সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৬.৬ — দৈবী ও আসুরী সম্পদ, মানুষের দ্বৈত প্রবণতা ও আত্মিক বিকাশের পথ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেহস্মিন্ দৈব আসুর এব চ।দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে…
দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেহস্মিন্ দৈব আসুর এব চ।
দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু।।৬।।

অনুবাদঃ হে পার্থ! এই সংসারে দৈব ও আসুরিক-এই দুই প্রকার জীব সৃষ্টি হয়েছে। দৈব সম্বন্ধে বিস্তারিতভবে বলা হয়েছে। এখন আমার থেকে অসুর প্রকৃতি সম্বন্ধে শ্রবণ কর।

ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি অত্যন্ত গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, এই জগতে জীবসত্তার দুই ধরনের প্রবণতা রয়েছে। একটি দৈবী এবং অন্যটি আসুরী। দৈবী প্রবণতা মানুষকে সত্য, সংযম, দয়া, বিনয়, আত্মজ্ঞান ও মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। অন্যদিকে আসুরী প্রবণতা মানুষকে অহংকার, লোভ, ক্রোধ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও অজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়। এই বক্তব্যকে কেবল দেবতা ও অসুরের পৌরাণিক ধারণা হিসেবে দেখলে শ্লোকটির প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায় না। এর গভীরতর অর্থ হলো মানুষের নিজের চেতনার মধ্যেই উন্নত ও অবনতিশীল দুটি সম্ভাবনা সক্রিয় থাকে এবং তার চিন্তা, অভ্যাস ও কর্মের মাধ্যমে কোন প্রবণতা শক্তিশালী হবে তা ক্রমে নির্ধারিত হয়।

শ্লোকের শুরুতেই রয়েছে দ্বৌ শব্দটি। সংস্কৃত দ্বি শব্দ থেকে উৎপন্ন দ্বৌ অর্থ দুই। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং মানুষের নৈতিক জীবনের একটি মৌলিক দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত। মানুষের মধ্যে যেমন সত্যের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে, তেমনি অসত্যের সুবিধা গ্রহণের প্রবণতাও থাকতে পারে। মানুষের মধ্যে যেমন দয়া ও ক্ষমা রয়েছে, তেমনি ক্রোধ ও প্রতিহিংসার সম্ভাবনাও রয়েছে। মানুষের মধ্যে যেমন বিনয় রয়েছে, তেমনি অহংকারও জন্ম নিতে পারে। তাই কৃষ্ণ মানুষের চরিত্রকে একরৈখিকভাবে দেখছেন না। তিনি দেখাচ্ছেন যে মানুষের অন্তর্জগৎ সম্ভাবনার একটি ক্ষেত্র, যেখানে দুটি বিপরীত প্রবাহ ক্রমাগত সক্রিয় থাকে।

এরপর এসেছে ভূতসর্গৌ শব্দটি। ভূত শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতু থেকে এসেছে। ভূ ধাতুর অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা, প্রকাশিত হওয়া বা উৎপন্ন হওয়া। তাই ভূত বলতে অস্তিত্বশীল সত্তা, জীব বা সৃষ্ট প্রাণীকে বোঝানো যায়। সর্গ শব্দের মূলেও রয়েছে সৃষ্টির ধারণা। ফলে ভূতসর্গের আক্ষরিক অর্থ জীবসৃষ্টি বা জীবসত্তার প্রকাশ। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে এর অর্থ আরও গভীর। এখানে ভূতসর্গ বলতে শুধু জীবের বাহ্যিক সৃষ্টি বোঝানো হয় না। মানুষের মধ্যে প্রকাশিত স্বভাব, প্রবণতা, চরিত্র ও মানসিক প্রকৃতির কথাও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই দ্বৌ ভূতসর্গৌ বলতে জীবনের দুই ধরনের অন্তর্গত প্রকৃতি বা চেতনার দুই প্রবাহ বোঝানো হয়েছে।

লোকে অস্মিন্ অর্থ এই জগতে। সংস্কৃত লোক শব্দের অর্থ জগৎ, পৃথিবী, মানুষের বসবাসের ক্ষেত্র কিংবা অভিজ্ঞতার জগৎ। কৃষ্ণ বিশেষভাবে বলছেন এই জগতে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাবোধ রয়েছে। দৈবী ও আসুরী প্রবণতা কোনো দূরবর্তী পৌরাণিক জগতে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতিদিনের জীবনেই এগুলো প্রকাশিত হয়। পরিবারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, বন্ধুত্বে এবং ব্যক্তিগত চিন্তার মধ্যেও এই দুই প্রবণতার প্রকাশ দেখা যায়। ফলে গীতার শিক্ষা মানুষের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়।

দৈব শব্দটি দেব শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেব শব্দের মধ্যে আলো, দীপ্তি ও উচ্চতর অস্তিত্বের ধারণা রয়েছে। সেই অর্থে দৈব হলো দেবসুলভ, আলোকময়, শুভ ও উচ্চতর চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু গীতায় দৈবী বলতে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা বা বাহ্যিক দেবত্ব বোঝানো হয় না। দৈবী সম্পদ হলো এমন সব গুণ যা মানুষকে সত্য, ন্যায়, আত্মসংযম, করুণা, বিনয় ও আত্মজ্ঞানমুখী করে। অভয়, অন্তরের পবিত্রতা, জ্ঞান, দান, ইন্দ্রিয়সংযম, সত্য, অহিংসা, ক্ষমা, ধৈর্য, দয়া, অলোভ ও অহংকারহীনতা দৈবী জীবনের লক্ষণ। অর্থাৎ দৈবত্ব মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ে নয়, তার চরিত্রে প্রকাশিত হয়।

এর বিপরীতে রয়েছে আসুর শব্দটি। আসুর অর্থ অসুরসম্পর্কিত বা অসুরের প্রকৃতিসম্পন্ন। গীতার দর্শনে আসুরী বলতে কোনো নির্দিষ্ট জাতি, সম্প্রদায় বা মানুষের বাহ্যিক পরিচয় বোঝানো হয় না। এটি একটি মানসিক ও নৈতিক প্রবণতার নাম। যখন মানুষের মধ্যে অহংকার, দম্ভ, লোভ, ক্রোধ, হিংসা, নিষ্ঠুরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং অজ্ঞতা প্রবল হয়ে ওঠে, তখন তার আচরণে আসুরী প্রকৃতি প্রকাশ পায়। তাই কাউকে জন্মগতভাবে অসুর বলে চিহ্নিত করা গীতার মূল বক্তব্য নয়। বরং মানুষ নিজের চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে নিজের মধ্যে আসুরী প্রবণতাকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

এই প্রসঙ্গে দৈবী ও আসুরীকে আলো ও অন্ধকারের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। আলো এখানে জ্ঞানের প্রতীক এবং অন্ধকার অজ্ঞতার প্রতীক। একজন মানুষ যখন নিজের ভুল দেখতে পারে, সত্যকে গ্রহণ করতে পারে, নিজের অহংকারকে প্রশ্ন করতে পারে এবং অন্যের কল্যাণের কথা বিবেচনা করতে পারে, তখন তার মধ্যে চেতনার আলো বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে যখন মানুষ নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ সত্য বলে মনে করে, নিজের ভুলকে অস্বীকার করে, অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করে এবং অন্যকে কেবল নিজের স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন তার অন্তরের অন্ধকার ঘনীভূত হয়।

শ্লোকের পরবর্তী অংশে রয়েছে দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত। এর অর্থ দৈবী প্রকৃতি বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। কৃষ্ণ ষোড়শ অধ্যায়ের প্রথম কয়েকটি শ্লোকে দৈবী সম্পদের বহু বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে অভয়, অন্তরের শুদ্ধতা, জ্ঞান, দান, আত্মসংযম, যজ্ঞ, স্বাধ্যায়, তপস্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্য, ক্রোধহীনতা, ত্যাগ, শান্তি, দয়া, অলোভ, মৃদুতা, ক্ষমা, ধৈর্য, শৌচ, অদ্রোহ ও অহংকারহীনতা। এই গুণগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় যে গীতার কাছে দৈবত্ব কোনো অলৌকিক মর্যাদা নয়। দৈবত্ব হলো চরিত্রের উৎকর্ষ এবং চেতনার পরিশুদ্ধতা।

প্রোক্ত শব্দের অর্থ বলা হয়েছে বা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষার একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। কৃষ্ণ প্রথমে দৈবী প্রকৃতির গুণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন এবং এরপর আসুরী প্রকৃতির কথা বলার জন্য প্রস্তুত করছেন। এর মাধ্যমে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। মানুষকে শুধু কী করা উচিত তা বললে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। কী করা উচিত এবং কীভাবে সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুতি ঘটে উভয় বিষয় বুঝতে হয়। আলোকে বোঝার জন্য অন্ধকারের প্রকৃতিও বোঝা দরকার। তাই দৈবী ও আসুরী প্রকৃতির তুলনামূলক আলোচনা মানুষের আত্মপরিচয়কে আরও গভীর করে।

এরপর কৃষ্ণ অর্জুনকে পার্থ বলে সম্বোধন করেন। পার্থ অর্থ পৃথার পুত্র। পৃথা ছিলেন কুন্তীর আরেক নাম। এই সম্বোধনের মধ্যে কেবল পরিচয় নয়, ব্যক্তিগত স্নেহও রয়েছে। তারপর কৃষ্ণ বলেন মে শৃণু। মে অর্থ আমার কাছ থেকে এবং শৃণু অর্থ শোনো। শৃণু শব্দটি শ্রু ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ শোনা। এই একটি শব্দের মধ্যেও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার একটি গভীর শিক্ষা নিহিত রয়েছে। জ্ঞান অর্জনের প্রথম শর্ত হলো শোনার ক্ষমতা। নিজের অহংকারের শব্দ যখন অতিরিক্ত প্রবল হয়ে যায়, তখন সত্যের কণ্ঠস্বর শোনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শোনো বলা মানে শুধু কান দিয়ে শব্দ গ্রহণ করা নয়, নিজের মনকে সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। মানুষ কি স্বভাবতই ভালো অথবা মন্দ। গীতার উত্তর অনেক বেশি সূক্ষ্ম। মানুষের মধ্যে উভয় ধরনের প্রবণতার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মধ্যে জ্ঞানও আছে, অজ্ঞতাও আছে। করুণাও আছে, নিষ্ঠুরতাও আছে। আত্মসংযমের ক্ষমতাও আছে, আবার ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণে ভেসে যাওয়ার প্রবণতাও আছে। তাই মানুষকে তার জন্ম বা বাহ্যিক পরিচয় দিয়ে বিচার করার চেয়ে তার চেতনা ও কর্মের প্রকৃতি বিচার করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাংখ্য দর্শনের আলোকে দৈবী ও আসুরী প্রবণতাকে প্রকৃতির তিন গুণের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা যায়। সত্ত্ব মানুষের মধ্যে জ্ঞান, স্বচ্ছতা ও সামঞ্জস্য বাড়ায়। রজস আকাঙ্ক্ষা ও অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত এবং তমস অজ্ঞতা ও জড়তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে দৈবীকে সরাসরি সত্ত্ব এবং আসুরীকে সরাসরি তমস বলা যথার্থ নয়। দৈবী ও আসুরী মূলত নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চরিত্রের শ্রেণিবিভাগ, আর সত্ত্ব, রজস ও তমস হলো প্রকৃতির গুণগত বিশ্লেষণ। তবু উভয় ধারণার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

বেদান্তীয় দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত আত্মা চৈতন্যস্বরূপ। কিন্তু মানুষ যখন নিজের সত্য সত্তাকে ভুলে দেহ, মন, সম্পদ, ক্ষমতা ও সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে এক করে ফেলে, তখন অহংকার ও আসক্তি জন্ম নিতে পারে। তখন আমি এবং আমার ধারণা তার চেতনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আমি কর্তা, আমি ভোগী, আমিই শ্রেষ্ঠ, আমার সম্পদ, আমার ক্ষমতা এবং আমার সাফল্য এই ধরনের চিন্তা ক্রমে মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলতে পারে। বিপরীতে আত্মজ্ঞান ও বিনয় মানুষকে বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এই উপলব্ধির সঙ্গে দৈবী প্রবণতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মধ্যে সহানুভূতি, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা ও নৈতিক বিবেচনার ক্ষমতা রয়েছে। আবার তার মধ্যে তাৎক্ষণিক তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা, আক্রমণাত্মকতা, অহংকেন্দ্রিকতা এবং অন্যকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতাও থাকতে পারে। গীতার ভাষায় এগুলোর একটি অংশ দৈবী এবং অন্য অংশ আসুরী প্রবণতার সঙ্গে তুলনীয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে গীতার শিক্ষা আত্মপর্যবেক্ষণের শিক্ষা। মানুষকে প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করতে হয় যে তার কোন প্রবণতা আজ বেশি শক্তিশালী হচ্ছে।

এই সত্যকে একটি বাগানের উপমা দিয়ে সহজে বোঝা যায়। মানুষের মন যেন একটি বাগান। সেখানে নানা ধরনের বীজ রয়েছে। কোনো বীজ থেকে দয়া, সত্য, সংযম ও প্রজ্ঞার গাছ জন্মাতে পারে। আবার কোনো বীজ থেকে লোভ, ক্রোধ, হিংসা ও অহংকারের গাছও জন্মাতে পারে। মানুষ প্রতিদিন নিজের চিন্তা, অভ্যাস ও কর্মের মাধ্যমে সেই বাগানে জল দেয়। যে প্রবণতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যে চিন্তাকে বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয় এবং যে আচরণকে নিয়মিত অনুশীলন করা হয়, সেটিই ধীরে ধীরে চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠে। তাই দৈবী ও আসুরী প্রকৃতির প্রশ্ন কেবল জন্মগত স্বভাবের প্রশ্ন নয়, বরং প্রতিদিনের আত্মগঠন ও আত্মপরিবর্তনের প্রশ্ন।

বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন ব্যবসায়ী যদি ভুলবশত নিজের হিসাবে অতিরিক্ত অর্থ দেখতে পান এবং জানেন যে অর্থটি তার নয়, তারপরও সেটি নিজের কাছে রেখে দেন, তাহলে সেখানে লোভ ও স্বার্থপরতার প্রবণতা কাজ করছে। কিন্তু তিনি যদি অর্থটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেখানে সততা ও নৈতিক সংযম প্রকাশিত হয়। একইভাবে একজন মানুষ যখন নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন, অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত না হয়ে আনন্দিত হতে পারেন, ক্ষমতা পাওয়ার পরও বিনয়ী থাকতে পারেন এবং দুর্বল মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন, তখন তার মধ্যে দৈবী প্রবণতা প্রকাশ পায়।

মহাভারতের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা আরও গভীর হয়ে ওঠে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে শুধু দুই রাজনৈতিক পক্ষের সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে গীতার অন্তর্নিহিত প্রতীকী অর্থ ধরা পড়ে না। এই যুদ্ধ মানুষের অন্তরের নৈতিক যুদ্ধেরও প্রতীক। মানুষের মধ্যে যেমন কর্তব্যবোধ রয়েছে, তেমনি আসক্তি রয়েছে। সত্যের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে, আবার নিজের স্বার্থ রক্ষার প্রবণতাও রয়েছে। অহংকার ও লোভ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করতে পারে। আবার জ্ঞান, আত্মসংযম ও ন্যায়বোধ সেই অন্ধকারকে অতিক্রম করার পথ দেখাতে পারে।

এই কারণেই দৈব ও আসুরকে কেবল বাহ্যিক চরিত্রের পরিচয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। একজন মানুষের মধ্যে কোনো কোনো সময় দৈবী প্রবণতা প্রবল হতে পারে এবং অন্য কোনো সময় আসুরী প্রবণতা সক্রিয় হতে পারে। মানুষ নিজের ভুল সংশোধন করতে পারে। নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নিজের লোভকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। অহংকারের পরিবর্তে বিনয় গ্রহণ করতে পারে। এই পরিবর্তনের সম্ভাবনাই গীতার শিক্ষাকে জীবন্ত করে তোলে। এখানে মানুষকে চিরস্থায়ীভাবে ভালো অথবা মন্দ বলে ঘোষণা করা হয় না। বরং তাকে নিজের চেতনার গতিপথ সম্পর্কে সচেতন হতে বলা হয়।

আধুনিক জীবনে এই শ্লোকের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য অন্যকে অপমান করা, অর্থের জন্য অন্যায় করা, ক্ষমতার জন্য সত্যকে বিসর্জন দেওয়া, ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য অন্যের অধিকার নষ্ট করা কিংবা নিজের ভুলকে স্বীকার না করে সবসময় অন্যকে দোষ দেওয়া আসুরী প্রবণতার আধুনিক প্রকাশ হতে পারে। অন্যদিকে সত্য কথা বলা, অন্যায় লাভ প্রত্যাখ্যান করা, দুর্বলকে সাহায্য করা, নিজের ভুল স্বীকার করা, ক্ষমা করতে শেখা এবং নিজের সাফল্যের মধ্যেও বিনয়ী থাকা দৈবী প্রবণতার আধুনিক প্রকাশ।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত একটি আত্মজিজ্ঞাসায় নিহিত। প্রশ্নটি শুধু কে দৈব এবং কে আসুর তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো আমার মধ্যে কোন প্রবণতা বর্তমানে সক্রিয়। আমি কি সত্যকে অনুসরণ করছি, নাকি নিজের সুবিধাকে। আমি কি অন্যকে সম্মান করছি, নাকি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছি। আমি কি নিজের ভুল দেখতে পারছি। আমি কি ক্রোধের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি। আমি কি ক্ষমতা পেলে আরও বিনয়ী হচ্ছি, নাকি আরও অহংকারী হয়ে উঠছি। এই প্রশ্নগুলো মানুষকে বাইরের জগতের বিচারক হওয়ার আগে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে শেখায়।

অতএব দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেহস্মিন্ দৈব আসুর এব চ শ্লোকটি মানুষের চরিত্র, চেতনা ও নৈতিক জীবনের একটি গভীর মানচিত্র। দৈবী প্রকৃতি হলো মানুষের মধ্যে থাকা সেই শক্তি যা তাকে সত্য, দয়া, সংযম, বিনয়, জ্ঞান ও মুক্তির দিকে নিয়ে যায়। আসুরী প্রকৃতি হলো সেই প্রবণতা যা তাকে অহংকার, লোভ, ক্রোধ, হিংসা, অজ্ঞতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে নিয়ে যায়। এই দুই প্রবণতার সংঘর্ষ কোনো দূরবর্তী পৌরাণিক জগতে ঘটে না। এটি প্রতিদিন মানুষের নিজের চিন্তার মধ্যে, সিদ্ধান্তের মধ্যে এবং আচরণের মধ্যে ঘটে।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের বাইরের কোনো অসুরকে খুঁজে বের করার শিক্ষা দেয় না। এটি নিজের অন্তরের অন্ধকারকে চিনতে শেখায়। একই সঙ্গে নিজের মধ্যে থাকা আলোর সম্ভাবনাকেও উপলব্ধি করতে শেখায়। মানুষের প্রকৃত উন্নতি তখনই সম্ভব যখন সে নিজের অহংকারকে প্রশ্ন করতে শেখে, লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, ক্রোধকে অতিক্রম করতে শেখে এবং সত্য, দয়া, সংযম ও জ্ঞানের পথে নিজেকে পরিচালিত করে। এই অর্থে দৈবত্ব কোনো দূরবর্তী দেবলোকের বিষয় নয়। মানুষের প্রতিটি সৎ চিন্তা, প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত, প্রতিটি সংযত আচরণ এবং প্রতিটি নিঃস্বার্থ কর্মের মধ্যেই দৈবী সম্ভাবনার প্রকাশ ঘটে। আর আসুরত্বও কোনো অদৃশ্য জগতের বিষয় নয়। যখন মানুষ সত্য জেনেও অসত্যকে বেছে নেয়, অন্যের ক্ষতি জেনেও নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ মনে করে এবং অহংকারকে সত্যের উপরে স্থান দেয়, তখন তার নিজের মধ্যেই আসুরী প্রবণতা শক্তিশালী হয়। তাই এই শ্লোকের চূড়ান্ত আহ্বান হলো নিজের অন্তরকে জানা, নিজের প্রবণতাকে পর্যবেক্ষণ করা এবং সচেতনভাবে সেই পথ বেছে নেওয়া যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে, অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে এবং সংকীর্ণ স্বার্থ থেকে বৃহত্তর কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি