ভগবদ্গীতা ১৭.২৪ — “ওঁ” উচ্চারণ, যজ্ঞ-দান-তপস্যা ও ব্রহ্মনিষ্ঠ কর্মের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব
তস্মাদ্ ওঁ ইত্যুদাহৃত্য যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ।
প্রবর্তন্তে বিধানোক্তাঃ সততং ব্রক্ষবাদিনাম্।।২৪।।
অনুবাদঃ সেই হেতু ব্রহ্মবাদীদের যজ্ঞ, দান, তপস্যা ও ক্রিয়াসমূহ সর্বদাই ওঁ এই শব্দ উচ্চারণ করে শাস্ত্রের বিধান অনুসারে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের চব্বিশতম শ্লোকটি মানুষের কর্মজীবনকে আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করার এক গভীর শিক্ষা প্রদান করে। শ্লোকটি হলো “তস্মাদ্ ওঁ ইত্যুদাহৃত্য যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ প্রবর্তন্তে বিধানোক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্।” এর সরল অর্থ হলো, তাই ব্রহ্মতত্ত্বনিষ্ঠ ব্যক্তিরা “ওঁ” এই পবিত্র শব্দ উচ্চারণ করে শাস্ত্রবিধান অনুসারে যজ্ঞ, দান ও তপস্যার কর্ম সর্বদা সম্পাদন করেন। কিন্তু এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ কেবল কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পূর্বে একটি পবিত্র শব্দ উচ্চারণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে মানুষের কর্ম, চেতনা, উদ্দেশ্য, আত্মসংযম, নিবেদন এবং পরম সত্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক সম্পর্কে একটি গভীর জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের শুরুতেই রয়েছে “তস্মাত্” শব্দটি। সংস্কৃত “তদ্” শব্দ থেকে উদ্ভূত এই পদটির অর্থ হলো সেই কারণে, তাই বা সুতরাং। এটি পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান বক্তব্যের একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে। সপ্তদশ অধ্যায়ের তেইশতম শ্লোকে বলা হয়েছে “ওঁ তৎ সৎ” এই তিনটি শব্দ ব্রহ্মের নির্দেশক এবং বৈদিক পরম্পরায় এগুলোর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সেই বক্তব্যের পরেই বলা হচ্ছে “তস্মাত্”, অর্থাৎ সেই কারণে। এর মাধ্যমে গীতা বোঝাচ্ছে যে কর্মকে যখন পরম সত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন সেই কর্মের সূচনাতেও পরম সত্যের স্মরণ থাকা প্রয়োজন। কর্ম তখন আর নিছক বাহ্যিক কাজ থাকে না। তা হয়ে ওঠে চেতনার একটি সচেতন প্রকাশ।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “ওঁ”। ওঁকে সংস্কৃত আধ্যাত্মিক পরম্পরায় প্রণব বলা হয় এবং এটি ভারতীয় দর্শনে পরম সত্যের অন্যতম গভীর প্রতীক। ওঁ কোনো সাধারণ শব্দের মতো কেবল একটি নির্দিষ্ট বস্তু বা ধারণাকে নির্দেশ করে না। এটি অস্তিত্বের সামগ্রিকতার একটি ধ্বনিগত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর উচ্চারণে অ, উ এবং ম এই তিন ধ্বনির সমন্বয় লক্ষ করা যায়। উপনিষদীয় ব্যাখ্যায় এই তিন ধ্বনিকে চেতনার বিভিন্ন অবস্থা এবং অস্তিত্বের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। জাগ্রত অবস্থা, স্বপ্ন অবস্থা এবং সুপ্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে যে চেতনা প্রকাশিত হয়, তারও একটি প্রতীকী ব্যাখ্যা ওঁ এর মধ্যে দেখা যায়। আবার সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মধ্য দিয়ে যে জগতের প্রকাশ ঘটে, তারও প্রতীকী ব্যাখ্যা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ওঁ এর সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য হলো এটি মানুষের মনকে সীমিত ব্যক্তিসত্তার বাইরে একটি সর্বব্যাপী সত্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়।
শ্লোকে “ওঁ ইতি উদাহৃত্য” বলা হয়েছে। এখানে “ইতি” অর্থ এই বলে বা এই শব্দে এবং “উদাহৃত্য” অর্থ উচ্চারণ করে বা প্রকাশ করে। ফলে “ওঁ ইত্যুদাহৃত্য” এর অর্থ দাঁড়ায় ওঁ এই পবিত্র শব্দ উচ্চারণ করে। কিন্তু এখানে উচ্চারণের বিষয়টি কেবল মুখের শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো কর্মের পূর্বে নিজের চেতনাকে একটি উচ্চতর সত্যের দিকে স্থাপন করা। মানুষ যখন কোনো কাজ করে, তখন তার কাজের ফল অনেকাংশে নির্ভর করে সে কী উদ্দেশ্য নিয়ে কাজটি করছে তার ওপর। একই কাজ স্বার্থপর উদ্দেশ্যে করা হলে এক ধরনের অর্থ বহন করতে পারে এবং নিঃস্বার্থভাবে করা হলে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ লাভ করতে পারে। তাই ওঁ উচ্চারণকে কর্মের পূর্বে অন্তরের অভিমুখ পরিবর্তনের একটি প্রতীক হিসেবেও বোঝা যায়।
এরপর এসেছে “যজ্ঞ” শব্দটি। সংস্কৃত “যজ্” ধাতু থেকে যজ্ঞ শব্দের উৎপত্তি। যজ্ এর মধ্যে পূজা করা, সম্মান করা, উপাসনা করা এবং নিবেদন করার ভাব রয়েছে। বৈদিক যুগে যজ্ঞ বলতে প্রধানত নির্দিষ্ট বৈদিক আচার ও অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার অনুষ্ঠানকে বোঝানো হলেও গীতার দৃষ্টিতে যজ্ঞের অর্থ অনেক বিস্তৃত। যজ্ঞের মূল ভাব হলো নিজের কোনো মূল্যবান শক্তি, সম্পদ, সময় বা কর্মকে বৃহত্তর কোনো উদ্দেশ্যের কাছে নিবেদন করা। একজন শিক্ষক যখন নিজের জ্ঞান শিক্ষার্থীর উন্নতির জন্য ব্যবহার করেন, একজন চিকিৎসক যখন নিজের দক্ষতা মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেন, একজন ব্যক্তি যখন নিজের শ্রম সমাজের কল্যাণে উৎসর্গ করেন, তখন সেগুলোর মধ্যেও যজ্ঞভাব দেখা যেতে পারে। এই অর্থে যজ্ঞ হলো নিজের অস্তিত্বকে কেবল নিজের জন্য না রেখে বৃহত্তর কল্যাণের প্রবাহে যুক্ত করা।
“দান” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “দা” ধাতু থেকে যার অর্থ দেওয়া। দানের বাহ্যিক রূপ হলো নিজের কোনো সম্পদ অন্যের কাছে প্রদান করা। কিন্তু দানের অন্তর্নিহিত অর্থ আরও গভীর। মানুষ সাধারণত কোনো কিছু অর্জন করার পর তার ওপর নিজের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। দান সেই মালিকানাবোধের মধ্যে একটি পরিবর্তন ঘটায়। মানুষ উপলব্ধি করতে শেখে যে সে যা পেয়েছে তা কেবল নিজের ভোগের জন্য নয়। তার সম্পদ, জ্ঞান, সময় এবং সামর্থ্য অন্যের কল্যাণেও ব্যবহার করা যেতে পারে। তাই প্রকৃত দান কেবল সম্পদ হস্তান্তর নয়। এটি হৃদয়ের সংকীর্ণতা থেকে উদারতার দিকে যাত্রা। যে দানে অহংকার নেই, প্রতিদানের প্রত্যাশা নেই এবং অন্যের কল্যাণের প্রতি আন্তরিকতা রয়েছে, সেই দানের মধ্যেই গীতার গভীর আদর্শ প্রকাশিত হয়।
এরপর রয়েছে “তপঃ”। এই শব্দটি সংস্কৃত “তপ্” ধাতু থেকে এসেছে যার মূল অর্থ উত্তপ্ত হওয়া বা তাপ সৃষ্টি করা। এখান থেকেই তপস্যার ধারণা এসেছে। তপস্যা মানে নিজের শরীরকে অকারণে কষ্ট দেওয়া নয়। এর গভীর অর্থ হলো আত্মসংযম, শৃঙ্খলা এবং নিজের নিম্নতর প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে উচ্চতর চরিত্র গঠন করা। মানুষের মধ্যে অসংখ্য আকাঙ্ক্ষা থাকে। সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই স্বাধীনতা নয়। বরং নিজের ইচ্ছাকে পরিচালনা করার ক্ষমতাই প্রকৃত স্বাধীনতার লক্ষণ। তপস্যা মানুষকে সেই শক্তি অর্জন করতে সাহায্য করে। ভোগের আকাঙ্ক্ষার উপর সংযম, ক্রোধের উপর নিয়ন্ত্রণ, অলসতার বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মধ্যেও তপস্যার প্রকাশ ঘটতে পারে।
“যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ” এই সমাসবদ্ধ পদটির মধ্য দিয়ে গীতা যজ্ঞ, দান এবং তপস্যাকে একত্র করেছে। এই তিনটি মানুষের জীবনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতাকে শুদ্ধ করে। যজ্ঞ মানুষকে নিবেদন শেখায়। দান মানুষকে উদারতা শেখায়। তপস্যা মানুষকে আত্মসংযম শেখায়। একজন মানুষ যদি কেবল নিজের জন্য কাজ করে, নিজের সম্পদ নিজের মধ্যেই জমিয়ে রাখে এবং নিজের ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে তার জীবন ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি নিজের কর্মকে বৃহত্তর উদ্দেশ্যের জন্য নিবেদন করে, নিজের সম্পদ অন্যের কল্যাণে ব্যবহার করে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, তাহলে তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি গভীর পরিবর্তন আসে।
শ্লোকে “প্রবর্তন্তে” শব্দটি এসেছে। এর মধ্যে শুরু হওয়া, প্রবাহিত হওয়া এবং কার্যকর হওয়ার ভাব রয়েছে। অর্থাৎ যজ্ঞ, দান ও তপস্যা কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এগুলো জীবনের ধারাবাহিক কর্মের অংশ। “সততম্” শব্দটি এই ধারাবাহিকতাকেই আরও স্পষ্ট করে। এর অর্থ সর্বদা বা নিরন্তর। গীতার দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক জীবন কেবল বিশেষ কোনো দিনে বা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের জীবন, প্রতিদিনের কাজ, সম্পর্ক, দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্তের মধ্যেই সেই চেতনার প্রকাশ ঘটতে পারে।
“বিধানোক্তাঃ” শব্দটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিধান বলতে নির্ধারিত নিয়ম বা শাস্ত্রনির্দেশ বোঝায় এবং উক্ত অর্থ হলো বলা বা নির্দিষ্ট করা। অর্থাৎ যজ্ঞ, দান ও তপস্যা এমনভাবে সম্পাদন করতে হবে যা যথাযথ নীতি ও বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গীতা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের কথা বলছে। শুধু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই যথেষ্ট নয়। সেই উদ্দেশ্যকে সঠিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করাও প্রয়োজন। মানুষের কর্মের মধ্যে যদি জ্ঞান, নৈতিকতা এবং শৃঙ্খলা না থাকে, তাহলে ভালো উদ্দেশ্যও কখনো কখনো ভুল ফল সৃষ্টি করতে পারে।
শ্লোকের শেষ অংশে এসেছে “ব্রহ্মবাদিনাম্”। ব্রহ্ম শব্দটি সংস্কৃত “বৃহ্” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে বিস্তৃত হওয়া, মহান হওয়া এবং বৃহত্তর হয়ে ওঠার ভাব রয়েছে। ব্রহ্মবাদী বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যিনি ব্রহ্মতত্ত্বকে উপলব্ধি করতে চান, ব্রহ্ম সম্পর্কে চিন্তা করেন অথবা জীবনের পরম সত্য হিসেবে ব্রহ্মকে স্বীকার করেন। তাই ব্রহ্মবাদীর কর্ম সাধারণ ব্যক্তির কর্মের মতো হলেও তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ভিন্ন। তিনি নিজের কর্মকে কেবল ব্যক্তিগত লাভের উপায় হিসেবে দেখেন না। তিনি কর্মের মধ্যে একটি বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ দেখতে পান।
এই শ্লোকের দার্শনিক গভীরতা এখানেই যে এটি মানুষের কর্মকে তার অন্তরের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মানুষ সাধারণত কাজ করে ফল পাওয়ার জন্য। সে চায় প্রশংসা, সম্পদ, সাফল্য, সম্মান অথবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। কিন্তু গীতা কর্মকে অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়। কর্মের মূল্য কেবল তার বাহ্যিক ফলের মধ্যে নয়। কর্ম মানুষের অন্তরকেও গঠন করে। একই কাজ একজন মানুষের অহংকার বাড়াতে পারে আবার অন্য একজনের মধ্যে বিনয় সৃষ্টি করতে পারে। একই সম্পদ একজনের মধ্যে লোভ বাড়াতে পারে আবার অন্যজনের মধ্যে দানের শক্তি জাগাতে পারে। একই কঠিন পরিস্থিতি একজনকে ভেঙে দিতে পারে আবার অন্যজনের মধ্যে তপস্যার শক্তি জাগিয়ে তুলতে পারে।
এই দৃষ্টিতে “ওঁ” হলো কর্মের পূর্বে চেতনার জাগরণ। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে সে একা নয় এবং তার জীবন কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার জন্য নয়। “যজ্ঞ” তাকে শেখায় নিজের কর্মকে নিবেদন করতে। “দান” শেখায় নিজের অর্জনকে ভাগ করে নিতে। “তপস্যা” শেখায় নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আর “বিধান” শেখায় সঠিক পথ ও শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে এই সবকিছু সম্পাদন করতে। এই চারটি ধারণা একত্রে মানুষের কর্মজীবনকে আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারে।
একটি নদীর উপমা দিয়ে বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝা যায়। নদী যদি নিজের জল নিজের মধ্যেই আটকে রাখতে চায়, তাহলে তার প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। নদীর সৌন্দর্য তার চলার মধ্যে এবং তার জলকে বৃহত্তর সাগরের দিকে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে। মানুষের জীবনও তেমন। নিজের শক্তি, জ্ঞান, সম্পদ ও সামর্থ্যকে কেবল নিজের মধ্যে আটকে রাখলে জীবন সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন মানুষ নিজের সামর্থ্যকে অন্যের কল্যাণে প্রবাহিত করে, তখন তার অস্তিত্ব বৃহত্তর অর্থ লাভ করে। এই প্রবাহের নাম যজ্ঞ, এই উদারতার নাম দান এবং এই প্রবাহকে সঠিক পথে রাখার শক্তির নাম তপস্যা।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো কাজ করার আগে মানুষ যদি নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হয়, তাহলে তার কর্মের অভিজ্ঞতা বদলে যেতে পারে। একজন শিক্ষক যদি মনে করেন তিনি শুধু চাকরি করছেন, তাহলে তার কাজ একটি পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু যদি তিনি মনে করেন তার জ্ঞান অন্যের জীবন গঠনে সহায়তা করছে, তাহলে সেই একই কাজ সেবায় পরিণত হয়। একজন চিকিৎসক যদি শুধু পেশাগত সাফল্যের কথা ভাবেন, তাহলে তার কাজ একরকম। কিন্তু যদি তিনি রোগীর কল্যাণকে নিজের কর্মের উদ্দেশ্য করেন, তাহলে সেই কর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ পরিবর্তিত হয়। এখানেই যজ্ঞভাবের আধুনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়। মুখে “ওঁ” উচ্চারণ করাই আধ্যাত্মিকতার পূর্ণতা নয়। শব্দের সঙ্গে চেতনার মিলন ঘটতে হবে। যদি মানুষ “ওঁ” উচ্চারণ করে কিন্তু তার অন্তরে থাকে লোভ, অহংকার, হিংসা এবং স্বার্থপরতা, তাহলে সেই উচ্চারণের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। “ওঁ” তখনই গভীর অর্থ লাভ করে যখন তা মানুষের কর্মের উদ্দেশ্যকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে নিজের সীমিত অহংকারের বাইরে বৃহত্তর সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের কর্মজীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক দর্শন প্রকাশ করে। এখানে “তস্মাত্” আমাদের পূর্ববর্তী সত্যের কথা স্মরণ করায়। “ওঁ” আমাদের পরম সত্যের দিকে মন ফেরায়। “যজ্ঞ” আমাদের নিজের কর্মকে নিবেদন করতে শেখায়। “দান” আমাদের মালিকানাবোধের সংকীর্ণতা অতিক্রম করতে শেখায়। “তপঃ” আমাদের ইন্দ্রিয় ও প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শেখায়। “বিধান” আমাদের শৃঙ্খলার গুরুত্ব বোঝায় এবং “ব্রহ্মবাদী” আমাদের সেই মানুষটির আদর্শ দেখায় যিনি নিজের জীবনকে বৃহত্তর সত্যের অনুসন্ধানের পথে পরিচালিত করেন। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো জীবনের কোনো কর্মই তুচ্ছ নয়, যদি সেই কর্ম সঠিক চেতনা, সঠিক উদ্দেশ্য, সঠিক পদ্ধতি এবং নিবেদনের মানসিকতা নিয়ে সম্পাদিত হয়। মানুষ যখন নিজের কর্মকে কেবল নিজের জন্য না রেখে বৃহত্তর সত্য ও কল্যাণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে শেখে, তখন তার সাধারণ জীবনও ধীরে ধীরে সাধনায় পরিণত হয়। “ওঁ” তখন কেবল একটি উচ্চারিত শব্দ থাকে না, তা হয়ে ওঠে অন্তরের জাগরণ। যজ্ঞ হয়ে ওঠে আত্মনিবেদন। দান হয়ে ওঠে উদারতা। তপস্যা হয়ে ওঠে আত্মশক্তি। আর কর্ম হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধির পথ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!