সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৭.১৮ — রাজসিক তপস্যা, সম্মানলাভের আকাঙ্ক্ষা ও দম্ভের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ। ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলমধ্রুবম্।।১৮।।
সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ। 
ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলমধ্রুবম্।।১৮।।

অনুবাদঃ শ্রদ্ধা, সম্মান ও পূজা লাভের আশায় দম্ভ সহকারে যে তপস্যা করা হয়, তাকেই এই জগতে অনিত্য ও অনিশ্চিত রাজসিক তপস্যা বলা হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের সাধনা ও তপস্যার একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম দিক তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো “সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ। ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলমধ্রুবম্।” এই শ্লোকে এমন এক ধরনের তপস্যার কথা বলা হয়েছে যা বাহ্যিকভাবে কঠোর, ধর্মীয় এবং প্রশংসনীয় বলে মনে হতে পারে, কিন্তু যার অন্তরে রয়েছে সম্মান লাভের আকাঙ্ক্ষা, মর্যাদা পাওয়ার বাসনা, পূজিত হওয়ার ইচ্ছা এবং নিজের মহত্ত্ব প্রদর্শনের প্রবণতা। এই কারণে শ্রীকৃষ্ণ একে রাজসিক তপস্যা বলেছেন এবং স্পষ্ট করেছেন যে এর প্রকৃতি চলমান ও অনিত্য।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো তপস্যা। সংস্কৃত তপস্ শব্দটি তপ্ ধাতু থেকে উদ্ভূত। তপ্ ধাতুর সঙ্গে উত্তাপ, তীব্রতা, দহন এবং কঠোর সাধনার ধারণা যুক্ত। আধ্যাত্মিক অর্থে তপস্যা হলো এমন সাধনা যার মাধ্যমে মানুষ নিজের ইন্দ্রিয়, মন, প্রবৃত্তি ও দুর্বলতাকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করে। প্রকৃত তপস্যা মানুষের বাহ্যিক পরিচয়কে বড় করার জন্য নয়, বরং অন্তরের অশুদ্ধতাকে দূর করার জন্য। তপস্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি, সত্য উপলব্ধি এবং চেতনার উন্নতি। কিন্তু সেই তপস্যার সঙ্গে যখন সম্মান, মর্যাদা ও পূজিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয়, তখন তার প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায়।

সৎকার, মান এবং পূজা এই তিনটি শব্দের সমন্বয় মানুষের বাহ্যিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। সৎকার অর্থ সম্মান বা সমাদর। মান অর্থ মর্যাদা এবং সামাজিক গুরুত্ব। পূজা অর্থ শ্রদ্ধা বা পূজিত হওয়া। অর্থং শব্দটি উদ্দেশ্য বা লাভের জন্য এই ভাব প্রকাশ করে। অর্থাৎ যে তপস্যার উদ্দেশ্য হলো মানুষের কাছ থেকে সম্মান পাওয়া, নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যের কাছে পূজিত হওয়া, সেই তপস্যা আর নিঃস্বার্থ আত্মশুদ্ধির সাধনা থাকে না। সেখানে সাধনার চেয়ে সাধকের পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই প্রসঙ্গে দম্ভ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দম্ভ হলো নিজের গুণ, ক্ষমতা, জ্ঞান বা আধ্যাত্মিকতার প্রদর্শন। দম্ভের মধ্যে এমন একটি মানসিকতা থাকে যেখানে মানুষ সত্যিকার গুণ অর্জনের চেয়ে অন্যের চোখে নিজেকে গুণবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বেশি আগ্রহী হয়। একজন মানুষ যদি কঠোর উপবাস করেন নিজের ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, তাহলে সেই সাধনার উদ্দেশ্য একরকম। কিন্তু যদি তিনি উপবাস করেন যাতে মানুষ তাকে মহান সাধক বলে প্রশংসা করে, তাহলে বাহ্যিক কাজ একই থাকলেও তার অন্তর্নিহিত চেতনা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। গীতার এই শ্লোক মূলত সেই অন্তর্নিহিত পার্থক্যটি আমাদের সামনে তুলে ধরে।

এখানে রাজস শব্দটি রজঃ গুণের সঙ্গে সম্পর্কিত। গীতার গুণতত্ত্ব অনুযায়ী প্রকৃতির তিনটি প্রধান গুণ হলো সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ। রজঃ মানুষের মধ্যে গতি, আকাঙ্ক্ষা, কর্মপ্রবণতা, প্রতিযোগিতা, আবেগ এবং ফললাভের বাসনা সৃষ্টি করে। তাই রাজসিক মানুষ নিষ্ক্রিয় নয়। সে অত্যন্ত সক্রিয় হতে পারে, কঠোর পরিশ্রম করতে পারে এবং অনেক বড় বড় কাজও করতে পারে। কিন্তু তার কর্মের অন্তরে যদি স্বীকৃতি, মর্যাদা, প্রতিপত্তি অথবা ফললাভের আকাঙ্ক্ষা প্রবল থাকে, তাহলে সেই কর্ম রাজসিক প্রকৃতির হয়। এই কারণেই রাজসিক তপস্যা বাইরে থেকে শক্তিশালী হলেও অন্তরে অস্থির।

শ্লোকের শেষের চলমধ্রুবম্ শব্দযুগল এই শিক্ষাকে আরও গভীর করে তোলে। চল অর্থ অস্থির বা পরিবর্তনশীল এবং অধ্রুব অর্থ অনিত্য বা স্থায়ী নয়। সম্মান পরিবর্তনশীল। মানুষের প্রশংসা পরিবর্তনশীল। সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তনশীল। জনপ্রিয়তা পরিবর্তনশীল। আজ যে মানুষ প্রশংসিত, কাল সে সমালোচিত হতে পারে। আজ যে ব্যক্তি শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত, সময়ের পরিবর্তনে তার স্থান অন্য কেউ গ্রহণ করতে পারে। অতএব যে তপস্যার ফল মানুষের প্রশংসা ও স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে, তার ভিত্তিও অনিশ্চিত। সে কারণে রাজসিক তপস্যার ফল স্থায়ী শান্তি বা আত্মতৃপ্তি দিতে পারে না।

এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো কর্মের বাহ্যিক রূপের চেয়ে কর্মের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একই কাজ একজন মানুষের ক্ষেত্রে আত্মশুদ্ধির পথ হতে পারে এবং অন্য একজনের ক্ষেত্রে অহংকারের প্রকাশ হতে পারে। দুজনেই উপবাস করতে পারেন, দুজনেই দান করতে পারেন, দুজনেই ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে পারেন, দুজনেই কঠোর জীবনযাপন করতে পারেন। কিন্তু একজন যদি সত্য উপলব্ধি ও আত্মশুদ্ধির জন্য এসব করেন এবং অন্যজন যদি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য করেন, তাহলে তাদের কর্মের আধ্যাত্মিক মূল্য এক নয়। তাই গীতার এই শিক্ষা আমাদের শুধু কী করছি তা জিজ্ঞাসা করতে বলে না, বরং কেন করছি সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

আধুনিক জীবনে এই শিক্ষার গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। মানুষ আজ নানা উপায়ে নিজের পরিচয় অন্যের সামনে প্রকাশ করে। কেউ দান করেন কিন্তু সেই দানের ছবি ও বিবরণ প্রচার করেন। কেউ ধর্মীয় কাজ করেন কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন মানুষ তাকে কতটা ধার্মিক মনে করছে তার ওপর। কেউ জ্ঞান অর্জন করেন সত্য জানার জন্য নয়, বরং অন্যকে নিজের জ্ঞানের কাছে ছোট প্রমাণ করার জন্য। কেউ সরল জীবনযাপন করেন কিন্তু মনে মনে প্রত্যাশা করেন সবাই যেন তাকে অসাধারণ ও মহৎ মানুষ হিসেবে দেখে। এই পরিস্থিতিতে গীতার শ্লোকটি আমাদের অন্তরের দিকে তাকাতে শেখায়। বাহ্যিকভাবে আমরা যতই পবিত্রতার পরিচয় দিই, অন্তরে যদি অহংকার ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা প্রবল থাকে, তাহলে সেই সাধনার মধ্যে রাজসিকতা প্রবেশ করতে পারে।

এই সত্যকে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি প্রকৃত ফলবান গাছ নিজের ফলের প্রচার করে না। সে নীরবে ফল দেয়। অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে সাজানো একটি গাছ বাইরে থেকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে প্রকৃত ফলন নাও থাকতে পারে। প্রকৃত সাধনাও তেমন। সত্যিকারের সাধনা মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করে এবং সেই পরিবর্তনের জন্য বাহ্যিক ঘোষণা প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যখন সাধনা মানুষের নিজের মহত্ত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন তার বাহ্যিক চাকচিক্য যতই বেশি হোক, অন্তরের পরিবর্তন ততটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এই শ্লোক আমাদের অহংকারের একটি সূক্ষ্ম রূপের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। সাধারণ অহংকারে মানুষ নিজের সম্পদ, ক্ষমতা, জ্ঞান বা সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু আধ্যাত্মিক অহংকার আরও সূক্ষ্ম। সেখানে মানুষ নিজের ত্যাগ, উপবাস, জ্ঞান, সাধনা বা ধর্মীয় আচরণ নিয়েই গর্ব করতে শুরু করে। তখন যে সাধনা অহংকার দূর করার কথা ছিল, সেটিই অহংকারের নতুন পরিচয় তৈরি করে। মানুষ তখন বলে না যে আমি ধনী, শক্তিশালী বা জ্ঞানী। তার পরিবর্তে তার অন্তরে জন্ম নিতে পারে এই অনুভূতি যে আমি অন্যদের চেয়ে বেশি ধার্মিক, বেশি সংযমী বা বেশি আধ্যাত্মিক। গীতার আলোচনায় এই অবস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার বিষয়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের বাহ্যিক পরিচয় এবং অন্তর্গত সত্তার পার্থক্যকে স্পষ্ট করে। মানুষ যখন নিজের মূল্য অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে, তখন তার আত্মপরিচয়ও অস্থির হয়ে যায়। কারণ অন্য মানুষের মতামত কখনো স্থায়ী নয়। প্রশংসা যেমন আসে, তেমনি চলে যায়। সম্মান যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়, তেমনি হারিয়েও যেতে পারে। কিন্তু আত্মশুদ্ধির ভিত্তিতে যে পরিচয় গড়ে ওঠে তা বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না। এই কারণে রাজসিক তপস্যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে সেই জিনিসের সঙ্গে যুক্ত করে যা পরিবর্তনশীল, আর সত্যিকারের আধ্যাত্মিক সাধনা মানুষকে সেই সত্যের দিকে নিয়ে যায় যা বাহ্যিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে।

এই শ্লোক তাই শুধু প্রাচীন যুগের তপস্বীদের জন্য কোনো নৈতিক নির্দেশ নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের আত্মপরীক্ষার একটি আয়না। আমি কেন ভালো কাজ করছি। আমি কেন জ্ঞান অর্জন করছি। আমি কেন ধর্মীয় আচরণ করছি। আমি কেন ত্যাগ করছি। আমি কি সত্যিই নিজেকে পরিবর্তন করতে চাই, নাকি অন্যরা আমাকে ভালো ও মহান মানুষ হিসেবে দেখুক সেটিই আমার গভীর আকাঙ্ক্ষা। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মানুষের নিজের কাছেই সবচেয়ে সত্যভাবে প্রকাশিত হয়। বাহ্যিক আচরণকে মানুষ অন্যের কাছ থেকে লুকাতে পারে, কিন্তু নিজের অন্তরের উদ্দেশ্য নিজের কাছ থেকে লুকানো কঠিন।

সবশেষে বলা যায়, “সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ” শ্লোকটি তপস্যার বিরোধিতা করে না। বরং এটি তপস্যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে শুদ্ধ করার আহ্বান জানায়। যে সাধনা সম্মান পাওয়ার জন্য, মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য, পূজিত হওয়ার জন্য এবং নিজের মহত্ত্ব প্রদর্শনের জন্য করা হয়, তা রাজসিক এবং তার ফল চলমান ও অনিত্য। সত্যিকারের তপস্যা মানুষের অহংকারকে বৃদ্ধি করে না, বরং তাকে অতিক্রম করতে সাহায্য করে। সত্যিকারের সাধনা অন্যের চোখে নিজেকে বড় করার চেষ্টা নয়, বরং নিজের অন্তরের অন্ধকারকে দূর করার প্রচেষ্টা। তাই এই শ্লোকের চূড়ান্ত শিক্ষা হলো মানুষের কাজের মূল্য কেবল তার বাহ্যিক রূপে নয়, তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে নিহিত। যে সাধনা প্রশংসার ওপর নির্ভরশীল, তার ফলও প্রশংসার মতোই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু যে সাধনা সত্য, আত্মশুদ্ধি ও অন্তরের রূপান্তরের জন্য, তার মূল্য বাহ্যিক সম্মান ও নিন্দার ঊর্ধ্বে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি