ভগবদ্গীতা ১৭.১০ — তামসিক আহার, বাসি-অপবিত্র খাদ্য ও চেতনার জড়তার সম্পর্ক
যাতযামং গতরসং পূতি পর্যষিতং চ যৎ।
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্।।১০।।
অনুবাদঃ আহারের এক প্রহরের অধিক পূর্বে রান্না করা খাদ্য, যা নীরস, দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী এবং অপরের উচ্ছিষ্ট দ্রব্য ও অমেধ্য দ্রব্য, সেই সমস্ত তামসিক লোকদের প্রিয়।
ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের দশম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ তামসিক প্রকৃতির মানুষের প্রিয় আহারের একটি গভীর পরিচয় দিয়েছেন। শ্লোকটি হলো যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতং চ যৎ উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্। অর্থাৎ যে খাদ্য অনেকক্ষণ পড়ে থাকার কারণে বাসি হয়ে গেছে, যার স্বাভাবিক রস ও সতেজতা নষ্ট হয়ে গেছে, যা পচা বা দুর্গন্ধযুক্ত, যা দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে আছে, যা উচ্ছিষ্ট এবং যা অপবিত্র, সেই খাদ্য তামসিক প্রকৃতির মানুষের প্রিয়। প্রথম দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কিত একটি নির্দেশনা বলে মনে হলেও গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এর মধ্যে মানুষের শরীর, মন, অভ্যাস, চেতনা এবং আধ্যাত্মিক জীবনের একটি বিস্তৃত দর্শন নিহিত রয়েছে।
যাতযামং শব্দটির মধ্যে সময় অতিক্রমের ধারণা রয়েছে। যাম শব্দের সঙ্গে সময়ের একটি পর্ব বা নির্দিষ্ট সময়ের ধারণা যুক্ত এবং যাত অর্থ অতিক্রান্ত বা চলে যাওয়া। সেই দৃষ্টিতে যাতযামং বলতে এমন খাদ্যকে বোঝানো হয়েছে যার উপযুক্ত সময় অতিক্রান্ত হয়েছে এবং যা তার স্বাভাবিক সতেজতা হারিয়েছে। খাদ্যের ক্ষেত্রে এটি বাসি বা দীর্ঘক্ষণ পড়ে থাকা খাদ্যের ধারণা প্রকাশ করে। এর পরেই এসেছে গতরসম্ শব্দটি। গত অর্থ চলে যাওয়া এবং রস অর্থ স্বাভাবিক স্বাদ, স্নিগ্ধতা, সার বা প্রাণময়তা। ফলে গতরসম্ অর্থ যার রস চলে গেছে। এই শব্দটি শুধু খাদ্যের স্বাদ নষ্ট হওয়ার কথা বলে না, বরং রসের মাধ্যমে জীবনের প্রাণময়তার একটি গভীর প্রতীকও তৈরি করে। যে খাদ্য তার রস হারিয়েছে, তা যেমন প্রাণবন্ততার অভাব প্রকাশ করে, তেমনি মানুষের জীবন থেকেও যদি আনন্দ, সতেজতা, সচেতনতা ও অন্তরের উজ্জ্বলতা হারিয়ে যায়, তবে সেই জীবনও এক অর্থে গতরস হয়ে উঠতে পারে।
পূতি শব্দটি আরও একটি অবক্ষয়ের স্তরকে প্রকাশ করে। পূতি অর্থ পচা, দুর্গন্ধযুক্ত বা বিকৃত। খাদ্যের স্বাভাবিক গুণ নষ্ট হয়ে যখন পচন ও দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, তখন তা পূতি অবস্থায় পৌঁছায়। এখানে খাদ্যের বাহ্যিক অবক্ষয়ের সঙ্গে মানুষের অন্তর্গত অবক্ষয়ের একটি প্রতীকী সম্পর্কও অনুভব করা যায়। যেমন খাদ্য দীর্ঘদিন অবহেলিত হলে পচে যায়, তেমনি মনও যদি অজ্ঞতা, অলসতা, নেতিবাচকতা ও অসচেতনতার মধ্যে দীর্ঘকাল অবস্থান করে, তাহলে তার স্বচ্ছতা ও সৌন্দর্য ক্ষয় হতে থাকে। এরপর এসেছে পর্যুষিতম্। এই শব্দের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকা, পুরোনো হয়ে যাওয়া এবং সতেজতা হারানোর ভাব রয়েছে। যাতযামং এবং পর্যুষিতম্ পরস্পরের কাছাকাছি অর্থ প্রকাশ করলেও তাদের পাশাপাশি ব্যবহার খাদ্যের সময়গত অবক্ষয়কে আরও জোরালো করে তোলে। একটি খাদ্য শুধু কিছুক্ষণ পুরোনো নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকার কারণে তার স্বাভাবিক গুণ হারিয়ে ফেলেছে, এই ধারণাটি এখানে স্পষ্ট হয়।
উচ্ছিষ্টম্ শব্দটি এমন খাদ্যকে বোঝায় যা অন্যের ভোজনের পরে অবশিষ্ট থাকে। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে খাদ্য এবং শুচিতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। সেই সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে উচ্ছিষ্ট খাদ্যকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অশুচি বা অনুপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হতো। শ্লোকে উচ্ছিষ্ট শব্দের ব্যবহার সেই সময়কার শুচিতা ও খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে প্রকাশ করে। এর সঙ্গে এসেছে আমেধ্যম্ শব্দটি। মেধ্য অর্থ পবিত্র বা শুচি এবং তার বিপরীত ভাব প্রকাশ করে আমেধ্য। ফলে আমেধ্য অর্থ অপবিত্র বা অশুচি। এই শব্দের মাধ্যমে বোঝা যায় যে এখানে খাদ্যের বিচার শুধু স্বাদ বা বাহ্যিক আকর্ষণের ভিত্তিতে করা হচ্ছে না। খাদ্যের সঙ্গে শুচিতা, সংযম এবং আধ্যাত্মিক জীবনের সম্পর্কও বিবেচনা করা হয়েছে।
শ্লোকটির শেষ পদ তামসপ্রিয়ম্ পুরো বক্তব্যের দার্শনিক তাৎপর্যকে প্রকাশ করে। তমস অর্থ অন্ধকার, জড়তা, অজ্ঞানতা, স্থবিরতা ও চেতনার ভারী অবস্থা। প্রিয় অর্থ পছন্দনীয় বা প্রিয়। তামসপ্রিয়ম্ তাই এমন কিছুকে বোঝায় যা তমোগুণপ্রধান মানুষের কাছে প্রিয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রীকৃষ্ণ কেবল খাদ্যের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করছেন না। তিনি খাদ্য এবং মানুষের অন্তর্গত প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্ক দেখাচ্ছেন। মানুষের মানসিক প্রবণতা তার পছন্দের মধ্যে প্রকাশ পায় এবং তার খাদ্যাভ্যাসও সেই প্রবণতার একটি অংশ হতে পারে।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে তমস প্রকৃতির তিনটি মৌলিক গুণের একটি। সত্ত্বের মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছতা, জ্ঞান ও সামঞ্জস্য। রজসের মধ্যে রয়েছে গতি, আকাঙ্ক্ষা ও ক্রিয়াশীলতা। তমসের মধ্যে রয়েছে জড়তা, অজ্ঞানতা, ভার ও স্থবিরতা। গীতার এই শ্লোকে খাদ্যকে এই গুণের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। তাই তামসিক খাদ্যের ধারণাকে শুধু রান্না বা খাদ্যের একটি তালিকা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যায় না। এর মূল বক্তব্য হলো মানুষের জীবনযাত্রা এবং চেতনার সঙ্গে তার গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে। যে মানুষ নিজের শরীর, মন ও জীবনের প্রতি অসচেতন হয়ে পড়ে, তার মধ্যে এমন কিছু অভ্যাস জন্ম নিতে পারে যা জড়তা ও অবক্ষয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই শ্লোকের একটি গভীর প্রতীকী অর্থ হলো মানুষের জীবনে সতেজতার প্রয়োজন। খাদ্যের রস যেমন হারিয়ে যেতে পারে, তেমনি মানুষের জীবন থেকেও রস হারিয়ে যেতে পারে। মানুষ যখন দীর্ঘদিন আনন্দহীনতা, অলসতা, নেতিবাচক চিন্তা, অজ্ঞতা ও অবহেলার মধ্যে বাস করে, তখন তার জীবন বাহ্যিকভাবে চলতে থাকলেও অন্তরে প্রাণের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে। এই অর্থে গতরসম্ শুধু একটি বাসি খাদ্যের পরিচয় নয়, এটি রসহীন জীবনেরও প্রতীক হতে পারে। পূতি শুধু পচা খাদ্য নয়, এটি অন্তর্গত অবক্ষয়েরও একটি শক্তিশালী প্রতীক। পর্যুষিত শুধু পুরোনো খাদ্য নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা জড়তা ও অচল মানসিকতার প্রতীক হিসেবেও পড়া যায়।
এই দৃষ্টিতে মানুষের মনও এক ধরনের খাদ্য গ্রহণ করে। চোখ যা দেখে, কান যা শোনে, মন যা চিন্তা করে, মানুষ যাদের সঙ্গে মেশে এবং যে ধারণাগুলোকে প্রতিদিন নিজের মধ্যে প্রবেশ করতে দেয়, সেগুলোও তার চেতনার খাদ্য। যদি কেউ প্রতিদিন বিদ্বেষ, হিংসা, মিথ্যা, নেতিবাচকতা ও অজ্ঞতার মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত রাখে, তাহলে তার মানসিক জীবনেও তামসিকতার প্রবলতা দেখা দিতে পারে। আবার যদি কেউ সত্য, জ্ঞান, সৎ সঙ্গ, সংযম, সুন্দর চিন্তা ও আত্মসচেতনতার মধ্যে নিজেকে গড়ে তোলে, তাহলে তার চেতনা ধীরে ধীরে অধিক স্বচ্ছ হতে পারে। এই কারণেই শ্লোকটি কেবল রান্নাঘরের একটি শিক্ষা নয়, বরং গ্রহণের একটি বৃহত্তর দর্শন।
একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি বাগানে যদি নিয়মিত আলো, পানি ও পরিচর্যা থাকে, তবে সেখানে সতেজতা ও সৌন্দর্য বজায় থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন যদি বাগানটির প্রতি কোনো যত্ন না নেওয়া হয়, তাহলে মাটি শুকিয়ে যায়, আগাছা বাড়ে এবং ধীরে ধীরে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের মনও তেমন। জ্ঞান, সচেতনতা, সৎ সঙ্গ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ মনকে সতেজ রাখে। অন্যদিকে অলসতা, অজ্ঞতা, অবহেলা ও নেতিবাচকতার দীর্ঘ সঞ্চয় মনের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে ক্ষয় করতে পারে। তাই খাদ্যের সতেজতা এখানে জীবনের সতেজতার একটি রূপক হয়ে ওঠে।
তবে এই শ্লোককে আধুনিক খাদ্যবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে খাদ্যকে শরীরের পাশাপাশি মন ও চেতনার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখা হয়েছে। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান খাদ্যের পুষ্টিমান, জীবাণু, সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তাকে ভিন্ন পদ্ধতিতে বিচার করে। তাই শ্লোকটির মূল বক্তব্য বোঝার ক্ষেত্রে তার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপটকে সম্মান করা জরুরি। একই সঙ্গে তামসিক খাদ্য গ্রহণকারী মানুষকে নৈতিকভাবে খারাপ বলে বিচার করাও গীতার শিক্ষার যথার্থ উদ্দেশ্য নয়। গীতার সামগ্রিক দর্শনে সত্ত্ব, রজস ও তমস প্রকৃতির গুণ এবং মানুষের সাধনার লক্ষ্য হলো নিজের চেতনাকে ক্রমশ পরিশুদ্ধ করে এই গুণগুলোর সীমা অতিক্রম করা।
সবশেষে বলা যায়, যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতং চ যৎ উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্ শ্লোকটি বাহ্যিক খাদ্যের মাধ্যমে অন্তর্গত জীবনের একটি গভীর শিক্ষা প্রদান করে। যাতযাম আমাদের সময়ের মূল্য ও সচেতনতার কথা মনে করায়। গতরসম্ আমাদের সতেজতা ও জীবনের রসের কথা স্মরণ করায়। পূতি আমাদের অবক্ষয়ের বিপদ দেখায়। পর্যুষিত আমাদের দীর্ঘস্থায়ী জড়তার কথা ভাবায়। উচ্ছিষ্ট আমাদের শুচিতা ও গ্রহণের সচেতনতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমেধ্য আমাদের বাহ্যিক ও অন্তর্গত পবিত্রতার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। আর তামসপ্রিয়ম্ আমাদের জানায় যে মানুষের পছন্দের মধ্যেও তার মানসিক প্রকৃতির ছাপ ফুটে ওঠে। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা খাদ্য সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নয়। এর শিক্ষা হলো মানুষ যা গ্রহণ করে, ধীরে ধীরে তার জীবন সেই গ্রহণের দ্বারা গঠিত হয়। শরীরের জন্য যেমন সতেজ ও শুচি আহার প্রয়োজন, তেমনি মনের জন্য প্রয়োজন নির্মল চিন্তা, সত্য জ্ঞান, সৎ সঙ্গ এবং সচেতন জীবনযাপন। বাহ্যিক খাদ্য শরীরকে পুষ্ট করে, কিন্তু অন্তরের খাদ্য মানুষের চরিত্র ও চেতনাকে নির্মাণ করে। এই উপলব্ধিই শ্লোকটিকে একটি সাধারণ খাদ্যবিষয়ক বক্তব্য থেকে মানবজীবনের গভীর আত্মশুদ্ধির দর্শনে উন্নীত করেছে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!