সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৬.১২ — আশার বন্ধন, কাম-ক্রোধ ও অন্যায়ভাবে অর্থসঞ্চয়ের আসুরী প্রবণতা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ।ঈহন্তে কামভোগার্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্।।১২।।
আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ।
ঈহন্তে কামভোগার্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্।।১২।।

অনুবাদঃ অপরিমেয় দুশ্চিন্তার আশ্রয় গ্রহণ করে মৃত্যুকাল পর্যন্ত ইন্দ্রিয়সুখ ভোগকেই তারা তাদের জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে। এভাবেই শত শত আশাপাশে আবদ্ধ হয়ে এবং কাম ও ক্রোধ-পরায়ণ হয়ে তারা কাম উপভোগের জন্য অসৎ উপায়ে অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের দ্বাদশ শ্লোকে মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর এবং চিরন্তন সংকট অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। শ্লোকটি হলো আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ। ঈহন্তে কামভোগার্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্। অর্থাৎ শত শত আশার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, কামনা ও ক্রোধকে জীবনের প্রধান অবলম্বন করে মানুষ কামভোগের উদ্দেশ্যে অন্যায় উপায়ে অর্থ সঞ্চয় করতে থাকে। এই শ্লোকের বক্তব্য শুধু প্রাচীনকালের কোনো বিশেষ ধরনের মানুষের চরিত্রচিত্রণ নয়। মানুষের লোভ, আকাঙ্ক্ষা, ক্রোধ, সম্পদলিপ্সা, নৈতিকতা এবং মানসিক স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে এটি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো আশা। সংস্কৃত আশা শব্দের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা এবং কোনো কাঙ্ক্ষিত ফল লাভের মানসিক প্রবণতা নিহিত রয়েছে। আশা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে, উন্নতি করতে চায় এবং নিজের ও অন্যের কল্যাণ কামনা করে। তাই আশা নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। কিন্তু যখন আশা সীমাহীন প্রত্যাশায় পরিণত হয় এবং মানুষ তার মানসিক শান্তি ও আত্মমূল্যকে বাহ্যিক অর্জনের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে, তখন সেই আশাই বন্ধনে পরিণত হয়। গীতার এই শ্লোকে সেই অবস্থাকেই অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।

আশাপাশ শব্দটির মধ্যে এই গভীর ভাবটি নিহিত রয়েছে। পাশ অর্থ দড়ি, ফাঁস বা বন্ধন। বাহ্যিক দড়ি যেমন একজন মানুষকে শারীরিকভাবে বেঁধে রাখতে পারে, তেমনি অসংখ্য আশা ও প্রত্যাশা মানুষের মনকে বেঁধে রাখতে পারে। মানুষ তখন বাইরে থেকে স্বাধীন হলেও অন্তরে স্বাধীন থাকে না। সে একটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। একটি সম্পদ অর্জনের পর আরও সম্পদ চায়, একটি সম্মান পাওয়ার পর আরও বেশি সম্মান চায় এবং একটি ভোগের পর আরও বৃহত্তর ভোগের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এই কারণে আশাপাশ মানুষের মানসিক বন্ধনের একটি গভীর প্রতীক।

শত শব্দটি এখানে শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যা বোঝায় না। সংস্কৃত সাহিত্যে শত শব্দটি বহু বা অসংখ্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তাই আশাপাশশতৈঃ বলতে শত শত বা অসংখ্য আশার বন্ধন বোঝানো হয়েছে। মানুষের মনের এই অসংখ্য প্রত্যাশা একসময় এমন এক জটিল জাল তৈরি করে যেখানে মানুষ নিজেই নিজের আকাঙ্ক্ষার বন্দী হয়ে পড়ে। তখন সে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে না, বরং তার আকাঙ্ক্ষাগুলোই তাকে পরিচালনা করতে থাকে।

এর পরেই এসেছে বদ্ধাঃ শব্দটি। এটি বন্ধ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ হলো আবদ্ধ, বাঁধা বা বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। আশার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বলতে এখানে কোনো শারীরিক কারাগার বোঝানো হয়নি। এটি মানসিক কারাগারের কথা বলছে। মানুষ যখন মনে করে যে নির্দিষ্ট কিছু বস্তু, অর্থ, ক্ষমতা বা ভোগ না পেলে সে সুখী হতে পারবে না, তখন সেই বিশ্বাসই তার স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে। তার চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং কর্ম ধীরে ধীরে সেই আকাঙ্ক্ষার অধীন হয়ে পড়ে।

