সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৬.১১ — সীমাহীন চিন্তা, কামভোগের আসক্তি ও জীবনের সংকীর্ণ লক্ষ্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
চিন্তামপরিমেয়াং চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ।কামোপভোগপরমা এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ।।১১।।
চিন্তামপরিমেয়াং চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ।
কামোপভোগপরমা এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ।।১১।।

অনুবাদঃ অপরিমেয় দুশ্চিন্তার আশ্রয় গ্রহণ করে মৃত্যুকাল পর্যন্ত ইন্দ্রিয়সুখ ভোগকেই তারা তাদের জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে। এভাবেই শত শত আশাপাশে আবদ্ধ হয়ে এবং কাম ও ক্রোধ-পরায়ণ হয়ে তারা কাম উপভোগের জন্য অসৎ উপায়ে অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করে।

ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের দৈবী ও আসুরী প্রবৃত্তির গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। এই অধ্যায়ের একাদশ শ্লোকে তিনি এমন এক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, যেখানে মানুষ সীমাহীন কামনা, ইন্দ্রিয়সুখের আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অবিরাম দুশ্চিন্তার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। শ্লোকটি হলো “চিন্তামপরিমেয়াং চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ। কামোপভোগপরমা এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ।। ১১।। ” এর সরল অর্থ হলো তারা অপরিমেয় চিন্তার আশ্রয় গ্রহণ করে, যা মৃত্যু পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করে। তারা কামনা ও ইন্দ্রিয়সুখ ভোগকেই জীবনের পরম লক্ষ্য বলে মনে করে এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে এইটুকুই জীবনের সবকিছু।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো চিন্তা। সংস্কৃত চিন্তা শব্দের সঙ্গে চিন্তন ও ভাবনার ধারণা যুক্ত। সাধারণ অর্থে চিন্তা মানে কোনো বিষয় নিয়ে ভাবা বা বিবেচনা করা। কিন্তু এই শ্লোকে চিন্তা শব্দটি ইতিবাচক মনন বা জ্ঞান অনুসন্ধানের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এখানে চিন্তা বলতে বোঝানো হয়েছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং অস্থির মানসিক ব্যস্ততা। মানুষ যখন কোনো কামনা পূরণের জন্য ক্রমাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, তখন সেই চিন্তা তার স্বাভাবিক বিবেচনাকে আচ্ছন্ন করতে পারে। ফলে চিন্তা আর কোনো সমস্যার সমাধানের উপায় থাকে না, বরং নিজেই জীবনের একটি স্থায়ী মানসিক অবস্থা হয়ে ওঠে।

চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিমেয় শব্দটি। অপরিমেয় শব্দের মধ্যে অ এবং পরিমেয় এই দুই অংশ রয়েছে। পরিমেয় বলতে বোঝায় যা পরিমাপ করা যায় এবং অপরিমেয় বলতে বোঝায় যা পরিমাপের সীমার মধ্যে আনা যায় না। এখানে অপরিমেয় শব্দটি চিন্তার অসীম বিস্তারকে বোঝাচ্ছে। মানুষের একটি কামনা পূর্ণ হলে আরেকটি কামনা জন্ম নিতে পারে। একটি সম্পদ অর্জিত হলে আরও সম্পদের আকাঙ্ক্ষা জাগতে পারে। একটি সাফল্য অর্জনের পর আরও বড় সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা দেখা দিতে পারে। এইভাবে কামনার কোনো স্বাভাবিক সীমা নির্ধারিত না থাকলে তার সঙ্গে যুক্ত চিন্তারও কোনো সীমা থাকে না। তাই কৃষ্ণ এখানে শুধু অনেক চিন্তার কথা বলেননি, বলেছেন অপরিমেয় চিন্তার কথা।

