সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৭.২৩ — ওঁ তৎ সৎ, ব্রহ্মের ত্রিবিধ নির্দেশ ও পরম সত্যের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ওঁ তৎসাদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ। ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা।।২৩।…
ওঁ তৎসাদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ। 
ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা।।২৩।।

অনুবাদঃ ওঁ তৎ সৎ- এই তিন প্রকার ব্রহ্ম-নির্দেশক নাম শস্ত্রে কথিত আছে। পুরাকালে সেই নাম দ্বারা ব্রাহ্মণগণ, বেদসমূহ ও যজ্ঞসমূহ বিহিত হয়েছে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের তেইশতম শ্লোকে বলা হয়েছে “ওঁ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ। ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা।। ১৭.২৩”। এই শ্লোকের মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তার একটি অত্যন্ত গভীর সূত্র নিহিত রয়েছে। এখানে ওঁ, তৎ এবং সৎ এই তিনটি শব্দকে ব্রহ্মের ত্রিবিধ নির্দেশ বা পরম সত্যের দিকে নির্দেশকারী তিনটি পবিত্র সংকেত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শ্লোকটি কেবল কোনো বৈদিক আচার পালনের পূর্বে উচ্চারণযোগ্য কয়েকটি পবিত্র শব্দের কথা বলে না, বরং মানুষের জ্ঞান, কর্ম, সাধনা, আত্মপরিচয় এবং পরম সত্যের সঙ্গে তার সম্পর্ককে একটি গভীর দার্শনিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে। এই কারণে ওঁ তৎ সৎ ধারণাটিকে ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব এবং মানবিক সাধনার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এর অন্তর্নিহিত অর্থ আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ওঁ শব্দটি সংস্কৃতের পবিত্রতম ধ্বনিগুলোর একটি এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে এটি প্রণব নামেও পরিচিত। এটি সাধারণ কোনো শব্দের মতো কেবল একটি নির্দিষ্ট বস্তুকে বোঝায় না। বরং ওঁ সমগ্র অস্তিত্বের এক মহাধ্বনি হিসেবে কল্পিত হয়েছে। উপনিষদীয় চিন্তায় অ, উ এবং ম এই তিন ধ্বনির সমন্বয়কে অস্তিত্বের বিভিন্ন অবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জাগ্রত অবস্থা, স্বপ্নাবস্থা এবং সুষুপ্তির মধ্য দিয়ে যে চেতনা প্রবাহিত হয়, তারও প্রতীকী ব্যাখ্যা ওঁর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। আবার এই তিন ধ্বনির পরবর্তী নীরবতাকে এমন এক চেতনার প্রতীক হিসেবে ধরা হয় যা সমস্ত প্রকাশিত অবস্থাকে অতিক্রম করে। ফলে ওঁ কেবল উচ্চারিত একটি শব্দ নয়, বরং দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত, ব্যক্ত ও অব্যক্ত অস্তিত্বের মধ্যে একটি সেতুর প্রতীক।

তৎ শব্দটি সংস্কৃত তদ্ সর্বনাম থেকে এসেছে এবং এর সরল অর্থ হলো তা, সেটি বা ওই। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে তৎ কোনো সাধারণ বস্তু বা ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে না। তৎ এমন এক পরম বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে যা আমাদের সীমাবদ্ধ ইন্দ্রিয়, ব্যক্তিগত পরিচয় এবং অহংকারের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে ধারণ করা যায় না। মানুষ সাধারণত নিজের জীবনকে আমি এবং আমার ধারণার কেন্দ্র করে দেখে। আমার জ্ঞান, আমার সম্পদ, আমার কর্ম, আমার সাফল্য এবং আমার পরিচয় তার চেতনার কেন্দ্রে অবস্থান করে। কিন্তু তৎ শব্দটি সেই সংকীর্ণ কেন্দ্র থেকে মানুষকে সরিয়ে বৃহত্তর এক সত্যের দিকে তাকাতে শেখায়। তৎ যেন বলে, সত্য কেবল আমার নয়, সত্য আমার ব্যক্তিগত অধিকারের বিষয় নয়, বরং আমি যে বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ সেই পরম বাস্তবতার দিকেই আমার চেতনার দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া উচিত।

সৎ শব্দটির উৎস সংস্কৃত অস্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। অস্ ধাতুর অর্থ হলো থাকা, অস্তিত্বশীল হওয়া বা বিদ্যমান থাকা। সেই দিক থেকে সৎ অর্থ হলো যা আছে, যা সত্য, যা বাস্তব এবং যা অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা ভাষায় সৎ শব্দটি সাধারণত নৈতিকভাবে ভালো, সত্যবাদী বা চরিত্রবান অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সংস্কৃত সৎ শব্দটির অর্থ আরও বিস্তৃত। এখানে সৎ একই সঙ্গে অস্তিত্ব, সত্য, বাস্তবতা, শুভতা এবং কল্যাণের ধারণা বহন করে। অর্থাৎ যা সত্যিই আছে, যা মিথ্যা নয়, যা স্থায়ী সত্যের সঙ্গে যুক্ত এবং যা মানুষের জীবনকে কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়, তার মধ্যে সৎ ভাব প্রকাশিত হয়। এই কারণে ওঁ তৎ সৎকে কেবল ধর্মীয় শব্দের সমষ্টি হিসেবে না দেখে অস্তিত্ব, সত্য এবং নৈতিকতার একটি সমন্বিত দর্শন হিসেবেও বোঝা যায়।

ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ শব্দবন্ধের মধ্যে বলা হয়েছে ব্রহ্মের ত্রিবিধ নির্দেশ। ব্রহ্ম শব্দটি সংস্কৃত বৃহ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করা হয় এবং এর মধ্যে বৃদ্ধি, বিস্তার ও বৃহত্ত্বের ভাব নিহিত রয়েছে। বেদান্তীয় দর্শনে ব্রহ্ম কোনো সীমাবদ্ধ ব্যক্তিসত্তা নয়। ব্রহ্ম হলো পরম বাস্তবতা, সর্বব্যাপী সত্য এবং সমস্ত অস্তিত্বের গভীরতম ভিত্তি। সেই ব্রহ্মকে যখন ভাষায় নির্দেশ করার চেষ্টা করা হয়, তখন ওঁ, তৎ এবং সৎ তিনটি ভিন্ন দিক থেকে সেই পরম সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। ওঁ পরম সত্যকে ধ্বনির মাধ্যমে স্মরণ করায়, তৎ ব্যক্তিগত সীমার বাইরে অবস্থিত সেই পরমকে নির্দেশ করে এবং সৎ সেই পরম সত্যের অস্তিত্ব ও সত্যতাকে প্রকাশ করে।

নির্দেশ শব্দটির মধ্যেও বিশেষ দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে। নির্দেশ শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছুর দিকে দেখানো, পথ দেখানো বা কোনো সত্যকে চিহ্নিত করা। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ভাষা যখন অসীমকে প্রকাশ করতে চায়, তখন ভাষা তাকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না। ভাষা কেবল তার দিকে নির্দেশ করতে পারে। আঙুল যেমন চাঁদের দিকে নির্দেশ করে কিন্তু আঙুল নিজে চাঁদ নয়, তেমনই ওঁ তৎ সৎ পরম ব্রহ্মের দিকে নির্দেশ করে কিন্তু এই তিনটি শব্দকে ব্রহ্মের সম্পূর্ণ সীমা হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দেশ শব্দটি শ্লোকটির দার্শনিক গভীরতাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।

শ্লোকে ব্রাহ্মণ, বেদ এবং যজ্ঞের কথাও বলা হয়েছে। বেদ শব্দটি বিদ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জানা বা জ্ঞান লাভ করা। সেই কারণে বেদের অন্তর্নিহিত ধারণার সঙ্গে জ্ঞানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যজ্ঞ শব্দটি যজ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ পূজা করা, অর্চনা করা, নিবেদন করা এবং যজ্ঞ সম্পাদন করা। বৈদিক যুগে যজ্ঞ ছিল ধর্মীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কিন্তু গীতার দর্শনে যজ্ঞের অর্থ ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হয়েছে। যজ্ঞ কেবল অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার অনুষ্ঠান নয়, বরং নিজের কর্ম, সামর্থ্য, সময় এবং অহংকে বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। তাই এই শ্লোকে ওঁ তৎ সৎকে বেদ এবং যজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে জ্ঞান ও কর্ম উভয়ের অন্তরেই পরম সত্যের স্মরণ এবং নিবেদনের চেতনা থাকা উচিত।

এই শ্লোকের গভীরতম তাৎপর্য সম্ভবত মানুষের কর্মের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই কাজ দুইজন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে করতে পারে। একজন ব্যক্তি দান করতে পারে নিজের খ্যাতি প্রকাশ করার জন্য, আর অন্য ব্যক্তি দান করতে পারে নিঃস্বার্থভাবে কোনো মানুষের কল্যাণের জন্য। বাহ্যিক কাজ একই হলেও অন্তরের উদ্দেশ্য এক নয়। গীতার পূর্ববর্তী আলোচনায় সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক কর্ম ও দানের যে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় ওঁ তৎ সৎ মানুষের কর্মকে ব্যক্তিগত অহং ও ফলকামনা থেকে মুক্ত করার একটি আধ্যাত্মিক স্মারক হিসেবে কাজ করে। ওঁ মানুষকে পরম অস্তিত্বের কথা স্মরণ করায়, তৎ মনে করায় যে কর্মের প্রকৃত অধিকারী হিসেবে নিজেকে অহংকারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত নয় এবং সৎ মানুষকে সত্য ও কল্যাণের ভিত্তিতে কর্ম সম্পাদনের শিক্ষা দেয়।

কর্মযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে তৎ শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন কোনো কর্ম করে এবং মনে করে এই কর্মের ফল একান্তই আমার, তখন কর্মের সঙ্গে অহংকার ও আসক্তি যুক্ত হয়। কিন্তু যখন মানুষ কর্মকে বৃহত্তর সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে, তখন কর্মের চরিত্র পরিবর্তিত হয়। তখন কর্ম ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম না হয়ে কর্তব্য ও নিবেদনের রূপ ধারণ করে। এই দৃষ্টিতে তৎ একটি গভীর মানসিক রূপান্তরের প্রতীক। আমি করছি এই চেতনা থেকে সেই পরম সত্যের উদ্দেশ্যে আমি করছি এই চেতনার দিকে যাত্রাই তৎ ভাবের অন্তর্নিহিত শিক্ষা।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে ওঁ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। উপনিষদীয় চিন্তায় ওঁকে ব্রহ্মের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। ব্যক্তি যখন ওঁর ধ্বনির মধ্যে মনকে স্থির করে, তখন তার চেতনা বহির্জগতের বিচ্ছিন্নতা থেকে ধীরে ধীরে নিজের গভীরতম অস্তিত্বের দিকে ফিরে যেতে পারে। তৎ সেই আত্মকেন্দ্রিকতার সীমা ভেঙে পরমের দিকে নির্দেশ করে। আর সৎ সেই উপলব্ধিকে অস্তিত্ব ও সত্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে। এইভাবে ওঁ তৎ সৎকে চেতনার একটি অন্তর্মুখী যাত্রার প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই তিনটি শব্দের একটি সুন্দর ব্যাখ্যা সম্ভব। ওঁ মনকে একাগ্র করার প্রতীক, তৎ অহং থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করার প্রতীক এবং সৎ সত্য ও বাস্তবতার সঙ্গে নিজের জীবনকে সংযুক্ত করার প্রতীক। মানুষের মানসিক অস্থিরতার একটি বড় কারণ হলো সে নিজের ক্ষুদ্র পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা এবং সাফল্যের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে নিজেকে একাত্ম করে ফেলে। তৎ সেই সীমাবদ্ধ পরিচয়ের বাইরে তাকাতে শেখায়। সৎ আবার মানুষকে নিজের জীবন ও কর্মের মধ্যে সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে আহ্বান জানায়। ফলে এই শ্লোকের আধ্যাত্মিক শিক্ষা একই সঙ্গে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষাও হয়ে ওঠে।

সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিকোণ থেকেও ওঁ তৎ সৎ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওঁ যেন অস্তিত্বের মহাসমুদ্র থেকে উঠে আসা একটি আদিধ্বনি। তৎ যেন সেই অজানা অসীমের দিকে নির্দেশ করা একটি নীরব আঙুল। আর সৎ যেন সেই অসীমের অস্তিত্বের এক গভীর স্বীকৃতি। মানুষের জীবনকে যদি একটি যাত্রা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ওঁ হতে পারে যাত্রার মহাজাগতিক আহ্বান, তৎ হতে পারে অজানার দিকে অগ্রসর হওয়া এবং সৎ হতে পারে সত্যের মধ্যে পৌঁছে স্থিত হওয়া। এই কারণে এই তিনটি শব্দের মধ্যে শব্দ, নীরবতা, অস্তিত্ব এবং সত্যের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।

বাস্তব জীবনে এর একটি সহজ উদাহরণ একজন শিক্ষকের জীবন থেকে নেওয়া যেতে পারে। একজন শিক্ষক যদি কেবল বেতন, পদমর্যাদা বা সামাজিক সম্মানের জন্য শিক্ষা দেন, তাহলে তাঁর কাজের কেন্দ্র ব্যক্তিগত লাভ। কিন্তু যদি তিনি জ্ঞানকে মানুষের জীবনে আলো জ্বালানোর একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন এবং নিজের শিক্ষাদানকে বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন, তাহলে তাঁর কর্মের মধ্যে তৎ এবং সৎ ভাব প্রকাশিত হয়। একইভাবে একজন চিকিৎসক যখন রোগীকে কেবল অর্থ উপার্জনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন, তখন কর্মের কেন্দ্র হয় ব্যক্তিগত স্বার্থ। কিন্তু যখন চিকিৎসাকে মানুষের সেবা ও কল্যাণের একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন তাঁর কর্ম বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

একটি নদীর উপমাও এখানে অত্যন্ত অর্থবহ। নদী নিজের মধ্যে আবদ্ধ থাকলে তার যাত্রা অসম্পূর্ণ। তার প্রকৃত গন্তব্য সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হওয়া। মানুষের জীবনও তেমন। আমি এবং আমার সীমিত পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকা মানুষের চেতনাকে সংকুচিত করে। তৎ মানুষকে সেই সীমাবদ্ধতার বাইরে বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যেতে শেখায়। আর যখন সেই যাত্রা সত্য, কল্যাণ ও বাস্তবতার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সৎ তার পরিণত রূপ হয়ে ওঠে। এই অর্থে ওঁ তৎ সৎ মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বিশ্বজনীনতার দিকে উত্তরণের প্রতীক।

এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কর্মের বাহ্যিক রূপের চেয়ে কর্মের অন্তর্নিহিত চেতনা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ দান করতে পারে, পূজা করতে পারে, যজ্ঞ করতে পারে, জ্ঞানচর্চা করতে পারে এবং সামাজিক সেবা করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই কাজের অন্তরে কী আছে। সেখানে যদি অহংকার, প্রদর্শন, স্বার্থ এবং ফলের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তাহলে কর্মের আধ্যাত্মিক গভীরতা সীমিত হয়ে যায়। আর যদি সত্য, নিবেদন, কর্তব্য এবং কল্যাণের চেতনা থাকে, তাহলে সেই কর্মের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে ওঠে। ওঁ তৎ সৎ তাই মানুষের বাহ্যিক আচরণের চেয়ে তার অন্তরের উদ্দেশ্যকে পবিত্র করার দিকে ইঙ্গিত করে।

সবশেষে বলা যায়, “ওঁ তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ” শ্লোকটি মানুষের সামনে একটি গভীর আধ্যাত্মিক দিগন্ত উন্মোচন করে। ওঁ আমাদের স্মরণ করায় যে আমরা একটি বৃহত্তর মহাজাগতিক বাস্তবতার অংশ। তৎ আমাদের ব্যক্তিগত অহংকারের সীমা অতিক্রম করে সেই পরম সত্যের দিকে তাকাতে শেখায়। সৎ আমাদের সত্য, অস্তিত্ব, শুভতা এবং কল্যাণের মধ্যে জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে আহ্বান জানায়। এই তিনটি শব্দ তাই কেবল উচ্চারণের বিষয় নয়, বরং একটি জীবনদর্শনের প্রতীক। ওঁ আমাদের চেতনার গভীরে মহাবিশ্বের স্মরণ জাগায়, তৎ আমাদের কর্মকে ব্যক্তিগত মালিকানার বোধ থেকে মুক্ত করে এবং সৎ আমাদের সত্য ও কল্যাণের পথে প্রতিষ্ঠিত করে। মানুষের জীবনের প্রকৃত সাধনা তখন কেবল নিজের জন্য কিছু অর্জন করা নয়, বরং নিজের জ্ঞান, কর্ম, শক্তি ও অস্তিত্বকে বৃহত্তর সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা। এই অর্থে ওঁ তৎ সৎ হলো শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক গভীর আহ্বান, যা মানুষকে আমি থেকে অসীমের দিকে, স্বার্থ থেকে নিবেদনের দিকে এবং অস্থায়ী পরিচয় থেকে চিরন্তন সত্যের দিকে যাত্রা করতে শিক্ষা দেয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি