জন করলেই সে সম্পূর্ণ হবে। কিন্তু আত্মা যদি স্বরূপত পূর্ণ হয়, তাহলে বাহ্যিক ভোগের মাধ্যমে সেই পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা মূলত একটি ভুল ধারণার ফল। এই ভুল ধারণাই মোহকে শক্তিশালী করে।
যোগদর্শনের দৃষ্টিতে কামনা চিত্তের স্থিরতা নষ্ট করতে পারে। মন যখন বারবার বাহ্যিক বস্তুর দিকে ছুটতে থাকে, তখন একাগ্রতা ও অন্তর্মুখিতা দুর্বল হয়। বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে তুলনা করলে কামনার এই অতৃপ্ত প্রকৃতি তৃষ্ণার ধারণার সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। তৃষ্ণা মানুষকে আকর্ষণ ও বিরাগের চক্রে আবদ্ধ করে এবং সেই চক্র থেকেই দুঃখের জন্ম হয়। যদিও বিভিন্ন দর্শনের তাত্ত্বিক ভিত্তি এক নয়, তবু অসংযত আকাঙ্ক্ষা মানুষের অশান্তির কারণ হতে পারে এই উপলব্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য দেখা যায়।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিতে এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ একটি শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। কামনা হলো আগুন, দম্ভ হলো মুখোশ, অহংকার হলো উঁচু প্রাচীর, মোহ হলো কুয়াশা, অসৎ ধারণা হলো মরীচিকা এবং অশুচি আচরণ হলো সেই অন্ধ পথ যার শেষ পতনের দিকে। মানুষ মরীচিকাকে জল মনে করে তার দিকে ছুটতে পারে, কিন্তু যত এগিয়ে যায় ততই তার তৃষ্ণা বাড়ে। একইভাবে মানুষ যখন বাহ্যিক অর্জনকে জীবনের চূড়ান্ত অর্থ মনে করে, তখন অর্জন যত বাড়ে, অন্তরের অস্থিরতাও কখনো কখনো তত বাড়তে পারে।
মহাভারতের চরিত্রগুলোর মধ্যেও এই মানসিকতার নানা প্রকাশ দেখা যায়। দুর্যোধনের রাজ্যলোভ, নিজের ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং অন্যায়কে ন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা এই শ্লোকের আলোচনাকে বাস্তব চরিত্রের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। একইভাবে ইতিহাসে এমন বহু শাসক ও ক্ষমতাবান মানুষের উদাহরণ পাওয়া যায় যারা সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা ও অহংকারের কারণে নিজেদের ক্ষমতাকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করেছিলেন। তাদের পতন দেখায় যে বাহ্যিক শক্তি যত বড়ই হোক, অন্তরের অসংযম শেষ পর্যন্ত মানুষের বিচারবুদ্ধিকে দুর্বল করতে পারে।
আধুনিক জীবনেও এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীর। একজন মানুষ অর্থ উপার্জন করছে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু যখন অর্থ তার জীবনের একমাত্র মূল্যবোধ হয়ে যায়, তখন সে ক্রমে নৈতিকতার সঙ্গে আপস করতে পারে। সামাজিক মর্যাদা অর্জন স্বাভাবিক, কিন্তু যখন অন্যের প্রশংসা পাওয়াই আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে যায়, তখন মানুষ বাহ্যিক প্রদর্শনের দাস হয়ে পড়তে পারে। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির যুগে এই সমস্যাটি আরও সূক্ষ্ম হয়েছে। মানুষ অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে বিচার করে এবং ক্রমাগত আরও কিছু অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হয়ে ওঠে। বাহ্যিকভাবে তার জীবন সমৃদ্ধ হলেও অন্তরে তৃপ্তি নাও আসতে পারে।
এই কারণে শ্লোকটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট ধরনের মানুষের সমালোচনা নয়। এটি মানুষের অন্তরের সম্ভাব্য দুর্বলতার একটি আয়না। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কামনা আছে, আত্মসম্মান আছে, সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা আছে এবং নিজের মতামতের প্রতি আসক্তি থাকতে পারে। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন এগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং মানুষ নিজের কামনা, অহংকার ও মোহকে সত্যের চেয়ে বড় করে তোলে। গীতার শিক্ষা তাই কামনাকে কেবল বাহ্যিকভাবে দমন করার কথা নয়। বরং কামনার প্রকৃতি বোঝা, তার উপর সচেতনতা প্রতিষ্ঠা করা এবং নিজের জীবনের কেন্দ্রকে আত্মজ্ঞান, কর্তব্য, সত্য ও সংযমের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে।
সবশেষে বলা যায়, কামমাশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভমানমদান্বিতাঃ মোহাদ্ গৃহীত্বাসদগ্রাহান্ প্রবর্তন্তেহশুচিব্রতাঃ এই শ্লোক মানুষের পতনের একটি পূর্ণাঙ্গ অন্তর্দর্শন। ভাষার দিক থেকে এটি সংস্কৃত শব্দগঠন ও ধাতুবিকাশের একটি গভীর উদাহরণ। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এটি কামনা, অহংকার, মোহ, ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং অনৈতিক আচরণের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে। দার্শনিক দিক থেকে এটি মানুষের অশান্তির মূল কারণ হিসেবে অসংযত আকাঙ্ক্ষা ও আত্মবিস্মৃতিকে চিহ্নিত করে। আর আধ্যাত্মিক দিক থেকে এটি মানুষকে বাহ্যিক ভোগের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে নিজের অন্তরের সত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায়। কামনা যখন মানুষের অধীন থাকে তখন তা জীবনের একটি স্বাভাবিক শক্তি হতে পারে, কিন্তু মানুষ যখন কামনার অধীন হয়ে যায় তখন সেই কামনাই ধীরে ধীরে দম্ভ, অহংকার, মোহ এবং অসত্যের মাধ্যমে তার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে। এই কারণেই শ্লোকটির গভীর শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত মুক্তি বাহ্যিক অর্জনের সীমাহীন বৃদ্ধিতে নয়, বরং অন্তরের অশান্ত আকাঙ্ক্ষাকে চিনতে পারা, সত্যকে গ্রহণ করা এবং আত্মসংযম ও আত্মজ্ঞান দ্বারা নিজের জীবনকে পরিচালিত করার মধ্যে নিহিত।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!