ভগবদ্গীতা ১৬.১৬ — মোহজাল, অসংখ্য চিন্তা, কামভোগের আসক্তি ও আত্মিক পতন
অনেকচিত্তবিভ্রান্তা মোহজালসমাবৃতাঃ।
প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকেহশুচৌ।।১৬।।
অনুবাদঃ অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা মনে করে- “আজ আমার দ্বারা এত লাভ হয়েছে এবং আমার পরিকল্পনা অনুসারে আরও লাভ হবে। এখন আমার এত ধন আছে এবং ভবিষ্যতে আরও ধন লাভ হবে। ঐ শত্রু আমার দ্বারা নিহত হয়েছে এবং অন্যান্য শত্রুদেরও আমি হত্যা করব। আমিই ঈশ্বর, আমি ভোক্তা। আমিই সিদ্ধ, বলবান ও সুখী। আমি সবচেয়ে ধনবান এবং অভিজাত আত্মীয়স্বজন পরিবৃত। আমার মতো আর কেউ নেই। আমি যজ্ঞ অনুষ্ঠান করব, দান করব এবং আনন্দ করব।” এভাবেই অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা অজ্ঞানের দ্বারা বিমোহিত হয়। নানা প্রকার দুশ্চিন্তায় বিভ্রান্ত হয়ে এবং মোহজালে বিজড়িত হয়ে কামভোগে আসক্তচিত্ত সেই ব্যক্তিরা অশুচি নরকে পতিত হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোক মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর সংকটকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় তুলে ধরেছে। শ্লোকটি হলো
এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমন মানুষের মানসিক ও নৈতিক পরিণতির কথা বলেছেন, যার চিত্ত অসংখ্য আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তার দ্বারা বিভ্রান্ত, যে মোহের জালে আবদ্ধ এবং কামনা ও ভোগের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত। এই আসক্তির পরিণতিতে সে অশুচি নরকে পতিত হয়। শ্লোকটির বাহ্যিক অর্থ যতটা সরল, এর অন্তর্নিহিত দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক অর্থ ততটাই গভীর। এখানে মানুষের পতনকে কোনো আকস্মিক ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং দেখানো হয়েছে যে পতন প্রথমে মানুষের চিন্তার জগতে জন্ম নেয়, তারপর তা মোহে পরিণত হয়, মোহ থেকে আসক্তি জন্মায়, আসক্তি মানুষকে কামভোগের অধীন করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অধীনতাই তাকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।
শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো অनेकচিত্তবিভ্রান্তাঃ। শব্দটির মধ্যে রয়েছে अनेक, चित्त এবং विभ्रान्त এই তিনটি ভাব। अनेक অর্থ বহু বা একের অধিক। চিত্ত বলতে মানুষের অন্তর্মন, চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি ও মানসিক প্রবাহকে বোঝায়। বিভ্রান্ত শব্দটি সংস্কৃত √भ्रम् ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে ঘোরা, বিচ্যুত হওয়া এবং পথ হারানোর ভাব রয়েছে। ফলে অনেক চিত্ত বা বহু চিন্তার দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া বলতে কেবল অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করাকে বোঝায় না। এর গভীর অর্থ হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষের মন কোনো কেন্দ্রে স্থির থাকতে পারে না। তার আকাঙ্ক্ষা একদিকে যায়, ভয় অন্যদিকে টানে, লোভ তাকে আরেকদিকে নিয়ে যায় এবং অহংকার তাকে অন্য একটি লক্ষ্যের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে তার চিন্তা বহু দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার অন্তর্গত স্থিরতা নষ্ট হয়।
মানুষের জীবনে চিন্তার সংখ্যা যত বেশি হয় তত বেশি সমস্যা হবে এমন নয়। একজন জ্ঞানী মানুষের মনেও বহু চিন্তা থাকতে পারে। কিন্তু তার চিন্তার মধ্যে একটি কেন্দ্র থাকে, একটি মূল্যবোধ থাকে এবং একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। বিপরীতে যে ব্যক্তি নিজের আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হয়, তার চিন্তার মধ্যে ঐক্য থাকে না। সে একই সঙ্গে অর্থ, ক্ষমতা, সম্মান, ভোগ, প্রশংসা ও প্রতিপত্তি চায়। এক আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হওয়ার আগেই আরেকটি আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ফলে তার মন কখনো সম্পূর্ণ হয় না। এই চিরঅপূর্ণতার মধ্যেই চিত্তের বিভ্রান্তি জন্ম নেয়। আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় এই অবস্থাকে মনোযোগের বিচ্ছিন্নতা, মানসিক অস্থিরতা এবং অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষাজাত বিভ্রান্তির সঙ্গে তুলনা করা যায়।