এরপর এসেছে প্রলয়ান্ত শব্দটি। প্রলয় শব্দের সঙ্গে বিলয়, লয়, অবসান এবং ধ্বংসের ধারণা যুক্ত। অন্ত অর্থ শেষ বা সমাপ্তি। তাই প্রলয়ান্ত অর্থ প্রলয় পর্যন্ত যার শেষ। এই শ্লোকে এর অর্থ জীবনাবসান বা মৃত্যু পর্যন্ত বলেও বোঝা যায়। অর্থাৎ এই দুশ্চিন্তা সাময়িক কোনো মানসিক অস্থিরতা নয়। যে ব্যক্তি ভোগকেন্দ্রিক জীবনদর্শনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তার কামনা এবং কামনা পূরণের চিন্তা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলতে পারে। সে যত কিছু অর্জন করে, সেগুলো হারানোর ভয়ও তত বাড়তে পারে। ফলে ভোগের আকাঙ্ক্ষা যেমন থাকে, তেমনি ভোগের বস্তু রক্ষা করার উদ্বেগও তৈরি হয়।

উপাশ্রিতাঃ শব্দটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে আশ্রয় নেওয়ার ধারণা রয়েছে। কৃষ্ণ বলেননি যে তারা শুধু চিন্তা করে। তিনি বলেছেন তারা চিন্তার আশ্রয় নিয়েছে। এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য নিহিত আছে। মানুষ কোনো সমস্যার কারণে কিছু সময়ের জন্য চিন্তা করতে পারে। কিন্তু যখন চিন্তাই তার স্থায়ী মানসিক আশ্রয় হয়ে ওঠে, তখন সে আর চিন্তা থেকে নিজেকে পৃথক করতে পারে না। তার পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের ধারণা সবকিছুই বাহ্যিক অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তখন উদ্বেগ তার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

শ্লোকটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো কামোপভোগপরমাঃ। এটি একটি সমাসবদ্ধ পদ, যার মধ্যে কাম, উপভোগ এবং পরম এই তিনটি ধারণা একত্রিত হয়েছে। কাম অর্থ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, বাসনা এবং ভোগের আকর্ষণ। ভারতীয় দর্শনে কাম শব্দটি কেবল যৌন আকাঙ্ক্ষাকে বোঝায় না। ইন্দ্রিয়সুখ, বস্তুগত সম্পদ, ক্ষমতা, সম্মান, প্রশংসা, ভোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাও কামনার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উপভোগ অর্থ কোনো বিষয়কে ভোগ করা বা তার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়সুখ গ্রহণ করা। আর পরম অর্থ সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত। ফলে কামোপভোগপরমাঃ বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয়েছে যারা কামনা ও ভোগকেই জীবনের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য বলে মনে করে।

এখানেই শ্লোকটির দার্শনিক বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গীতা ভোগের অস্তিত্বকে নিজে নিন্দা করছে না। মানুষের জীবনে খাদ্য, পরিবার, সম্পদ, সৌন্দর্য, সম্পর্ক, সাফল্য এবং আনন্দের স্বাভাবিক স্থান রয়েছে। সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন মানুষ এই বিষয়গুলোকেই জীবনের পরম সত্য বলে মনে করে। অর্থাৎ ভোগ যদি জীবনের একটি অংশ হয় তাহলে তা এক বিষয়, আর ভোগই যদি জীবনের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে তাহলে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কৃষ্ণের সমালোচনার কেন্দ্র এই দ্বিতীয় মানসিকতা।

এই প্রসঙ্গে এতাবৎ এবং ইতি নিশ্চিতাঃ শব্দদ্বয় অত্যন্ত গভীর। এতাবৎ অর্থ এইটুকু বা এই পর্যন্ত। ইতি অর্থ এইভাবে বা এই ধারণায়। নিশ্চিতাঃ অর্থ দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত। তাই এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ বলতে বোঝায় তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে এইটুকুই সব। জীবনের কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য নেই, আত্মজ্ঞান বা আত্মঅনুসন্ধানের কোনো প্রয়োজন নেই, নৈতিকতার কোনো গভীর ভিত্তি নেই এবং ভোগের বাইরে কোনো চূড়ান্ত সত্য নেই। তাদের কাছে যা দেখা যায়, যা পাওয়া যায় এবং যা উপভোগ করা যায়, সেটিই বাস্তবতার সম্পূর্ণ পরিসর।

এই ধারণার মধ্যে গীতার দৃষ্টিতে একটি গভীর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মানুষ যখন নিজের সমস্ত সুখকে বাহ্যিক বস্তু ও ইন্দ্রিয়সুখের উপর নির্ভরশীল করে তোলে, তখন তার স্বাধীনতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কারণ যে বস্তু থেকে সুখ পাওয়া যায়, সেটিকে হারানোর ভয়ও তৈরি হয়। যে সম্পদ অর্জন করা হয়েছে, সেটিকে রক্ষা করার চিন্তা থাকে। যে সম্মান অর্জিত হয়েছে, তা হারানোর আশঙ্কা থাকে। যে সম্পর্ক আনন্দ দেয়, তার বিচ্ছেদের ভয় থাকে। যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তার চেয়ে বড় সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। এইভাবে ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং দুশ্চিন্তা একে অপরকে ক্রমাগত শক্তিশালী করতে পারে।

একজন মানুষ মনে করতে পারে যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেলেই তার জীবনের সব সমস্যা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সেই অর্থ অর্জনের পর তার লক্ষ্য আরও বড় হতে পারে। এরপর সে সম্পদ বাড়ানোর চিন্তা করবে, সম্পদ রক্ষা করার চিন্তা করবে এবং অন্যদের তুলনায় নিজের অবস্থান বজায় রাখার চিন্তা করবে। এভাবে যে সম্পদকে সে স্বাধীনতার মাধ্যম মনে করেছিল, সেটিই কখনো কখনো তার মানসিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখানেই কামোপভোগপরমা এবং অপরিমেয় চিন্তার মধ্যে গভীর সম্পর্ক প্রকাশ পায়।

এই সম্পর্ককে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। মরুভূমির একজন তৃষ্ণার্ত মানুষ দূরে জল দেখতে পেল। আসলে সেটি মরীচিকা। সে যত দ্রুত সেই জল পাওয়ার জন্য এগিয়ে যায়, ততই সেটি দূরে সরে যায়। সে মনে করে আর একটু এগোলেই জল পাবে। তার এই আরও একটু মানসিকতা কখনো শেষ হয় না। কামনাও অনেক সময় একইভাবে কাজ করে। মানুষ মনে করে আরেকটু সম্পদ, আরেকটু সাফল্য, আরেকটু সম্মান অথবা আরেকটু ভোগ পেলেই সে সম্পূর্ণ তৃপ্ত হবে। কিন্তু সেই তৃপ্তি স্থায়ী না হলে নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ফলে মানুষ দৌড়াতে থাকে, অথচ তার অন্তরের তৃষ্ণা শেষ হয় না।

শ্লোকটির মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যও গভীর। কামনা যখন মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন চিন্তা আর বাস্তবতার নিরপেক্ষ বিচার থাকে না। মানুষ তখন নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবতার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে। সে যা চায় সেটিই সত্য বলে মনে করতে চায় এবং যা তার কামনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেটিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ফলে বিচারবুদ্ধি ধীরে ধীরে কামনার অধীন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মানুষ নিজের তৈরি আকাঙ্ক্ষার জগতের মধ্যেই বন্দী হয়ে যেতে পারে।

এই শ্লোককে আধুনিক জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত করা যায়। আজকের ভোগবাদী সমাজে মানুষের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আকর্ষণ উপস্থিত হচ্ছে। আরও ভালো বাড়ি, আরও দামি গাড়ি, আরও উন্নত প্রযুক্তি, আরও সামাজিক মর্যাদা, আরও জনপ্রিয়তা এবং আরও বেশি সম্পদের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ক্রমাগত তুলনার মধ্যে রাখে। একজন মানুষ যখন অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে অসম্পূর্ণ মনে করতে শুরু করে, তখন তার মধ্যে নতুন কামনা জন্মায়। সেই কামনা পূরণের জন্য সে পরিশ্রম করে এবং অর্জনের পর কিছু সময় আনন্দ পায়। কিন্তু আবার নতুন তুলনা শুরু হয়। এই চক্রের কোনো স্বাভাবিক শেষ না থাকলে জীবন ক্রমাগত অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

তবে গীতার শিক্ষা এই নয় যে মানুষ কোনো আকাঙ্ক্ষা রাখবে না বা জীবনের আনন্দ উপভোগ করবে না। গীতার শিক্ষা বরং কামনার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে পুনর্বিবেচনা করতে বলে। কামনা যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে মানুষ তার প্রয়োজন ও কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারে। কিন্তু কামনাই যদি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন স্বাধীনতা ক্ষীণ হয়ে যায়। তাই মূল প্রশ্ন হলো মানুষ ভোগ করছে কিনা তা নয়, বরং ভোগ কি তার জীবনের প্রভু হয়ে উঠেছে কিনা।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক বস্তুবাদী জীবনদর্শনের একটি সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে। যদি মানুষ মনে করে যে দৃশ্যমান বস্তু এবং ইন্দ্রিয়সুখই বাস্তবতার সম্পূর্ণ পরিসর, তাহলে তার জীবনদর্শন বাহ্যিক জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ভারতীয় দর্শনের বৃহত্তর পরিসরে মানুষের অস্তিত্বকে কেবল শরীর ও ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয় না। আত্মা, চেতনা, নৈতিকতা, কর্ম, জ্ঞান এবং মুক্তির মতো ধারণা মানবজীবনের উচ্চতর মাত্রাকে নির্দেশ করে। গীতার দৃষ্টিতে বাহ্যিক ভোগের সঙ্গে অন্তর্গত আত্মসচেতনতার সম্পর্ক স্থাপন করাই অধিক পরিপূর্ণ জীবনদৃষ্টির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এই কারণে শ্লোকটির গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো মানুষের সুখের প্রকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা। যে সুখ সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক বস্তুর উপর নির্ভর করে, তা বস্তুটির পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু আত্মজ্ঞান ও অন্তর্গত স্থিরতার অনুসন্ধান মানুষকে এমন এক স্তরের দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে সুখকে কেবল বাহ্যিক অর্জনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হয় না। গীতার সমগ্র দর্শনে এই অন্তর্মুখী যাত্রার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অসাধারণ। কয়েকটি শব্দের মধ্যেই শ্রীকৃষ্ণ একটি সম্পূর্ণ চরিত্রের মানসিক ছবি এঁকেছেন। চিন্তা তার মানসিক অবস্থা, অপরিমেয় তার সীমাহীনতা, প্রলয়ান্ত তার স্থায়িত্ব, কামোপভোগপরমা তার জীবনদর্শন এবং এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ তার দার্শনিক বিশ্বাসকে প্রকাশ করে। অর্থাৎ শ্লোকটি শুধু কিছু মানুষের আচরণ বর্ণনা করছে না, বরং একটি পূর্ণ মানসিক কাঠামোকে ভাষায় রূপ দিয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের বাহ্যিক জীবন এবং অন্তর্গত জীবনের মধ্যে ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। মানুষ যদি কামনাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করে কিন্তু তাকে জীবনের পরম লক্ষ্য না বানায়, তাহলে সে ভোগের মধ্যেও সংযম ও সচেতনতা বজায় রাখতে পারে। কিন্তু যখন কামনা ও উপভোগই জীবনের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হয়ে যায়, তখন সেই কামনা পূরণের জন্য চিন্তা, ভয়, প্রতিযোগিতা এবং অস্থিরতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষ যেন ভোগের পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবনের গভীর অর্থকে হারিয়ে না ফেলে। বাহ্যিক সাফল্য ও আনন্দ জীবনের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেগুলোকেই জীবনের সম্পূর্ণ সত্য মনে করা উচিত নয়। মানুষের প্রকৃত পরিপূর্ণতা কেবল সে কত কিছু অর্জন করেছে তার মধ্যে নয়, বরং সে নিজের কামনা, চিন্তা, আসক্তি এবং অন্তর্গত চেতনার সঙ্গে কতটা সজ্ঞান সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছে তার মধ্যেও নিহিত। এই দৃষ্টিতে “চিন্তামপরিমেয়াং চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ” এবং “কামোপভোগপরমা এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ” কেবল একটি প্রাচীন শ্লোকের বর্ণনা নয়, বরং আধুনিক মানুষের অস্থির জীবন, সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা এবং সুখের প্রকৃতি নিয়ে এক গভীর দার্শনিক সতর্কবার্তা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি