ভগবদ্গীতা ১৬.১৪ — অহংকার, ক্ষমতার মোহ, ভোগবাসনা ও আত্মম্ভরিতার আসুরী মানসিকতা
অসৌ ময়া হতঃ শত্রুর্হনিষ্যে চাপরানপি।
ঈশ্বরোহহমহং ভোগী সিদ্ধোহহং বলবান্ সুখী।।১৪।।
অনুবাদঃ অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা মনে করে- “আজ আমার দ্বারা এত লাভ হয়েছে এবং আমার পরিকল্পনা অনুসারে আরও লাভ হবে। এখন আমার এত ধন আছে এবং ভবিষ্যতে আরও ধন লাভ হবে। ঐ শত্রু আমার দ্বারা নিহত হয়েছে এবং অন্যান্য শত্রুদেরও আমি হত্যা করব। আমিই ঈশ্বর, আমি ভোক্তা। আমিই সিদ্ধ, বলবান ও সুখী। আমি সবচেয়ে ধনবান এবং অভিজাত আত্মীয়স্বজন পরিবৃত। আমার মতো আর কেউ নেই। আমি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করব, দান করব এবং আনন্দ করব।” এভাবেই অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা অজ্ঞানের দ্বারা বিমোহিত হয়। নানা প্রকার দুশ্চিন্তায় বিভ্রান্ত হয়ে এবং মোহজালে বিজড়িত হয়ে কামভোগে আসক্তচিত্ত সেই ব্যক্তিরা অশুচি নরকে পতিত হয়।
ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের চতুর্দশ শ্লোকটি মানুষের অহংকার, ক্ষমতার মোহ, ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মম্ভরিতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চিত্র তুলে ধরে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে এমন এক মানুষের অন্তরের ভাষা প্রকাশ করেছেন যে নিজের শক্তি, সম্পদ, সাফল্য এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে নিজের পরিচয় নির্মাণ করেছে। সে মনে করে তার জীবনের সমস্ত সাফল্যের একমাত্র কারণ তার নিজের ক্ষমতা এবং তার সামনে দাঁড়ানো প্রত্যেক মানুষই তার প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই সে বলে, ওই শত্রুকে আমি হত্যা করেছি, অন্য শত্রুদেরও আমি হত্যা করব। আমি ঈশ্বর, আমি ভোগী, আমি সিদ্ধ, আমি বলবান এবং আমি সুখী। এই কথাগুলোর মধ্যে শুধু একজন অহংকারী মানুষের আত্মপ্রশংসা নেই, বরং মানুষের অন্তরে জন্ম নেওয়া এক গভীর আত্মভ্রান্তির ছবি রয়েছে।
শ্লোকের শুরুতেই রয়েছে অসৌ শব্দটি। সংস্কৃত অসৌ অর্থ ওই ব্যক্তি বা ঐ ব্যক্তি। এটি দূরে থাকা কাউকে নির্দেশ করার জন্য ব্যবহৃত একটি নির্দেশবাচক সর্বনাম। এখানে বক্তা তার শত্রুর দিকে ইঙ্গিত করে তাকে নিজের জীবনের একটি প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখছে। তার কাছে সেই মানুষটি আর একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি নয়। সে কেবল এমন একজন, যে তার ক্ষমতা এবং সাফল্যের পথে দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই আসুরী মানসিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। অহংকার যখন মানুষের চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে তখন পৃথিবী তার কাছে সহযোগিতা এবং সহাবস্থানের ক্ষেত্র থাকে না। পৃথিবী হয়ে ওঠে নিজের সঙ্গে অন্যের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র।
এরপর আসে ময়া শব্দটি। ময়া শব্দটি অহম্ অর্থাৎ আমি সর্বনাম থেকে গঠিত এবং এর অর্থ আমার দ্বারা। অসৌ ময়া হতঃ শত্রুঃ অর্থাৎ ওই শত্রু আমার দ্বারা নিহত হয়েছে। এখানে আমি করেছি এই কর্তৃত্ববোধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অহংকারী মানুষের চিন্তার কেন্দ্রে সব সময় আমি অবস্থান করে। আমি করেছি, আমি অর্জন করেছি, আমি জয় করেছি, আমার ক্ষমতা, আমার সম্পদ, আমার সাফল্য। সে নিজের কর্মের পেছনে থাকা অসংখ্য মানুষ, পরিস্থিতি, প্রকৃতি, সমাজ এবং সময়ের অবদানকে ভুলে যায়। ফলে তার ব্যক্তিগত সাফল্য ধীরে ধীরে তার কাছে নিজের সর্বময় ক্ষমতার প্রমাণ হয়ে ওঠে।
হতঃ শব্দটি সংস্কৃত হन् ধাতু থেকে এসেছে। এই ধাতুর অর্থ আঘাত করা, হত্যা করা, ধ্বংস করা অথবা পরাজিত করা। হতঃ অর্থ নিহত, ধ্বংসপ্রাপ্ত অথবা পরাজিত। এই শব্দটি শ্লোকে অতীতের একটি বিজয়কে নির্দেশ করছে। বক্তা বলছে সে ইতিমধ্যে একজন শত্রুকে পরাজিত করেছে। কিন্তু এই বিজয় তার মধ্যে আত্মসংযম সৃষ্টি করেনি। বরং বিজয় তার অহংকারকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানেই শ্লোকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশ পায়। কোনো মানুষ যখন নিজের একটি সাফল্যকে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ বলে মনে করে তখন সেই সাফল্য তাকে বিনয়ী না করে আরও আত্মম্ভরী করে তুলতে পারে।
শত্রুঃ শব্দের অর্থ শত্রু, বিরোধী বা প্রতিপক্ষ। কিন্তু প্রতীকী অর্থে শত্রু বলতে কেবল বাইরের কোনো মানুষকে বোঝানো জরুরি নয়। মানুষের জীবনের শত্রু হতে পারে তার নিজের ক্রোধ, লোভ, মোহ, ভয়, দুর্বলতা, অজ্ঞতা এবং অহংকার। এই শ্লোকে আসুরী মানুষ বাইরের শত্রুকে দেখতে পায়, কিন্তু নিজের অন্তরের শত্রুকে দেখতে পায় না। সে অন্যকে জয় করতে ব্যস্ত থাকে, অথচ নিজের মন তার কাছে অজিতই থেকে যায়। এই কারণেই শ্লোকটির অন্তর্নিহিত ব্যঙ্গ অত্যন্ত গভীর। যে ব্যক্তি নিজেকে সর্বজয়ী মনে করে, সে নিজের অহংকারের কাছেই পরাজিত।
হনিষ্যে শব্দটিও হन् ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ আমি হত্যা করব অথবা আমি ধ্বংস করব। এখানে ভবিষ্যৎকালের একটি দৃঢ় ঘোষণা রয়েছে। বক্তা শুধু অতীতের বিজয়ের কথা বলছে না, ভবিষ্যতের জন্যও আরও সংঘর্ষের পরিকল্পনা করছে। একটি শত্রুকে পরাজিত করার পর তার সামনে আরও শত্রু তৈরি হচ্ছে। অপরান্ শব্দের অর্থ অন্যদের এবং অপি অর্থও বা এমনকি। অপরান্ অপি মিলিয়ে অর্থ দাঁড়ায় অন্যদেরও। এই ছোট্ট অংশটি প্রকাশ করে যে অহংকারের ক্ষুধার কোনো স্বাভাবিক সীমা নেই। একজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করার পর আরেকজন সামনে আসে এবং মানুষ যদি নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করে তাহলে সেই প্রতিযোগিতা কখনো শেষ হয় না।
এরপর শ্লোকটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী আত্মঘোষণার দিকে এগিয়ে যায়। ঈশ্বরোহম্ অর্থ আমি ঈশ্বর। ঈশ্বর শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত ঈশ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। ঈশ্ ধাতুর অর্থ শাসন করা, ক্ষমতা রাখা অথবা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হওয়া। সেই অর্থ থেকে ঈশ্বর শব্দের মধ্যে প্রভু, অধিপতি, নিয়ন্তা এবং ক্ষমতাধর সত্তার ধারণা এসেছে। ভারতীয় দর্শনে ঈশ্বর শব্দটি সর্বোচ্চ নিয়ন্তা বা পরম সত্তার অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এই শ্লোকে একজন অহংকারী মানুষের মুখে ঈশ্বরোহম্ উচ্চারিত হওয়ার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে এটি প্রকৃত ঈশ্বর উপলব্ধির ঘোষণা নয়। বরং এটি এমন এক ব্যক্তির মানসিকতা যে নিজের সীমিত ক্ষমতাকে অসীম কর্তৃত্বের সমতুল্য মনে করেছে।
এই কারণে ঈশ্বরোহম্ শব্দবন্ধটির মধ্যে শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর দার্শনিক সমস্যা নিহিত রয়েছে। মানুষ যখন বলে আমি ঈশ্বর তখন প্রশ্ন ওঠে সেই আমি কে। যদি আমি বলতে শরীর, সম্পদ, পদমর্যাদা, সামাজিক ক্ষমতা, অর্থ, খ্যাতি এবং ব্যক্তিগত সাফল্যকে বোঝানো হয় তবে এই আমি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং সীমিত। কিন্তু অহংকারী ব্যক্তি এই সীমিত আমিকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করে। তার কাছে নিজের ইচ্ছাই নিয়ম, নিজের ক্ষমতাই ন্যায় এবং নিজের আকাঙ্ক্ষাই জীবনের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হয়ে ওঠে। এই আত্মভ্রান্তিই আসুরী সম্পদের অন্যতম লক্ষণ।
এরপর আসে অহং ভোগী। ভোগী শব্দটি ভোগ থেকে এসেছে এবং ভোগ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ভুজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। ভুজ্ ধাতুর অর্থ ভোগ করা, গ্রহণ করা অথবা উপভোগ করা। ভোগী অর্থ যে ভোগ করে। এখানে ব্যক্তি নিজেকে জীবনের ভোগের অধিকারী বলে মনে করছে। সম্পদ, ক্ষমতা, ইন্দ্রিয়সুখ, সম্মান এবং পার্থিব সাফল্য তার কাছে জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে। সে মনে করে জীবনের অর্থ হলো যত বেশি অর্জন করা যায় এবং যত বেশি উপভোগ করা যায়। কিন্তু ভারতীয় দর্শনের গভীর শিক্ষা হলো ভোগের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেই অন্তরের তৃপ্তি বৃদ্ধি পায় না। বরং নিয়ন্ত্রণহীন ভোগ অনেক সময় আকাঙ্ক্ষাকে আরও বৃদ্ধি করে।
সিদ্ধোহম্ শব্দের অর্থ আমি সিদ্ধ অথবা আমি সফল। সিদ্ধ শব্দটি সংস্কৃত সিধ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ সফল হওয়া, সম্পন্ন হওয়া অথবা লক্ষ্যে পৌঁছানো। ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাহিত্যে সিদ্ধ শব্দটি আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত বা সিদ্ধিলাভকারী ব্যক্তিকেও বোঝাতে পারে। কিন্তু এখানে শব্দটি সেই অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এখানে একজন অহংকারী মানুষ তার পার্থিব সাফল্যকে নিজের পূর্ণতার প্রমাণ বলে মনে করছে। সে মনে করে আমি যা চেয়েছি তা পেয়েছি, তাই আমার আর কিছু পাওয়ার নেই এবং আমি সম্পূর্ণ সফল। কিন্তু এই আত্মসন্তুষ্টির মধ্যেই তার অজ্ঞতা লুকিয়ে আছে। কারণ বাহ্যিক সাফল্য এবং অন্তরের পূর্ণতা এক বিষয় নয়।
বলবান্ শব্দটি বল থেকে এসেছে। বল অর্থ শক্তি, সামর্থ্য এবং ক্ষমতা। বলবান্ অর্থ শক্তিশালী বা ক্ষমতাবান। শক্তি নিজে কখনোই খারাপ নয়। শক্তি যদি ন্যায়, সুরক্ষা, সেবা এবং সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত হয় তবে তা মহৎ। কিন্তু যখন শক্তির সঙ্গে বিবেক ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখন শক্তি আধিপত্যের অস্ত্রে পরিণত হয়। এই শ্লোকে বলবান্ শব্দটি সেই আত্মগর্বিত শক্তির প্রতীক। বক্তা নিজের শক্তিকে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করছে। সে মনে করছে শক্তিশালী হওয়া মানেই শ্রেষ্ঠ হওয়া।
সবশেষে আসে সুখী শব্দটি। সুখ শব্দটি ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর ধারণা। প্রচলিত অর্থে সুখ মানে আনন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং তৃপ্তি। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে সুখের প্রকৃতি অনেক বেশি গভীর। বাহ্যিক সম্পদ এবং ইন্দ্রিয়সুখ থেকে যে আনন্দ আসে তা পরিবর্তনশীল। প্রকৃত শান্তি এবং স্থায়ী আনন্দের প্রশ্ন মানুষের অন্তর্জগতের সঙ্গে যুক্ত। এই শ্লোকে সুখী শব্দটি এমন একজন মানুষের আত্মপ্রশংসাকে নির্দেশ করছে যে নিজের ভোগ, সাফল্য এবং ক্ষমতাকেই সুখের উৎস মনে করছে। সে বুঝতে পারছে না যে বাহ্যিক অর্জনের ওপর নির্মিত সুখ হারানোর ভয়ও সঙ্গে নিয়ে আসে।
শ্লোকটির ভাষাগত সৌন্দর্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমে বক্তা বলে আমি একজন শত্রুকে হত্যা করেছি। তারপর বলে আমি অন্য শত্রুদেরও হত্যা করব। এরপর বলে আমি ঈশ্বর। তারপর বলে আমি ভোগী, আমি সিদ্ধ, আমি বলবান এবং আমি সুখী। অর্থাৎ বক্তব্যটি ধীরে ধীরে বাহ্যিক কর্ম থেকে অভ্যন্তরীণ আত্মপরিচয়ের দিকে অগ্রসর হয়েছে। প্রথমে আছে কাজের অহংকার। তারপর আছে ক্ষমতার অহংকার। এরপর আছে ভোগের অহংকার। তারপর আছে সাফল্যের অহংকার। শেষে আছে শক্তি এবং সুখের অহংকার। এই সমগ্র ধারাটির কেন্দ্রে একটি মাত্র ধারণা কাজ করছে এবং সেটি হলো আমি।
এই কারণে এই শ্লোককে অহংকারের একটি পূর্ণাঙ্গ মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকৃতি বলা যায়। অহংকার প্রথমে মানুষকে নিজের কাজের কৃতিত্ব নিতে শেখায়। তারপর নিজের সাফল্যকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বলে মনে করায়। এরপর অন্যদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শেখায়। ধীরে ধীরে সে নিজের ক্ষমতাকে সর্বময় বলে মনে করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত এমন একটি অবস্থায় পৌঁছে যায় যেখানে সে মনে করে তার ইচ্ছাই সর্বোচ্চ সত্য। এই অবস্থায় মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে যায় এবং নিজের অহংকেই নিজের ঈশ্বর বানিয়ে ফেলে।
বেদান্তের দৃষ্টিতে এই বিষয়টি আরও গভীর। এখানে আমি ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আত্মজ্ঞান এবং অহংকারের আমি এক নয়। আত্মজ্ঞান মানুষকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ অনুসন্ধান করতে শেখায়। অহংকার মানুষকে নিজের সীমিত পরিচয়ের সঙ্গে আবদ্ধ করে। আমি শরীর, আমি ধনী, আমি শক্তিশালী, আমি সফল, আমি শ্রেষ্ঠ এই ধারণাগুলো যখন আত্মপরিচয়ের সম্পূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে তখন মানুষ পরিবর্তনশীল জগতের সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে বেঁধে ফেলে। কিন্তু আত্মজ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় আমি আসলে কে। এই প্রশ্ন অহংকারকে ভেঙে দেয় এবং আত্মঅনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়।
সাংখ্যদর্শনের আলোতেও শ্লোকটির গভীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সাংখ্য দর্শনে অহংকার এমন একটি তত্ত্ব যার মাধ্যমে ব্যক্তি আমি এবং আমার ধারণা নির্মাণ করে। আমি কর্তা, আমি ভোগী, আমার শক্তি, আমার সম্পদ এবং আমার সাফল্য এই আত্মপরিচয় যখন অতিরিক্ত দৃঢ় হয় তখন মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপকে ভুলে যায়। শ্লোকে অহং ভোগী এবং ঈশ্বরোহম্ এই দুইটি প্রকাশের মধ্যে সেই কর্তা এবং ভোগী সত্তার প্রবল উপস্থিতি দেখা যায়।
কর্মযোগের আলোতেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কর্ম করা মানুষের কর্তব্য হতে পারে, কিন্তু কর্মের ফলকে নিজের ব্যক্তিগত অহংকারের ভিত্তি করে তোলা কর্মযোগের আদর্শ নয়। অহংকারী ব্যক্তি বলে আমি করেছি। আমি জয় করেছি। আমি ধ্বংস করেছি। অন্যদিকে কর্মযোগ মানুষকে কর্মের মধ্যে কর্তব্য, সংযম এবং অনাসক্তির শিক্ষা দেয়। তাই শ্লোকটি আমাদের সতর্ক করে দেয় যে সাফল্য তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন সাফল্যের সঙ্গে আত্মগর্ব যুক্ত হয়।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায়ও এই শ্লোকের সঙ্গে একটি অতিরঞ্জিত আত্মমহিমাবোধের মিল দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যদি নিজের মূল্যকে কেবল ক্ষমতা, অর্থ, সামাজিক মর্যাদা এবং বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত করে তাহলে তার আত্মপরিচয় বাহ্যিক সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সে অন্যের সাফল্যকে নিজের জন্য হুমকি মনে করতে পারে। সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। পরাজয়কে নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে আঘাত বলে মনে করতে পারে। ফলে তার জীবনে প্রতিযোগিতা, ক্রোধ, ভয় এবং অস্থিরতা বাড়তে পারে। শ্লোকটি এই মানসিক প্রবণতাকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। এখানে শত্রু কেবল বাইরের মানুষ নয়। শত্রু হতে পারে নিজের অজ্ঞতা, লোভ, ক্রোধ, মোহ এবং অহংকার। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের দুর্বলতাকে দেখতে পায় না সে সব সময় বাইরের জগতে শত্রু খুঁজে বেড়ায়। সে মনে করে অন্য মানুষ তার সমস্যার কারণ। অথচ প্রকৃত সমস্যা অনেক সময় তার নিজের মনেই অবস্থান করে। তাই একজন মানুষ যখন বাইরের শত শত্রুকে জয় করেও নিজের ক্রোধ ও অহংকারকে জয় করতে পারে না তখন তার বিজয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বাস্তব জীবনে আমরা এই মানসিকতার বহু উদাহরণ দেখতে পারি। একজন সফল ব্যবসায়ী তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে বলতে পারেন আমি তাকে শেষ করেছি। তারপর আরও কয়েকজন প্রতিযোগীর দিকে তাকিয়ে বলতে পারেন তাদেরও সরিয়ে দেব। ক্রমে তার মনে হতে পারে এই বাজার আমার, আমার মতো শক্তিশালী কেউ নেই এবং আমি যা চাই তাই করতে পারি। তখন ব্যবসায়িক সাফল্য ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত অহংকারে পরিণত হয়। একই ঘটনা রাজনীতি, প্রশাসন, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। সমস্যা সাফল্যে নয়। সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন সাফল্য মানুষের বিবেককে অতিক্রম করে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণে পরিণত হয়।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। কোনো ব্যক্তি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারদিকে তাকিয়ে যদি বলে আমি পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে আছি তবে তার কথাটি তার বর্তমান অবস্থান থেকে সত্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সে যদি সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নেয় যে পৃথিবীতে তার চেয়ে উঁচু আর কিছু নেই তাহলে তার দৃষ্টির সীমাবদ্ধতাকে সে সত্যের সীমা বলে ধরে নিচ্ছে। অহংকারও ঠিক এমনই। নিজের সীমিত অভিজ্ঞতা এবং সাফল্যকে সে সমগ্র সত্য বলে মনে করে। এই কারণেই অহংকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা তার শক্তি নয়, তার অন্ধত্ব।
শ্লোকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত বিজয় বাইরের জগতকে জয় করার মধ্যে নয়, নিজের অন্তর্জগতকে জয় করার মধ্যে। একজন মানুষ অন্যকে পরাজিত করতে পারে, কিন্তু নিজের ক্রোধকে পরাজিত করতে না পারলে সে প্রকৃত অর্থে বিজয়ী নয়। সে সম্পদ অর্জন করতে পারে, কিন্তু লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সে মুক্ত নয়। সে ক্ষমতা অর্জন করতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার মোহকে অতিক্রম করতে না পারলে সে শান্ত নয়। সে অনেক মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কিন্তু নিজের অহংকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারলে তার আত্মজয় সম্পূর্ণ হয় না।
এই দৃষ্টিতে অসৌ ময়া হতঃ শত্রুর্হনিষ্যে চাপরানপি কেবল যুদ্ধ বা শত্রু নিধনের বক্তব্য নয়। এটি মানুষের সেই মানসিকতার প্রতীক যেখানে অন্যের পরাজয় নিজের বিজয়ের শর্ত হয়ে ওঠে। ঈশ্বরোহম্ অহং ভোগী সিদ্ধোহম্ বলবান্ সুখী কেবল আত্মপ্রশংসার বাক্য নয়। এগুলো এমন এক চেতনার প্রকাশ যেখানে মানুষ নিজের ক্ষমতা, ভোগ, সাফল্য এবং সুখকে কেন্দ্র করে নিজের জন্য একটি কৃত্রিম সর্বময় পরিচয় তৈরি করে। সে নিজেকে যত বড় মনে করে তার অন্তরের স্বাধীনতা তত কমে যেতে পারে।
সুতরাং এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা আত্মঅবমাননা নয়, আত্মসচেতনতা। গীতা মানুষকে শক্তিহীন হতে বলে না। সাফল্য ত্যাগ করতে বলে না। ভোগের জগতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতেও বলে না। বরং শিক্ষা দেয় নিজের শক্তির সঙ্গে বিনয়, নিজের সাফল্যের সঙ্গে সংযম, নিজের সম্পদের সঙ্গে দায়িত্ব এবং নিজের কর্মের সঙ্গে আত্মজ্ঞান যুক্ত করতে। যে ব্যক্তি নিজের ক্ষমতাকে ঈশ্বরত্বের অহংকারে পরিণত করে সে আসুরী প্রবণতার দিকে এগিয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি নিজের শক্তিকে সত্য, ন্যায়, কর্তব্য এবং আত্মসংযমের পথে ব্যবহার করে সে নিজের জীবনে অন্য এক উচ্চতর চেতনার প্রকাশ ঘটায়।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকটি মানুষের অহংকারের একটি আয়না। এখানে শত্রু আছে, বিজয় আছে, ক্ষমতা আছে, ভোগ আছে, সাফল্য আছে, শক্তি আছে এবং সুখের দাবি আছে। কিন্তু এই সবকিছুর কেন্দ্রে যে আমি রয়েছে, গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত অনুসন্ধানের বিষয় সেটিই। আমি কি শুধু আমার সাফল্য, সম্পদ, ক্ষমতা এবং পরিচয়ের সমষ্টি, নাকি আমার অস্তিত্বের আরও গভীর কোনো সত্য রয়েছে। বাহ্যিক শত্রুকে পরাজিত করা মানুষকে বিজয়ী করতে পারে, কিন্তু নিজের অহংকারকে অতিক্রম করাই তাকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করে। তাই এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত বাণী হলো বাহ্যিক জয়ের চেয়ে আত্মজয় শ্রেষ্ঠ, ক্ষমতার চেয়ে আত্মসংযম মহত্তর এবং অহংকারের চেয়ে আত্মজ্ঞান অসীমভাবে গভীর।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!