ভগবদ্গীতা ১৬.২ — অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, দয়া ও দৈবী চরিত্রের অন্তর্গত গুণাবলি
অহিংসা সত্যমক্রোধস্ত্যাগঃ শান্তিরপৈশুনম্।
দয়া ভূতেষ্বলোলুপ্ত্বং মার্দবং হ্রীরচাপলম্।।২।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন-হে ভারত! ভয়শূন্যতা, সত্তার পবিত্রতা, পারমার্থিক জ্ঞানের অনুশীলন, দান, আত্মসংযম, যজ্ঞ অনুষ্ঠান, বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়ন, তপশ্চর্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্যবাদিতা, ক্রোধশূন্যতা, বৈরাগ্য, শান্তি, অন্যের দোষ দর্শন না করা, সমস্ত জীবে দয়া, লোভহীনতা, মৃদুতা, লজ্জা, অপচলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, শৌচ, মাৎসর্য শূন্যতা, অভিমান শূন্যতা- এই সমস্ত গুণগুলি দিব্যভাব সমন্বিত ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়।
এই শ্লোকে এমন কয়েকটি গুণের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি তার অন্তর্জগতকেও নির্মল করে। অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, ত্যাগ, শান্তি, পরনিন্দাহীনতা, সকল জীবের প্রতি দয়া, লোভহীনতা, কোমলতা, নৈতিক লজ্জাবোধ এবং চঞ্চলতাহীনতা এই গুণগুলোর সমন্বয়ে এমন এক চরিত্র গড়ে ওঠে, যেখানে শক্তি ও কোমলতা, সত্য ও দয়া, কর্তব্য ও ত্যাগ এবং আত্মসংযম ও স্বাধীনতা একসঙ্গে অবস্থান করে।
অহিংসা শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং হিংসা থেকে। সংস্কৃত হিংসা শব্দের মূল অর্থ আঘাত করা, ক্ষতি করা বা পীড়ন করা। তাই অহিংসার সরল অর্থ হলো হিংসা না করা। কিন্তু গীতার আলোকে অহিংসার অর্থ আরও বিস্তৃত। শুধু কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত না করাই অহিংসা নয়। চিন্তায় বিদ্বেষ না রাখা, বাক্যে অকারণে কাউকে অপমান না করা এবং কর্মের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে কারও ক্ষতি না করাও অহিংসার অন্তর্ভুক্ত। এই অর্থে অহিংসা মানুষের চিন্তা, বাক্য ও কর্মের পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে কাউকে আঘাত না করেও তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করতে পারে অথবা কটু কথা বলে তাকে মানসিকভাবে আহত করতে পারে। তাই প্রকৃত অহিংসা মানুষের অন্তরের পরিবর্তনের দাবি করে।
সত্য শব্দটির গভীরে রয়েছে অস্তিত্বের ধারণা। সংস্কৃত সত্য শব্দটি সত্ এর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সত্ এর মূল ভাব হলো যা আছে বা যা বাস্তব। তাই সত্য কেবল মিথ্যার বিপরীত কোনো বক্তব্য নয়। সত্য হলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা। মানুষের চিন্তা, বাক্য ও কর্মের মধ্যে যখন সামঞ্জস্য সৃষ্টি হয় তখন তার চরিত্রে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ কেবল সত্য কথা বলে না, সে সত্যকে নিজের জীবনযাপনের ভিত্তি করে তোলে। তার অন্তরে যা, কথায় তা এবং কর্মেও তার প্রতিফলন থাকে। এই কারণে গীতার সত্য একটি গভীর নৈতিক আদর্শ।
অক্রোধ শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং ক্রোধ থেকে। ক্রোধের মূল ধারণার মধ্যে রয়েছে রাগ, উত্তেজনা এবং প্রতিশোধের প্রবণতা। অক্রোধ অর্থ ক্রোধের দ্বারা পরিচালিত না হওয়া। এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষের মনে কখনো রাগের অনুভূতি সৃষ্টি হবে না। রাগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। কিন্তু সেই রাগ যখন বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ করে দেয় এবং মানুষকে অন্যায় আচরণে পরিচালিত করে তখন তা ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। অক্রোধ হলো সেই অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে রাগ অনুভূত হলেও মানুষ রাগের দাস হয় না। সে আবেগকে দেখে, বোঝে এবং সংযতভাবে তার প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করে।
