Related

Share

ভগবদ্গীতা ১৬.৭ — প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির অজ্ঞান, শৌচহীনতা, অসদাচার ও সত্যবিমুখতা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on August 24, 2026
প্রবৃত্তিং চ নিবৃত্তিং চ জনা ন বিদুরাসুরাঃ।ন শৌচং নাপি চাচারো ন সত্যং…
প্রবৃত্তিং চ নিবৃত্তিং চ জনা ন বিদুরাসুরাঃ।
ন শৌচং নাপি চাচারো ন সত্যং তেষু বিদ্যতে।।৭।।

অনুবাদঃ অসুরস্বভাব ব্যক্তিরা ধর্ম বিষয়ে প্রবৃত্ত এবং অধর্ম বিষয় থেকে নিবৃত্ত হতে জানে না। তাদের মেধ্যে শৌচ, সদাচার ও সত্যতা বিদ্যমান নেই।

ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকটি মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে প্রকাশ করে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ আসুরী প্রকৃতির মানুষের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, তারা প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির প্রকৃত স্বরূপ জানে না। তাদের মধ্যে শৌচ নেই, সঠিক আচার নেই এবং সত্যও প্রতিষ্ঠিত থাকে না। শ্লোকটি ছোট হলেও এর মধ্যে মানুষের কর্মবোধ, নৈতিক বিচার, আত্মসংযম, চরিত্র, সত্যনিষ্ঠা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে মানুষের বাহ্যিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা করেননি। তিনি মানুষের অন্তর্গত প্রকৃতি এবং সেই প্রকৃতির দ্বারা পরিচালিত জীবনযাত্রার কথা বলেছেন। তাই এই শ্লোককে মানুষের অন্তর্জগতের একটি গভীর নৈতিক বিশ্লেষণ হিসেবেও দেখা যায়।

শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো প্রবৃত্তি। সংস্কৃত প্রবৃত্তি শব্দটি প্র এবং √বৃত ধাতুর সঙ্গে তি প্রত্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত। প্র উপসর্গের মধ্যে সামনে এগিয়ে যাওয়া, অগ্রসর হওয়া এবং বিশেষভাবে কোনো কাজে প্রবেশ করার ভাব রয়েছে। √বৃত ধাতুর মধ্যে চলা, ঘোরা, প্রবাহিত হওয়া এবং কোনো অবস্থায় প্রবেশ করার অর্থ নিহিত আছে। সেই দিক থেকে প্রবৃত্তির আক্ষরিক অর্থ হলো কোনো কাজের দিকে অগ্রসর হওয়া বা কোনো কর্মে প্রবেশ করা। বাংলায় প্রবৃত্তি বলতে কর্মপ্রবণতা, আগ্রহ, কোনো কাজের দিকে স্বাভাবিক ঝোঁক কিংবা সক্রিয়ভাবে কোনো পথে এগিয়ে যাওয়াকে বোঝানো হয়। তবে গীতার এই শ্লোকে প্রবৃত্তি শব্দের অর্থ কেবল কোনো কাজ করার ইচ্ছা নয়। এখানে প্রবৃত্তি হলো কোন কাজ মানুষের জন্য কর্তব্য, কোন কর্ম ধর্মসম্মত এবং কোন পথে এগিয়ে যাওয়া উচিত সেই বিচারবোধসহ কর্মে প্রবেশ করা।

এর বিপরীত অর্থের গভীর ধারণা প্রকাশ করে নিবৃত্তি শব্দটি। নিবৃত্তি গঠিত হয়েছে নি উপসর্গ, √বৃত ধাতু এবং তি প্রত্যয়ের মাধ্যমে। নি উপসর্গের মধ্যে প্রত্যাহার, সরে আসা, নিচের দিকে যাওয়া কিংবা কোনো অবস্থান থেকে নিজেকে ফিরিয়ে নেওয়ার ভাব রয়েছে। তাই নিবৃত্তির আক্ষরিক অর্থ হলো কোনো কাজ বা প্রবণতা থেকে ফিরে আসা, সরে যাওয়া কিংবা বিরত হওয়া। কিন্তু গীতার দর্শনে নিবৃত্তি মানে জীবনের সব কাজ ত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং যে কাজ অধর্মপূর্ণ, অনৈতিক, আত্মবিনাশী কিংবা অন্যের ক্ষতির কারণ, সেই কাজ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করার ক্ষমতাই নিবৃত্তির গভীর অর্থ। এই কারণে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং একটি সুস্থ নৈতিক জীবনে কোথায় প্রবৃত্ত হতে হবে এবং কোথায় নিবৃত্ত হতে হবে, সেই বিচারবুদ্ধিই মানুষের প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়।

মানুষের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে প্রতিটি মুহূর্তে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির প্রশ্ন উপস্থিত হয়। আমাদের সামনে কোনো কাজ করার সুযোগ এলে প্রশ্ন ওঠে সেটি কি করা উচিত। আবার কোনো আকাঙ্ক্ষা বা প্রবণতা আমাদের মধ্যে জাগলে প্রশ্ন ওঠে সেটিকে অনুসরণ করা উচিত কি না। প্রবৃত্তি আমাদের কর্মের দিকে নিয়ে যায় এবং নিবৃত্তি আমাদের সীমারেখা চিনতে শেখায়। একজন মানুষ যদি কেবল কাজ করতে জানে কিন্তু কখন থামতে হবে তা না জানে, তাহলে তার কর্মশক্তি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে। আবার যদি সে সবকিছু থেকে সরে যেতে চায় এবং কর্তব্যকর্ম থেকেও পালিয়ে যায়, তাহলেও তার জীবন পূর্ণতা লাভ করে না। তাই গীতার দৃষ্টিতে জ্ঞানী মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো সঠিক কর্মে প্রবৃত্ত হওয়া এবং অনুচিত কর্ম থেকে নিবৃত্ত হওয়া।

শ্লোকে বলা হয়েছে জনা ন বিদুরাসুরাঃ। এখানে বিদু শব্দটি √বিদ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ জানা, উপলব্ধি করা কিংবা সত্যকে জ্ঞানের মাধ্যমে ধারণ করা। কিন্তু আসুরী মানুষ প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি জানে না বলা মানে এই নয় যে তারা এই দুটি শব্দের অভিধানগত অর্থ জানে না। এর গভীর অর্থ হলো তারা নৈতিকভাবে বুঝতে পারে না কোনটি গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি বর্জনীয়। তাদের জ্ঞান যদি থাকে, সেটি অনেক সময় তথ্যের জ্ঞান হতে পারে, কিন্তু তা বিবেকের জ্ঞান হয়ে ওঠে না। তারা জানে কীভাবে কোনো কাজ করতে হয়, কিন্তু সবসময় জানে না কোন কাজ করা উচিত। তারা নিজের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন কি না তা বুঝতে পারে না। এখানেই আসুরী প্রকৃতির মূল সমস্যা।

আসুরী শব্দটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণভাবে অসুর বলতে পৌরাণিক কাহিনির কোনো দানবীয় সত্তাকে বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে আসুরী শব্দের অর্থ আরও গভীর এবং মনস্তাত্ত্বিক। এখানে আসুরী প্রকৃতি কোনো বিশেষ জাতি, সম্প্রদায় বা বাহ্যিক পরিচয়ের নাম নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত এমন একটি মানসিক ও নৈতিক অবস্থার প্রতীক যেখানে অহংকার, দম্ভ, লোভ, অতিরিক্ত ভোগপ্রবণতা, অসংযম, নিষ্ঠুরতা, অসত্য এবং ধর্মবোধের অভাব প্রবল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ অসুরকে কেবল বাইরে কোনো শত্রু হিসেবে খুঁজলে শ্লোকটির প্রকৃত শিক্ষা বোঝা যায় না। মানুষের নিজের মনেও আসুরী প্রবণতা জন্ম নিতে পারে। যখন মানুষ নিজের কামনা ও স্বার্থকে ন্যায়ের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে এবং নিজের কাজের নৈতিক পরিণতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে যায়, তখন তার মধ্যেই আসুরী প্রকৃতি প্রকাশ পায়।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন ন শৌচং। শৌচ শব্দটি √শুচ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে পরিষ্কার হওয়া, পবিত্র হওয়া এবং স্বচ্ছ হওয়ার ভাব রয়েছে। শৌচকে কেবল শরীরের পরিচ্ছন্নতা হিসেবে দেখলে এর অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শৌচের একটি বাহ্যিক দিক আছে এবং একটি অন্তর্গত দিক আছে। বাহ্যিক শৌচ হলো শরীর, পরিবেশ ও জীবনযাপনের পরিচ্ছন্নতা। কিন্তু অন্তরের শৌচ হলো চিন্তার পবিত্রতা, উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতা এবং হৃদয়ের কলুষতা থেকে মুক্ত থাকা। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন হতে পারেন, কিন্তু যদি তার মনে প্রতারণা, হিংসা, লোভ এবং বিদ্বেষ থাকে, তাহলে তার অন্তর সত্যিকার অর্থে শুচি নয়। এই কারণে গীতার আলোকে শৌচ হলো মানুষের বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরের স্বচ্ছতা।

এরপর আসে আচার শব্দটি। সংস্কৃত আচার শব্দটি আ এবং √চর ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। √চর ধাতুর মধ্যে চলা, বিচরণ করা এবং জীবনযাপনের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চলার ভাব রয়েছে। সেই অর্থে আচার হলো মানুষ কীভাবে চলে, কীভাবে আচরণ করে এবং কীভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করে তার প্রকাশ। বাংলায় আচার বলতে সামাজিক রীতি, ধর্মীয় অনুশাসন, নৈতিক আচরণ, সদাচরণ এবং জীবনপদ্ধতিকে বোঝানো হয়। শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন আসুরী মানুষের মধ্যে আচার নেই, তখন তিনি কেবল কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক রীতির কথা বলছেন না। তিনি এমন জীবনযাত্রার কথা বলছেন যেখানে নৈতিক শৃঙ্খলা, সংযম, কর্তব্যবোধ এবং সদাচরণ অনুপস্থিত।

এরপর শ্লোকের শেষের দিকে আসে সত্য শব্দটি। সত্য সংস্কৃত দর্শনের অন্যতম গভীর শব্দ। এর সঙ্গে √অস ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ অস্তিত্বশীল হওয়া বা থাকা। সৎ বলতে যা আছে বা যা সত্যভাবে বিদ্যমান তাকে বোঝানো হয়। সেই থেকে সত্যের ধারণা এসেছে। তাই সত্য কেবল মিথ্যার বিপরীত নয়। সত্য হলো বাস্তবতার সঙ্গে চিন্তা, বাক্য এবং জীবনের সামঞ্জস্য। একজন মানুষ মুখে সত্য কথা বললেও যদি তার জীবন প্রতারণায় পূর্ণ হয়, তাহলে তার সত্যনিষ্ঠা অসম্পূর্ণ। সত্য তখনই গভীর অর্থ লাভ করে যখন মানুষের চিন্তা, কথা ও কাজের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্লোকের ন শৌচং নাপি চাচারো ন সত্যং তেষু বিদ্যতে অংশটি তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ একে একে তিনটি স্তরের পতন দেখিয়েছেন। প্রথমে অন্তরের শুদ্ধতার অভাব, তারপর আচরণের অবক্ষয় এবং শেষ পর্যন্ত সত্যের অনুপস্থিতি। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে নৈতিক অবক্ষয় হঠাৎ ঘটে না। মানুষের ভিতরের বিচারবোধ দুর্বল হলে তার চিন্তা কলুষিত হয়। চিন্তা কলুষিত হলে আচরণে তার প্রকাশ ঘটে। আচরণ বিকৃত হলে সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়। ধীরে ধীরে এমন একটি জীবন তৈরি হয় যেখানে মানুষ নিজের স্বার্থকে সত্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করে।

এই শ্লোকের মধ্যে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির ধারণা মানুষের নৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাধারণভাবে মানুষ মনে করতে পারে যে স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তা করা। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এটি প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। যদি একজন মানুষ নিজের প্রতিটি ইচ্ছার দাস হয়ে যায়, তাহলে সে বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হলেও অন্তরে স্বাধীন নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো নিজের আকাঙ্ক্ষাকে বিচার করার ক্ষমতা এবং প্রয়োজন হলে অনুচিত আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করার শক্তি। যে মানুষ ক্রোধ অনুভব করেও ক্রোধের দ্বারা পরিচালিত হয় না, সে নিবৃত্তির শক্তি জানে। যে মানুষ কর্তব্য বুঝে তা সম্পাদন করে, সে প্রবৃত্তির সঠিক ব্যবহার জানে।

এই বিষয়টি একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। মানুষের জীবনকে যদি একটি গাড়ির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে প্রবৃত্তি হলো গাড়ির গতি এবং নিবৃত্তি হলো তার নিয়ন্ত্রণ। শুধু গতি থাকলে গাড়ি দ্রুত এগোতে পারে, কিন্তু কোথায় থামতে হবে তা না জানলে সেই গতি বিপদের কারণ হতে পারে। আবার সবসময় থেমে থাকলেও গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। দক্ষ চালক জানেন কখন গতি বাড়াতে হবে এবং কখন থামতে হবে। তেমনি জ্ঞানী মানুষ জানেন কখন কর্তব্যকর্মে প্রবৃত্ত হতে হবে এবং কখন অন্যায় প্রবণতা থেকে নিবৃত্ত হতে হবে। এই ভারসাম্যই নৈতিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি।

আধুনিক জীবনেও এই শিক্ষার গুরুত্ব অসীম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা কিছু আকর্ষণীয় মনে হয় তা অনুসরণ করা প্রবৃত্তি হতে পারে, কিন্তু কোন বিষয় নিজের মনকে কলুষিত করছে তা বুঝে সেখান থেকে সরে আসা নিবৃত্তি। ব্যবসায় দ্রুত লাভের সুযোগ পাওয়া প্রবৃত্তিকে উৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু প্রতারণার মাধ্যমে লাভ অর্জন না করা নিবৃত্তি। ক্ষমতা অর্জনের ইচ্ছা প্রবৃত্তি হতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নিজেকে বিরত রাখা নিবৃত্তি। কোনো অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রবৃত্তি হতে পারে, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে ন্যায়ের পথে থাকা নিবৃত্তি। এই অর্থে গীতার এই শ্লোক বহু শতাব্দী পেরিয়ে আজও মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।

শ্লোকটির দার্শনিক শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত সমস্যা কেবল ভুল কাজ করা নয়। আরও গভীর সমস্যা হলো কোন কাজ সঠিক এবং কোন কাজ ভুল সেই বিচারবোধ হারিয়ে ফেলা। মানুষ যখন নিজের কামনা, লোভ এবং অহংকারকে একমাত্র সত্য বলে মনে করতে শুরু করে, তখন তার কাছে ধর্মের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। সে তখন নিজের সুবিধাকে ন্যায় বলে মনে করতে পারে এবং নিজের স্বার্থকে সত্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে পারে। এই অবস্থাই আসুরী প্রকৃতির একটি গভীর লক্ষণ। তাই গীতার শিক্ষা কেবল ভালো কাজ করার নির্দেশ নয়। এটি মানুষের মধ্যে এমন একটি বিবেক জাগ্রত করতে চায় যা তাকে প্রতিটি কর্মের আগে প্রশ্ন করতে শেখায় যে এই কাজ কি সত্য, ন্যায় এবং কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই শ্লোকের আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলে কেবল ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষা, অহংকার এবং ভোগকে জীবনের কেন্দ্র করে তোলে, তখন তার চেতনা বাইরের বিষয়ের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসংযম তাকে আবার নিজের গভীরে ফিরিয়ে আনে। প্রবৃত্তি তখন কেবল ভোগের দিকে যাওয়া নয়, বরং কর্তব্য ও কল্যাণের দিকে এগিয়ে যাওয়া হয়ে ওঠে। নিবৃত্তি তখন জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং অধর্ম, লোভ, হিংসা এবং অসত্য থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করা হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই মানুষের চেতনা ক্রমে পরিশুদ্ধ হয়।

সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানুষের জীবনের একটি মৌলিক সত্যকে প্রকাশ করে। মানুষের উন্নতি শুধু সে কত কিছু করতে পারে তার উপর নির্ভর করে না। সে কখন কী করবে এবং কখন কী করবে না, সেই বিচারবোধের উপরও তার উন্নতি নির্ভর করে। প্রবৃত্তি মানুষকে কর্মের পথে নিয়ে যায় এবং নিবৃত্তি তাকে সীমা চিনতে শেখায়। শৌচ মানুষের অন্তরকে পরিষ্কার রাখে, আচার সেই অন্তরের গুণকে জীবনে প্রকাশ করে এবং সত্য মানুষের চিন্তা, বাক্য ও কর্মকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত রাখে। আর যখন প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির বিচারবোধ হারিয়ে যায়, তখন অন্তরের শুদ্ধতা নষ্ট হয়, আচরণ বিকৃত হয় এবং সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এই শ্লোক কেবল আসুরী প্রকৃতির মানুষের সমালোচনা নয়, এটি প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি আত্মপরীক্ষার আহ্বান। আমাদের প্রত্যেকের নিজের মধ্যে প্রশ্ন করা দরকার আমরা কোথায় প্রবৃত্ত হচ্ছি, কোথা থেকে নিবৃত্ত হচ্ছি, আমাদের অন্তর কতটা শুচি, আমাদের আচরণ কতটা সৎ এবং আমাদের জীবন কতটা সত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই আত্মজিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েই গীতার এই সংক্ষিপ্ত শ্লোক একটি গভীর জীবনদর্শনে পরিণত হয়।

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: August 24, 2026 August 24, 2026

More insight about ভগবদ্গীতা ১৬.৭ — প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির অজ্ঞান, শৌচহীনতা, অসদাচার ও সত্যবিমুখতা

More insight about ভগবদ্গীতা ১৬.৭ — প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির অজ্ঞান, শৌচহীনতা, অসদাচার ও সত্যবিমুখতা