ভগবদ্গীতা ১৬.১৯ — আসুরী প্রবৃত্তি, নিষ্ঠুরতা, কর্মফল ও অধঃপতনের পুনর্জন্মতত্ত্ব
তানহং দ্বিষতঃ ক্রুরান্ সংসারেষু নরাধমান্।
ক্ষিপাম্যজস্রমশুভানাসুরীষ্বেব যোনিষু।।১৯।।
অনুবাদঃ সেই বিদ্বেষী, ক্রুর ও নরাধমদের আমি এই সংসারেই অশুভ আসুরী যোনিতে অবিরত নিক্ষেপ করি।
ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের উনিশতম শ্লোকটি মানুষের নৈতিক অধঃপতন, আসুরিক প্রবৃত্তি, কর্মফল এবং পুনর্জন্মের গভীর সম্পর্ককে অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “তানহং দ্বিষতঃ ক্রুরান্ সংসারেষু নরাধমান্ ক্ষিপাম্যজস্রমশুভানাসুরীষ্বেব যোনিষু।” অর্থাৎ যারা ঈশ্বরকে দ্বেষ করে, যারা নিষ্ঠুর, মানবসমাজের মধ্যে অধম এবং অশুভ প্রকৃতির, তাদের আমি অবিরত সংসারের মধ্যে আসুরী যোনিতে নিক্ষেপ করি। প্রথম দৃষ্টিতে এই বক্তব্যকে ঈশ্বরের পক্ষ থেকে পাপীর প্রতি শাস্তি হিসেবে মনে হতে পারে। কিন্তু গীতার সামগ্রিক দর্শনের আলোকে বিচার করলে বোঝা যায় যে এখানে কেবল শাস্তির কথা বলা হয়নি। বরং মানুষের অন্তর্গত প্রবৃত্তি, তার কর্ম, চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের মধ্যে যে গভীর কারণ ও ফলের সম্পর্ক রয়েছে, সেই সত্যটিই প্রকাশ করা হয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “দ্বিষতঃ”। এর মূল সংস্কৃত ধাতু হলো √দ্বিষ্, যার অর্থ ঘৃণা করা, বিদ্বেষ করা বা শত্রুতা পোষণ করা। দ্বেষ সাধারণ রাগের তুলনায় গভীরতর একটি মানসিক অবস্থা। রাগ কোনো বিশেষ ঘটনার কারণে সাময়িকভাবে সৃষ্টি হতে পারে এবং পরে দূর হয়ে যেতে পারে। কিন্তু দ্বেষ হলো এমন এক মানসিক প্রবণতা যেখানে ব্যক্তি কোনো মানুষ, মূল্যবোধ, সত্য বা আদর্শের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী বিরাগ পোষণ করে। গীতার এই শ্লোকে দ্বেষ বিশেষভাবে ঈশ্বরীয় সত্য এবং ধর্মের প্রতি বিরোধী মানসিকতাকে নির্দেশ করে। মানুষ যখন নিজের অহংকারকে সত্যের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সত্যকে অস্বীকার করতে শুরু করে, তখন তার চেতনার মধ্যে দ্বেষের বীজ জন্ম নেয়।
এর পরেই এসেছে “ক্রুরান্” শব্দটি। ক্রূর অর্থ নিষ্ঠুর, নির্মম বা কঠোর হৃদয়ের মানুষ। দ্বেষ যখন মানুষের অন্তরে দীর্ঘদিন অবস্থান করে তখন তা ধীরে ধীরে আচরণে প্রকাশিত হয় এবং মানুষকে ক্রূর করে তোলে। যে ব্যক্তি অন্যের কষ্ট অনুভব করতে পারে না, অন্যের অধিকারকে সম্মান করে না এবং নিজের স্বার্থের জন্য অন্যকে আঘাত করতে দ্বিধা করে না, তার মধ্যে এই ক্রূরতা প্রকাশ পায়। ফলে শ্লোকটির শব্দগুলোর মধ্যে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা দেখা যায়। অন্তরের দ্বেষ ধীরে ধীরে বাহ্যিক নিষ্ঠুরতায় রূপান্তরিত হয় এবং নিষ্ঠুরতা ক্রমে মানুষের মানবিক চরিত্রকে ক্ষয় করতে থাকে।