এরপর এসেছে কামক্রোধপরায়ণাঃ। কাম শব্দের মূল ভাব হলো ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বা কামনা। ভারতীয় দর্শনে কাম সবসময় নেতিবাচক নয়। মানবজীবনের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা এবং আনন্দলাভের প্রবণতাও কাম শব্দের বিস্তৃত অর্থের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই শ্লোকে কাম বলতে এমন আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়েছে যা নিয়ন্ত্রণহীন এবং ভোগকেন্দ্রিক। যখন আকাঙ্ক্ষা মানুষের বিবেক, নীতি এবং আত্মসংযমের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন সেই কামনা বন্ধনের কারণ হয়ে ওঠে।

কামনার সঙ্গে ক্রোধের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মানুষ যখন কোনো কিছু চায় এবং সেই চাওয়া পূরণে বাধা সৃষ্টি হয়, তখন তার মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ জন্ম নিতে পারে। সেই ক্ষোভ ক্রোধে পরিণত হয়। গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়েও কামনা থেকে ক্রোধের উৎপত্তির কথা বলা হয়েছে। এই দৃষ্টিতে কাম ও ক্রোধ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। কামনা হলো পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ক্রোধ হলো সেই আকাঙ্ক্ষার পথে বাধা সৃষ্টি হলে তার প্রতিক্রিয়া। তাই যে ব্যক্তি কামনা ও ক্রোধের অধীন হয়ে পড়ে, তার মানসিক শান্তি বহুলাংশে বাহ্যিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়।

পরায়ণ শব্দের অর্থ যার দিকে সম্পূর্ণভাবে অভিমুখী বা যার মধ্যে আশ্রয় গ্রহণকারী। কামক্রোধপরায়ণ অর্থ এমন ব্যক্তি যার জীবন কামনা ও ক্রোধকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সে কী চায়, কীভাবে তা পাবে এবং তার চাওয়া পূরণ না হলে কার ওপর ক্রুদ্ধ হবে এই চিন্তাগুলোই তার মানসিক জগতকে দখল করে রাখে। এখানে গীতা মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি তার অন্তর্নিহিত মানসিক প্রবণতাকেও বিশ্লেষণ করছে।

শ্লোকটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ঈহন্তে। এর অর্থ চেষ্টা করা, উদ্যোগ নেওয়া বা কোনো কিছু অর্জনের জন্য প্রয়াস করা। এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ গীতা মানুষের চেষ্টা বা কর্মকে নিন্দা করছে না। মানুষ চেষ্টা করবে, পরিশ্রম করবে এবং সম্পদ অর্জন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য কী এবং সেই প্রচেষ্টার পদ্ধতি কেমন সেটিই এখানে মূল প্রশ্ন। ন্যায়সংগতভাবে জীবিকা অর্জন এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ সঞ্চয় এক বিষয় নয়।

কামভোগার্থম্ শব্দটি এই উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে। কাম অর্থ আকাঙ্ক্ষা এবং ভোগ অর্থ উপভোগ। অর্থম্ এখানে উদ্দেশ্য বা জন্য অর্থ প্রকাশ করে। ফলে কামভোগার্থম্ অর্থ কামনাজাত ভোগের উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ এখানে সম্পদ সঞ্চয়ের উদ্দেশ্য কোনো উচ্চতর কল্যাণ, নৈতিক কর্তব্য বা সমাজসেবার আদর্শ নয়। বরং নিজের ইন্দ্রিয়সুখ ও কামনা পূরণই প্রধান লক্ষ্য।

এরপর এসেছে অন্যায়েন শব্দটি। ন্যায়ের বিপরীত হলো অন্যায়। ন্যায়ের মধ্যে নৈতিকতা, সঠিকতা, নীতিসঙ্গত আচরণ এবং ধর্মসম্মত পদ্ধতির ধারণা রয়েছে। অন্যায় অর্থ ন্যায়বিরুদ্ধ বা নীতিবিরুদ্ধ আচরণ। শ্লোকটির এই অংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সম্পদকে নিজে নিন্দা করা হয়নি। বরং কামভোগের জন্য অন্যায় উপায়ে সম্পদ অর্জনের প্রবণতাকে নিন্দা করা হয়েছে। অর্থাৎ গীতার বক্তব্য হলো সম্পদ অর্জন করা অপরাধ নয়, কিন্তু সম্পদের জন্য নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়া আত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ।

অর্থ শব্দটির অর্থ এখানে ধনসম্পদ। ভারতীয় দর্শনে অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরুষার্থ। ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ এই চার পুরুষার্থের মধ্যে অর্থের একটি স্বীকৃত স্থান রয়েছে। অর্থ মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় উপাদান। পরিবার পরিচালনা, সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং ন্যায়সংগত জীবনযাপনের জন্য সম্পদ প্রয়োজন। কিন্তু অর্থ যখন ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং শুধু ভোগের উপকরণে পরিণত হয়, তখন তা মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে বন্ধনের কারণ হতে পারে।

সঞ্চয় শব্দের মধ্যে সংগ্রহ করে জমিয়ে রাখার ধারণা রয়েছে। অর্থসঞ্চয় বলতে ধনসম্পদ জমা করা বোঝায়। কিন্তু এই শ্লোকে সঞ্চয় সাধারণ প্রয়োজনীয় সঞ্চয়ের অর্থ বহন করছে না। এখানে এমন অর্থসঞ্চয়ের কথা বলা হয়েছে যার পেছনে সীমাহীন কামনা এবং ভোগের আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। মানুষ যত পায় ততই আরও পাওয়ার ইচ্ছা করে এবং সেই ইচ্ছা পূরণের জন্য সম্পদ সঞ্চয়ের প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।

এইভাবে শ্লোকটির মধ্যে মানুষের অধঃপতনের একটি ধারাবাহিক মানসিক চিত্র পাওয়া যায়। প্রথমে জন্ম নেয় আশা। সেই আশা ক্রমে আসক্তিতে পরিণত হয়। আসক্তি মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে। তারপর কামনা তার চিন্তাকে পরিচালিত করে। কামনা পূরণে বাধা এলে ক্রোধ জন্ম নেয়। কামনা ও ক্রোধের প্রভাবে মানুষ কামভোগকে জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য করে তোলে। সেই ভোগের জন্য অর্থ প্রয়োজন হয়। অর্থের আকাঙ্ক্ষা যখন সীমাহীন হয়ে ওঠে, তখন অন্যায় উপায়ে সম্পদ সঞ্চয়ের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এই ধারাটিই শ্লোকটির অন্যতম গভীর শিক্ষা।

এই শিক্ষাকে একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন মানুষ ন্যায়সংগতভাবে ব্যবসা করে জীবিকা অর্জন করতে শুরু করল। এটি স্বাভাবিক এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে জন্ম নিল আরও বেশি অর্থের আকাঙ্ক্ষা। তারপর সে ভাবল তাকে প্রতিযোগীদের যেকোনো মূল্যে পরাজিত করতে হবে। এরপর সে লাভের জন্য প্রতারণা, ভেজাল, ঘুষ বা অন্যায় পদ্ধতি গ্রহণ করল। এখানে সমস্যাটি অর্থ উপার্জনে ছিল না। সমস্যাটি সৃষ্টি হয়েছে যখন অর্থের আকাঙ্ক্ষা নৈতিকতার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এই অবস্থাই গীতার ভাষায় আশার বন্ধন, কাম ও ক্রোধের অধীনতা এবং অন্যায় অর্থসঞ্চয়ের মানসিকতা।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের অপূর্ণতার অনুভূতির গভীর সমস্যাকে সামনে আনে। মানুষ যখন নিজের পূর্ণতা বাহ্যিক বস্তুতে খুঁজতে থাকে, তখন সে মনে করে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু অর্জন করলেই তার জীবন সম্পূর্ণ হবে। কিন্তু একটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার পর নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ফলে পূর্ণতা কখনো স্থায়ী হয় না। মানুষ বাহ্যিকভাবে যত অর্জন করে, তার চাহিদা তত বৃদ্ধি পেতে পারে। এইভাবে সম্পদের বৃদ্ধি সবসময় অন্তরের শান্তি বৃদ্ধি করে না।

বেদান্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়টি আরও গভীর। আত্মা স্বভাবত পূর্ণ হলেও অজ্ঞানের কারণে মানুষ নিজের পূর্ণতাকে বাহ্যিক বস্তুর মধ্যে খুঁজতে থাকে। সে ভাবে সম্পদ, ভোগ, ক্ষমতা বা সম্মান তাকে সম্পূর্ণ করবে। কিন্তু বাহ্যিক কোনো অর্জনই আত্মিক পূর্ণতার স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না। ফলে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে ছুটে বেড়ায়। আশাপাশের বন্ধন মূলত এই ভুল পরিচয় এবং বাহ্যিক নির্ভরতার প্রতীক।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের প্রত্যাশা যখন বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তখন হতাশা সৃষ্টি হয়। হতাশা থেকে ক্রোধ জন্ম নিতে পারে এবং ক্রোধ মানুষের বিচারবোধকে দুর্বল করতে পারে। তখন ব্যক্তি এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে যা শান্ত ও স্থির অবস্থায় সে কখনো গ্রহণ করত না। প্রাচীন গীতার ভাষায় কাম ও ক্রোধের যে বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য দেখা যায়।

এই শ্লোকের প্রতীকী শক্তিও অসাধারণ। আশাপাশ হলো মানসিক শৃঙ্খলের প্রতীক। কাম হলো অতৃপ্তির প্রতীক। ক্রোধ হলো অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণের প্রতীক। অন্যায় হলো নৈতিক সীমা অতিক্রমের প্রতীক। আর অর্থসঞ্চয় হলো সেই বাহ্যিক অর্জনের প্রতীক যার পেছনে মানুষ নিজের অন্তরের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিতে পারে। তাই শ্লোকটি কেবল একজন লোভী মানুষের বর্ণনা নয়। এটি মানুষের অন্তরে জন্ম নেওয়া সেই প্রবণতার প্রতিচ্ছবি যা তাকে বলে আরও চাই, আরও পেতে হবে এবং যেকোনো মূল্যে পেতে হবে।

এখানে একটি বিশেষ ভারসাম্যের শিক্ষা রয়েছে। গীতা অর্থকে প্রত্যাখ্যান করছে না। কামনাকেও মানুষের অস্তিত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে বলছে না। বরং অর্থ ও কামকে ধর্ম এবং আত্মসংযমের অধীন রাখার শিক্ষা দিচ্ছে। অর্থ মানুষের জীবনকে সুন্দর করতে পারে, কিন্তু অর্থ যদি জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায় তবে মানুষ অর্থের মালিক না হয়ে অর্থের দাসে পরিণত হতে পারে। কামনা মানুষের কর্মের শক্তি হতে পারে, কিন্তু কামনা যদি বিবেকের ওপর কর্তৃত্ব করে তবে তা বন্ধনে পরিণত হয়।

এই কারণে শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন হতে পারে মানুষ কি সম্পদকে ব্যবহার করছে, নাকি সম্পদের আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে ব্যবহার করছে। মানুষ যখন সম্পদকে জীবনের একটি উপায় হিসেবে দেখে তখন সে সম্পদের অধিকারী। কিন্তু যখন সম্পদই তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে তখন সম্পদ তার মানসিক প্রভুতে পরিণত হয়। তখন মানুষ আর বলে না যে জীবনের জন্য অর্থ প্রয়োজন। বরং তার জীবন এমনভাবে পরিচালিত হয় যেন অর্থের জন্যই তার জীবন প্রয়োজন।

সুতরাং আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ ঈহন্তে কামভোগার্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্ এই শ্লোকটি মানুষের জীবনের এক গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। মানুষের প্রকৃত বন্ধন বাহ্যিক শিকলে নয়, তার অসংযত আকাঙ্ক্ষায়। কামনা যখন বিবেকের অধীন থাকে তখন তা জীবনকে পরিচালিত করতে পারে। কিন্তু কামনা যখন বিবেককে পরিচালিত করে তখন তা মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে। অর্থ যখন ধর্মের অধীন থাকে তখন তা জীবনধারণ ও কল্যাণের উপায়। কিন্তু অর্থ যখন সীমাহীন ভোগের উপকরণ হয়ে ওঠে তখন তা লোভের জন্ম দিতে পারে। আর কামনা পূরণের জন্য অন্যায় পথ গ্রহণ করলে মানুষের বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে তার অন্তরের পতন শুরু হয়।

এই শ্লোকের চূড়ান্ত শিক্ষা তাই সম্পদ ত্যাগ নয়, বরং সম্পদের প্রতি সঠিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। কামনা ধ্বংস নয়, কামনার ওপর আত্মসংযম প্রতিষ্ঠা করা। কর্ম থেকে পলায়ন নয়, ন্যায়সংগত কর্ম করা। আশা পরিত্যাগ নয়, আশাকে আসক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত করা। মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসে যখন সে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং নিজের সম্পদ, কর্ম ও ভোগকে নৈতিকতা ও আত্মজ্ঞান দ্বারা পরিচালিত করতে পারে। এই কারণেই গীতার এই শ্লোক আজও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, অর্থনৈতিক জীবন, সামাজিক আচরণ এবং নৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এক গভীর আয়নার মতো কাজ করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অসংখ্য আশার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং আশার ওপর নিজের চেতনার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই প্রকৃত স্বাধীনতার পথ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি