সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৭.২৫ — “তৎ” ভাবনা, ফলত্যাগ ও মোক্ষকামী নিষ্কাম কর্মের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ। দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ।।২৫।।
তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ। 
দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ।।২৫।।

অনুবাদঃ মুক্তিকামীরা ফলের আকাঙ্ক্ষা না করে ‘তৎ’ এই শব্দ উচ্চারণ-পূর্বক নানা প্রকার যজ্ঞ, তপস্যা, দান আদি কর্মের অনুষ্ঠান করেন।

ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের পঁচিশতম শ্লোক মানুষের কর্মজীবনের একটি অত্যন্ত গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো “তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ। দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ।। ২৫।। ” এর সরল অর্থ হলো, সেই পরম সত্যকে স্মরণ করে এবং কর্মের ফলের প্রতি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা না রেখে মোক্ষকামী মানুষ যজ্ঞ, তপস্যা এবং বিভিন্ন প্রকার দানের কর্ম সম্পাদন করেন। কিন্তু এই অর্থের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, শ্লোকটি কেবল যজ্ঞ, তপস্যা বা দানের বাহ্যিক আচরণ সম্পর্কে কথা বলছে না। এটি মানুষের কর্মের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য, অহংকার, ফলের আকাঙ্ক্ষা, আত্মসংযম, অর্পণ এবং মুক্তির মধ্যে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করছে।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “তৎ”। সংস্কৃত “তৎ” শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো “সেই”। সাধারণ ভাষায় এটি কোনো দূরবর্তী বা পূর্বে উল্লিখিত বিষয়কে নির্দেশ করে। কিন্তু গীতার আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপটে “তৎ” একটি গভীরতর অর্থ বহন করে। এটি সেই পরম সত্যকে নির্দেশ করে যা ব্যক্তিগত সীমা, অহংকার এবং স্বার্থের ঊর্ধ্বে। সপ্তদশ অধ্যায়ে “ওঁ তৎ সৎ” এর যে আলোচনা এসেছে, তার ধারাবাহিকতায় এখানে “তৎ” মানুষের কর্মকে ব্যক্তিগত মালিকানার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করার একটি আধ্যাত্মিক সংকেত হয়ে ওঠে। মানুষ সাধারণত বলে এটি আমার কাজ, আমি এটি করেছি, এর ফল আমি পাব। কিন্তু “তৎ” শব্দটি যেন সেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক বোধের সামনে একটি বৃহত্তর সত্যকে উপস্থিত করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের কর্ম ও তার সামর্থ্যও বৃহত্তর অস্তিত্বের একটি অংশ।

এরপর এসেছে “অনভিসন্ধায়” শব্দটি। এই শব্দের মধ্যে রয়েছে কোনো নির্দিষ্ট ফলের প্রতি মনকে নিবদ্ধ না করার ভাব। “অভিসন্ধি” বলতে কোনো লক্ষ্য বা ফলকে উদ্দেশ্য করে মানসিকভাবে এগিয়ে যাওয়া বোঝায়। তার আগে নিষেধাত্মক ভাব যুক্ত হয়ে “অনভিসন্ধায়” অর্থ দাঁড়ায় ফলের প্রতি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বা মানসিক দাবি না রেখে। এখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম দর্শন রয়েছে। গীতা ফলকে অস্বীকার করছে না এবং কর্মের স্বাভাবিক পরিণতিকেও অস্বীকার করছে না। বরং বলা হচ্ছে ফল যেন মানুষের কর্মের একমাত্র উদ্দেশ্য না হয়ে ওঠে। একজন মানুষ যদি প্রতিটি কাজের আগে শুধু ভাবতে থাকে এর বিনিময়ে আমি কী পাব, মানুষ আমাকে কতটা সম্মান করবে, আমার কতটা লাভ হবে অথবা আমি কতটা সফল হব, তাহলে তার মন কর্মের সত্যতা থেকে সরে গিয়ে ফলের প্রত্যাশায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই বন্ধনই কর্মকে অস্থিরতা ও আসক্তির দিকে নিয়ে যায়।

“ফলং” শব্দের অর্থ ফল বা পরিণাম। মানুষের জীবনে ফলের আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। প্রত্যেক মানুষ কোনো না কোনো ফলের প্রত্যাশায় কাজ করে। কৃষক বীজ বপন করেন ফসলের আশায়, ছাত্র পড়াশোনা করে জ্ঞানের পাশাপাশি সাফল্যের আশায় এবং কর্মী পরিশ্রম করে জীবিকা ও উন্নতির আশায়। গীতার শিক্ষা এই স্বাভাবিক প্রত্যাশাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে না। বরং এর লক্ষ্য হলো ফলের সঙ্গে মানুষের যে অতিরিক্ত আসক্তি তৈরি হয় তা অতিক্রম করা। কর্মের ফল আসবে কিনা, কখন আসবে, কতটা আসবে এবং অন্যরা সেই ফলকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে এসবের উপর নিজের অন্তরের শান্তিকে নির্ভরশীল করে না রেখে মানুষ যেন নিজের কর্তব্য ও কর্মের সততার দিকে মনোযোগ দেয়। এই অর্থে ফলত্যাগ মানে ফলকে ধ্বংস করা নয়, বরং ফলের উপর নিজের অহংকার ও মানসিক স্বাধীনতা সমর্পণ না করা।

শ্লোকে “যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ” শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। “যজ্ঞ” শব্দটি সংস্কৃত “যজ” ধাতু থেকে এসেছে এবং এর মধ্যে উপাসনা, অর্পণ ও বৃহত্তর কোনো উদ্দেশ্যের কাছে নিজেকে নিবেদনের ভাব রয়েছে। বৈদিক যুগে যজ্ঞের একটি সুস্পষ্ট আচারগত রূপ ছিল, কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে যজ্ঞের অন্তর্নিহিত অর্থ আরও বিস্তৃত। নিজের সম্পদ, সময়, শ্রম, জ্ঞান এবং সামর্থ্যকে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য উৎসর্গ করাও যজ্ঞের ভাব বহন করতে পারে। মানুষ যখন নিজের সীমিত স্বার্থের বাইরে গিয়ে অন্যের জন্য কিছু করে এবং নিজের সামর্থ্যকে একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্যের কাছে অর্পণ করে, তখন তার কর্মের মধ্যে যজ্ঞের চেতনা জন্ম নেয়।

“তপঃ” শব্দটি এসেছে “তপ” ধাতু থেকে। এর মূল ভাব উত্তাপ, দহন ও শুদ্ধিকরণের সঙ্গে যুক্ত। আধ্যাত্মিক অর্থে তপস্যা হলো আত্মসংযমের এমন একটি সাধনা যার মাধ্যমে মানুষ নিজের অস্থিরতা, প্রবৃত্তি ও দুর্বলতাকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করে। তপস্যা শুধু দুঃখ সহ্য করা নয়। এটি নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা এবং সত্যের জন্য নিজের স্বাচ্ছন্দ্যকে অতিক্রম করার মানসিক শক্তি। কিন্তু তপস্যাও যদি অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং মানুষ মনে করে আমি অন্যদের চেয়ে বেশি পবিত্র বা শ্রেষ্ঠ, তাহলে তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই গীতা তপস্যাকেও ফলের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত করার শিক্ষা দেয়।

এরপর আসে “দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ”। দান শব্দের মূল অর্থ দেওয়া বা প্রদান করা। কিন্তু প্রকৃত দান কেবল অর্থ বা বস্তু দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ জ্ঞান দিতে পারে, সময় দিতে পারে, শ্রম দিতে পারে, ভালোবাসা দিতে পারে, সহানুভূতি দিতে পারে এবং বিপদের সময় অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারে। দানের প্রকৃত মূল্য শুধু কী দেওয়া হলো তার মধ্যে নয়, কেন দেওয়া হলো তার মধ্যেও নিহিত। কেউ যদি দান করে প্রশংসা পাওয়ার জন্য, সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য অথবা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করার জন্য, তাহলে বাহ্যিকভাবে দান থাকলেও তার মধ্যে স্বার্থের ছায়া থেকে যেতে পারে। অন্যদিকে কেউ যদি অন্যের কল্যাণকে নিজের কর্তব্য মনে করে নীরবে সাহায্য করে, তবে সেই দানের মধ্যে অর্পণের একটি গভীরতর চেতনা প্রকাশ পায়।

“বিবিধাঃ” শব্দটি বোঝায় নানাবিধ বা বিভিন্ন প্রকার। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে মানুষের দানের ক্ষেত্র অসীম। জীবনের বিভিন্ন অবস্থায় মানুষ বিভিন্নভাবে অন্যের উপকার করতে পারে। একজন শিক্ষক জ্ঞান দিয়ে দান করেন, একজন চিকিৎসক সেবা দিয়ে দান করেন, একজন শ্রমিক নিজের শ্রম দিয়ে সমাজকে দান করেন এবং একজন সাধারণ মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে দানের চেতনা প্রকাশ করতে পারেন। তাই দান কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের কাজ নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত উদারতার প্রকাশ।

“ক্রিয়ন্তে” শব্দটি “কৃ” ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। এখানে কর্মবাচ্য ভাব রয়েছে। এই ব্যবহারের মধ্যেও একটি সূক্ষ্ম তাৎপর্য রয়েছে। শ্লোকটি ব্যক্তিগত কর্তার অহংকারকে সামনে না এনে কর্ম সম্পাদনের দিকে গুরুত্ব দেয়। যেন বলা হচ্ছে যে প্রকৃত সাধনায় “আমি করলাম” এই অহংকার ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে। কর্ম তখন নিজের গৌরব প্রতিষ্ঠার উপায় না হয়ে কর্তব্য ও অর্পণের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।

শ্লোকটির শেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ”। “মোক্ষ” শব্দটি “মুচ” ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ মুক্তি বা বন্ধন থেকে অবমুক্ত হওয়া। ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ হলো অজ্ঞতা, আসক্তি, অহংকার এবং জন্মমৃত্যুর বন্ধন থেকে চূড়ান্ত মুক্তির ধারণা। “কাঙ্ক্ষী” অর্থ যিনি আকাঙ্ক্ষা করেন। ফলে “মোক্ষকাঙ্ক্ষী” বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি মোক্ষ বা মুক্তিকে জীবনের পরম লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই মানুষটির কাছে যজ্ঞ, তপস্যা ও দান কোনো ব্যক্তিগত পুরস্কার পাওয়ার উপায় নয়। এগুলো হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যম।

এই শ্লোকের দার্শনিক গভীরতা এখানেই যে এটি কর্ম ত্যাগের কথা বলে না, বরং কর্মের মধ্যে থেকে আসক্তি ত্যাগের কথা বলে। মানুষ কাজ করবে, নিজের কর্তব্য পালন করবে, অন্যের জন্য দান করবে, আত্মসংযম অনুশীলন করবে এবং নিজের সামর্থ্যকে বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহার করবে। কিন্তু কর্মের ফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মানদণ্ড বানাবে না। গীতার কর্মযোগের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কর্ম নিজে বন্ধনের কারণ নয়। কর্মের সঙ্গে যুক্ত আসক্তি, অহংকার এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে মানসিকভাবে আবদ্ধ করে।

অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শিক্ষা আরও গভীর হয়। মানুষ যখন নিজেকে কেবল কর্তা এবং ভোক্তা হিসেবে দেখে তখন সে মনে করে আমি কাজ করছি এবং আমিই তার ফল ভোগ করব। এই “আমি” ও “আমার” বোধ যত দৃঢ় হয়, কর্মের বন্ধনও তত দৃঢ় হয়। “তৎ” সেই অহংকেন্দ্রিক চেতনাকে বৃহত্তর সত্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়। তখন মানুষ উপলব্ধি করতে শেখে যে তার শরীর, মন, বুদ্ধি ও সামর্থ্য সবকিছুই বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই উপলব্ধি কর্মের মধ্যে বিনয় ও অর্পণের জন্ম দেয়।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষ যখন কোনো কাজের ফল নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন থাকে তখন তার মন ভবিষ্যতের অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে আটকে যায়। সে ভাবতে থাকে আমি সফল হব কিনা, মানুষ আমাকে কীভাবে বিচার করবে, আমার মর্যাদা বাড়বে কিনা এবং আমার প্রত্যাশা পূরণ হবে কিনা। এর ফলে বর্তমান কর্মের প্রতি মনোযোগ কমে যেতে পারে। ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের মানসিক শান্তিকে দুর্বল করে। কিন্তু যখন মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয় অর্থাৎ সততা, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও কর্তব্যের প্রতি মনোযোগ দেয় এবং ফলকে বৃহত্তর নিয়তির হাতে অর্পণ করতে শেখে, তখন তার অন্তরে এক ধরনের স্থিরতা জন্ম নিতে পারে। এই দৃষ্টিতে গীতার ফলাসক্তিহীন কর্ম আধুনিক জীবনের মানসিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও একটি গভীর শিক্ষা বহন করে।

বাস্তব জীবনের একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যায়। একজন শিক্ষক তার ছাত্রকে আন্তরিকভাবে শিক্ষা দিলেন। যদি তাঁর সমস্ত মনোযোগ থাকে ছাত্র ভালো ফল করলে মানুষ তাঁকে কতটা প্রশংসা করবে, তাহলে তাঁর কর্মের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। কিন্তু যদি তিনি মনে করেন আমার কর্তব্য হলো সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্রকে শিক্ষা দেওয়া এবং ছাত্রের চূড়ান্ত ফলাফল সম্পূর্ণভাবে আমার হাতে নেই, তাহলে তাঁর কর্মের মধ্যে ফলাসক্তিহীনতার একটি চেতনা প্রকাশ পায়। একইভাবে একজন মানুষ যদি দরিদ্রকে সাহায্য করে এবং সেই সাহায্যের মাধ্যমে নিজের খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তার দানের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ যুক্ত থাকে। কিন্তু যদি সে অন্যের কষ্ট লাঘব করাকে নিজের মানবিক কর্তব্য মনে করে এবং বিনিময়ে কোনো প্রশংসা প্রত্যাশা না করে, তাহলে সেই দানের মধ্যে “তৎ” ভাবনার গভীরতা প্রকাশ পেতে পারে।

এই শ্লোক তাই মানুষের জীবনের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়। আমরা কেন কাজ করি। আমরা কি শুধু ফলের জন্য কাজ করি, নাকি কর্মের নিজস্ব নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যও উপলব্ধি করি। আমরা কি দান করি কারণ মানুষ আমাদের ভালো বলবে, নাকি সত্যিই অন্যের কল্যাণ চাই। আমরা কি তপস্যা করি নিজের অহংকার বাড়ানোর জন্য, নাকি নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করার জন্য। আমরা কি যজ্ঞ করি কোনো ব্যক্তিগত পুরস্কারের প্রত্যাশায়, নাকি নিজের সামর্থ্যকে বৃহত্তর সত্যের কাছে অর্পণ করার জন্য। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই কর্মের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণ করে।

“তৎ” তাই কেবল একটি ছোট সংস্কৃত সর্বনাম নয়। এটি মানুষের চেতনাকে নিজের সংকীর্ণ সত্তার বাইরে নিয়ে যাওয়ার একটি আধ্যাত্মিক প্রতীক। “আমি” থেকে “সেই” এর দিকে যাত্রা হলো অহংকার থেকে অর্পণের দিকে যাত্রা। “আমার ফল” থেকে “কর্তব্যের কর্ম” এর দিকে যাত্রা হলো আসক্তি থেকে স্বাধীনতার দিকে যাত্রা। আর এই স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপই মোক্ষের দিকে অগ্রসর হওয়া।

সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতা ১৭.২৫ মানুষের কর্মজীবনকে একটি গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ প্রদান করে। এখানে যজ্ঞ হলো অর্পণের প্রতীক, তপস্যা হলো আত্মসংযমের প্রতীক, দান হলো উদারতার প্রতীক এবং মোক্ষ হলো চূড়ান্ত মুক্তির প্রতীক। কিন্তু এই সবকিছুকে সত্যিকার অর্থে পবিত্র করে তোলে যে চেতনা তা হলো “তৎ” এবং “অনভিসন্ধায় ফলম্” এর শিক্ষা। অর্থাৎ কাজ করো কিন্তু কাজের ফলকে নিজের অহংকারের সম্পত্তি বানিও না। দাও কিন্তু দানের বিনিময়ে নিজের গৌরব দাবি করো না। তপস্যা করো কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে আবদ্ধ হয়ো না। নিজের কর্তব্য পালন করো কিন্তু ফলের অনিশ্চয়তার কাছে নিজের অন্তরের শান্তিকে সমর্পণ করো না। কারণ কর্মের প্রকৃত মুক্তি কর্ম ত্যাগে নয়, কর্মের মধ্যকার স্বার্থপর আসক্তি ত্যাগে। যখন মানুষ নিজের প্রতিটি সৎ কর্মকে সেই পরম সত্যের উদ্দেশে অর্পণ করতে শেখে, তখন কর্ম আর কেবল দৈনন্দিন কাজ থাকে না। তা হয়ে ওঠে সাধনা, দান হয়ে ওঠে আত্মঅর্পণ, তপস্যা হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধি এবং সমগ্র জীবন ধীরে ধীরে মুক্তির পথে একটি সচেতন যাত্রায় পরিণত হয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 24, 2026 August 24, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি