ভগবদ্গীতা ১৭.১ — শ্রদ্ধার প্রকৃতি, শাস্ত্রবিধি ও সাত্ত্বিক-রাজসিক-তামসিক বিশ্বাস
অর্জুন উবাচ
যে শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ।
তেষাং নিষ্ঠা তু কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ।।১।।
অনুবাদঃ অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন- হে কৃষ্ণ! যারা শাস্ত্রীয় বিধান পরিত্যাগ করে শ্রদ্ধা সহকারে দেব-দেবীর পূজা করে, তাদের সেই নিষ্ঠা কি সাত্ত্বিক, রাজসিক না তামসিক?।
ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের সূচনায় অর্জুন যে প্রশ্নটি কৃষ্ণের কাছে উত্থাপন করেন, তার মধ্যে মানুষের ধর্মবোধ, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং অন্তর্জগতের এক গভীর রহস্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা নিহিত রয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেন, যারা শাস্ত্রের বিধি পরিত্যাগ করেও শ্রদ্ধার সঙ্গে উপাসনা করে, তাদের সেই শ্রদ্ধা এবং নিষ্ঠার প্রকৃতি কী। তা কি সত্ত্বগুণ দ্বারা পরিচালিত, নাকি রজোগুণ দ্বারা, অথবা তমোগুণ দ্বারা। শ্লোকটির মর্মার্থ হল, হে কৃষ্ণ, যারা শাস্ত্রবিধি পরিত্যাগ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে উপাসনা করে, তাদের সেই নিষ্ঠা কোন প্রকৃতির, তা কি সাত্ত্বিক, রাজসিক না তামসিক। এই প্রশ্নের মধ্যে বাহ্যিক ধর্মাচরণ অপেক্ষা মানুষের অন্তরের প্রকৃতিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শাস্ত্রবিধি শব্দের মধ্যে শাস্ত্র এবং বিধি এই দুটি ধারণা নিহিত। শাস্ত্র শব্দটি সংস্কৃত শাস্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে শিক্ষা দেওয়া, নির্দেশ করা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং সঠিক পথে পরিচালিত করার ভাব রয়েছে। বিধি বলতে বোঝায় নির্ধারিত নিয়ম, কর্তব্যের পদ্ধতি এবং করণীয় নির্দেশ। ফলে শাস্ত্রবিধি কেবল ধর্মীয় নিয়মের একটি তালিকা নয়, বরং মানুষের জীবনকে জ্ঞান, নৈতিকতা এবং আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করার একটি সুসংবদ্ধ নির্দেশনা। এর পরেই এসেছে উৎসৃজ্য শব্দটি, যার মধ্যে ত্যাগ করা, পরিত্যাগ করা বা দূরে সরিয়ে রাখার ভাব রয়েছে। অর্থাৎ এখানে এমন মানুষের কথা বলা হচ্ছে যারা শাস্ত্রের নির্দেশিত পথকে অনুসরণ না করেও কোনো না কোনো বিশ্বাস ও উপাসনার মধ্যে প্রবেশ করেছে।
যজন্তে শব্দটি যজ্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর সঙ্গে যজ্ঞ, উপাসনা, পূজা ও নিবেদনের ধারণা যুক্ত। কিন্তু এই প্রসঙ্গে যজনা শুধু বাহ্যিক যজ্ঞ বা পূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের কোনো উচ্চতর শক্তি, আদর্শ বা উপাস্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মনিবেদনের সামগ্রিক প্রকাশকেও নির্দেশ করে। এর সঙ্গে যখন শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ শব্দটি যুক্ত হয় তখন বিষয়টি আরও গভীর হয়ে ওঠে। শ্রদ্ধা হল অন্তরের বিশ্বাস, আস্থা এবং সত্য বলে গ্রহণ করার প্রবণতা। শ্রদ্ধয়ান্বিত অর্থ শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ। অর্থাৎ আলোচ্য মানুষগুলো অবিশ্বাসী নয়, বরং তারা বিশ্বাসী এবং তাদের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধাও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল সেই শ্রদ্ধার ভিত্তি কী এবং সেই শ্রদ্ধা তাদের চেতনার কোন গুণ দ্বারা পরিচালিত।
এই কারণেই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হল নিষ্ঠা। নিষ্ঠা শব্দের মধ্যে স্থিত হওয়া, কোনো অবস্থানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের মধ্যে জীবনকে স্থাপন করার অর্থ নিহিত। এখানে নিষ্ঠা কেবল একটি ধর্মীয় আচরণের নাম নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত অবস্থানের পরিচয়। মানুষ কী বিশ্বাস করে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সে বিশ্বাসের মধ্যে তার চেতনা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই ধর্মীয় আচার দুই ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে পালন করতে পারেন। একজনের মধ্যে থাকতে পারে জ্ঞান, শান্তি ও আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা, অন্যজনের মধ্যে থাকতে পারে খ্যাতি, ক্ষমতা, সম্পদ বা ব্যক্তিগত লাভের বাসনা। আবার তৃতীয় ব্যক্তির আচরণের পেছনে থাকতে পারে অজ্ঞতা, ভয়, কুসংস্কার বা অন্ধ অনুকরণ। বাহ্যিকভাবে তিনজনের কাজ একই রকম হলেও অন্তর্গত অবস্থান এক নয়।
এই পার্থক্য বোঝানোর জন্য গীতা সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই তিন গুণের কথা সামনে আনে। সত্ত্বের মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, শান্তি, ভারসাম্য, পবিত্রতা এবং সত্যের প্রতি আকর্ষণ। রজঃ এর মধ্যে রয়েছে প্রবল কর্মচাঞ্চল্য, আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি, প্রতিযোগিতা, অর্জনের বাসনা এবং অস্থিরতা। তমঃ এর মধ্যে রয়েছে অজ্ঞতা, জড়তা, মোহ, অবিবেচনা, অন্ধতা এবং নিষ্ক্রিয়তার প্রবণতা। মানুষের মন সাধারণত এই তিন গুণের বিভিন্ন সংমিশ্রণে প্রভাবিত হয়। তাই মানুষের শ্রদ্ধাও তার অন্তর্গত প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। শ্রদ্ধা একটি শক্তি, কিন্তু সেই শক্তি কোন দিকে প্রবাহিত হবে তা নির্ভর করে চেতনার গুণগত প্রকৃতির ওপর।
এই শ্লোকের দার্শনিক সৌন্দর্য এখানেই যে কৃষ্ণের শিক্ষা কেবল বাহ্যিক আচরণের বিচার করতে বলে না, বরং আচরণের অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করতে শেখায়। একজন মানুষ ধর্মীয় আচার পালন করছেন বলেই তাঁর চেতনা অবশ্যই পবিত্র এমন নয়। আবার কোনো মানুষের উপাসনার ধরন বাহ্যিকভাবে সাধারণ বা অপরিচিত বলেই তার অন্তর অবশ্যই অশুদ্ধ এমনও নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হল সেই বিশ্বাস মানুষের মধ্যে কী সৃষ্টি করছে। তার মধ্যে কি জ্ঞান বৃদ্ধি পাচ্ছে, অহংকার কমছে, মন শান্ত হচ্ছে, সত্যের প্রতি আকর্ষণ জন্মাচ্ছে এবং অন্যের কল্যাণের জন্য হৃদয় প্রসারিত হচ্ছে। নাকি তার মধ্যে অহংকার, প্রতিযোগিতা, লোভ, প্রদর্শন, ভয় এবং বিভাজন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটি ধর্মীয় আচরণের বাহ্যিক রূপের চেয়ে তার অন্তর্গত গুণগত প্রকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এই শিক্ষা মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মানুষ কোনো আদর্শে বিশ্বাস করতে পারে, কোনো গুরু বা দর্শন অনুসরণ করতে পারে, কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারে অথবা কোনো আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে। কিন্তু তার বিশ্বাসের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে সেই বিশ্বাস তার জীবনকে কীভাবে পরিবর্তন করছে তার ওপর। যে বিশ্বাস মানুষকে সত্যবাদী, সংযমী, শান্ত, সহানুভূতিশীল ও জ্ঞানসন্ধানী করে তোলে তার মধ্যে সত্ত্বের আলো দেখা যায়। যে বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা, খ্যাতি অর্জন, প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িয়ে যায় সেখানে রজোগুণের প্রভাব প্রবল হতে পারে। আর যে বিশ্বাস মানুষকে অন্ধতা, নিষ্ঠুরতা, কুসংস্কার, অজ্ঞতা এবং বিবেচনাহীনতার দিকে নিয়ে যায় সেখানে তমোগুণের প্রভাব প্রকাশ পেতে পারে।
এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি আসলে অন্যকে বিচার করার শিক্ষা নয়, বরং আত্মপরীক্ষার শিক্ষা। প্রত্যেক মানুষের নিজের কাছে প্রশ্ন করা উচিত, আমার শ্রদ্ধার উৎস কোথায়। আমি কেন বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাস কি আমাকে সত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি শুধু আমার আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করছে। আমার উপাসনা কি আমার অহংকারকে কমাচ্ছে, নাকি তাকে আরও বড় করছে। আমার ধর্মীয় জীবন কি আমার হৃদয়কে প্রসারিত করছে, নাকি অন্যকে তুচ্ছ করার প্রবণতা সৃষ্টি করছে। এই আত্মজিজ্ঞাসার মধ্যেই শ্লোকটির প্রকৃত আধ্যাত্মিক শক্তি নিহিত।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একই আগুন দিয়ে কেউ অন্ধকার দূর করে আলো পেতে পারে, কেউ রান্না করে মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে, আবার কেউ অসতর্কভাবে সেই আগুন দিয়ে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। আগুনের শক্তি এক হলেও তার ব্যবহার ও ফল ভিন্ন। তেমনি শ্রদ্ধাও মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী অন্তর্গত শক্তি। কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যখন জ্ঞান ও স্বচ্ছতার সঙ্গে যুক্ত হয় তখন তা আত্মোন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারে, আকাঙ্ক্ষা ও অহংকারের সঙ্গে যুক্ত হলে তা রাজসিক প্রবণতাকে শক্তিশালী করতে পারে, আর অজ্ঞতা ও মোহের সঙ্গে যুক্ত হলে তা তামসিকতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অতএব এই শ্লোকের গভীরতম বার্তা হল মানুষের বিশ্বাসকে শুধু তার বাহ্যিক রূপ দিয়ে বিচার করা যায় না। বিশ্বাসের প্রকৃতি বুঝতে হলে তার উৎস, উদ্দেশ্য, মানসিক গুণ এবং ফলাফল দেখতে হয়। শাস্ত্রবিধি এখানে জ্ঞান ও বিবেচনার প্রতীক, শ্রদ্ধা হল হৃদয়ের শক্তি, যজনা হল সেই শক্তির বাহ্যিক প্রকাশ এবং নিষ্ঠা হল সেই বিশ্বাসের মধ্যে মানুষের অন্তর্গত অবস্থান। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ নির্দেশ করে সেই অন্তর্গত শক্তির তিন ভিন্ন প্রবাহ। তাই সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতা শুধু কতটা উপাসনা করা হচ্ছে তার মধ্যে নয়, বরং উপাসনার মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তর কতটা নির্মল, জ্ঞানময়, শান্ত এবং সত্যমুখী হয়ে উঠছে তার মধ্যে। এই কারণেই ভগবদ্গীতার এই শ্লোক একটি ধর্মীয় প্রশ্নের সীমা অতিক্রম করে মানুষের বিশ্বাস, মন, চরিত্র এবং আত্মবিকাশের এক সর্বজনীন দর্শনে পরিণত হয়েছে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!