ত্যাগ শব্দটি সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ ছেড়ে দেওয়া বা পরিত্যাগ করা। কিন্তু গীতার দর্শনে ত্যাগ মানে কেবল সংসার বা সম্পদ পরিত্যাগ করে দূরে চলে যাওয়া নয়। মানুষ তার কর্তব্য পালন করেও ত্যাগী হতে পারে। যখন সে নিজের কর্মের ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি পরিত্যাগ করে এবং কর্তব্যকে কর্তব্যের জন্য পালন করে, তখন সেখানে প্রকৃত ত্যাগের প্রকাশ ঘটে। ত্যাগ মানুষের কর্মকে দুর্বল করে না বরং তাকে অধিক স্বাধীন করে। ফলের অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত মানুষ নিজের কাজের প্রতি আরও মনোযোগী ও নিষ্ঠাবান হতে পারে।
শান্তি শব্দের সঙ্গে প্রশমন ও স্থিরতার ধারণা যুক্ত। প্রকৃত শান্তি কেবল বাইরের সংঘর্ষের অনুপস্থিতি নয়। মানুষের চারপাশে কোনো যুদ্ধ না থাকলেও তার মনে যদি ভয়, ঈর্ষা, লোভ ও ক্রোধের ঝড় চলতে থাকে তাহলে তার অন্তরে শান্তি নেই। গীতার শান্তি হলো এমন এক অন্তর্গত স্থিরতা যেখানে মন বাহ্যিক পরিস্থিতির দ্বারা সহজে বিপর্যস্ত হয় না। সুখ এলে মানুষ অহংকারে ভেসে যায় না এবং দুঃখ এলে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না। তার মধ্যে একটি গভীর মানসিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।
অপৈশুনম্ শব্দটি পরনিন্দা, চোগলখোরি, অন্যের দোষ প্রচার এবং মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার প্রবণতার বিপরীত। একজন মানুষ শারীরিকভাবে কাউকে আঘাত না করেও তার সম্মান নষ্ট করতে পারে। কারও সম্পর্কে মিথ্যা কথা ছড়ানো, এক ব্যক্তির কথা অন্য ব্যক্তির কাছে এমনভাবে বলা যাতে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয় অথবা কারও দুর্বলতাকে উপহাসের বিষয় করে তোলা মানুষের সামাজিক জীবনে গভীর ক্ষতি সৃষ্টি করে। তাই অপৈশুন্য আসলে বাক্যের অহিংসা। অন্যের সম্মান রক্ষা করাও নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দয়া ভূতেষু এই শ্লোকের অন্যতম সুন্দর অভিব্যক্তি। দয়া অর্থ করুণা ও সহমর্মিতা এবং ভূত শব্দটি সমস্ত অস্তিত্বশীল জীবের প্রতি নির্দেশ করে। ফলে দয়া ভূতেষু অর্থ সমস্ত জীবের প্রতি দয়া। এখানে কেবল মানুষের প্রতি সহানুভূতির কথা বলা হয়নি। সমস্ত জীবনের প্রতি সম্মান ও মমত্বের কথা বলা হয়েছে। যে ব্যক্তি অন্যের কষ্ট অনুভব করতে পারে, সে নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে পৃথিবীকে দেখতে শেখে। দয়া মানুষের হৃদয়কে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে এবং তাকে বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে।
অলোলুপ্ত্বম্ শব্দের মধ্যে লোভহীনতা ও অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষার অনুপস্থিতির ভাব রয়েছে। মানুষের কাছে যত বেশি সম্পদ থাকে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তার আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি। একজন মানুষের কাছে অনেক কিছু থাকতে পারে কিন্তু যদি তার মন সর্বদা আরও বেশি পাওয়ার জন্য অস্থির থাকে তাহলে সে প্রকৃত অর্থে তৃপ্ত নয়। অলোলুপ্ত্ব মানুষকে শেখায় প্রয়োজন এবং লোভের মধ্যে পার্থক্য করতে। এটি সম্পদবিরোধী শিক্ষা নয় বরং সম্পদের প্রতি দাসত্ববিরোধী শিক্ষা। মানুষ সম্পদ ব্যবহার করবে কিন্তু সম্পদ যেন মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ না করে।
মার্দব শব্দের মূল ভাব কোমলতা। মৃদু থেকে মার্দবের ধারণা এসেছে। কিন্তু এই কোমলতা দুর্বলতার প্রতীক নয়। একজন মানুষের মধ্যে শক্তি থাকতে পারে অথচ সে কোমলভাবে আচরণ করতে পারে। প্রকৃত শক্তির একটি পরিচয় হলো নিজের ক্ষমতাকে অন্যকে অপমান বা দমন করার জন্য ব্যবহার না করা। কঠোর হওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যখন মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী কোমলতা বেছে নেয় তখন তার চরিত্রে মার্দব প্রকাশ পায়।
হ্রী শব্দটি নৈতিক লজ্জা ও অন্তরের সংকোচের সঙ্গে যুক্ত। এটি এমন এক বিবেকবোধ যা মানুষকে অন্যায় কাজ করতে বাধা দেয়। সমাজের ভয়ে মানুষ অন্যায় থেকে বিরত থাকতে পারে কিন্তু তার চেয়েও গভীর হলো নিজের বিবেকের কাছে লজ্জিত হওয়ার ক্ষমতা। হ্রী মানুষের অন্তরে একটি নৈতিক প্রহরীর মতো কাজ করে। কোনো অন্যায় করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি মানুষ মনে করে যে কাজটি তার মর্যাদা ও বিবেকের বিরুদ্ধে, তখন হ্রী তার চরিত্রকে রক্ষা করে।
অচাপলম্ শব্দের অর্থ চঞ্চলতা ও অস্থিরতার অনুপস্থিতি। চাপল্য মানে অপ্রয়োজনীয় ছটফটানি, হঠকারিতা এবং অস্থিরতা। অচাপল্য তাই শুধু শরীরকে স্থির রাখার শিক্ষা নয়। এটি মন, বাক্য ও আচরণের স্থিরতার শিক্ষা। যে মানুষ প্রতিটি উত্তেজনায় সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায়, সে সহজেই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়। কিন্তু যে ব্যক্তি চিন্তা করে কথা বলে, বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং আবেগের মুহূর্তেও নিজের ভারসাম্য বজায় রাখে, তার মধ্যে অচাপল্য প্রকাশ পায়।
এই গুণগুলোকে একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায় যে শ্লোকটি মানুষের চরিত্রের বিভিন্ন স্তরকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অহিংসা অন্যের ক্ষতি থেকে বিরত রাখে। সত্য মানুষকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে। অক্রোধ আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। ত্যাগ আসক্তিকে শিথিল করে। শান্তি মনকে স্থির করে। অপৈশুন্য সামাজিক সম্পর্ককে কলুষমুক্ত রাখে। দয়া হৃদয়কে প্রসারিত করে। অলোলুপ্ত্ব আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে। মার্দব আচরণকে কোমল করে। হ্রী বিবেককে জাগ্রত রাখে। অচাপল্য মানুষকে স্থির ও সংযত করে। অর্থাৎ এই শ্লোক মানুষের বাহ্যিক আচরণ থেকে শুরু করে তার গভীরতম মানসিক প্রবণতা পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র নির্মাণের পথ নির্দেশ করে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের একটি বিশেষ তাৎপর্য হলো এখানে নৈতিকতাকে বাহ্যিক নিয়মের বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি। নৈতিকতা মানুষের অন্তর্গত চরিত্রের অংশ। আইন না থাকলেও যে ব্যক্তি অন্যায় করে না, অন্যকে কষ্ট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও যে ব্যক্তি তা করে না এবং প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি সংযম বেছে নেয়, তার নৈতিকতা বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভর করে না। তার নৈতিকতা তার নিজের সত্তার অংশ হয়ে ওঠে। গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত উন্নতি তাই কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, সেই জ্ঞানকে চরিত্রে রূপান্তর করা।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির শিক্ষা গভীর। অহিংসা আক্রমণাত্মক প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অক্রোধ আবেগ নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। ত্যাগ অতিরিক্ত আসক্তি কমায়। শান্তি মানসিক স্থিতি সৃষ্টি করে। দয়া সহমর্মিতা বাড়ায়। অলোলুপ্ত্ব অতৃপ্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অচাপল্য মনোযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের ভাষায় প্রকাশিত এই গুণগুলো মানুষের সুস্থ সামাজিক ও মানসিক জীবনের জন্য আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
সাহিত্য ও প্রতীকের দিক থেকে এই শ্লোককে মানুষের অন্তর্জগতের একটি মানচিত্র হিসেবেও দেখা যায়। অহিংসা হলো হাতের সংযম। সত্য হলো বাক্যের পবিত্রতা। অক্রোধ হলো আবেগের নিয়ন্ত্রণ। ত্যাগ হলো আসক্তির বন্ধন ছিন্ন করা। শান্তি হলো মনের নির্মলতা। অপৈশুন্য হলো কথার মাধ্যমে অন্যকে আঘাত না করা। দয়া হলো হৃদয়ের প্রসার। অলোলুপ্ত্ব হলো আকাঙ্ক্ষার উপর স্বাধীনতা। মার্দব হলো শক্তির মধ্যে কোমলতা। হ্রী হলো বিবেকের জাগরণ। অচাপল্য হলো চিত্তের স্থিরতা। এই সব গুণ একত্রিত হলে মানুষ কেবল ভালো আচরণকারী ব্যক্তি হয় না, বরং তার চরিত্রের গভীরে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিপক্বতা সৃষ্টি হয়।
বাস্তব জীবনের একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যায়। ধরুন কর্মক্ষেত্রে একজন সহকর্মী আপনার সম্পর্কে অন্যায়ভাবে কিছু বলেছে। আপনি চাইলে তার বিরুদ্ধে একইভাবে অপমানজনক কথা ছড়াতে পারেন। এতে প্রতিশোধের সাময়িক তৃপ্তি আসতে পারে কিন্তু সম্পর্কের সংঘাত আরও বাড়বে। অন্যদিকে আপনি যদি সত্য বিষয়টি শান্তভাবে ব্যাখ্যা করেন, অপ্রয়োজনীয় পরনিন্দা না করেন এবং নিজের কর্তব্য ঠিকভাবে পালন করেন তাহলে সেখানে অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, শান্তি এবং অপৈশুন্য একসঙ্গে প্রকাশ পায়। আবার একজন মানুষের যথেষ্ট সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যদি সে অতিরিক্ত ভোগের পেছনে নিজের সমগ্র জীবন ব্যয় না করে এবং প্রয়োজনের বাইরে অন্যের কল্যাণের কথা ভাবে, সেখানে ত্যাগ, দয়া ও অলোলুপ্ত্ব প্রকাশ পায়।
মানুষের মনকে যদি একটি বাগানের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে এই শ্লোকের গুণগুলো সেই বাগানের পরিচর্যার বিভিন্ন উপায়ের মতো। অহিংসা হলো কাঁটা না লাগানো। সত্য হলো নির্মল আলো। অক্রোধ হলো আগুনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। ত্যাগ হলো অপ্রয়োজনীয় আগাছা সরিয়ে ফেলা। শান্তি হলো স্বচ্ছ জল। দয়া হলো ফুলের সৌরভ। অলোলুপ্ত্ব হলো অতিরিক্ত লোভে বাগান নষ্ট না করা। মার্দব হলো কোমল পাতা। হ্রী হলো নিজের ভুল চিনতে পারার ক্ষমতা। অচাপল্য হলো মাটির গভীরে থাকা শক্ত শিকড়। এই সবকিছু মিলেই মানুষের চরিত্রের বাগানকে সুন্দর ও ফলপ্রসূ করে তোলে।
এই শ্লোকে ব্যবহৃত অ উপসর্গগুলোর মধ্যেও একটি গভীর ভাষাগত ও দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে। অহিংসা, অক্রোধ, অপৈশুন্য, অলোলুপ্ত্ব এবং অচাপল্য শব্দগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক প্রবণতার অনুপস্থিতিকে ইতিবাচক নৈতিক গুণে রূপান্তর করেছে। এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ পায়। আত্মশুদ্ধি মানে সবসময় নতুন কিছু অর্জন করা নয়। কখনো কখনো আত্মশুদ্ধি হলো নিজের মধ্যে থাকা হিংসা, ক্রোধ, পরনিন্দা, লোভ ও অস্থিরতাকে সরিয়ে দেওয়া। মানুষের অন্তর যখন অপ্রয়োজনীয় প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হয় তখন তার প্রকৃত স্বভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, অহিংসা সত্যমক্রোধস্ত্যাগঃ শান্তিরপৈশুনম্ শ্লোকটি মানুষের জন্য কেবল একটি নৈতিক আচরণবিধি নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। এখানে বলা হয়েছে কেমন হলে মানুষ নিজের শক্তিকে সংযত করতে পারে, সত্যকে ধারণ করতে পারে, ক্রোধকে অতিক্রম করতে পারে, আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারে, অন্যের প্রতি দয়াশীল হতে পারে এবং নিজের অন্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার বাহ্যিক ক্ষমতা, সম্পদ বা সাফল্যের মধ্যে নয়, বরং সে নিজের চিন্তা, আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, বাক্য ও কর্মকে কতটা নির্মল ও সংযত করতে পেরেছে তার মধ্যে। যে মানুষ শক্তিশালী হয়েও অহিংস, সত্যবাদী হয়েও কোমল, কর্মঠ হয়েও আসক্তিহীন, সম্পদশালী হয়েও লোভহীন এবং জ্ঞানী হয়েও বিনয়ী হতে পারে, গীতার দৃষ্টিতে সেই মানুষই প্রকৃত অর্থে দৈবী সম্পদের অধিকারী। এই কারণেই শ্লোকটির শিক্ষা প্রাচীন সময়ের ধর্মীয় পরিসর অতিক্রম করে আজও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক আচরণ এবং আত্মিক বিকাশের ক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!