ভগবদ্গীতা ১৬.৪ — দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ ও অজ্ঞানতার আসুরী প্রকৃতি
দম্ভো দর্পোহভিমানশ্চ ক্রোধঃ পারুষ্যমেব চ।
অজ্ঞানং চাভিজাতস্য পার্থ সম্পদমাসুরীম্।।৪।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, রূঢ়তা ও অবিবেক- এই সমস্ত সম্পদ আসুরিক ভাবাপন্ন ব্যক্তিদের লাভ হয়।
ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের আসুরী প্রকৃতির কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো
অর্থাৎ হে পার্থ, দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, পারুষ্য এবং অজ্ঞান যে ব্যক্তির মধ্যে থাকে, তার মধ্যে আসুরী সম্পদের প্রকাশ ঘটেছে। এই শ্লোকের বিশেষত্ব হলো এখানে আসুরিকতা বলতে কোনো বাহ্যিক জাতি, সম্প্রদায় বা পৌরাণিক দানবকে বোঝানো হয়নি। বরং মানুষের নিজের মনের মধ্যে জন্ম নেওয়া কিছু প্রবণতাকে আসুরী প্রকৃতির লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষের চরিত্র যখন অহংকার, আত্মপ্রদর্শন, ক্ষমতার গর্ব, অতিরিক্ত আত্মমর্যাদাবোধ, ক্রোধ, কঠোরতা এবং সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতার দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন তার চেতনার মধ্যে আসুরী প্রবণতা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো দম্ভ। সংস্কৃত দম্ভ শব্দের মধ্যে ভণ্ডামি, কপটতা এবং নিজের প্রকৃত অবস্থাকে আড়াল করে অন্যের সামনে নিজেকে বড় করে প্রকাশ করার ভাব রয়েছে। দম্ভ এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ প্রকৃতপক্ষে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সে নিজের জ্ঞান, সম্পদ, ধর্মপরায়ণতা, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা অন্যের সামনে বিশেষভাবে প্রদর্শন করতে চায়। দম্ভের মূল সমস্যা হলো এখানে বাহ্যিক পরিচয় এবং অন্তরের প্রকৃত অবস্থার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়। মানুষ তখন নিজের সত্যকে জানার পরিবর্তে অন্যের চোখে নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে, সেই বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই কারণে দম্ভ কেবল অহংকার নয়, বরং একটি কৃত্রিম আত্মপরিচয়ের নির্মাণ।
দম্ভের পরেই এসেছে দর্প। দর্পের মধ্যে রয়েছে নিজের শক্তি, সম্পদ, সৌন্দর্য, জ্ঞান, বংশ, ক্ষমতা অথবা সামাজিক অবস্থান নিয়ে স্ফীত হয়ে ওঠার ভাব। দম্ভ যেখানে নিজেকে প্রদর্শনের প্রবণতা, দর্প সেখানে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অন্তরের একটি অতিরঞ্জিত অনুভূতি। একজন মানুষ যখন সাফল্য অর্জন করে এবং সেই সাফল্যকে নিজের মানবিক মূল্য থেকে আলাদা করে দেখতে না পারে, তখন তার মধ্যে দর্প জন্ম নিতে পারে। সে মনে করতে শুরু করে যে তার অর্থ তাকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ করেছে, তার জ্ঞান তাকে অন্যদের চেয়ে উন্নত করেছে অথবা তার ক্ষমতা তাকে অন্য মানুষের উপরে একটি বিশেষ অধিকার দিয়েছে। এই অবস্থায় সাফল্য আর মানুষের জন্য আশীর্বাদ থাকে না, বরং অহংকারের ভিত্তিতে পরিণত হয়।
এরপর এসেছে অভিমান। বাংলা ভাষায় অভিমান শব্দটি অনেক সময় প্রিয়জনের প্রতি মনঃক্ষুণ্ণতা বা কষ্ট বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সংস্কৃত দার্শনিক অর্থে অভিমান অনেক গভীর। অভিমান শব্দের সঙ্গে নিজেকে একটি বিশেষ পরিচয়ের মাধ্যমে উপলব্ধি করার ধারণা যুক্ত। মানুষ যখন মনে করে আমি ধনী, আমি জ্ঞানী, আমি শক্তিশালী, আমি শ্রেষ্ঠ, আমি কর্তা, আমার সম্মান অবশ্যই রক্ষা করতে হবে, তখন সেই আমি কেন্দ্রিক পরিচয় তার চেতনার উপর আধিপত্য বিস্তার করে। এই অহংবোধই অভিমানের গভীর অর্থ। মানুষের প্রকৃত সমস্যা তখন বাইরের ঘটনা নয়, বরং নিজের সম্পর্কে তার তৈরি করা ধারণা। কেউ সেই ধারণাকে প্রশ্ন করলে সে মনে করে তার অস্তিত্বকেই আঘাত করা হয়েছে।
এই অভিমান থেকে ক্রোধের জন্ম হয়। ক্রোধ শব্দটি সংস্কৃত ক্রুধ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মূল ভাব হলো রাগ বা উত্তেজিত হওয়া। গীতার দৃষ্টিতে ক্রোধকে শুধু একটি সাধারণ আবেগ হিসেবে দেখলে তার গভীর অর্থ বোঝা যায় না। মানুষের কোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে, কোনো প্রত্যাশা ব্যর্থ হলে অথবা তার অহংকারে আঘাত লাগলে ক্রোধ সৃষ্টি হতে পারে। মানুষ তখন বাস্তবতাকে গ্রহণ করার পরিবর্তে বাস্তবতাকে নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করতে চায়। যখন তা সম্ভব হয় না, তখন তার ভিতরের অস্থিরতা ক্রোধে রূপ নেয়। তাই ক্রোধের গভীরে প্রায়ই থাকে অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা, আহত অহংকার এবং নিজের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করার প্রবণতা।
ক্রোধের বহিরাগত প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত হলো পারুষ্য। পারুষ্য শব্দের মধ্যে রুক্ষতা, কঠোরতা, কর্কশতা এবং নির্দয়তার ভাব রয়েছে। একজন ক্রুদ্ধ মানুষ শুধু নিজের ভিতরে অশান্ত হয় না, তার কথা ও আচরণেও সেই অশান্তি প্রকাশ পায়। সে অন্যকে অপমান করতে পারে, কঠোর ভাষায় কথা বলতে পারে, দুর্বল মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর হতে পারে এবং নিজের ক্ষমতাকে অন্যকে আঘাত করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। পারুষ্য তাই শুধু কর্কশ ভাষা নয়। এটি এমন এক মানসিক কঠোরতা যেখানে অন্য মানুষের অনুভূতি, মর্যাদা ও কষ্টের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। মানুষের হৃদয় যখন অহংকার ও ক্রোধে কঠিন হয়ে ওঠে, তখন পারুষ্য তার আচরণের স্বাভাবিক পরিণতিতে পরিণত হয়।
এই ধারাবাহিকতার শেষদিকে এসেছে অজ্ঞান। অজ্ঞান শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং জ্ঞান থেকে। জ্ঞান এসেছে সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। কিন্তু গীতায় অজ্ঞান বলতে শুধু কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য না জানা বোঝানো হয় না। এখানে অজ্ঞান হলো সত্য সম্পর্কে মৌলিক ভুল ধারণা। মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ হতে পারে। সে অস্থায়ী জিনিসকে স্থায়ী মনে করতে পারে, বাহ্যিক পরিচয়কে নিজের প্রকৃত পরিচয় বলে মনে করতে পারে এবং নিজের অহংকারকে সত্য বলে গ্রহণ করতে পারে। সে নিজের ভুল দেখতে না পারলেও নিজেকে অত্যন্ত জ্ঞানী মনে করতে পারে। এই কারণেই গীতার অজ্ঞান সাধারণ অশিক্ষা নয়। এটি আত্মসত্য সম্পর্কে অন্ধত্ব।
এই শব্দগুলিকে আলাদা আলাদা অর্থে দেখলে শ্লোকটির গভীর মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না। দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, পারুষ্য এবং অজ্ঞান আসলে পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজন মানুষ প্রথমে নিজেকে অন্যের সামনে বড় করে দেখাতে পারে। এটি দম্ভ। সেই প্রদর্শনের পেছনে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হতে পারে। এটি দর্প। সেই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধীরে ধীরে তার আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। এটি অভিমান। কেউ সেই আত্মপরিচয়কে আঘাত করলে ক্রোধ জন্ম নেয়। ক্রোধ আচরণ ও ভাষাকে কঠোর করে তোলে। এটি পারুষ্য। কিন্তু ব্যক্তি যদি নিজের এই প্রবণতাগুলিকে দেখতে না পারে, তাহলে অজ্ঞান আরও গভীর হয়। এভাবে একটি আত্মবিনাশী মানসিক চক্র সৃষ্টি হয়।
এই শ্লোকের একটি গভীর দার্শনিক দিক হলো মানুষের আসুরিকতা তার বাহ্যিক পরিচয়ে নয়, তার চেতনার প্রকৃতিতে। একজন ব্যক্তি অত্যন্ত শিক্ষিত হয়েও অজ্ঞান হতে পারেন। একজন ধর্মীয় মানুষ হয়েও দম্ভে আক্রান্ত হতে পারেন। একজন ধনী মানুষ দর্পে আক্রান্ত হতে পারেন। একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি অভিমান ও ক্রোধের দাস হতে পারেন। তাই গীতার আসুরী প্রকৃতির ধারণা কোনো সামাজিক পরিচয়ের বিচার নয়। এটি আত্মপরীক্ষার একটি দর্শন। প্রশ্নটি অন্য মানুষ কেমন তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো আমার নিজের ভিতরে কী কাজ করছে।
বেদান্তীয় দৃষ্টিতে এই অজ্ঞান আরও গভীর অর্থ বহন করে। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে না জেনে দেহ, মন, পদ, সম্পদ, ক্ষমতা ও সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে এক করে ফেলে, তখন অহংকার জন্ম নেয়। সে ভাবে এই দেহই আমি, এই পদই আমার পরিচয়, এই সম্পদই আমার মূল্য এবং আমার ইচ্ছাই চূড়ান্ত। কিন্তু এই সব পরিচয় পরিবর্তনশীল। আজ যে ব্যক্তি ক্ষমতাবান, কাল সে ক্ষমতাহীন হতে পারে। আজ যে ধনী, কাল সে দরিদ্র হতে পারে। আজ যে প্রশংসিত, কাল সে সমালোচিত হতে পারে। বাহ্যিক পরিচয়ের এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যে স্থায়ী আত্মপরিচয় খুঁজতে গেলে মানুষ অনিবার্যভাবে অস্থির হয়ে পড়ে। এই অস্থিরতা থেকে অহংকার এবং ক্রোধ জন্ম নেয়।
যোগদর্শনের আলোতেও এই শ্লোকের সঙ্গে মানুষের অন্তর্গত অস্থিরতার একটি গভীর সম্পর্ক দেখা যায়। নিজের প্রকৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকে অহংবোধ তৈরি হয়। নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অতিরিক্ত পরিচয় তৈরি হলে সেই আকাঙ্ক্ষা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সময় ক্রোধ সৃষ্টি হয়। ক্রোধ মনকে অস্থির করে এবং অস্থির মন সত্যকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। ফলে অজ্ঞান আরও শক্তিশালী হয়। এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি মানুষের আত্মবিভ্রান্তি থেকে আত্মবিনাশের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির তাৎপর্য বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক। দম্ভকে নিজের একটি অতিরঞ্জিত সামাজিক ভাবমূর্তি নির্মাণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। দর্পকে নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়। অভিমানকে এমন একটি ভঙ্গুর আত্মপরিচয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যান অত্যন্ত গভীর আঘাত সৃষ্টি করে। ক্রোধ অনেক সময় অপূর্ণ প্রত্যাশা, নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি অথবা আহত আত্মমর্যাদা থেকে জন্ম নেয়। পারুষ্য সেই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বাহ্যিক প্রকাশ। আর অজ্ঞান হলো নিজের এই মানসিক অবস্থাকে যথার্থভাবে দেখতে না পারা। অর্থাৎ প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের ভাষা এবং আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষা ভিন্ন হলেও মানুষের অহংকেন্দ্রিক আচরণের কিছু মৌলিক সত্য এখানে একইভাবে প্রতিফলিত হয়।
এই শ্লোকে অসুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। অসুর বলতে শুধু পৌরাণিক কোনো দানবকে বোঝালে এর দার্শনিক গভীরতা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। মানুষের ভিতরের সেই প্রবণতাই অসুরের প্রতীক, যা বলে আমি শ্রেষ্ঠ, আমার ইচ্ছাই চূড়ান্ত, আমার ক্ষমতাই সত্য, আমার সম্পদই আমার মূল্য এবং আমাকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। এই আমি কেন্দ্রিক চেতনা যত শক্তিশালী হয়, মানুষ তত বেশি নিজের প্রকৃত মানবিকতা থেকে দূরে সরে যেতে পারে। বিপরীতে বিনয়, সত্য, আত্মসংযম, সহমর্মিতা এবং আত্মজ্ঞান মানুষের চেতনাকে তার উচ্চতর সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যায়।
বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন ব্যক্তি ব্যবসায় সাফল্য অর্জন করে প্রথমে নিজের সাফল্য নিয়ে গর্ব করতে শুরু করলেন। এরপর তিনি মনে করতে লাগলেন যে অন্য মানুষ তার চেয়ে নিম্নস্তরের। কেউ তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে তিনি সেটিকে নিজের প্রতি অপমান হিসেবে গ্রহণ করলেন। তার মধ্যে ক্রোধ সৃষ্টি হলো। ক্রোধের ফলে তিনি কর্মচারী ও সহকর্মীদের সঙ্গে কঠোর ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন। কিন্তু নিজের আচরণের কোনো ভুল তিনি স্বীকার করলেন না। এই একটি উদাহরণের মধ্যেই দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, পারুষ্য এবং অজ্ঞান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি চরিত্রের পতনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আবার একই সাফল্য অন্য একজন মানুষের জীবনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফল সৃষ্টি করতে পারে। তিনি যদি মনে করেন তার সাফল্যের পেছনে পরিবার, সহকর্মী, সমাজ এবং অসংখ্য অদৃশ্য মানুষের অবদান রয়েছে, তাহলে তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা ও বিনয় জন্ম নিতে পারে। কেউ সমালোচনা করলে তিনি নিজের ভুল পরীক্ষা করতে পারেন। রাগ উঠলেও তিনি নিজেকে সংযত করতে পারেন। অন্যের সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে পারেন। তখন বাহ্যিক সাফল্য তার অহংকারের কারণ না হয়ে চরিত্রের উন্নতির উপায় হয়ে ওঠে। এখানেই বোঝা যায় যে মানুষের জীবনে সম্পদ বা ক্ষমতা নিজে আসুরী নয়। সেই সম্পদের সঙ্গে মানুষের মানসিক সম্পর্কই তাকে উন্নত বা অধঃপতিত করতে পারে।
এই কারণে শ্লোকটি আমাদের অন্যকে বিচার করার আগে নিজের ভিতরে তাকাতে শেখায়। আমার মধ্যে কি দম্ভ আছে। আমি কি অন্যের চোখে নিজেকে বড় করে দেখাতে চাই। আমার মধ্যে কি দর্প আছে। সাফল্যের কারণে কি আমি অন্যকে ছোট মনে করি। আমার মধ্যে কি অভিমান আছে। কেউ আমার ধারণাকে প্রশ্ন করলে কি আমি আহত হয়ে পড়ি। আমার মধ্যে কি ক্রোধ আছে। আমার ইচ্ছা পূরণ না হলে কি আমি অন্যকে আঘাত করি। আমার মধ্যে কি পারুষ্য আছে। আমার কথা কি অপ্রয়োজনীয়ভাবে অন্যের হৃদয়কে আহত করে। আমার মধ্যে কি অজ্ঞান আছে। আমি কি নিজের ভুল ও সীমাবদ্ধতা দেখতে অক্ষম। এই আত্মপরীক্ষাই শ্লোকটির সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহারিক শিক্ষা।
শব্দগুলির গভীরে তাকালে দেখা যায় যে এই শ্লোক আসলে মানুষের চরিত্রের একটি সূক্ষ্ম মানচিত্র নির্মাণ করেছে। দম্ভ মানুষের সামনে একটি কৃত্রিম পরিচয় তৈরি করে। দর্প সেই পরিচয়কে শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতিতে পরিণত করে। অভিমান সেই শ্রেষ্ঠত্ববোধকে নিজের অস্তিত্বের অংশ করে তোলে। ক্রোধ সেই পরিচয় রক্ষার প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশ পায়। পারুষ্য সেই ক্রোধকে অন্যের প্রতি কঠোর আচরণে পরিণত করে। অজ্ঞান মানুষকে পুরো প্রক্রিয়াটি দেখতে বাধা দেয়। ফলে মানুষ নিজের দ্বারা নির্মিত অহংকারের কারাগারে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
ভগবদ্গীতার এই শ্লোক তাই কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়। এটি মানুষের অহংকার, আত্মপরিচয়, আবেগ, আচরণ এবং আত্মজ্ঞান সম্পর্কে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ। এখানে আসুরী সম্পদ বলতে এমন কোনো বাহ্যিক সম্পদ বোঝানো হয়নি যা মানুষ জন্মসূত্রে পায়। বরং এটি মানুষের ভিতরে সঞ্চিত এমন মানসিক সম্পদ, যা ভুলভাবে ব্যবহৃত হলে তাকে নিজের সত্য থেকে দূরে নিয়ে যায়। মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার কত অর্থ আছে, কত ক্ষমতা আছে অথবা কত মানুষ তাকে সম্মান করে তার মধ্যে নয়। তার প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ পায় সে নিজের অহংকারকে কতটা অতিক্রম করতে পারে, নিজের ভুলকে কতটা স্বীকার করতে পারে এবং অন্য মানুষের প্রতি কতটা সত্য, নম্র ও সহানুভূতিশীল হতে পারে তার মধ্যে।
সবশেষে বলা যায়, দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, পারুষ্য এবং অজ্ঞান একই মানসিক বৃক্ষের বিভিন্ন শাখা। এর মূল হলো আত্মবিস্মৃতি এবং সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপকে ভুলে বাহ্যিক পরিচয়কে নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব বলে মনে করে, তখন অহংকার জন্ম নেয়। অহংকার আহত হলে ক্রোধ আসে। ক্রোধ কঠোরতায় পরিণত হয় এবং কঠোরতা সম্পর্ক ও চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে মানুষ যদি নিজের অন্তরকে দেখতে না শেখে, তাহলে অজ্ঞান আরও গভীর হয়। তাই শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা আমাদের অন্যের মধ্যে অসুর খুঁজতে নয়, নিজের মধ্যে আসুরী প্রবণতাকে চিনতে আহ্বান জানায়। কারণ মানুষ নিজের দম্ভকে চিনতে পারলে বিনয়ের পথে যেতে পারে, নিজের দর্পকে চিনতে পারলে নম্র হতে পারে, নিজের অভিমানকে চিনতে পারলে অহংকার অতিক্রম করতে পারে, নিজের ক্রোধকে চিনতে পারলে সংযম অর্জন করতে পারে, নিজের পারুষ্যকে চিনতে পারলে কোমলতা অর্জন করতে পারে এবং নিজের অজ্ঞানকে চিনতে পারলে জ্ঞানের পথে যাত্রা শুরু করতে পারে। এই আত্মপরিচয়ের জাগরণই শেষ পর্যন্ত মানুষকে আসুরী প্রবণতা থেকে দৈবী সম্পদের দিকে এবং আত্মবিভ্রান্তি থেকে আত্মজ্ঞান ও মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!