সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৬.১৩ — সম্পদের অহংকার, ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষা ও ‘আমি-আমার’ মানসিকতার বন্ধন

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ইদমদ্য ময়া লদ্ধমিমং প্রাপ্স্যে মনোরথম্।ইদমন্তীদমপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম্।।১৩।।
ইদমদ্য ময়া লদ্ধমিমং প্রাপ্স্যে মনোরথম্।
ইদমন্তীদমপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম্।।১৩।।

অনুবাদঃ অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা মনে করে- “আজ আমার দ্বারা এত লাভ হয়েছে এবং আমার পরিকল্পনা অনুসারে আরও লাভ হবে। এখন আমার এত ধন আছে এবং ভবিষ্যতে আরও ধন লাভ হবে। ঐ শত্রু আমার দ্বারা নিহত হয়েছে এবং অন্যান্য শত্রুদেরও আমি হত্যা করব। আমিই ঈশ্বর, আমি ভোক্তা। আমিই সিদ্ধ, বলবান ও সুখী। আমি সবচেয়ে ধনবান এবং অভিজাত আত্মীয়স্বজন পরিবৃত। আমার মতো আর কেউ নেই। আমি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করব, দান করব এবং আনন্দ করব।” এভাবেই অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা অজ্ঞানের দ্বারা বিমোহিত হয়। নানা প্রকার দুশ্চিন্তায় বিভ্রান্ত হয়ে এবং মোহজালে বিজড়িত হয়ে কামভোগে আসক্তচিত্ত সেই ব্যক্তিরা অশুচি নরকে পতিত হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের ত্রয়োদশ শ্লোকে মানুষের এক বিশেষ মানসিক প্রবণতার গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে। শ্লোকটি হলো ইদমদ্য ময়া লব্ধমিমং প্রাপ্স্যে মনোরথম্। ইদমস্তীদমপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম্। এই শ্লোকের সরল অর্থ হলো আজ আমি এই সম্পদ লাভ করেছি, আমার এই মনোরথও আমি পূর্ণ করব। এই সম্পদ আমার কাছে আছে এবং ভবিষ্যতে আরও সম্পদ আমার হবে। বাহ্যিকভাবে এটি একজন মানুষের সম্পদ অর্জনের কথা মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ আরও গভীর। এখানে আসলে এমন এক মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় যেখানে মানুষের চিন্তার কেন্দ্র হয়ে ওঠে আমি, আমার এবং আমার ভবিষ্যৎ অর্জন। এই আত্মকেন্দ্রিকতা ধীরে ধীরে অহংকার, লোভ এবং সীমাহীন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ইদম্। সংস্কৃত ইদম্ একটি নির্দেশবাচক সর্বনাম যার অর্থ এই বা এটি। শ্লোকে এই শব্দটির পুনরাবৃত্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তি বারবার নিজের সামনে থাকা সম্পদ ও অর্জনের দিকে নির্দেশ করছে। আজ যা পেয়েছি, ভবিষ্যতে যা পাব, বর্তমানে যা আছে এবং ভবিষ্যতে যা আমার হবে, তার সবকিছুকেই সে নিজের দখল ও অধিকারের দৃষ্টিতে দেখছে। এর মধ্য দিয়ে একটি বিশেষ মানসিকতা প্রকাশিত হয়। মানুষ যখন পৃথিবীর প্রতিটি মূল্যবান বিষয়কে আমার বলে চিহ্নিত করতে শুরু করে, তখন তার সঙ্গে জগতের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ব্যবহার ও মালিকানার সম্পর্কে পরিণত হয়।

অদ্য শব্দের অর্থ আজ। এই শব্দটি বর্তমান সময়কে নির্দেশ করে। ইদম্ অদ্য ময়া লব্ধম্ অর্থ আজ আমি এটি লাভ করেছি। এখানে বর্তমান অর্জনের প্রতি মানুষের প্রবল সচেতনতা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষ একটি অর্জন করার পর সাধারণত সেখানে থেমে থাকে না। একটি সাফল্য পরবর্তী সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। ফলে বর্তমান অর্জন ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার ভিত্তি হয়ে ওঠে। শ্লোকটির মধ্যে এই মানসিক গতিপথ খুব সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।

ময়া শব্দটি অহম্ অর্থাৎ আমি সর্বনামের একটি রূপ। এর অর্থ আমার দ্বারা অথবা আমি। ময়া লব্ধম্ অর্থ আমার দ্বারা লাভ করা হয়েছে বা আমি লাভ করেছি। এই শব্দটি শ্লোকের মনস্তাত্ত্বিক কেন্দ্রকে প্রকাশ করে। বক্তার সমস্ত চিন্তার কেন্দ্র হলো নিজের সাফল্য। আমি অর্জন করেছি, আমি আরও অর্জন করব, আমার কাছে আছে এবং আমার আরও হবে। অর্থাৎ বাহ্যিক সম্পদকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী আত্মকেন্দ্রিক পরিচয় তৈরি হয়েছে।

লব্ধম্ শব্দটি সংস্কৃত লভ্ ধাতু থেকে এসেছে। লভ্ ধাতুর অর্থ পাওয়া, লাভ করা বা অর্জন করা। লব্ধম্ অর্থ প্রাপ্ত বা অর্জিত। ময়া লব্ধম্ অর্থ আমি অর্জন করেছি। এখানে অর্জনের ধারণাটি কেবল অর্থনৈতিক নয়। মানুষের জীবনে ক্ষমতা, খ্যাতি, সামাজিক মর্যাদা, সম্পত্তি এবং ভোগসামগ্রীও অর্জনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই অর্জন যখন কর্তব্য ও প্রয়োজনের সীমার মধ্যে থাকে তখন তা স্বাভাবিক। কিন্তু অর্জন যখন আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে যায় তখন মানুষ নিজের মূল্যকে নিজের অন্তর্গত গুণ দিয়ে নয়, বাহ্যিক সাফল্য দিয়ে পরিমাপ করতে শুরু করে।

শ্লোকটির আরেকটি গভীর শব্দ হলো মনোরথম্। শব্দটি মনঃ এবং রথ এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। মনঃ অর্থ মন এবং রথ অর্থ বাহন বা রথ। আক্ষরিক অর্থে মনোরথ হলো মনের রথ। রথ যেমন মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়, তেমনি মনোরথ মানুষের মনকে বর্তমান বাস্তবতা থেকে ভবিষ্যতের কল্পনার দিকে নিয়ে যায়। তাই মনোরথের অর্থ মনের আকাঙ্ক্ষা, অভিলাষ, বাসনা বা কল্পিত ইচ্ছা। এখানে মনোরথ এমন একটি আকাঙ্ক্ষার প্রতীক যা মানুষকে ভবিষ্যৎ অর্জনের দিকে ক্রমাগত চালিত করে।

প্রাপ্স্যে শব্দটি প্রাপ্ত হওয়ার বা অর্জন করার ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। এর মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আত্মবিশ্বাস এবং প্রত্যাশা উভয়ই রয়েছে। ব্যক্তি শুধু বর্তমানের অর্জনে সন্তুষ্ট নয়। সে মনে করছে ভবিষ্যতেও তার মনোরথ পূর্ণ হবে। অর্থাৎ একটি অর্জন তার আকাঙ্ক্ষাকে শেষ করেনি, বরং আরও বড় আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে। মানুষের ভোগকেন্দ্রিক মানসিকতার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য। আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে আকাঙ্ক্ষা শেষ হয় না। অনেক সময় একটি আকাঙ্ক্ষার পূরণ পরবর্তী আরও বড় আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়।

ইদমস্তি অর্থ এই আছে। এখানে অস্তি শব্দটি অস্তিত্ব বোঝায়। এর মূল সংস্কৃত ধাতু অস্ যার অর্থ থাকা বা অস্তিত্বশীল হওয়া। ইদম্ অস্তি অর্থ এই আছে। কিন্তু প্রসঙ্গের মধ্যে এর অর্থ এই সম্পদ আমার কাছে আছে। এরপর ইদমপি মে ভবিষ্যতি অর্থ এটিও আমার হবে। এখানে মে শব্দটি আমার অর্থ প্রকাশ করছে এবং ভবিষ্যতি শব্দটি ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকে নির্দেশ করছে। অর্থাৎ ব্যক্তি শুধু বর্তমান সম্পদের দিকে তাকিয়ে নেই। তার মন ভবিষ্যতে আরও সম্পদ অর্জনের কল্পনায় ব্যস্ত।

পুনর্ধনম্ শব্দে পুনঃ অর্থ আবার এবং ধনম্ অর্থ সম্পদ। ধন শব্দটি প্রাচীন ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতিতে শুধু অর্থ বোঝাত না। সম্পত্তি, স্বর্ণ, পশু, ভূমি এবং বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রীও ধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই শ্লোকে ধন বস্তুগত সম্পদ ও ঐশ্বর্যের প্রতীক। কিন্তু দার্শনিক অর্থে এটি মানুষের যে কোনো বাহ্যিক অর্জনের প্রতীক হিসেবেও বোঝা যায়। আধুনিক জীবনে অর্থের পাশাপাশি ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা, সামাজিক মর্যাদা, খ্যাতি এবং প্রভাবও ধনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

শ্লোকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে সম্পদকে নিজে নিন্দা করা হয়নি। গীতার দৃষ্টিতে সম্পদ থাকা বা সৎভাবে সম্পদ অর্জন করা অপরাধ নয়। সমস্যার সূচনা হয় তখন যখন সম্পদ মানুষের চেতনার কেন্দ্র হয়ে যায়। একজন মানুষ পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করতে পারেন এবং সেই সম্পদ পরিবার, সমাজ ও মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে পারেন। সেখানে সম্পদ একটি উপায়। কিন্তু যখন সম্পদই মানুষের আত্মপরিচয় হয়ে ওঠে, তখন সম্পদ আর উপায় থাকে না। সেটিই হয়ে ওঠে জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। তখন মানুষ ভাবতে শুরু করে আমি কতটা অর্জন করেছি, অন্যদের তুলনায় আমি কতটা বড় এবং ভবিষ্যতে আমি আরও কতটা পাব।

এই মানসিকতাকে গীতা আসুরী প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত করে। আসুরী মানসিকতা বলতে এখানে কোনো বাহ্যিক জাতি বা সম্প্রদায়কে বোঝানো হচ্ছে না। এটি মানুষের অন্তর্গত একটি মানসিক অবস্থাকে নির্দেশ করে। যে মানসিকতায় অহংকার, লোভ, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, অন্যের প্রতি অবজ্ঞা এবং নিজের ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত মোহ জন্মায়, সেটিই আসুরী প্রবণতা। এই শ্লোকে আমি এবং আমার শব্দের মানসিক পুনরাবৃত্তি সেই প্রবণতাকে স্পষ্ট করে তোলে।

দার্শনিকভাবে দেখলে এই শ্লোক মানুষের আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসে। মানুষ সাধারণত নিজেকে তার দেহ, সম্পদ, সামাজিক অবস্থান, কর্মজীবন এবং অর্জনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। সে মনে করে আমার বাড়ি, আমার অর্থ, আমার ব্যবসা, আমার ক্ষমতা এবং আমার খ্যাতিই আমাকে সংজ্ঞায়িত করে। কিন্তু গীতার আত্মদর্শনের আলোকে এগুলো পরিবর্তনশীল। আজ যা আমার, কাল তা অন্যের হতে পারে। আজ যে সম্পদ আছে, ভবিষ্যতে তা নাও থাকতে পারে। আজ যে সামাজিক মর্যাদা আছে, সময়ের পরিবর্তনে তা হারিয়ে যেতে পারে। তাই পরিবর্তনশীল বস্তুর ওপর স্থায়ী আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করা গভীর অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

বেদান্তের দৃষ্টিতে এই সমস্যার সঙ্গে অবিদ্যার সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে ভুলে বাহ্যিক উপাধির সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে, তখন আমি এবং আমার ধারণা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সম্পদ তখন শুধু একটি বস্তু থাকে না। সেটি আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। তখন সম্পদের বৃদ্ধি নিজের অস্তিত্বের বৃদ্ধি বলে মনে হয় এবং সম্পদের ক্ষয় নিজের অস্তিত্বের ক্ষয় বলে অনুভূত হয়। এই কারণেই বাহ্যিক সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের মনে ভয়, উদ্বেগ এবং অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

যোগদর্শনের আলোকে এই শ্লোককে দেখলে আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তির মনস্তত্ত্ব আরও স্পষ্ট হয়। মন যখন কোনো বস্তুকে সুখের প্রধান উৎস বলে মনে করে, তখন সেই বস্তু লাভের জন্য তার মধ্যে প্রবল আকর্ষণ জন্মায়। বস্তুটি লাভ করলে সাময়িক তৃপ্তি আসে। কিন্তু কিছু সময় পরে সেই তৃপ্তি স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। তখন মানুষ আবার নতুন কিছুর পিছনে ছুটতে থাকে। এভাবেই আকাঙ্ক্ষা, অর্জন এবং নতুন আকাঙ্ক্ষার একটি অন্তহীন চক্র তৈরি হয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মনোরথ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীক। মন নিজের জন্য ভবিষ্যতের একটি কল্পিত জগৎ তৈরি করে। সেখানে মানুষ নিজেকে আরও ধনী, আরও সফল, আরও ক্ষমতাবান এবং আরও সম্মানিত হিসেবে দেখতে চায়। এই কল্পনা তাকে কর্মে উৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু যখন সেই কল্পনার সঙ্গে অতিরিক্ত আসক্তি যুক্ত হয়, তখন বর্তমান মুহূর্তের জীবন মূল্যহীন হয়ে পড়ে। মানুষ বর্তমানকে বাঁচে ভবিষ্যতের একটি কল্পিত অর্জনের জন্য। ফলে যে ভবিষ্যৎ সুখের জন্য সে ছুটছে, সেই সুখের সন্ধানে বর্তমানের শান্তিই হারিয়ে যেতে পারে।

আধুনিক জীবনেও এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীর। একজন ব্যবসায়ী বলতে পারেন আজ আমি একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছি, আগামীতে আরও বড় কোম্পানি তৈরি করব। একজন চাকরিজীবী বলতে পারেন আজ আমি একটি পদ পেয়েছি, ভবিষ্যতে আরও উচ্চ পদে যাব। একজন সামাজিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি বলতে পারেন আজ আমার এত অনুসারী আছে, ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ আমাকে অনুসরণ করবে। বাহ্যিক বিষয় ভিন্ন হলেও মানসিক কাঠামো একই। আজ যা অর্জন করেছি, আগামীতে আরও অর্জন করব। আমার যা আছে, তার সঙ্গে আরও কিছু যুক্ত হবে। এই ধারাবাহিক আকাঙ্ক্ষাই শ্লোকটির অন্তর্নিহিত মনস্তত্ত্ব।

একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায়। একজন মানুষ যদি মনে করেন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ অর্জন করলেই তিনি চিরতরে সুখী হবেন, তবে সেই অর্থ পাওয়ার পরে দেখা যায় তার চাহিদা আরও বেড়ে গেছে। আগে যে বাড়ি যথেষ্ট মনে হতো, পরে তার চেয়ে বড় বাড়ি প্রয়োজন হয়। আগে যে গাড়ি আনন্দ দিত, পরে আরও দামি গাড়ির আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। আগে যে সামাজিক মর্যাদা যথেষ্ট ছিল, পরে আরও বেশি পরিচিতি প্রয়োজন হয়। এভাবে আকাঙ্ক্ষার পাত্র কখনো পূর্ণ হয় না। সমস্যাটি সম্পদের পরিমাণে নয়। সমস্যাটি তৃপ্তির অভাবের মধ্যে।

তবে এই শ্লোকের শিক্ষা সম্পদ ত্যাগ করার আহ্বান নয়। বরং সম্পদের সঙ্গে সঠিক সম্পর্ক স্থাপনের শিক্ষা। মানুষ সম্পদ অর্জন করবে, কর্ম করবে, উন্নতি করবে এবং নিজের ও সমাজের কল্যাণে সম্পদ ব্যবহার করবে। কিন্তু সেই সম্পদ যেন তার অহংকারের ভিত্তি না হয়। সে যেন মনে না করে সম্পদ থাকার কারণে তার অস্তিত্ব অন্য মানুষের চেয়ে বেশি মূল্যবান। সে যেন অর্জনকে নিজের কর্তব্যের ফল হিসেবে গ্রহণ করে এবং অর্জিত বস্তু সম্পর্কে অতিরিক্ত আসক্ত না হয়।

এই শ্লোকের ভাষাগত সৌন্দর্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েকটি সংক্ষিপ্ত শব্দের মাধ্যমে একটি মানুষের সম্পূর্ণ মানসিক জগৎ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ইদম্ তার বর্তমান অধিকারকে প্রকাশ করছে। অদ্য তার বর্তমান অর্জনকে প্রকাশ করছে। ময়া তার অহংকেন্দ্রিক কর্তৃত্বকে প্রকাশ করছে। লব্ধম্ তার অতীত অর্জনকে নির্দেশ করছে। প্রাপ্স্যে তার ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করছে। মনোরথ তার মানসিক বাসনাকে প্রকাশ করছে। মে তার মালিকানাবোধকে প্রকাশ করছে। ভবিষ্যতি তার ভবিষ্যৎ প্রত্যাশাকে নির্দেশ করছে। আর ধনম্ তার সমগ্র আকাঙ্ক্ষার বস্তুগত কেন্দ্রকে প্রকাশ করছে। এভাবে ব্যাকরণ, শব্দার্থ এবং দর্শন একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটি গভীর চরিত্রচিত্রণ তৈরি করেছে।

এই শ্লোকের মূল শিক্ষা তাই বাহ্যিক ধনসম্পদের পরিমাণ নিয়ে নয়। মূল শিক্ষা হলো মানুষের অন্তর্গত চেতনা নিয়ে। একজন মানুষ ধনী হতে পারেন কিন্তু লোভী নাও হতে পারেন। আবার একজন দরিদ্র মানুষও গভীর লোভ ও অহংকারে আবদ্ধ হতে পারেন। তাই গীতার বিচারে আসল প্রশ্ন হলো মানুষের কাছে কত সম্পদ আছে তা নয়, বরং সম্পদের প্রতি তার মনোভাব কেমন। সম্পদ কি তার হাতে আছে, নাকি তার মন সম্পদের হাতে বন্দী হয়ে গেছে।

সবশেষে বলা যায়, ইদমদ্য ময়া লব্ধম্ এই শ্লোকটি মানুষের সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা, অহংকার এবং মালিকানাবোধের এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ। আজ আমি অর্জন করেছি, আগামীকাল আরও অর্জন করব, এটি আমার আছে এবং আরও আমার হবে এই চিন্তার মধ্যে মানুষের বাহ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি তার অন্তর্গত অস্থিরতাও প্রকাশিত হয়েছে। শ্লোকটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সম্পদ জীবনের একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু সম্পদকে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বানালে মানুষ নিজের অন্তরের স্বাধীনতা হারাতে পারে। প্রকৃত সমৃদ্ধি শুধু কত কিছু আমাদের আছে তার মধ্যে নয়। প্রকৃত সমৃদ্ধি হলো যা আছে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, যা অর্জন করি তা ন্যায়ের পথে ব্যবহার করা এবং অর্জিত বস্তুর ঊর্ধ্বে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে উপলব্ধি করা। এই উপলব্ধিই মানুষকে অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে, লোভ থেকে তৃপ্তির দিকে এবং বাহ্যিক সম্পদের মোহ থেকে অন্তরের স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি