ভগবদ্গীতা ১৬.৮ — আসুরী বিশ্বদৃষ্টি, জগতের অসত্য ধারণা ও ঈশ্বর অস্বীকারের দর্শন
অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্।
অপরস্পরসম্ভুতং কিমন্যৎ কামহৈতুকম্।।৮।।
অনুবাদঃ আসুরিক স্বভাববিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলে যে, এই জগৎ মিথ্যা, অবলম্বনহীন ও ঈশ্বরশূন্য। কামবশত এই জগৎ উৎপন্ন হয়েছে এবং কাম ছাড়া আর অন্য কোন কারণ নেই।
ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকটি মানুষের একটি বিশেষ বিশ্বদৃষ্টির গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে। শ্লোকটি হলো
এর সরল অর্থ হলো, যারা আসুরী প্রকৃতির অধিকারী তারা বলে যে এই জগৎ অসত্য, এর কোনো স্থায়ী ভিত্তি নেই, এর কোনো ঈশ্বর বা সর্বোচ্চ নিয়ন্তা নেই। তারা মনে করে জগৎ পরস্পর সম্পর্কিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়েছে এবং কামনা ছাড়া এর আর কোনো কারণ নেই। তবে এই শ্লোককে কেবল একটি ধর্মীয় মতের বিবরণ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। এর মধ্যে জগতের প্রকৃতি, সত্যের ভিত্তি, ঈশ্বরের ধারণা, কারণ ও কার্য, মানবিক কামনা এবং নৈতিকতার ভিত্তি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক প্রশ্ন নিহিত রয়েছে।
শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অসত্যম্। সংস্কৃত অসত্যম্ শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং সত্য থেকে। সত্য শব্দটি সত্ শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। সত্ বলতে বোঝায় যা আছে, যা বিদ্যমান, যা বাস্তব এবং যা অস্তিত্বের দিক থেকে সত্য। এর পূর্বে অ যুক্ত হলে অসত্য অর্থ দাঁড়ায় যা সত্য নয় বা যা পরম বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এই শ্লোকে অসত্য শব্দটিকে শুধু মিথ্যা অর্থে গ্রহণ করলে এর গভীরতা হারিয়ে যায়। এখানে অসত্য বলতে এমন একটি বিশ্বদৃষ্টিকে বোঝানো হয়েছে যেখানে জগতের পেছনে কোনো চূড়ান্ত সত্য বা পরম বাস্তবতা নেই বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ দৃশ্যমান জগৎ আছে ঠিকই, কিন্তু তার অন্তরে কোনো শাশ্বত সত্য বা চূড়ান্ত ভিত্তি নেই। এটি মূলত একটি অস্তিত্বতাত্ত্বিক বক্তব্য।
এরপর এসেছে অপ্রতিষ্ঠম্ শব্দটি। প্রতিষ্ঠা শব্দটি স্থা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে স্থিত হওয়া, দাঁড়িয়ে থাকা, ভিত্তি লাভ করা এবং নির্ভর করার মতো অবস্থানের ধারণা রয়েছে। অপ্রতিষ্ঠ অর্থ হলো যার কোনো প্রতিষ্ঠা নেই, যার কোনো স্থায়ী ভিত্তি নেই। এখানে ভিত্তি বলতে শুধু বস্তুগত ভিত্তি বোঝানো হয় না। এর মধ্যে অস্তিত্বের ভিত্তি, নৈতিকতার ভিত্তি, বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি এবং পরম সত্যের ভিত্তি সবই অন্তর্ভুক্ত। আসুরী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জগৎ কোনো চিরন্তন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে জীবন ও বিশ্বকে একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং নৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখার প্রয়োজনও তারা অনুভব করে না।
এরপর বলা হয়েছে জগৎ। জগৎ শব্দটির সঙ্গে গম্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে যার অর্থ যাওয়া বা চলা। এই দিক থেকে জগৎ বলতে এমন এক বাস্তবতাকে বোঝানো যায় যা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এবং গতিশীল। যা জন্মায়, পরিবর্তিত হয়, ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং অন্য রূপ ধারণ করে সেই পরিবর্তনশীল বিশ্বই জগৎ। তাই জগৎ শব্দের মধ্যে শুধু পৃথিবীর ধারণা নেই। এর মধ্যে সমগ্র জীবজগৎ, প্রকৃতি এবং পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের ধারণা রয়েছে। এই পরিবর্তনশীল জগতকে কেউ যদি চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করে তবে সে দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য অনুসন্ধান করবে না।
শ্লোকে এরপর এসেছে আহুঃ শব্দটি। এর অর্থ তারা বলে বা তারা মনে করে। এই শব্দটির গুরুত্ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শ্রীকৃষ্ণ নিজে বলছেন না যে জগৎ অসত্য এবং ঈশ্বরহীন। তিনি বলছেন, আসুরী প্রকৃতির মানুষরা জগৎ সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করে। ফলে শ্লোকটি একটি নির্দিষ্ট বিশ্বদর্শনের বর্ণনা এবং সমালোচনা করছে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি মনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গীতার বক্তব্য বোঝার জন্য শ্লোকটিকে তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শ্লোকের সঙ্গে পড়তে হয়।
অনীশ্বরম্ শব্দটি এই শ্লোকের আরেকটি গভীর শব্দ। এটি অ এবং ঈশ্বর থেকে গঠিত। ঈশ্বর শব্দের সঙ্গে ঈশ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে যার মধ্যে শাসন করা, নিয়ন্ত্রণ করা, অধিকার রাখা এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতার ধারণা রয়েছে। তাই ঈশ্বর বলতে শুধু কোনো দেবতাকে বোঝানো হয় না। এর গভীর অর্থ হলো পরম নিয়ন্তা, সর্বোচ্চ অধীশ্বর এবং বিশ্বব্যবস্থার চূড়ান্ত নিয়ামক। অনীশ্বর অর্থ হলো এমন একটি বিশ্ব যেখানে কোনো পরম নিয়ন্তা বা ঈশ্বরকে স্বীকার করা হয় না। এর ফলে নৈতিকতার চূড়ান্ত ভিত্তি, কর্মের অতীন্দ্রিয় ফল এবং জীবনের কোনো পরম উদ্দেশ্য আছে কি না সেই প্রশ্নগুলোও ভিন্নভাবে দেখা হয়।
অপরস্পরসম্ভূতম্ শব্দটি শ্লোকটির কারণতত্ত্বকে প্রকাশ করে। অপরস্পর অর্থ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সম্ভূত শব্দটি সম্ ও ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত যার অর্থ উৎপন্ন হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা উদ্ভূত হওয়া। অর্থাৎ অপরস্পরসম্ভূত বলতে বোঝানো হয়েছে পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে উৎপন্ন। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জগৎ কোনো পরম সত্তার দ্বারা সৃষ্ট নয়। এক বস্তু অন্য বস্তুর কারণ এবং সেই বস্তু আবার অন্য কিছুর ফল। এভাবে পারস্পরিক কারণের ধারায় জগতের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। এখানে মূল প্রশ্ন হলো এই কারণশৃঙ্খলার চূড়ান্ত ভিত্তি কোথায়। আসুরী দৃষ্টিভঙ্গি সেই চূড়ান্ত ভিত্তি স্বীকার করে না।
শ্লোকের শেষ অংশ হলো কিমন্যৎ কামহৈতুকম্। কিম অর্থ কী এবং অন্যৎ অর্থ অন্য কিছু। অর্থাৎ আর কী থাকতে পারে। কামহৈতুকম্ শব্দটি কাম ও হেতুর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। কাম বলতে ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, ভোগেচ্ছা এবং কোনো কিছু লাভ করার প্রবল বাসনা বোঝায়। হেতু বলতে কারণ বোঝায়। সুতরাং কামহৈতুকম্ অর্থ হলো কামনাই যার কারণ বা কামনাজাত। এখানে কাম শব্দকে শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। এর মধ্যে সম্পদ, ক্ষমতা, সম্মান, ভোগ, ইন্দ্রিয়সুখ এবং নিজের ইচ্ছা পূরণের আকাঙ্ক্ষা অন্তর্ভুক্ত। এই অর্থে কামহৈতুকম্ একটি সম্পূর্ণ ভোগবাদী বিশ্বদর্শনের প্রতীক।
শ্লোকটির সমগ্র ভাবকে একত্র করলে একটি ধারাবাহিক দার্শনিক চিন্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমে বলা হচ্ছে জগতের কোনো পরম সত্য নেই। এরপর বলা হচ্ছে এর কোনো স্থায়ী ভিত্তি নেই। তারপর বলা হচ্ছে এর কোনো ঈশ্বর বা পরম নিয়ন্তা নেই। এরপর বলা হচ্ছে এটি পরস্পর সম্পর্কিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়েছে। সবশেষে বলা হচ্ছে কামনা ছাড়া এর আর কোনো কারণ নেই। অর্থাৎ সত্যের ভিত্তি অস্বীকার, ঈশ্বরের ধারণা অস্বীকার এবং কামনাকে জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করা একই বিশ্বদৃষ্টির বিভিন্ন দিক।
এই শ্লোকের দার্শনিক গুরুত্ব এখানেই যে এটি মানুষের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে। জগতের দৃশ্যমান কারণগুলোর বাইরে কি কোনো চূড়ান্ত কারণ আছে। পরিবর্তনশীল বাস্তবতার পেছনে কি কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য রয়েছে। নৈতিকতার কি কোনো শাশ্বত ভিত্তি আছে। মানুষের জীবন কি শুধু ইচ্ছা ও ভোগের ধারাবাহিকতা, নাকি তার মধ্যে আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। আসুরী দৃষ্টিভঙ্গি এসব প্রশ্নের উত্তর বাহ্যিক জগৎ এবং কামনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। গীতার আধ্যাত্মিক দর্শন সেই সীমার বাইরে সত্য অনুসন্ধানের আহ্বান জানায়।
মানবজীবনের মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ইচ্ছা তার আচরণকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। মানুষ সম্পদ চায়, সম্মান চায়, ক্ষমতা চায়, ভালোবাসা চায়, নিরাপত্তা চায় এবং ইন্দ্রিয়সুখ চায়। কামনা নিজে সবসময় নেতিবাচক নয়। কিন্তু যখন মানুষ নিজের কামনাকে সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে তখন সমস্যা শুরু হয়। প্রথমে মানুষ বলে আমি এটি চাই। এরপর বলে আমার এটি পাওয়া উচিত। তারপর বলে এটি পাওয়ার অধিকার আমার আছে। শেষ পর্যন্ত সে মনে করতে পারে আমার ইচ্ছাই ন্যায়সঙ্গত। এই অবস্থায় কামনা ধীরে ধীরে বিবেক এবং নৈতিক বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি বাস্তব উদাহরণ হতে পারে এমন একজন ব্যক্তি যে মনে করে জীবনের কোনো চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নেই এবং মানুষ কেবল নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য বেঁচে থাকে। তার কাছে সম্পদ হবে ভোগের মাধ্যম, ক্ষমতা হবে নিজের ইচ্ছা প্রতিষ্ঠার উপায় এবং অন্য মানুষ হয়ে উঠবে নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণের উপকরণ। এই মানসিকতার পরিণতিতে লোভ, অহংকার, প্রতিযোগিতা, শোষণ এবং সংঘাত জন্ম নিতে পারে। তাই গীতার সমালোচনা মানুষের ইচ্ছা থাকার বিরুদ্ধে নয়। বরং ইচ্ছাকে জীবনের একমাত্র সত্য বলে মনে করার বিরুদ্ধে।
এই প্রসঙ্গে একটি সহজ উপমা ব্যবহার করা যায়। একটি বিশাল ভবন দেখে কেউ যদি বলে ভবনটি আছে কিন্তু তার কোনো ভিত্তি নেই, তার কোনো পরিকল্পনাকারী নেই এবং এটি কেবল এক অংশের ওপর আরেক অংশের নির্ভরতার ফলে দাঁড়িয়ে আছে, তাহলে সে ভবনের দৃশ্যমান অস্তিত্বকে স্বীকার করলেও তার গভীর ভিত্তি অস্বীকার করছে। একইভাবে আসুরী দৃষ্টিভঙ্গি জগতের অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে না। বরং জগতের অন্তর্নিহিত কোনো চূড়ান্ত সত্য, ভিত্তি বা নিয়ামককে অস্বীকার করছে। তারপর তার অস্তিত্বকে কামনার সঙ্গে ব্যাখ্যা করছে।
তবে এই শ্লোককে আধুনিক বিজ্ঞান বা প্রত্যেক ধরনের নাস্তিকতার সরাসরি সমার্থক মনে করা উচিত নয়। আধুনিক বিজ্ঞান প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর কার্যকারণ ব্যাখ্যা করে এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য জগতের নিয়ম অনুসন্ধান করে। কিন্তু এই শ্লোকের প্রশ্ন আরও মৌলিক। এখানে প্রশ্ন করা হচ্ছে জগতের চূড়ান্ত ভিত্তি কী, নৈতিকতার গভীর উৎস কী এবং মানবজীবনের পরম উদ্দেশ্য কী। তাই শ্লোকটি কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ বক্তব্য নয়। এটি মূলত একটি দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক বিশ্বদৃষ্টির সমালোচনা।
এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কাম এবং সত্যের সম্পর্ক। মানুষ যখন কোনো কিছু কামনা করে তখন তার মন সেই কামনাকে পূরণ করার মতো যুক্তি খুঁজতে থাকে। তখন সত্যের পরিবর্তে আকাঙ্ক্ষা হয়ে উঠতে পারে চিন্তার কেন্দ্র। মানুষ যা চায় সেটাকেই ভালো মনে করে এবং যা তার ইচ্ছার বিরোধী সেটাকে খারাপ মনে করে। এভাবে ব্যক্তিগত কামনা ধীরে ধীরে নৈতিকতার মানদণ্ড হয়ে ওঠে। গীতার দৃষ্টিতে এখানেই আসুরী মানসিকতার গভীর বিপদ।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক আরও গভীর একটি প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ কি শুধু তার আকাঙ্ক্ষার সমষ্টি। যদি মানুষ কেবল চাওয়া, পাওয়া এবং ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে তার জীবন একটি অন্তহীন চক্রে আবদ্ধ হয়ে যায়। একটি ইচ্ছা পূরণ হলে আরেকটি ইচ্ছা জন্ম নেয়। একটি সাফল্যের পরে আরেকটি সাফল্য প্রয়োজন হয়। একটি ভোগের পরে আরও ভোগের আকাঙ্ক্ষা জাগে। ফলে কামনা কখনো স্থায়ী তৃপ্তি দেয় না। গীতার আধ্যাত্মিক শিক্ষা মানুষকে এই চক্রের বাইরে নিজের প্রকৃত সত্তাকে অনুসন্ধান করতে আহ্বান জানায়।
এই কারণে অসত্যম্, অপ্রতিষ্ঠম্, অনীশ্বরম্, অপরস্পরসম্ভূতম্ এবং কামহৈতুকম্ শব্দগুলো কেবল কয়েকটি সংস্কৃত পদ নয়। এগুলো একত্রে একটি সম্পূর্ণ বিশ্বদর্শনের ছবি তৈরি করে। সেই বিশ্বদর্শনে জগতের কোনো পরম সত্য নেই, কোনো স্থায়ী ভিত্তি নেই, কোনো ঈশ্বরীয় নিয়ামক নেই, সবকিছু পারস্পরিক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন এবং কামনাই জীবনের মূল চালিকাশক্তি। গীতার দৃষ্টিতে এই বিশ্বদর্শন মানুষকে বাহ্যিক ভোগ, অহংকার এবং সীমাহীন আকাঙ্ক্ষার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের সামনে একটি চিরন্তন মানবিক প্রশ্ন রেখে যায়। মানুষ কি কেবল তার কামনা পূরণের জন্য পৃথিবীতে এসেছে, নাকি তার অস্তিত্বের মধ্যে এমন কোনো গভীরতর সত্য রয়েছে যা ভোগ ও আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে। গীতার উত্তর হলো মানুষের জীবনকে কেবল ইচ্ছা ও ভোগের দৃষ্টিতে দেখলে তার প্রকৃত সম্ভাবনা আড়াল হয়ে যায়। মানুষ বাহ্যিক জগতের ভোক্তা হওয়ার পাশাপাশি নিজের অন্তর্লোকের অনুসন্ধানীও হতে পারে। কামনা তাকে বাইরে টেনে নিয়ে যায়, আর জ্ঞান তাকে নিজের গভীরে ফিরিয়ে আনে। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো সত্যকে কেবল চোখে দেখা জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অস্তিত্বের ভিত্তি, নৈতিকতার উৎস এবং নিজের প্রকৃত সত্তার অনুসন্ধান করা।
অতএব অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্ শ্লোকটি মূলত মানুষের একটি কামনাকেন্দ্রিক ও ভিত্তিহীন বিশ্বদৃষ্টির চিত্র তুলে ধরে। ভাষাগতভাবে এটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থের দিক থেকে গভীর। দার্শনিকভাবে এটি সত্য, কারণ, ঈশ্বর এবং নৈতিকতার প্রশ্ন উত্থাপন করে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি সম্পর্কে সতর্ক করে। আধ্যাত্মিকভাবে এটি বাহ্যিক ভোগের সীমা অতিক্রম করে গভীরতর সত্য অনুসন্ধানের আহ্বান জানায়। এই কারণেই শ্লোকটি শুধু প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের একটি অংশ নয়। এটি আজও মানুষের সামনে একই মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে যে আমাদের জীবন কি কেবল আমরা যা চাই তার দ্বারা পরিচালিত, নাকি আমাদের অস্তিত্বের গভীরে এমন কোনো সত্য রয়েছে যা আমাদের সমস্ত কামনা, ভোগ এবং পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!