এরপর শ্লোকে এসেছে মোহজালসমাবৃতাঃ। এটি শ্লোকটির অন্যতম গভীরতম অভিব্যক্তি। মোহ শব্দটির উৎস সংস্কৃত √मुह् ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ধাতুর মধ্যে বিভ্রান্ত হওয়া, বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি হারানো এবং মুগ্ধতার ভাব রয়েছে। তাই মোহ কেবল কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ নয়। মোহ হলো এমন একটি মানসিক আবরণ যার কারণে মানুষ কোনো বিষয়কে তার প্রকৃত স্বরূপে দেখতে পারে না। সে নিজের ইচ্ছা, ভয় ও আকাঙ্ক্ষার আলোকে বাস্তবতাকে দেখতে শুরু করে। তখন সত্যের পরিবর্তে নিজের পছন্দই তার কাছে সত্য বলে মনে হয়।
মোহের সঙ্গে জাল শব্দটি যুক্ত হওয়ায় অর্থটি আরও গভীর হয়েছে। জাল এমন একটি বস্তু যা কাউকে চারদিক থেকে আটকে ফেলে। মোহও তেমনই। একটি ভুল ধারণা যখন মানুষের মনে জন্ম নেয়, তখন সেটি একা থাকে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা, ভয়, অহংকার এবং আসক্তি। ধীরে ধীরে এগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি মানসিক জাল তৈরি করে। মানুষ তখন নিজের তৈরি সেই জালের মধ্যে বন্দী হয়ে যায়। সে মনে করে সে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, অথচ তার সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় তার অচেতন আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। এই কারণেই মোহকে জালের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
সমাবৃত শব্দটির মধ্যেও একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এর অর্থ সম্পূর্ণভাবে আবৃত বা চারদিক থেকে পরিবেষ্টিত। অর্থাৎ মানুষ শুধু মোহ দ্বারা স্পর্শিত নয়, সে মোহের দ্বারা চারদিক থেকে আবৃত। তার চিন্তা, বিচার, আকাঙ্ক্ষা এবং সিদ্ধান্ত সবকিছুর ওপর মোহের প্রভাব পড়েছে। শঙ্করাচার্যের ব্যাখ্যার আলোকে মোহকে অবিবেক ও অজ্ঞান হিসেবে বোঝা যায়। মানুষ যখন নিত্য ও অনিত্য, সত্য ও মিথ্যা, প্রয়োজন ও লালসা এবং আত্মকল্যাণ ও ইন্দ্রিয়সুখের মধ্যে যথার্থ পার্থক্য করতে পারে না, তখন তার জীবন মোহের দ্বারা আবৃত হয়ে পড়ে।
এরপর আসে প্রসক্তাঃ। এই শব্দটি সংস্কৃত √सञ्ज् ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে যুক্ত হওয়া, লেগে থাকা, আঁকড়ে ধরা এবং গভীরভাবে সংযুক্ত হওয়ার ভাব রয়েছে। প্রসক্ত শব্দের অর্থ তাই কেবল কোনো বিষয় পছন্দ করা নয়। বরং এমনভাবে কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া যাতে সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এখানেই সাধারণ ভোগ এবং আসক্ত ভোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মানুষ খাদ্য গ্রহণ করতে পারে, অর্থ উপার্জন করতে পারে, সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং সামাজিক সম্মান লাভ করতে পারে। এগুলো নিজের মধ্যে সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন এসবের কোনো একটি তার জীবনের স্বাধীনতা কেড়ে নেয় এবং তার সুখের একমাত্র উৎস হয়ে ওঠে।
এই প্রসক্তি যখন কামভোগেষু অর্থাৎ কামনাজাত ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন মানুষের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। কাম শব্দের অর্থ শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা নয়। সংস্কৃত সাহিত্যে কাম শব্দের অর্থ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, কামনা এবং ভোগের বাসনা পর্যন্ত বিস্তৃত। গীতার এই প্রসঙ্গে এটি এমন কামনার দিকে নির্দেশ করে যা মানুষকে ইন্দ্রিয়সুখ ও বস্তুগত ভোগের প্রতি গভীরভাবে নির্ভরশীল করে তোলে। মানুষ তখন বস্তু ব্যবহার করে না, বরং বস্তু তার মনকে ব্যবহার করতে শুরু করে। সে অর্থের মালিক নয়, অর্থ তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। সে সম্মান গ্রহণ করে না, বরং সম্মানের ওপর নিজের অস্তিত্ব নির্ভরশীল করে ফেলে। সে ভোগ করে না, বরং ভোগের জন্য বাঁচতে শুরু করে।
এখানে ভোগ শব্দটির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। ভোগের প্রকৃতি হলো সাময়িক আনন্দ প্রদান করা। কিন্তু মানুষ যখন সেই সাময়িক আনন্দকে স্থায়ী সুখের উৎস বলে মনে করে, তখনই সমস্যা সৃষ্টি হয়। একটি নতুন সম্পদ কিছু সময়ের জন্য আনন্দ দিতে পারে, নতুন সম্মান কিছু সময়ের জন্য তৃপ্তি দিতে পারে এবং কোনো ইন্দ্রিয়সুখ কিছু সময়ের জন্য মনকে আনন্দিত করতে পারে। কিন্তু সেই আনন্দের স্থায়িত্ব সীমিত। ফলে মানুষ যখন সেই আনন্দকে পুনরায় পেতে চায়, তখন নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হলে সাময়িক তৃপ্তি আসে, তারপর আবার নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। এইভাবে মানুষ এক আকাঙ্ক্ষা থেকে আরেক আকাঙ্ক্ষায় ঘুরতে থাকে। এই চক্রই তাকে প্রকৃত স্বাধীনতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
শ্লোকের পরবর্তী শব্দ পতন্তি। এটি সংস্কৃত √पत् ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ পতিত হওয়া বা নিচে পড়ে যাওয়া। কিন্তু এখানে পতনকে শুধু বাহ্যিক পতন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রকৃত পতন তার চেতনায় শুরু হয়। যখন তার বিবেক দুর্বল হয়, যখন তার আকাঙ্ক্ষা তার বিচারশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, যখন তার ভোগ তার স্বাধীনতাকে গ্রাস করে এবং যখন তার সুখ বাহ্যিক বস্তুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়, তখন সে অন্তর্গতভাবে পতিত হয়। বাইরে সে হয়তো ধনী, ক্ষমতাবান বা সম্মানিত হতে পারে, কিন্তু ভেতরে সে অস্থির, ভীত, অসন্তুষ্ট ও পরাধীন হয়ে পড়তে পারে।
এই পতনের শেষ পরিণতি হিসেবে শ্লোকে বলা হয়েছে নরকে অশুচৌ। নরক শব্দটি সাধারণভাবে দুঃখ ও শাস্তির এক অবস্থাকে বোঝায় এবং অশুচি অর্থ অপবিত্র বা কলুষিত। ধর্মীয় দৃষ্টিতে নরককে মৃত্যুর পরবর্তী একটি যন্ত্রণাময় অবস্থার অর্থে গ্রহণ করা যায়। কিন্তু দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক অর্থে নরককে মানুষের নিজের অন্তর্জগতের এক যন্ত্রণাময় অবস্থার প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। যে মানুষ সবকিছু পাওয়ার পরও শান্তি পায় না, যে ক্রমাগত অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে, যে নিজের সম্পদ হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত থাকে, যে সম্মান হারানোর ভয়ে অস্থির থাকে এবং যে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তার বাহ্যিক জীবন যতই আকর্ষণীয় হোক তার অন্তর্জগৎ নরকের মতো হয়ে উঠতে পারে।
এই অর্থে নরক কোনো দূরবর্তী জগতের ধারণা মাত্র নয়। নরক মানুষের চেতনার মধ্যেও তৈরি হতে পারে। একজন মানুষ যখন নিজের কামনা পূরণের জন্য ক্রমাগত ছুটতে থাকে, তখন তার মনে এক ধরনের অদৃশ্য আগুন জ্বলতে থাকে। সে ভাবে আরও অর্থ পেলে শান্ত হবে, আরও ক্ষমতা পেলে শান্ত হবে, আরও প্রশংসা পেলে শান্ত হবে, আরও ভোগ করলে শান্ত হবে। কিন্তু প্রত্যেক অর্জনের পর আবার নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ফলে তার জীবনের শান্তি সবসময় ভবিষ্যতের কোনো বস্তু বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত থাকে। সে বর্তমানকে উপভোগ করতে পারে না এবং নিজের অন্তরের পরিপূর্ণতাও উপলব্ধি করতে পারে না। এই অবস্থাই নরকের গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রতীক।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দার্শনিক কাঠামোর মধ্যে এই শ্লোকটি মানুষের পতনের একটি কারণপরম্পরা প্রকাশ করে। প্রথমে আসে অসংখ্য আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তার কারণে চিত্তের বিভ্রান্তি। তারপর সেই বিভ্রান্তি বাস্তবতার ভুল উপলব্ধি সৃষ্টি করে। সেই ভুল উপলব্ধি মোহের জন্ম দেয়। মোহ মানুষকে তার নিজের মানসিক জালে আবদ্ধ করে। সেই আবদ্ধতা কামনার প্রতি আসক্তি তৈরি করে। আসক্তি মানুষকে ভোগের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। ভোগের প্রতি নির্ভরতা তার স্বাধীনতা নষ্ট করে এবং শেষ পর্যন্ত তার পতন ঘটে। অর্থাৎ মানুষের পতন হঠাৎ ঘটে না। পতনের বীজ প্রথমে তার চিন্তায় জন্মায়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই সমস্যার মূল হলো অজ্ঞান ও অবিবেক। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলে বাহ্যিক বিষয়ের সঙ্গে নিজের পরিচয় স্থাপন করে, তখনই কামনা ও আসক্তির জন্ম হয়। সে ভাবে আমি দেহ, আমি সম্পদ, আমি সম্মান, আমি ক্ষমতা এবং এই পরিচয়গুলোকেই নিজের প্রকৃত সত্তা বলে মনে করে। ফলে বাহ্যিক কোনো পরিবর্তন তার অন্তর্গত অস্তিত্বকে নাড়া দেয়। আত্মজ্ঞান সেই ভুল পরিচয়কে সংশোধন করে এবং মানুষকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যে বাহ্যিক বস্তু তার জীবনের উপকরণ হতে পারে, কিন্তু তার প্রকৃত সত্তার বিকল্প হতে পারে না।
যোগদর্শনের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যোগের মূল লক্ষ্য চিত্তের অস্থিরতা প্রশমিত করা। চিত্ত যখন বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষার দ্বারা ক্রমাগত আলোড়িত হয়, তখন মানুষ নিজের অন্তর্গত স্বরূপকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। একদিকে ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ এবং অন্যদিকে অন্তরের অস্থিরতা তাকে বহির্মুখী করে তোলে। তাই এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো চিত্তকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যেখানে মানুষ আকাঙ্ক্ষাকে দেখতে পারে কিন্তু আকাঙ্ক্ষার দাস হয় না।
বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে তুলনা করলেও মোহের ধারণাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বৌদ্ধ দর্শনে মোহ অজ্ঞতা ও বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে বিভ্রান্তির সঙ্গে যুক্ত। যদিও গীতার দর্শন এবং বৌদ্ধ দর্শনের চূড়ান্ত অধিবিদ্যাগত অবস্থান এক নয়, তবুও উভয় ক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য দেখা যায়। মানুষ বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করলে আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তির দ্বারা পরিচালিত হয় এবং সেই আসক্তি তাকে দুঃখের দিকে নিয়ে যায়।
এই শ্লোককে আধুনিক জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্ট হয়। আজকের মানুষ একসঙ্গে অসংখ্য তথ্য, বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভোগের প্রলোভন এবং তুলনার মধ্যে বাস করে। একজন মানুষ অন্যের জীবন দেখে মনে করতে পারে তার নিজের জীবন যথেষ্ট নয়। সে আরও অর্থ, আরও সৌন্দর্য, আরও জনপ্রিয়তা এবং আরও ভোগের আকাঙ্ক্ষা করতে পারে। একসময় সে নিজের জীবনকে আর নিজের চোখে দেখে না। সে অন্যের জীবনকে নিজের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলে। তখন তার চিত্ত অসংখ্য আকাঙ্ক্ষায় বিভ্রান্ত হয় এবং সে নিজের তৈরি মোহের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই আধুনিক পরিস্থিতির মধ্যেও গীতার এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
একটি জালের মধ্যে আটকে পড়া মাছের উপমা এখানে যথার্থ। মাছটি মুক্ত হতে যত বেশি ছটফট করে অনেক সময় তত বেশি জড়িয়ে পড়ে। মানুষের ক্ষেত্রেও তেমন ঘটে। সে নিজের অস্থিরতা দূর করার জন্য আরও ভোগের দিকে ছুটতে পারে। কিন্তু ভোগ দিয়ে ভোগের আকাঙ্ক্ষা শেষ হয় না। বরং নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ফলে মানুষ যে জিনিসকে মুক্তির পথ মনে করে, সেটিই কখনো কখনো তার বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটাই মোহজালের সবচেয়ে গভীর প্রতীকী অর্থ।
তবে এই শ্লোককে ভোগবিরোধী বক্তব্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। গীতার শিক্ষা ভোগের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার শিক্ষা নয়। মূল সমস্যা হলো ভোগের প্রতি অন্ধ আসক্তি। একজন মানুষ অর্থ ব্যবহার করতে পারে কিন্তু অর্থের দাস না হয়েও বাঁচতে পারে। সে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে কিন্তু প্রযুক্তির ওপর নিজের মনকে নির্ভরশীল না করেও বাঁচতে পারে। সে সম্মান পেতে পারে কিন্তু সম্মানকে নিজের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি না করেও বাঁচতে পারে। তাই প্রকৃত প্রশ্ন হলো মানুষ কী ভোগ করছে তা নয়, বরং ভোগের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন।
এই কারণে শ্লোকটির কেন্দ্রে আসলে রয়েছে স্বাধীনতার প্রশ্ন। মানুষ কি নিজের কামনাকে পরিচালনা করতে পারে, নাকি কামনাই তাকে পরিচালনা করে। সে কি নিজের চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, নাকি চিন্তাই তাকে টেনে নিয়ে যায়। সে কি ভোগকে ব্যবহার করতে পারে, নাকি ভোগই তার জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। সে কি নিজের অন্তর্গত মূল্য উপলব্ধি করতে পারে, নাকি বাহ্যিক অর্জনের ওপর নিজের অস্তিত্ব নির্ভরশীল করে রাখে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করে মানুষ মুক্তির দিকে যাচ্ছে, নাকি মোহজালের দিকে।
সুতরাং অनेकচিত্তবিভ্রান্তাঃ মানুষের চিত্তের বিচ্ছিন্নতার প্রতীক, মোহজালসমাবৃতাঃ ভুল উপলব্ধির বন্ধনের প্রতীক, প্রসক্তাঃ আসক্তির প্রতীক, কামভোগেষু আকাঙ্ক্ষা ও ভোগনির্ভর জীবনের প্রতীক এবং পতন্তি নরকে অশুচৌ সেই জীবনপদ্ধতির পরিণত অধঃপতনের প্রতীক। শ্লোকটির প্রতিটি শব্দ যেন মানুষের অন্তর্জগতের একটি একটি স্তর উন্মোচন করে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের বাহ্যিক জীবনের চেয়ে তার অন্তর্গত জীবনের একটি গভীর মানচিত্র। মানুষ যখন অসংখ্য আকাঙ্ক্ষায় নিজের মনকে ছড়িয়ে দেয়, তখন তার চিত্তের ঐক্য নষ্ট হয়। চিত্তের ঐক্য নষ্ট হলে বিচারশক্তি দুর্বল হয়। বিচারশক্তি দুর্বল হলে মোহ জন্ম নেয়। মোহ মানুষকে তার নিজের ভুল ধারণার জালে আবদ্ধ করে। সেই জাল থেকে জন্ম নেয় আসক্তি। আসক্তি তাকে কামভোগের প্রতি নির্ভরশীল করে তোলে। আর যখন মানুষ নিজের সুখ, শান্তি ও পরিচয়কে বাহ্যিক ভোগের সঙ্গে বেঁধে ফেলে, তখন তার স্বাধীনতার পতন ঘটে। সেই পতনই গীতার ভাষায় অশুচি নরকে পতন।
অতএব এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষকে পৃথিবী থেকে পালিয়ে যেতে বলা নয়, বরং নিজের চিত্তকে চিনতে শেখানো। আকাঙ্ক্ষা থাকবে, ভোগ থাকবে, সম্পদ থাকবে, সম্পর্ক থাকবে এবং জীবন তার স্বাভাবিক গতিতে চলবে। কিন্তু মানুষ যেন এগুলোর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে। যে ব্যক্তি নিজের আকাঙ্ক্ষাকে দেখতে পারে কিন্তু তার দ্বারা পরিচালিত হয় না, যে ব্যক্তি ভোগ গ্রহণ করতে পারে কিন্তু ভোগের দাস হয় না এবং যে ব্যক্তি বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের অন্তর্গত স্থিরতা বজায় রাখতে পারে, সেই ব্যক্তি মোহের জাল থেকে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। এই দৃষ্টিতে অनेकচিত্তবিভ্রান্তা মোহজালসমাবৃতাঃ প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকে অশুচৌ কেবল প্রাচীন ধর্মীয় সতর্কবাণী নয়। এটি মানুষের চিরন্তন মানসিক সংকটের এক গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা এবং একই সঙ্গে আত্মসংযম, বিবেক, আত্মজ্ঞান ও অন্তর্গত স্বাধীনতার দিকে ফিরে যাওয়ার এক শক্তিশালী আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!