সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৬.২২ — কাম, ক্রোধ ও লোভ ত্যাগে আত্মকল্যাণ ও পরম গতি লাভের পথ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্নরঃ।আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়স্ততো যাতি পরাং গতিম্।।২২।।
এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্নরঃ।
আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়স্ততো যাতি পরাং গতিম্।।২২।।

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! এই তিন প্রকার তমোদ্বার থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ আত্মার শ্রেয় আচরণ করেন এবং তার ফলে পরাগতি লাভ করে থাকেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের বাইশতম শ্লোক মানবজীবনের অন্তর্গত দুর্বলতা, আত্মসংযম এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, কাম, ক্রোধ ও লোভ এই তিনটি আত্মবিনাশের দ্বার। যে মানুষ এই তিনটি অন্ধকারের দ্বার থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে, সে নিজের প্রকৃত কল্যাণের পথে চলতে সক্ষম হয় এবং শেষ পর্যন্ত পরম গতি লাভ করে। এই শিক্ষার গভীরতা কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নৈতিক সিদ্ধান্ত, মানসিক শান্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং আত্মউন্নতির ক্ষেত্রেও এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

শ্লোকটির সূচনা হয়েছে এতৈর্বিমুক্তঃ শব্দ দিয়ে। এতৈঃ শব্দটি সংস্কৃত এতদ্ সর্বনাম থেকে এসেছে এবং এর অর্থ এইগুলি বা এই তিনটি। এখানে পূর্ববর্তী শ্লোকে উল্লিখিত কাম, ক্রোধ ও লোভকে বোঝানো হয়েছে। বিমুক্তঃ শব্দটি গঠিত হয়েছে বি উপসর্গ এবং মুচ্ ধাতুর সঙ্গে ক্ত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে। মুচ্ ধাতুর অর্থ মুক্ত করা, ছেড়ে দেওয়া বা বন্ধন থেকে অব্যাহতি দেওয়া। বি উপসর্গ যুক্ত হওয়ায় এর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বা সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হওয়ার ভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে এতৈর্বিমুক্তঃ বলতে বোঝায় এই তিনটি প্রবল অন্তর্গত বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া। এখানে মুক্তি কোনো বাহ্যিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার বিষয় নয়। এটি মানুষের নিজের মনকে কামনা, ক্রোধ ও লোভের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার কথা বলে।

শ্লোকে কৌন্তেয় শব্দটির ব্যবহারও অর্থপূর্ণ। কৌন্তেয় অর্থ কুন্তীর পুত্র। কৃষ্ণ অর্জুনকে এই নামে সম্বোধন করে যেন তার মধ্যে নিহিত মহত্ত্ব এবং আত্মিক সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। মানুষ কেবল তার দুর্বল প্রবৃত্তির সমষ্টি নয়। তার মধ্যে আত্মসংযম, বিবেক, জ্ঞান এবং উচ্চতর জীবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। তাই কাম, ক্রোধ ও লোভকে অতিক্রম করার আহ্বান আসলে মানুষের নিজের উচ্চতর সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান।

তমোদ্বারৈস্ত্রিভিঃ পদবন্ধটির মধ্যেও অসাধারণ প্রতীকী শক্তি রয়েছে। তমঃ অর্থ অন্ধকার এবং দ্বার অর্থ প্রবেশপথ। এই দুইয়ের সমন্বয়ে তমোদ্বার অর্থ দাঁড়ায় অন্ধকারে প্রবেশের দ্বার। তিনটি দ্বার হলো কাম, ক্রোধ ও লোভ। অন্ধকার এখানে শুধু রাতের অন্ধকার নয়। এটি অজ্ঞানতা, বিবেকের আচ্ছন্নতা, আত্মবিস্মৃতি এবং নৈতিক অধঃপতনের প্রতীক। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত কল্যাণ ভুলে ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিহিংসা এবং অসীম অর্জনের নেশার দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন তার চেতনা ক্রমে অন্ধকারের দিকে চলে যায়। কৃষ্ণ তাই এই তিন প্রবৃত্তিকে সরাসরি অন্ধকারের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

কাম শব্দটির অর্থ সাধারণভাবে আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা। তবে গীতার প্রেক্ষাপটে কাম বলতে শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা বোঝায় না। যে কোনো সীমাহীন ভোগের আকাঙ্ক্ষা, অতিরিক্ত ক্ষমতার বাসনা, প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করার বাসনা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট বস্তু না পেলে সুখী হওয়া অসম্ভব মনে করা কামনার বিস্তৃত অর্থের মধ্যে পড়ে। মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন থাকা দোষ নয়। সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন প্রয়োজন আকাঙ্ক্ষায় এবং আকাঙ্ক্ষা আসক্তিতে পরিণত হয়। তখন মানুষ বস্তুকে ব্যবহার করে না, বরং বস্তু এবং আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে পরিচালনা করতে শুরু করে।

কামের পরেই আসে ক্রোধ। মানুষের আকাঙ্ক্ষা যখন কোনো বাধার সম্মুখীন হয়, তখন হতাশা জন্মায় এবং সেই হতাশা অনেক সময় ক্রোধে রূপান্তরিত হয়। একজন মানুষ যা চেয়েছিল তা পেল না, কেউ তার ইচ্ছার বিরোধিতা করল, তার অহংকারে আঘাত লাগল কিংবা তার প্রত্যাশা পূরণ হলো না, তখন তার অন্তরে ক্রোধের জন্ম হতে পারে। ক্রোধের বিশেষ বিপদ হলো এটি মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে। ক্রুদ্ধ মানুষ অনেক সময় এমন কথা বলে বা এমন কাজ করে যার জন্য পরে তাকে অনুতপ্ত হতে হয়। ফলে ক্রোধ প্রথমে অন্যকে আঘাত করার ইচ্ছা সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত নিজের শান্তি এবং বিবেককেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

লোভ হলো এই ধারার আরেকটি গভীর স্তর। লোভের মূল বৈশিষ্ট্য হলো যা আছে তা কখনো যথেষ্ট মনে না হওয়া। প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পরও যখন মানুষ আরও চায় এবং সেই আরও চাওয়ার কোনো সীমা থাকে না, তখন তা লোভে পরিণত হয়। লোভ শুধু অর্থের ক্ষেত্রে প্রকাশ পায় না। ক্ষমতা, সম্মান, জনপ্রিয়তা, সামাজিক মর্যাদা এবং অন্যের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও লোভ দেখা দিতে পারে। একজন মানুষের অনেক কিছু থাকার পরও যদি তার মনে ক্রমাগত আরও পাওয়ার অস্থিরতা থাকে, তাহলে বাহ্যিক সমৃদ্ধির মধ্যেও তার অন্তর দরিদ্র থেকে যায়।

কাম, ক্রোধ ও লোভকে তিনটি পৃথক প্রবৃত্তি হিসেবে দেখা গেলেও বাস্তবে তারা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষ কোনো কিছু কামনা করে। সেই কামনা পূরণে বাধা এলে ক্রোধ জন্মায়। আর কোনো কিছু অর্জন করার পর সেটিকে হারানোর ভয় এবং আরও অর্জনের আকাঙ্ক্ষা থেকে লোভ জন্ম নিতে পারে। আবার লোভ নতুন কামনাকে জন্ম দেয়। এভাবে একটি চক্র তৈরি হয় যার মধ্যে মানুষ ক্রমাগত ঘুরতে থাকে। এই কারণেই কৃষ্ণ তাদের শুধু দোষ হিসেবে চিহ্নিত করেননি। তিনি তাদের দ্বার বলেছেন। কারণ এগুলো এমন প্রবেশপথ যা মানুষকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে নরঃ অর্থাৎ মানুষ। এই শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ এমন এক প্রাণী যে নিজের প্রবৃত্তিকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং নিজের আচরণ সম্পর্কে বিচার করতে পারে। তার মধ্যে কামনা আছে, কিন্তু সে কামনাকে বিচার করতে পারে। তার মধ্যে ক্রোধ আছে, কিন্তু সে ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তার মধ্যে লোভের প্রবণতা থাকতে পারে, কিন্তু সে নিজের সীমা নির্ধারণ করতে পারে। এই আত্মসচেতনতার ক্ষমতাই মানুষকে অন্য অনেক প্রাণী থেকে পৃথক করে। তাই গীতার শিক্ষা মানুষের স্বাধীন নির্বাচন এবং নৈতিক দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আচরতি শব্দটি এসেছে চর্ ধাতু থেকে, যার অর্থ চলা, গমন করা এবং আচরণ করা। এর মধ্যে শুধু কোনো বিষয় জানা নয়, বাস্তবে সেই অনুযায়ী জীবনযাপন করার অর্থ রয়েছে। কৃষ্ণ এখানে শুধু কাম, ক্রোধ ও লোভ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের কথা বলেননি। তিনি বলেছেন আত্মনঃ শ্রেয়ঃ আচরতি। অর্থাৎ মানুষ নিজের প্রকৃত কল্যাণের পথে জীবন পরিচালনা করে। জ্ঞান তখনই অর্থপূর্ণ হয় যখন তা আচরণে প্রকাশ পায়। একজন মানুষ জানে যে ক্রোধ ক্ষতিকর, কিন্তু প্রতিবার ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সেই জ্ঞান তার জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে না।

আত্মনঃ শব্দটি আত্মন্ থেকে এসেছে এবং এর অর্থ নিজের, স্বয়ং বা আত্মার। আর শ্রেয়ঃ অর্থ প্রকৃত কল্যাণ, মঙ্গল বা সর্বোচ্চ উন্নতি। শ্রেয়ঃ শব্দটির সঙ্গে প্রেয়ঃ ধারণাটির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রেয়ঃ হলো যা এই মুহূর্তে আনন্দদায়ক বা আকর্ষণীয়। শ্রেয়ঃ হলো যা দীর্ঘমেয়াদে সত্যিকার কল্যাণ বয়ে আনে। একজন শিক্ষার্থীর কাছে সারাদিন বিনোদনে সময় কাটানো আনন্দদায়ক হতে পারে, কিন্তু অধ্যয়ন তার ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য অধিক কল্যাণকর। অতএব বিনোদন প্রেয়ঃ হতে পারে এবং অধ্যয়ন শ্রেয়ঃ হতে পারে। গীতা মানুষকে বারবার প্রশ্ন করতে শেখায় যে সে শুধু যা ভালো লাগে তা বেছে নেবে, নাকি যা সত্যিই তার জীবনকে উন্নত করে তা বেছে নেবে।

এই শ্রেয়ঃ ধারণাটিই শ্লোকটির নৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে। মানুষ যা চায় তা সবসময় তার জন্য ভালো নয়। কোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়া মানেই কল্যাণ লাভ করা নয়। কখনো কখনো কোনো ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করাই প্রকৃত কল্যাণের পথ। কখনো কোনো ক্রোধকে প্রকাশ না করে সংযত করাই শ্রেয়। কখনো অতিরিক্ত সম্পদ বা ক্ষমতার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সীমার মধ্যে থাকা শ্রেয়। তাই শ্রেয়ঃ হলো এমন এক জীবনবোধ যেখানে তাৎক্ষণিক আনন্দের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সত্য, নৈতিকতা এবং আত্মিক উন্নতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শ্লোকের শেষাংশে এসেছে ততো যাতি পরাং গতিম্। ততঃ অর্থ তারপর এবং যাতি এসেছে যা ধাতু থেকে যার অর্থ যাওয়া, অগ্রসর হওয়া বা পৌঁছানো। পরাং গতিম্ অর্থ পরম গতি বা সর্বোচ্চ গন্তব্য। এই পরম গতি শুধু কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়। আধ্যাত্মিক অর্থে এটি আত্মজ্ঞান, মোক্ষ, ঈশ্বরপ্রাপ্তি বা চেতনার সর্বোচ্চ অবস্থাকে নির্দেশ করতে পারে। মনস্তাত্ত্বিক অর্থে এটি এমন এক অবস্থাও হতে পারে যেখানে মানুষ আর নিজের নিম্নতর প্রবৃত্তির দাস নয়। সে নিজের মনকে বুঝতে শেখে, ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে শেখে।

বেদান্তীয় দৃষ্টিতে এই শিক্ষা আরও গভীর। মানুষের প্রকৃত সমস্যা কেবল কাম, ক্রোধ ও লোভ নয়। এগুলোর গভীরে রয়েছে আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতা। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, মন, সম্পদ, ক্ষমতা বা সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখে, তখন তার মধ্যে আমার এবং আমার চাই এই ধারণা শক্তিশালী হয়। সেখান থেকেই আসক্তি জন্ম নেয়। আত্মজ্ঞান মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে যে সে তার আকাঙ্ক্ষা নয়, সে তার ক্রোধ নয় এবং সে তার সম্পদও নয়। এই উপলব্ধি যত গভীর হয়, ততই তার মধ্যে বিমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

যোগদর্শনের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। মানুষের মন নানা আকাঙ্ক্ষা, বিরাগ এবং প্রবৃত্তির দ্বারা আলোড়িত হয়। আত্মসংযমের উদ্দেশ্য সেই মনকে জোর করে ধ্বংস করা নয়, বরং তাকে সচেতনতার অধীনে আনা। কামকে অস্বীকার না করে তাকে বোঝা, ক্রোধকে দমন না করে তার কারণ উপলব্ধি করা এবং লোভকে ন্যায্যতা না দিয়ে তার সীমাহীন প্রকৃতি চিনতে পারাই আত্মসংযমের পরিণত রূপ। তখন মানুষ নিজের প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত না হয়ে নিজের বিবেক ও জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত হয়।

সাহিত্যিক দৃষ্টিতে অন্ধকারের তিনটি দ্বার একটি অসাধারণ রূপক। কল্পনা করা যায়, মানুষের সামনে একটি অন্ধকার নগরী এবং তার তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। সেই তিনটি দরজা হলো কাম, ক্রোধ ও লোভ। মানুষ চাইলে সেখানে প্রবেশ করতে পারে এবং চাইলে ফিরে আসতে পারে। এই রূপকের মধ্যে মানুষের নৈতিক স্বাধীনতার ধারণা রয়েছে। কৃষ্ণ মানুষকে কেবল ভয় দেখাচ্ছেন না। তিনি তাকে সচেতন করছেন যে পতনেরও কিছু নির্দিষ্ট প্রবেশপথ আছে। যে মানুষ সেই পথগুলো চিনে ফেলতে পারে, তার পক্ষে সেগুলো এড়িয়ে চলা সহজ হয়।

আধুনিক জীবনে এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত বেশি। একজন ব্যবসায়ী যখন প্রয়োজনীয় লাভের পরও সীমাহীন লাভের জন্য অন্যায় পথে যেতে শুরু করেন, সেখানে লোভ কাজ করতে পারে। একজন মানুষ যখন নিজের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় সম্পর্কের মানুষটির প্রতি অকারণে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন, সেখানে কামনা ও ক্রোধের সম্পর্ক দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যখন সামাজিক মাধ্যমে অন্যের প্রশংসা, স্বীকৃতি এবং জনপ্রিয়তার জন্য ক্রমাগত অস্থির হয়ে থাকেন, তখনও কামনার সূক্ষ্ম রূপ কাজ করতে পারে। তাই গীতার এই শিক্ষা প্রাচীন কোনো বিমূর্ত নীতি নয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন মানসিক জীবনের একটি গভীর পর্যবেক্ষণ।

এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মুক্তি মানে পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। সংসার ত্যাগ করলেই মানুষ কাম, ক্রোধ ও লোভ থেকে মুক্ত হয়ে যায় না। কেউ নির্জন স্থানে থেকেও নিজের আকাঙ্ক্ষার দাস হতে পারে। আবার কেউ সংসারের মধ্যেই থেকে সংযমী, জ্ঞানী এবং শান্তচিত্ত হতে পারে। প্রকৃত প্রশ্ন মানুষ কোথায় আছে তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো তার মন কোন শক্তির অধীনে আছে। যে মানুষ নিজের অন্তরের প্রবৃত্তিকে দেখতে পারে এবং সেই প্রবৃত্তির দ্বারা অন্ধভাবে পরিচালিত না হয়ে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার মধ্যেই প্রকৃত মুক্তির সূচনা ঘটে।

এই কারণে এতৈর্বিমুক্তঃ শব্দটি শুধু একটি ব্যাকরণগত পদ নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শনের দরজা খুলে দেয়। বিমুক্ত হওয়া মানে নিজের ভিতরের অন্ধকারকে অস্বীকার করা নয়। বরং সেই অন্ধকারের উৎসকে চিনে তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক পরিবর্তন করা। কামকে চিনতে হবে, ক্রোধের কারণ বুঝতে হবে এবং লোভের সীমাহীন প্রকৃতি উপলব্ধি করতে হবে। তারপর প্রেয়ঃ এবং শ্রেয়ঃ এর মধ্যে পার্থক্য করে শ্রেয়ঃকে বেছে নিতে হবে। কারণ মানুষের প্রকৃত উন্নতি শুরু হয় তখনই যখন সে তাৎক্ষণিক আকর্ষণের পরিবর্তে সত্যিকারের কল্যাণকে বেছে নিতে শেখে।

সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানুষের অন্তর্জীবনের একটি গভীর মানচিত্র। কাম মানুষকে আকাঙ্ক্ষার বন্ধনে আবদ্ধ করে, ক্রোধ তার বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে এবং লোভ তাকে কখনো তৃপ্ত হতে দেয় না। এই তিনটি যখন মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন তার চেতনা অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু মানুষ যদি এই তিন প্রবৃত্তিকে চিনতে পারে, তাদের দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে এবং নিজের প্রকৃত শ্রেয়সের পথে জীবন পরিচালিত করতে পারে, তাহলে তার সামনে উচ্চতর জীবনের পথ উন্মুক্ত হয়। পরাং গতিম্ তাই শুধু মৃত্যুর পরের কোনো অজানা গন্তব্য নয়। এটি মানুষের চেতনার ঊর্ধ্বগতি, আত্মসংযমের পরিণতি, আত্মজ্ঞান লাভের সম্ভাবনা এবং নিজের প্রকৃত সত্তার দিকে প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নয়, নিজের অন্তরের সেই প্রবৃত্তিগুলোর সঙ্গে যা তাকে তার সত্য, শান্তি এবং শ্রেয়স থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যে মানুষ সেই অন্তর্দ্বারগুলিকে চিনে তাদের অতিক্রম করতে পারে, তার জীবন ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অস্থিরতা থেকে শান্তির দিকে এবং সীমাবদ্ধতা থেকে পরম গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি