ভগবদ্গীতা ১৬.৩ — তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, শৌচ, বিদ্বেষহীনতা ও অহংকারমুক্ত দৈবী চরিত্র
তেজঃ ক্ষমা ধৃতিঃ শৈৗচমদ্রোহো নাতিমানিতা।
ভবন্তি সম্পদং দৈবীমভিজাতস্য ভারত।।৩।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন-হে ভারত! ভয়শূন্যতা, সত্তার পবিত্রতা, পারমার্থিক জ্ঞানের অনুশীলন, দান, আত্মসংযম, যজ্ঞ অনুষ্ঠান, বৈদিক শাস্ত্র অধ্যয়ন, তপশ্চর্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্যবাদিতা, ক্রোধশূন্যতা, বৈরাগ্য, শান্তি, অন্যের দোষ দর্শন না করা, সমস্ত জীবে দয়া, লোভহীনতা, মৃদুতা, লজ্জা, অপচলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, শৌচ, মাৎসর্য শূন্যতা, অভিমান শূন্যতা- এই সমস্ত গুণগুলি দিব্যভাব সমন্বিত ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়।
ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান দৈবী গুণাবলির একটি অত্যন্ত গভীর পরিচয় দিয়েছেন। শ্লোকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো “তেজঃ ক্ষমা ধৃতিঃ শৌচমদ্রোহো নাতিমানিতা”। এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে মানুষের চরিত্র গঠন, নৈতিকতা, আত্মসংযম, মানসিক দৃঢ়তা, অন্তরের পবিত্রতা, অন্যের প্রতি বিদ্বেষহীনতা এবং অহংকারমুক্ত জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন নিহিত রয়েছে। এগুলি বাহ্যিক আচরণের কিছু বিচ্ছিন্ন গুণ নয়। বরং মানুষের অন্তর্জগতকে পরিশুদ্ধ করে তাকে উচ্চতর মানবিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি মৌলিক শক্তি।
প্রথম শব্দটি হলো তেজঃ। সংস্কৃত তেজস্ শব্দটি মূলত তিজ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ধাতুর মধ্যে তীক্ষ্ণতা, দীপ্তি, প্রখরতা ও শক্তির ভাব নিহিত রয়েছে। তাই তেজ শব্দের আক্ষরিক অর্থ দীপ্তি, জ্যোতি, প্রভা, শক্তি, সামর্থ্য, সাহস ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে তেজ বলতে শুধু বাহ্যিক শক্তি বা ক্ষমতা বোঝানো হয় না। এখানে তেজ হলো মানুষের অন্তর্নিহিত নৈতিক সাহস এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি। যে ব্যক্তি অন্যায়, ভয় বা প্রতিকূলতার সামনে নিজের কর্তব্য থেকে সরে যায় না, তার মধ্যে তেজ প্রকাশিত হয়। তেজ এমন এক অন্তরের আগুন যা মানুষকে নিষ্ক্রিয়তা থেকে জাগিয়ে তোলে। তবে এই তেজ যদি বিবেক ও আত্মসংযমহীন হয়, তাহলে তা ক্রোধ, কঠোরতা ও অত্যাচারে পরিণত হতে পারে। তাই গীতার তেজ হলো এমন শক্তি যা ন্যায় ও সত্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটি আগুনের মতো দীপ্তিমান, কিন্তু সেই আগুন যেন ধ্বংস না করে বরং অন্ধকার দূর করে।
তেজের পরেই এসেছে ক্ষমা। সংস্কৃত ক্ষমা শব্দটি ক্ষম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে সহ্য করা, ধারণ করা এবং অপরাধ মার্জনা করার ভাব রয়েছে। সাধারণ অর্থে ক্ষমা হলো কারও অপরাধের জন্য প্রতিশোধ না নেওয়া বা অপরাধকে মার্জনা করা। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে ক্ষমা তার চেয়ে অনেক গভীর। ক্ষমা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। অনেক সময় দুর্বল মানুষ প্রতিশোধ নিতে পারে না বলেই প্রতিশোধ নেয় না। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমাশীল মানুষ প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিহিংসাকে নিজের হৃদয়ের অধিপতি হতে দেয় না। সে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে বুঝতে পারে, কিন্তু সেই অন্যায়ের কারণে নিজের মনকে ঘৃণা ও ক্রোধের বিষে পূর্ণ করে না। এই কারণে ক্ষমা আসলে শক্তিরই একটি পরিণত রূপ। তেজ মানুষকে শক্তিশালী করে আর ক্ষমা সেই শক্তিকে মানবিক ও সংযত করে। তেজ যদি আগুন হয়, ক্ষমা যেন সেই আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করার জল। এই দুই গুণের সমন্বয়েই শক্তি ধ্বংসাত্মক না হয়ে কল্যাণকর হয়।
এরপর এসেছে ধৃতিঃ। ধৃতি শব্দটি সংস্কৃত ধৃ ধাতু থেকে এসেছে। ধৃ অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা, স্থির রাখা ও সমর্থন করা। সেই অর্থে ধৃতি হলো এমন এক অন্তর্নিহিত শক্তি যার দ্বারা মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেকে ধরে রাখতে পারে। এর সঙ্গে ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা, অধ্যবসায়, স্থিরতা ও সংকল্পের সম্পর্ক রয়েছে। জীবনে জ্ঞান থাকা যথেষ্ট নয়, কারণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও মানুষ অনেক সময় বিপদের মুহূর্তে ভেঙে পড়ে। ধৃতি সেই শক্তি যা মানুষকে নিজের কর্তব্য ও আদর্শের সঙ্গে যুক্ত রাখে। ব্যর্থতা, দুঃখ, অপমান বা দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্যেও যে ব্যক্তি নিজের সৎ উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয় না, তার মধ্যে ধৃতি রয়েছে। ধৃতি তাই শুধু অপেক্ষা করার ক্ষমতা নয়। এটি নিজের অন্তরকে ধরে রাখার ক্ষমতা। ঝড়ের মধ্যে একটি পর্বত যেমন নিজের অবস্থান থেকে সরে যায় না, ধৃতিও তেমনি মানুষের চিত্তকে স্থির রাখে।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন শৌচম্। শৌচ শব্দটি সংস্কৃত শুচ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে পরিষ্কার, নির্মল, উজ্জ্বল ও পবিত্র হওয়ার ভাব রয়েছে। সাধারণভাবে শৌচ বলতে পরিচ্ছন্নতা বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে শৌচের অর্থ শুধু দেহ ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা নয়। এর একটি বাহ্যিক দিক আছে এবং একটি অন্তর্নিহিত দিক আছে। বাহ্যিক শৌচ হলো শরীর, পোশাক, বাসস্থান ও পরিবেশকে পরিষ্কার রাখা। আর অন্তরের শৌচ হলো চিন্তা, উদ্দেশ্য, আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক প্রবণতাকে কলুষমুক্ত রাখা। একজন মানুষ বাইরে থেকে যতই পরিচ্ছন্ন হোক, তার অন্তরে যদি প্রতারণা, লোভ, বিদ্বেষ ও হিংসা থাকে, তাহলে তার প্রকৃত শৌচ সম্পূর্ণ হয় না। নির্মল মন যেন স্বচ্ছ জলের মতো। স্বচ্ছ জলে নিজের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি নির্মল চেতনার মধ্যেই মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে। তাই শৌচ হলো আত্মপরিচয়ের জন্য অন্তরের আয়নাকে পরিষ্কার রাখার সাধনা।
এরপর এসেছে অদ্রোহঃ। শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং দ্রোহ এই দুই অংশের সমন্বয়ে। এখানে অ একটি নঞর্থক উপাদান যার অর্থ না বা অনুপস্থিতি। দ্রোহ শব্দটি সংস্কৃত দ্রুহ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে শত্রুতা, বিদ্বেষ, অনিষ্টকামনা ও বৈরিতার ভাব রয়েছে। তাই অদ্রোহের আক্ষরিক অর্থ হলো দ্রোহের অনুপস্থিতি। অর্থাৎ অন্যের প্রতি বিদ্বেষ না রাখা, শত্রুতা না করা এবং অন্যের অনিষ্ট কামনা না করা। কিন্তু অদ্রোহ শুধু শারীরিকভাবে কাউকে আঘাত না করার বিষয় নয়। মানুষ বাইরে থেকে কারও ক্ষতি না করেও মনে মনে তার পতন কামনা করতে পারে। সেই অন্তর্গত বৈরিতাও দ্রোহের একটি রূপ। অদ্রোহ হলো সেই বৈরভাব থেকে মুক্ত হওয়া। ক্ষমা এবং অদ্রোহ পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এক নয়। কেউ আমার প্রতি অন্যায় করেছে এবং আমি তার অপরাধের জন্য প্রতিশোধ নিচ্ছি না, এটি ক্ষমার দিক। কিন্তু সেই ব্যক্তির প্রতি আমার অন্তরে স্থায়ী শত্রুতা ও অনিষ্টকামনা নেই, এটি অদ্রোহের দিক। এই কারণে অদ্রোহ মানুষের চেতনা থেকে আমি এবং অন্য এই বিভাজনের কঠোরতা কমিয়ে হৃদয়ের বিস্তার ঘটায়।
শেষে এসেছে নাতিমানিতা। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং গভীর অর্থবহ একটি শব্দ। শব্দটিকে ন, অতি এবং মানিতা এই অর্থস্তরগুলির মাধ্যমে বোঝা যায়। ন অর্থ না, অতি অর্থ অতিরিক্ত এবং মানিতা মান বা আত্মমর্যাদা ও আত্মগরিমার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং নাতিমানিতা বলতে অতিরিক্ত আত্মগরিমার অনুপস্থিতি, অহংকারহীনতা এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব না করাকে বোঝানো হয়েছে। তবে নাতিমানিতা কখনো আত্মসম্মানের অভাব নয়। একজন মানুষ নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে, নিজের মর্যাদা সম্পর্কে জানতেও পারে, কিন্তু সে যেন সেই যোগ্যতাকে অন্যকে তুচ্ছ করার কারণ না বানায়। আত্মসম্মান মানুষকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখায়, আর অহংকার অন্যকে নিচে নামিয়ে নিজেকে উঁচু দেখাতে চায়। গীতার নাতিমানিতা আত্মসম্মানকে অস্বীকার করে না, বরং আত্মসম্মানকে অহংকার থেকে রক্ষা করে। প্রকৃত জ্ঞান যত গভীর হয়, মানুষ তত বেশি উপলব্ধি করে যে তার সাফল্য ও প্রতিভার পেছনে পরিবার, সমাজ, শিক্ষক, প্রকৃতি এবং অসংখ্য মানুষের অবদান রয়েছে। তাই সত্যিকারের মহত্ত্ব মানুষকে প্রায়ই বিনয়ী করে তোলে।
এই ছয়টি গুণকে একসঙ্গে দেখলে শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্যের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। তেজ মানুষকে শক্তি দেয়, ক্ষমা সেই শক্তিকে কোমল করে, ধৃতি তাকে স্থির রাখে, শৌচ তাকে নির্মল করে, অদ্রোহ তাকে বিদ্বেষ থেকে রক্ষা করে এবং নাতিমানিতা তাকে অহংকার থেকে মুক্ত রাখে। অর্থাৎ একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের মধ্যে শুধু শক্তি থাকলেই হবে না, সেই শক্তির সঙ্গে ক্ষমাও থাকতে হবে। শুধু ক্ষমাশীল হলেই হবে না, অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোর তেজও থাকতে হবে। শুধু দৃঢ়তা থাকলেই হবে না, সেই দৃঢ়তার উদ্দেশ্য নির্মল হতে হবে। শুধু পবিত্রতার কথা বললেই হবে না, অন্যের প্রতি বৈরিতা ত্যাগ করতে হবে। আবার নিজের মহত্ত্ব উপলব্ধি করলেও সেই উপলব্ধি যেন অহংকারে পরিণত না হয়।
এই দৃষ্টিতে তেজ ও ক্ষমার সম্পর্ক বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তেজ হলো আগুনের মতো শক্তি আর ক্ষমা হলো জলের মতো কোমলতা। আগুন ছাড়া জীবন উষ্ণতা ও আলো হারায়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন আগুন ধ্বংস করে। একইভাবে শক্তি ছাড়া মানুষ অন্যায়ের সামনে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, কিন্তু সংযমহীন শক্তি মানুষকে অত্যাচারী করে তুলতে পারে। ক্ষমা সেই শক্তিকে মানবিক করে। আবার ক্ষমারও তেজ প্রয়োজন। কারণ সত্যিকারের ক্ষমা করতে হলে অন্তরের গভীর শক্তি দরকার। এইভাবে তেজ এবং ক্ষমা একে অপরের বিপরীত নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক।
ধৃতি এবং শৌচের মধ্যেও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ধৃতি মানুষের মধ্যে স্থিরতা সৃষ্টি করে আর শৌচ সেই স্থিরতাকে সঠিক উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করে। কোনো মানুষ যদি অত্যন্ত অধ্যবসায়ী হয় কিন্তু তার উদ্দেশ্য যদি অপবিত্র হয়, তাহলে তার অধ্যবসায় বিপজ্জনক হতে পারে। আবার উদ্দেশ্য যদি নির্মল হয় কিন্তু সামান্য প্রতিকূলতায় মানুষ ভেঙে পড়ে, তাহলে সেই নির্মল উদ্দেশ্য বাস্তবে প্রকাশ পায় না। তাই শৌচ পথকে পবিত্র করে এবং ধৃতি সেই পথে অবিচল থাকার শক্তি দেয়।
অদ্রোহ এবং নাতিমানিতার সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। অহংকার যত বাড়ে, মানুষের মধ্যে অন্যকে ছোট করার প্রবণতা তত বৃদ্ধি পেতে পারে। যখন কেউ মনে করে সে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তখন অন্যের প্রতি অবজ্ঞা ও বৈরিতা জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। নাতিমানিতা সেই অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অদ্রোহ অন্যের প্রতি শত্রুতা দূর করে। ফলে হৃদয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে বৃহত্তর মানবিকতার দিকে এগিয়ে যায়।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোতেও এই গুণগুলির গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়। তেজকে আত্মবিশ্বাস ও কার্যক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। ক্ষমা মানুষের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা থেকে মুক্ত হওয়ার ক্ষমতা প্রকাশ করে। ধৃতি মানসিক স্থিতিস্থাপকতা ও প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। শৌচ মানুষের অন্তর্দৃষ্টি ও নৈতিক স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পর্কিত। অদ্রোহ সহমর্মিতা ও বৈরিতামুক্ত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। নাতিমানিতা সুস্থ বিনয় সৃষ্টি করে। এই সবকিছুর সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। সেখানে মানুষ নিজের শক্তিকে অস্বীকার করে না, কিন্তু সেই শক্তিকে অন্যকে দমনের জন্যও ব্যবহার করে না।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির দৃষ্টিতেও এই ছয়টি গুণ একটি আদর্শ চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একজন মহৎ চরিত্রের মধ্যে তেজ তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়। ক্ষমা তাকে প্রতিহিংসাপরায়ণ হতে বাধা দেয়। ধৃতি তাকে বিপদের মধ্যে স্থির রাখে। শৌচ তার উদ্দেশ্যকে নির্মল রাখে। অদ্রোহ তাকে নিষ্ঠুর ও বিদ্বেষপরায়ণ হতে বাধা দেয়। নাতিমানিতা তাকে নিজের মহত্ত্বের অহংকার থেকে রক্ষা করে। ফলে এই ছয়টি গুণ মিলিয়ে এমন একটি চরিত্র তৈরি হয় যার শক্তি অন্যকে ভীত করার জন্য নয়, বরং অন্যকে রক্ষা ও উন্নত করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
বাস্তব জীবনে একজন ন্যায়পরায়ণ মানুষের চরিত্রে এই গুণগুলির সমন্বয় সহজেই দেখা যায়। একজন সত্যনিষ্ঠ বিচারক ক্ষমতাবান মানুষের চাপকে ভয় না করলে তার মধ্যে তেজ আছে। দীর্ঘ ও জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও ন্যায়ের পথ ধরে রাখলে তার মধ্যে ধৃতি আছে। ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিচার থেকে দূরে রাখলে তার মধ্যে শৌচ আছে। ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে কারও ক্ষতি না চাইলে তার মধ্যে অদ্রোহ আছে। ব্যক্তিগত অপমানকে প্রতিশোধের কারণ না বানালে তার মধ্যে ক্ষমা আছে। আর নিজের পদমর্যাদাকে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব মনে না করলে তার মধ্যে নাতিমানিতা আছে। তখন তার ক্ষমতা মানুষের ভয়ের কারণ না হয়ে মানুষের আস্থার কারণ হয়ে ওঠে।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ছয়টি গুণকে মানুষের অন্তর্জাগরণের বিভিন্ন স্তর হিসেবেও দেখা যায়। প্রথমে মানুষকে নিজের অন্তর্নিহিত শক্তি উপলব্ধি করতে হয়। এটি তেজ। এরপর সেই শক্তিকে ক্রোধ ও প্রতিহিংসা থেকে মুক্ত করতে হয়। এটি ক্ষমা। তারপর জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য ও কর্তব্যকে ধারণ করতে হয়। এটি ধৃতি। এরপর নিজের অন্তরকে কলুষমুক্ত করতে হয়। এটি শৌচ। তারপর অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ও বৈরিতা ত্যাগ করতে হয়। এটি অদ্রোহ। সবশেষে নিজের আধ্যাত্মিক অগ্রগতিকেও অহংকারের কারণ হতে দেওয়া যাবে না। এটি নাতিমানিতা। এইভাবে এই গুণগুলি মানুষের বাহ্যিক আচরণকে পরিবর্তন করার পাশাপাশি তার অন্তর্চেতনাকেও পরিশুদ্ধ করে।
শ্রীকৃষ্ণ এই গুণগুলিকে দৈবী সম্পদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এখানে সম্পদ বলতে শুধু অর্থ, ক্ষমতা বা বাহ্যিক ঐশ্বর্য বোঝানো হয় না। মানুষের চরিত্রে যে গুণগুলি তাকে উচ্চতর, নির্মল ও কল্যাণময় করে তোলে, সেগুলিই প্রকৃত অর্থে তার সম্পদ। বাহ্যিক সম্পদ মানুষকে সাময়িকভাবে ধনী করতে পারে, কিন্তু তেজ, ক্ষমা, ধৃতি, শৌচ, অদ্রোহ এবং নাতিমানিতা মানুষকে অন্তর থেকে সমৃদ্ধ করে। একজন মানুষের কাছে বিপুল অর্থ থাকতে পারে, কিন্তু যদি তার মধ্যে ক্ষমা না থাকে, ধৈর্য না থাকে, পবিত্রতা না থাকে এবং বিনয় না থাকে, তাহলে তার বাহ্যিক ঐশ্বর্য তার চরিত্রের মহত্ত্ব প্রমাণ করে না। অন্যদিকে যার মধ্যে এই গুণগুলি আছে, সে বাহ্যিকভাবে সাধারণ হলেও অন্তরের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
সবশেষে বলা যায়, “তেজঃ ক্ষমা ধৃতিঃ শৌচমদ্রোহো নাতিমানিতা” মানুষের একটি গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ চরিত্রের আদর্শ তুলে ধরে। তেজ শেখায় শক্তিশালী হতে, ক্ষমা শেখায় শক্তিকে কোমল রাখতে, ধৃতি শেখায় প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থির থাকতে, শৌচ শেখায় অন্তরকে নির্মল রাখতে, অদ্রোহ শেখায় অন্যের প্রতি বিদ্বেষ না রাখতে এবং নাতিমানিতা শেখায় নিজের মহত্ত্বকে অহংকারে পরিণত না করতে। এই ছয়টি গুণ একত্রে এমন এক মানবিক আদর্শ নির্মাণ করে যেখানে শক্তি আছে কিন্তু নিষ্ঠুরতা নেই, ক্ষমা আছে কিন্তু দুর্বলতা নেই, দৃঢ়তা আছে কিন্তু জড়তা নেই, পবিত্রতা আছে কিন্তু সংকীর্ণতা নেই, অন্যের প্রতি মমতা আছে কিন্তু আত্মঅবমূল্যায়ন নেই এবং আত্মমর্যাদা আছে কিন্তু অহংকার নেই। এই ভারসাম্যই মানুষের প্রকৃত অন্তর্গত সম্পদ। তাই শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার কত ক্ষমতা আছে তার মধ্যে নয়, বরং সেই ক্ষমতাকে কতটা সংযত, নির্মল, ন্যায়নিষ্ঠ, ক্ষমাশীল এবং অহংকারমুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারে তার মধ্যেই নিহিত।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!