এই প্রসঙ্গে “নরাধমান্” শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। “নর” অর্থ মানুষ এবং “অধম” অর্থ সর্বনিম্ন বা নিকৃষ্ট। নরাধম অর্থ মানুষের মধ্যে অধম। এখানে কাউকে কেবল খারাপ মানুষ বলা হয়নি। বরং বোঝানো হয়েছে এমন মানুষকে, যে নিজের মানবিক সম্ভাবনাকে নিজেই নিচে নামিয়ে দিয়েছে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তার বুদ্ধি, শক্তি বা সম্পদের মধ্যে নয়। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার বিবেক, করুণা, আত্মসংযম, সত্যবোধ এবং ন্যায়বোধের মধ্যে নিহিত। যখন একজন মানুষ এই গুণগুলোকে পরিত্যাগ করে কেবল অহংকার, লোভ, হিংসা এবং স্বার্থপরতার দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন সে বাহ্যিকভাবে মানুষ থাকলেও তার আচরণে মানবিকতার অধঃপতন ঘটে। এই কারণেই নরাধম শব্দটি গভীর নৈতিক তাৎপর্য বহন করে।
শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “সংসারে”। সংসার শব্দটির উৎস সংস্কৃত সম্ এবং √সৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে প্রবাহমানতা, অবিরাম চলাচল এবং পুনরাবৃত্ত অস্তিত্বের ধারণা রয়েছে। ভারতীয় দর্শনে সংসার কেবল দৈনন্দিন পারিবারিক জীবন নয়। এটি জন্ম, মৃত্যু, কর্ম, কর্মফল এবং পুনর্জন্মের অবিরাম চক্র। জীব তার কর্ম ও প্রবৃত্তির দ্বারা এই চক্রের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। তাই শ্লোকে যখন বলা হচ্ছে যে আসুরিক মানুষদের সংসারে নিক্ষেপ করা হয়, তখন এর মধ্যে এমন এক অস্তিত্বের ধারাবাহিকতার কথা রয়েছে যেখানে মানুষের কর্ম ও চেতনা তার ভবিষ্যৎ গতিকে প্রভাবিত করে।
“ক্ষিপামি” শব্দটির মধ্যেও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এর মূল ধাতু হলো √ক্ষিপ্, যার অর্থ নিক্ষেপ করা, ছুড়ে দেওয়া বা ফেলে দেওয়া। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলেন “আমি নিক্ষেপ করি”। এই শব্দটি পতনের তীব্রতা প্রকাশ করে। মানুষ যখন ক্রমাগত অশুভ কর্ম, দ্বেষ, নিষ্ঠুরতা এবং অহংকারকে নিজের জীবনে পোষণ করে, তখন সে নিজের চেতনার স্তরকে এমনভাবে নিচে নামিয়ে আনে যে তার পরবর্তী অস্তিত্বও সেই প্রবৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঈশ্বরকে এখানে কোনো ব্যক্তিগত ক্রোধে শাস্তিদাতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে মহাজাগতিক নৈতিক নিয়মের অধিষ্ঠাতা হিসেবে দেখা যায়। মানুষের কর্ম তার গতিপথ তৈরি করে এবং ঈশ্বরীয় বিধান সেই কর্মফলের উপযুক্ত পরিণতির সঙ্গে তাকে যুক্ত করে।
“অজস্রম্” শব্দের অর্থ অবিরত, অনবরত বা নিরন্তর। এই শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বোঝায় যে কর্মফলের প্রক্রিয়া আকস্মিক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটি প্রবৃত্তি যদি বারবার চর্চা করা হয়, তাহলে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। অভ্যাস থেকে চরিত্র তৈরি হয় এবং চরিত্র মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনকে প্রভাবিত করে। এই অর্থে মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের অস্তিত্বের উপর একটি ছাপ রেখে যায়। একবারের ভুলের চেয়ে দীর্ঘদিনের প্রবৃত্তি অনেক বেশি শক্তিশালীভাবে মানুষের চরিত্রকে নির্মাণ করে।
“অশুভান্” শব্দটি গঠিত হয়েছে “অ” এবং “শুভ” থেকে। শুভ অর্থ মঙ্গল, কল্যাণ, সৌন্দর্য বা হিতকর। তার বিপরীত হলো অশুভ। কিন্তু অশুভকে কেবল ধর্মীয় পাপের অর্থে সীমাবদ্ধ করলে শব্দটির গভীরতা কমে যায়। যা ব্যক্তি ও সমাজের প্রকৃত কল্যাণকে নষ্ট করে, যা সত্য ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে যায় এবং যা অন্যের জীবন ও মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা বৃহত্তর অর্থে অশুভ। অর্থাৎ অশুভতা কেবল একটি কাজের মধ্যে নয়, মানুষের জীবনদৃষ্টির মধ্যেও অবস্থান করতে পারে।
এরপর এসেছে “আসুরীষু” শব্দটি। আসুরী শব্দটি অসুর থেকে এসেছে। গীতার ষোড়শ অধ্যায়ে অসুর কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা পৌরাণিক দানবগোষ্ঠীর পরিচয় মাত্র নয়। এটি একটি মানসিক ও নৈতিক প্রবৃত্তির প্রতীক। অহংকার, দম্ভ, লোভ, কামনা, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিক সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা আসুরিক প্রকৃতির লক্ষণ। মানুষের মধ্যে দেবত্ব ও আসুরিকতা উভয় সম্ভাবনাই থাকতে পারে। তাই আসুরিকতা কোনো বাহ্যিক পরিচয় নয়। এটি মানুষের অন্তরের একটি প্রবণতা, যা তার চিন্তা, ইচ্ছা এবং কর্মের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
“যোনিষু” শব্দটির অর্থ জন্মস্থান, গর্ভ, উৎপত্তির আধার বা জন্মের ক্ষেত্র। তাই “আসুরীষু যোনিষু” অর্থ আসুরী জন্মক্ষেত্রসমূহে। ভারতীয় পুনর্জন্মতত্ত্বের আলোকে এর অর্থ এমন জন্ম বা অস্তিত্ব যেখানে পূর্বকর্ম ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আসুরিক জীবন প্রকাশ পায়। তবে এই ধারণাকে প্রতীকী অর্থেও বোঝা যায়। মানুষ বর্তমান জীবনেই এমন এক মানসিক জগতে প্রবেশ করতে পারে যেখানে ঘৃণা, হিংসা, প্রতারণা এবং নিষ্ঠুরতা তার স্বাভাবিক পরিবেশ হয়ে ওঠে। তখন তার জীবন এক অর্থে আসুরী যোনিতে পরিণত হয়। সে এমন এক চেতনার মধ্যে জন্ম নেয় যেখানে অশুভকে স্বাভাবিক এবং শুভকে দুর্বলতা বলে মনে হয়।
এই শ্লোকের দার্শনিক গভীরতা এখানেই যে ঈশ্বর মানুষের উপর ইচ্ছামতো শাস্তি আরোপ করছেন, এমন সরল ধারণা এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং কর্ম ও চরিত্রের একটি গভীর নিয়ম এখানে কাজ করছে। মানুষ যা বারবার করে, ধীরে ধীরে সে তেমনই হয়ে ওঠে। তার চিন্তা তার কর্মকে প্রভাবিত করে, কর্ম তার অভ্যাস তৈরি করে, অভ্যাস তার চরিত্র নির্মাণ করে এবং চরিত্র তার ভবিষ্যৎ জীবন ও অস্তিত্বের গতিকে প্রভাবিত করে। এই দৃষ্টিতে কর্মফল কোনো আকস্মিক শাস্তি নয়। এটি মানুষের নিজের নির্বাচিত পথের স্বাভাবিক পরিণতি।
এই সত্যকে একটি বীজের উপমা দিয়ে বোঝা যায়। একটি ছোট বীজ মাটিতে পড়ে প্রথমে খুব সামান্য কিছু বলে মনে হয়। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেই বীজ থেকে বৃক্ষ জন্মায়। একইভাবে মানুষের মনে দ্বেষের একটি ছোট বীজ জন্মালে এবং তাকে বারবার চিন্তা, কথা ও কাজের মাধ্যমে পুষ্ট করা হলে তা ক্রোধে পরিণত হতে পারে। ক্রোধ থেকে প্রতিহিংসা জন্ম নিতে পারে। প্রতিহিংসা থেকে নিষ্ঠুরতা এবং নিষ্ঠুরতা থেকে এমন এক চরিত্র তৈরি হতে পারে যেখানে অন্যের কষ্ট আর বিবেককে স্পর্শ করে না। তখন মানুষ শুধু কিছু খারাপ কাজ করেনি, বরং সে নিজেকেই এক ধরনের অশুভ অস্তিত্বে রূপান্তরিত করেছে।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ব্যাখ্যা সম্ভব। মানুষ যদি দীর্ঘদিন ঘৃণা, হিংসা এবং প্রতিশোধের চিন্তা পোষণ করে, তাহলে তার দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। সে অন্য মানুষের মধ্যে ভালো দিক দেখতে অক্ষম হয়ে পড়তে পারে। সন্দেহ, রাগ এবং প্রতিহিংসা তার স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে। ফলে সে এমন এক মানসিক জগতে বসবাস করতে শুরু করে যেখানে শান্তি ও সহমর্মিতার স্থান সংকুচিত হয়। এই মানসিক অবস্থাকেও প্রতীকীভাবে আসুরী যোনি বলা যেতে পারে।
শ্লোকটির সঙ্গে মহাভারতের চরিত্রগুলোরও একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দুর্যোধনের চরিত্রকে উদাহরণ হিসেবে নিলে দেখা যায় যে ঈর্ষা, অহংকার, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিহিংসা ধীরে ধীরে তার বিচারবোধকে আচ্ছন্ন করেছিল। তার সমস্যা কেবল কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তার প্রবৃত্তিগুলো ক্রমে তার চরিত্রকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিল যে ন্যায়ের কথাও তার কাছে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে মনে হতে থাকে। এই দৃষ্টিতে মহাভারতের চরিত্রগুলোকে মানুষের অন্তর্গত প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবেও পড়া যায়।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত আত্মসমীক্ষার শিক্ষা। এটি কেবল অন্যকে অসুর হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য নয়। বরং প্রত্যেক মানুষকে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে বলে। আমার মধ্যে কি অকারণ দ্বেষ আছে। আমি কি অন্যের কষ্টকে উপেক্ষা করি। আমার অহংকার কি সত্যকে গ্রহণ করতে বাধা দেয়। আমি কি নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের অধিকারকে নষ্ট করতে প্রস্তুত। আমি কি ক্রোধ ও প্রতিহিংসাকে নিজের চরিত্রের অংশ করে তুলছি। এই প্রশ্নগুলোই শ্লোকটিকে জীবন্ত করে তোলে।
শ্লোকটির বিপরীত শিক্ষা গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের দৈবী সম্পদের মধ্যে পাওয়া যায়। আসুরিকতার বিপরীতে রয়েছে নির্ভয়তা, অন্তরের শুদ্ধতা, আত্মসংযম, সত্য, দয়া, অহিংসা, নম্রতা এবং করুণা। অর্থাৎ মানুষকে শুধু অশুভ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাকে এমন গুণও অর্জন করতে বলা হয়েছে যা তার চেতনাকে উন্নত করে। দ্বেষের পরিবর্তে মৈত্রী, নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে করুণা, অহংকারের পরিবর্তে বিনয় এবং অজ্ঞানের পরিবর্তে জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের জীবন অন্যদিকে প্রবাহিত হয়।
এই কারণে “তানহং দ্বিষতঃ ক্রুরান্ সংসারেেষু নরাধমান্” শ্লোকটি কেবল পরজন্মের কোনো ভয়াবহ পরিণতির কথা বলে না। এটি মানুষের বর্তমান চরিত্রের মধ্যেই ভবিষ্যতের বীজ দেখতে শেখায়। মানুষ আজ যে চিন্তা পোষণ করছে, যে কাজ করছে এবং যে প্রবৃত্তিকে শক্তিশালী করছে, তার মধ্যেই তার আগামী দিনের সত্তার আকার লুকিয়ে আছে। সে যদি ঘৃণাকে পোষণ করে, তাহলে ঘৃণাই তার চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করবে। সে যদি করুণাকে পোষণ করে, তাহলে করুণাই তার চরিত্রের শক্তিতে পরিণত হবে।
সুতরাং এই শ্লোকের ভাষাগত, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্যকে একত্র করলে একটি গভীর সত্য প্রকাশ পায়। মানুষ শুধু তার কাজের ফল ভোগ করে না, সে তার কাজের দ্বারা নিজেকেও নির্মাণ করে। দ্বেষ থেকে নিষ্ঠুরতা, নিষ্ঠুরতা থেকে মানবিকতার অবক্ষয়, অবক্ষয় থেকে অশুভ জীবন এবং অশুভ জীবন থেকে আসুরিক অস্তিত্বের দিকে যে গতি, গীতা সেই গতির ব্যাপারে সতর্ক করেছে। একই সঙ্গে শ্লোকটি মানুষকে জানায় যে এই অধঃপতন অনিবার্য নয়। চেতনার দিক পরিবর্তন করা সম্ভব। মানুষ যদি নিজের অন্তরের দ্বেষকে চিনতে পারে, অহংকারকে সংযত করতে পারে, করুণাকে বিকশিত করতে পারে এবং সত্য ও ধর্মের দিকে নিজেকে পরিচালিত করতে পারে, তাহলে তার অস্তিত্বও উচ্চতর পথে অগ্রসর হতে পারে।
শেষ বিচারে এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত ভাগ্য তার বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে তার অন্তর্গত চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। “দ্বিষতঃ” আমাদের সতর্ক করে দ্বেষ সম্পর্কে, “ক্রুরান্” সতর্ক করে নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে, “নরাধমান্” স্মরণ করিয়ে দেয় মানবিকতার মর্যাদা, “অশুভান্” দেখায় কল্যাণবিরোধী জীবনের বিপদ এবং “আসুরীষু যোনিষু” আমাদের সামনে তুলে ধরে সেই অস্তিত্বের পরিণতি যেখানে আসুরিক প্রবৃত্তি নিজের পূর্ণতা লাভ করে। তাই শ্লোকটি ভয়ের শিক্ষা নয়, বরং আত্মজাগরণের শিক্ষা। এটি আমাদের বলে যে মানুষের প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিটি কর্ম তার ভবিষ্যৎ সত্তার দিকে একটি পদক্ষেপ। সেই কারণে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা হলো নিজের অন্তরকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তার মধ্যে দ্বেষের পরিবর্তে প্রেম, নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে করুণা, অহংকারের পরিবর্তে বিনয় এবং অজ্ঞানের পরিবর্তে জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন মানুষ কেবল সংসারের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী একটি জীব থাকে না, বরং নিজের চেতনাকে উন্নত করে মুক্তির পথের দিকে অগ্রসর হওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!