ভগবদ্গীতা ১৬.১৮ — অহংকার, শক্তির মোহ, কাম, ক্রোধ ও ঈশ্বরবিমুখতার আসুরী প্রকৃতি
অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ।
মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোহভ্যসূয়কাঃ।।১৮।।
অনুবাদঃ অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধকে আশ্রয় করে অসুরেরা স্বীয় দেহে ও পরদেহে অবস্থিত পরমেশ্বর স্বরূপ আমাকে দ্বেষ করে এবং সাধুদের গুণেতে দোষারোপ করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোক মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর ও জটিল অন্ধকারকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্লোকটি হলো “অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ। মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোহভ্যসূয়কাঃ।” এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমন মানুষের চরিত্র ও মানসিক প্রবণতা ব্যাখ্যা করেছেন যারা অহঙ্কার, শক্তির মোহ, দর্প, কামনা এবং ক্রোধকে নিজেদের জীবনের আশ্রয় করে নিয়েছে। তারা নিজের এবং অন্যের দেহে অবস্থিত ঈশ্বরীয় সত্তাকেও বিদ্বেষ করে এবং অন্যের মধ্যে দোষ খুঁজে বেড়ায়। এই কারণে শ্লোকটি শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়। এটি মানুষের অহমিকা, ক্ষমতার মোহ, আকাঙ্ক্ষা, হতাশা, ক্রোধ, ঈর্ষা এবং আধ্যাত্মিক বিচ্ছিন্নতার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অহঙ্কারং। সংস্কৃত অহঙ্কার শব্দটি অহম্ এবং কার এই দুটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। অহম্ অর্থ আমি এবং কার অর্থ করা বা নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই অর্থে অহঙ্কার বলতে আমি বোধের একটি নির্মাণকে বোঝানো যায়। সাধারণ বাংলায় অহঙ্কার বলতে গর্ব, আত্মম্ভরিতা বা নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় মনে করাকে বোঝানো হয়। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে অহঙ্কারের অর্থ আরও গভীর। এখানে অহঙ্কার শুধু আত্মগর্ব নয়। এটি এমন একটি আত্মপরিচয় যেখানে মানুষ দেহ, মন, বুদ্ধি, সম্পদ, ক্ষমতা, জ্ঞান, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয়কে নিজের প্রকৃত সত্তা বলে মনে করে। সে মনে করে আমি কর্তা, আমি ভোক্তা, আমি শক্তিমান, আমি সফল এবং আমার ইচ্ছাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই ভুল আত্মপরিচয় থেকেই ধীরে ধীরে অন্যান্য আসুরী প্রবণতার জন্ম হয়।
অহঙ্কারের পরেই এসেছে বলং। সংস্কৃত বল শব্দের অর্থ শক্তি, সামর্থ্য, ক্ষমতা বা প্রভাব। এই শক্তি শারীরিক হতে পারে, অর্থনৈতিক হতে পারে, রাজনৈতিক হতে পারে কিংবা সামাজিক ও মানসিকও হতে পারে। শক্তি নিজে কোনো দোষ নয়। শক্তি মানুষের কল্যাণেও ব্যবহার করা যায়। কিন্তু যখন শক্তির সঙ্গে অহঙ্কার যুক্ত হয় তখন শক্তি হয়ে ওঠে আধিপত্যের অস্ত্র। মানুষ তখন মনে করে তার ক্ষমতা তাকে অন্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তারের অধিকার দিয়েছে। সে অন্যের মতামতকে তুচ্ছ করে এবং নিজের ক্ষমতাকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থাপন করে। তখন বল আর কেবল শক্তি থাকে না। এটি অহঙ্কারের বাহ্যিক প্রকাশে পরিণত হয়।
এরপর এসেছে দর্পং। দর্প শব্দের অর্থ গর্ব, ঔদ্ধত্য, আত্মম্ভরিতা এবং শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা। অহঙ্কার এবং দর্পের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। অহঙ্কার হলো নিজের সম্পর্কে একটি বিকৃত ধারণা আর দর্প হলো সেই ধারণা থেকে জন্ম নেওয়া প্রকাশ্য ঔদ্ধত্য। অহঙ্কার বলে আমি বিশেষ। দর্প বলে আমি বিশেষ এবং অন্যরা আমার তুলনায় নিচু। একজন মানুষ নিজের জ্ঞান, অর্থ, সৌন্দর্য, পদ, ক্ষমতা কিংবা সাফল্য নিয়ে গর্বিত হতে পারে। কিন্তু যখন সেই গর্ব অন্যকে তুচ্ছ করার মানসিকতায় পরিণত হয় তখন সেটিই দর্প। তাই দর্প হলো অহঙ্কারের সামাজিক ও আচরণগত প্রকাশ।
এরপর এসেছে কামং। কাম শব্দটি সংস্কৃতের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও ব্যাপক অর্থবহ শব্দ। এর অর্থ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, কামনা, ভোগেচ্ছা বা কোনো কিছু পাওয়ার প্রবল বাসনা। ভারতীয় দর্শনে কাম সবসময় নেতিবাচক নয়। মানুষের জীবনে ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার একটি স্বাভাবিক স্থান রয়েছে। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে কাম বলতে এমন আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষকে নিজের ইচ্ছা ও ভোগের কেন্দ্র করে তোলে। তখন মানুষ আর প্রয়োজন ও সংযমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সে যা চায় তা পেতেই হবে বলে মনে করে। তার আকাঙ্ক্ষা যত পূর্ণ হয় তত নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ফলে কামনা ক্রমে তৃপ্তির পরিবর্তে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কামনার সঙ্গে ক্রোধের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। শ্লোকে পরবর্তী শব্দ হলো ক্রোধং। সংস্কৃত ক্রোধ শব্দের মূল অর্থ রাগ, রোষ বা ক্রোধ। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে ক্রোধকে শুধু একটি স্বতন্ত্র আবেগ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। ক্রোধের পেছনে প্রায়ই থাকে অপূর্ণ কামনা এবং আহত অহঙ্কার। মানুষ যখন মনে করে তার ইচ্ছা অবশ্যই পূর্ণ হবে এবং কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি তার সেই ইচ্ছার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখন তার মধ্যে ক্রোধ জন্ম নেয়। সে তখন মনে করে অন্য কেউ তার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। ফলে কামনা থেকে হতাশা এবং হতাশা থেকে ক্রোধের সৃষ্টি হয়। ক্রোধ আবার বিচারবুদ্ধিকে দুর্বল করে এবং মানুষকে বিদ্বেষের দিকে নিয়ে যায়।
এই পাঁচটি শব্দকে একত্রে দেখলে শ্লোকটির অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমে জন্ম নেয় অহঙ্কার। মানুষ নিজের একটি অতিরঞ্জিত পরিচয় তৈরি করে। এরপর সে নিজের শক্তি ও ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। শক্তি তাকে দর্পী করে তোলে। দর্প থেকে জন্ম নেয় নিজের ইচ্ছাকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করার প্রবণতা। সেই প্রবণতা কামনাকে শক্তিশালী করে। কামনা বাধাপ্রাপ্ত হলে ক্রোধ জন্ম নেয়। ক্রোধ থেকে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় এবং বিদ্বেষের ফলে মানুষ অন্যের ভালোতেও দোষ খুঁজতে শুরু করে। এইভাবে একটি ছোট অহমিকা ধীরে ধীরে একটি সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক চরিত্রে পরিণত হতে পারে।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যে সংশ্রিতাঃ শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এর অর্থ আশ্রয় নিয়েছে বা অবলম্বন করেছে। কৃষ্ণ শুধু বলেননি যে এই মানুষের মধ্যে অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধ রয়েছে। তিনি বলেছেন তারা এগুলোর আশ্রয় নিয়েছে। অর্থাৎ এগুলো তাদের জীবনের সাময়িক আবেগ নয়। তারা এই প্রবণতাগুলোকেই নিজেদের জীবন পরিচালনার ভিত্তি করে তুলেছে। মানুষের মনে কখনো অহঙ্কার আসতে পারে, কখনো ক্রোধ আসতে পারে এবং কখনো কামনা জাগতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ যখন এই প্রবণতাগুলোকে নিজের চরিত্রের স্থায়ী ভিত্তিতে পরিণত করে তখন তার জীবনধারা আসুরী প্রকৃতির দিকে অগ্রসর হয়।
এরপর শ্লোকে এসেছে মাম্ আত্মপরদেহেষু। এর অর্থ হলো নিজের এবং অন্যের দেহে অবস্থিত আমাকে। এখানে কৃষ্ণ একটি অত্যন্ত গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করেছেন। মানুষ সাধারণত নিজেকে পৃথক এবং অন্যকে পৃথক বলে মনে করে। অহঙ্কার এই পৃথকত্বকে আরও শক্তিশালী করে। আমি এবং তুমি, আমার এবং তোমার, আমাদের এবং তাদের এই বিভাজন যত তীব্র হয় ততই বিদ্বেষের সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু গীতার আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে প্রত্যেক জীবের অন্তরে ঈশ্বরীয় সত্তার উপস্থিতি রয়েছে। ফলে অন্যকে ঘৃণা করা কেবল অন্য একজন মানুষকে ঘৃণা করা নয়। এর মধ্যে নিজের এবং অন্যের অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক ঐক্যকে অস্বীকার করার প্রবণতাও রয়েছে।
প্রদ্বিষন্তঃ শব্দটির অর্থ যারা বিদ্বেষ করে বা ঘৃণা করে। এর মধ্যে সাধারণ বিরক্তির চেয়ে অনেক গভীর অর্থ রয়েছে। বিদ্বেষ হলো অন্যের অস্তিত্ব, সাফল্য, মতামত কিংবা উপস্থিতির বিরুদ্ধাচরণ। অহঙ্কারী মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করতে গিয়ে অন্যকে শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে। সে মনে করে অন্যের উন্নতি তার নিজের অবনতি। অন্যের সম্মান তার নিজের সম্মানকে কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যের সাফল্য তার নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ। এই মানসিকতা থেকে বিদ্বেষ জন্ম নেয়।
শেষে এসেছে অভ্যসূয়কাঃ। এই শব্দটি পরদোষদর্শন, ঈর্ষা, নিন্দা এবং অন্যের গুণেও দোষ খুঁজে বের করার প্রবণতাকে নির্দেশ করে। একজন মানুষ যখন নিজের অহঙ্কার দ্বারা পরিচালিত হয় তখন অন্যের গুণ তাকে আনন্দ দেয় না। বরং অন্যের সাফল্য তার নিজের অহমিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই সে অন্যের ভালোতেও খারাপ কিছু খুঁজে বের করে। কেউ জ্ঞানী হলে সে বলে তার জ্ঞান অহঙ্কার। কেউ ধনী হলে বলে তার সম্পদ অসৎ পথে অর্জিত। কেউ সৎ হলে তার সততাকেও ভণ্ডামি বলে ব্যাখ্যা করে। এই প্রবণতা মানুষের নিজের অন্তরের অসন্তোষকে অন্যের ওপর নিক্ষেপ করার একটি মানসিক প্রক্রিয়া। এটাই অভ্যসূয়ার গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপ।
এই শ্লোককে অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে দেখলে অহঙ্কারের বিষয়টি আরও গভীর হয়ে ওঠে। অদ্বৈত মতে মানুষের প্রকৃত আত্মা দেহ, মন বা অহঙ্কার নয়। কিন্তু অজ্ঞানের কারণে মানুষ অনাত্মকে আত্মা বলে ভুল করে। সে বলে আমি দেহ, আমি মন, আমি কর্তা, আমি ভোক্তা এবং আমার সম্পদই আমার পরিচয়। এই ভুল আত্মপরিচয়ই অহঙ্কারের মূল। তাই অহঙ্কারকে কেবল গর্ব হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। এটি আত্মার প্রকৃত স্বরূপের ওপর সীমাবদ্ধ পরিচয়ের আরোপ। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলে যায় তখন অন্যের মধ্যেও সেই একই চৈতন্যকে দেখতে পারে না। ফলে আত্মবিভ্রম থেকে অন্যত্ববোধ এবং অন্যত্ববোধ থেকে বিদ্বেষের জন্ম হয়।
সাংখ্য ও যোগ দর্শনের দৃষ্টিতেও অহঙ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সেখানে অহঙ্কার হলো অন্তঃকরণের একটি স্তর যার মাধ্যমে আমি বোধ সৃষ্টি হয়। এই আমি বোধ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও সমস্যা দেখা দেয় যখন মানুষ এই সীমাবদ্ধ আমি বোধকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় বলে মনে করে। তখন সে চৈতন্যের পরিবর্তে দেহ ও মানসিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে এক করে ফেলে। ফলে জন্ম নেয় আসক্তি, ভয়, কামনা এবং ক্রোধ। এই কারণে আধ্যাত্মিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো অহঙ্কারকে ধ্বংস করা নয়, বরং অহঙ্কারের প্রকৃতি বুঝে তাকে অতিক্রম করা।
এই শ্লোকের সঙ্গে আধুনিক মনোবিজ্ঞানেরও একটি আকর্ষণীয় সম্পর্ক রয়েছে। একজন মানুষ যখন নিজের আত্মমূল্যকে সম্পূর্ণভাবে সাফল্য, ক্ষমতা, অর্থ বা সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করে তখন তার আত্মপরিচয় অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে যায়। কেউ তার সমালোচনা করলে সে মনে করে তার অস্তিত্বকে আক্রমণ করা হয়েছে। কেউ তার চেয়ে বেশি সফল হলে সে হুমকি অনুভব করে। তার কোনো ইচ্ছা পূর্ণ না হলে হতাশা জন্ম নেয়। হতাশা ক্রোধে রূপান্তরিত হয়। ক্রোধ অন্যের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করে এবং বিদ্বেষ অন্যের চরিত্রে দোষ খোঁজার প্রবণতা সৃষ্টি করে। এই দৃষ্টিতে গীতার শ্লোকটি মানুষের অহমিকা ও আবেগের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
মহাভারতের চরিত্রগুলোর মধ্যেও এই প্রবণতার সাহিত্যিক প্রকাশ দেখা যায়। বিশেষ করে দুর্যোধনের চরিত্রকে এই শ্লোকের আলোকে বিশ্লেষণ করলে অহঙ্কার, ক্ষমতার মোহ, ঈর্ষা, কামনা এবং ক্রোধের একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। পাণ্ডবদের প্রতি তার ঈর্ষা শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। অন্যের উন্নতি তার নিজের শ্রেষ্ঠত্ববোধকে আহত করত। সে নিজের ক্ষমতা ও রাজকীয় অবস্থানকে ন্যায়ের ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছিল। ফলে তার কামনা বাধাপ্রাপ্ত হলে ক্রোধ জন্ম নিত এবং ক্রোধ ক্রমে বৃহত্তর সংঘাতের দিকে নিয়ে যেত। এই অর্থে মহাভারত মানুষের অন্তর্জগতের দ্বন্দ্বকেও প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে।
তবে গীতার শিক্ষা এই নয় যে শক্তি, সম্পদ, জ্ঞান বা ইচ্ছা নিজেই খারাপ। একজন মানুষের শক্তি থাকতে পারে এবং সেই শক্তি দিয়ে সে অন্যের সেবা করতে পারে। একজন মানুষ ধনী হতে পারে এবং তার সম্পদ দিয়ে সমাজের কল্যাণ করতে পারে। একজন মানুষ জ্ঞানী হতে পারে এবং বিনয়ের সঙ্গে সেই জ্ঞান বিতরণ করতে পারে। সমস্যা শুরু হয় তখন যখন শক্তি অহঙ্কারের সঙ্গে যুক্ত হয়, সম্পদ দর্পের কারণ হয়, জ্ঞান শ্রেষ্ঠত্ববোধ সৃষ্টি করে এবং কামনা মানুষের নৈতিক বিবেচনাকে অতিক্রম করে যায়। তাই গীতার প্রকৃত শিক্ষা বাহ্যিক সম্পদ ত্যাগ নয়। বরং সম্পদের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের ভুল সংযোগ ত্যাগ করা।
এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের অন্তর্জগতের দিকে তাকাতে শেখানো। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কখনো অহঙ্কার আসে, কখনো ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা জাগে, কখনো অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা হয়, কখনো নিজের ইচ্ছা পূরণ না হলে ক্রোধ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই আবেগগুলোর উপস্থিতিই মানুষকে আসুরী করে তোলে না। আসল বিষয় হলো আমরা এগুলোর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক স্থাপন করছি। আমরা কি ক্রোধকে চিনতে পারছি, নাকি ক্রোধকেই নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলছি। আমরা কি কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি, নাকি কামনাই আমাদের জীবন পরিচালনা করছে। আমরা কি নিজের সাফল্যকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করছি, নাকি সেটিকে অন্যকে তুচ্ছ করার কারণ বানাচ্ছি।
এই কারণে শ্লোকটির বিপরীত শিক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অহঙ্কারের বিপরীতে রয়েছে বিনয়। শক্তির দর্পের বিপরীতে রয়েছে দায়িত্ববোধ। কামনার বিপরীতে রয়েছে সংযম। ক্রোধের বিপরীতে রয়েছে শান্তি ও ক্ষমা। বিদ্বেষের বিপরীতে রয়েছে মৈত্রী ও করুণা। অভ্যসূয়ার বিপরীতে রয়েছে পরের গুণকে স্বীকার করার উদারতা। অর্থাৎ গীতার শিক্ষা শুধু নেতিবাচক প্রবণতা পরিত্যাগ করতে বলে না। এটি মানুষের মধ্যে এমন একটি চেতনা গড়ে তুলতে চায় যেখানে সে নিজের মর্যাদা বজায় রেখেও অন্যের মর্যাদাকে সম্মান করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, “অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ” শ্লোকটি মানুষের আত্মবিভ্রম থেকে আত্মবিনাশের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি গভীর মানসিক ও আধ্যাত্মিক মানচিত্র। অহঙ্কার মানুষকে সীমাবদ্ধ আমি বোধের মধ্যে আবদ্ধ করে। শক্তির মোহ তাকে সেই আমিত্বকে প্রতিষ্ঠা করার বাহ্যিক ক্ষমতা দেয়। দর্প তাকে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করায়। কামনা তাকে নিজের ইচ্ছার দাসে পরিণত করে। কামনা বাধাপ্রাপ্ত হলে ক্রোধ জন্ম নেয়। ক্রোধ থেকে বিদ্বেষ আসে এবং বিদ্বেষ মানুষকে অন্যের গুণেও দোষ দেখতে শেখায়। শেষ পর্যন্ত সে নিজের এবং অন্যের অন্তরে বিরাজমান ঐশ্বরিক ঐক্যকে উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
তাই এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের প্রকৃত শত্রু সবসময় বাইরে থাকে না। অনেক সময় মানুষের নিজের বিকৃত অহঙ্কারই তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে। যে অহঙ্কার বলে আমি পৃথক, আমি শ্রেষ্ঠ, আমার ইচ্ছাই শেষ সত্য, সেই অহঙ্কারই ধীরে ধীরে কামনা, ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষার জন্ম দেয়। আর যে চেতনা বলে নিজের মধ্যে যেমন চৈতন্য আছে, অন্যের মধ্যেও তেমনই ঐশ্বরিক সত্তা বিরাজমান, সেই চেতনা মানুষকে বিনয়, সংযম, সহমর্মিতা এবং সমদৃষ্টির দিকে নিয়ে যায়। এই কারণেই ষোড়শ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোক কেবল প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের একটি শ্লোক নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত অহমিকা, ক্ষমতার মোহ, আকাঙ্ক্ষা ও ক্রোধকে চিনে নেওয়ার এবং নিজের চেতনাকে আরও নির্মল ও মানবিক করে তোলার এক চিরন্তন আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!