ভগবদ্গীতা ১৭.২৭ — যজ্ঞ, তপস্যা ও দানে নিষ্ঠা এবং “সৎ” কর্মের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব
যজ্ঞে তপসি দানে চ স্থিতিঃ সদিতি চোচ্যতে।
কর্ম চৈব তদর্থীয়ং সদিত্যেবাভিধীয়তে।।২৭।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! সৎভাবে ও সাধুভাবে ‘সৎ’ এই শব্দটি প্রযুক্ত হয়। তেমনই শুভ কর্মসমূহে ‘সৎ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। যজ্ঞে, তপস্যায় ও দানে ‘সৎ’ শব্দ উচ্চারিত হয়। যেহেতু ঐ সকল কর্ম ব্রহ্মোদ্দেশক হলেই ‘সৎ’ শব্দে অভিহিত হয়।
ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের সাতাশতম শ্লোকে বলা হয়েছে যজ্ঞে তপস্যায় এবং দানে যে স্থিতি বা অবিচল নিষ্ঠা তাকে সৎ বলা হয় এবং সেই মহান উদ্দেশ্যে সম্পাদিত কর্মও সৎ নামেই অভিহিত হয়। এই শ্লোকের সৎ শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ একটি শব্দ মনে হলেও এর অন্তরে নিহিত রয়েছে ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর অস্তিত্ববোধ। সংস্কৃত সৎ শব্দটির মূল সম্পর্ক সংস্কৃত √অস্ ধাতুর সঙ্গে যার অর্থ থাকা বা অস্তিত্বশীল হওয়া। এই মূল অর্থ থেকেই সৎ শব্দের মধ্যে বিদ্যমান বাস্তব সত্য শুভতা মহত্ত্ব পবিত্রতা এবং কল্যাণের ধারণা বিকশিত হয়েছে। তাই সৎ কেবল ভালো অর্থে ব্যবহৃত কোনো নৈতিক শব্দ নয় বরং যা সত্যভাবে বিদ্যমান যা বাস্তব যা কল্যাণময় এবং যা মানুষের চেতনাকে উচ্চতর সত্যের দিকে নিয়ে যায় তারই একটি গভীর প্রকাশ।
সৎ শব্দটির সবচেয়ে প্রাথমিক অর্থ হলো যা আছে বা যা বিদ্যমান। ভারতীয় দর্শনের দৃষ্টিতে এই থাকা বা অস্তিত্বশীল হওয়ার ধারণাটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ যখন জগতের দিকে তাকায় তখন সে অসংখ্য পরিবর্তনশীল বস্তু দেখতে পায়। মানুষের দেহ পরিবর্তিত হয় চিন্তা পরিবর্তিত হয় অনুভূতি পরিবর্তিত হয় সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় সমাজ পরিবর্তিত হয় এবং সময়ের সঙ্গে প্রায় সব বাহ্যিক অবস্থাই পরিবর্তনের মধ্যে থাকে। কিন্তু এই পরিবর্তনের অন্তরালে এমন কোনো সত্য আছে কি না যা অধিক স্থায়ী এবং মৌলিক এই অনুসন্ধান থেকেই সৎ ধারণাটি গভীর দার্শনিক অর্থ লাভ করে। সৎ তখন কেবল কোনো বস্তুর অস্তিত্ব নয় বরং অস্তিত্বের সেই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে যা বাহ্যিক পরিবর্তনের আড়ালে গভীরতর বাস্তবতাকে ধারণ করে।
এই কারণেই সৎ শব্দের সঙ্গে সত্য শব্দটিরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সৎ বলতে বোঝানো হয় যা আছে এবং সত্য বলতে বোঝানো হয় যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অস্তিত্ব থেকে বাস্তবতা এবং বাস্তবতা থেকে সত্যের যে অর্থগত বিকাশ তা ভারতীয় দর্শনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পরবর্তীকালে এই সত্যের ধারণার সঙ্গে শুভতা ও কল্যাণের ধারণাও যুক্ত হয়েছে। ফলে সৎ এমন এক শব্দে পরিণত হয়েছে যার মধ্যে অস্তিত্বের সত্য নৈতিকতার শুভতা এবং আধ্যাত্মিকতার মহত্ত্ব একই সঙ্গে উপস্থিত।
ভগবদ্গীতার এই শ্লোকে সৎ শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয় যখন এর সঙ্গে স্থিতি শব্দটির সম্পর্ক বিবেচনা করা হয়। শ্রীকৃষ্ণ কেবল যজ্ঞ তপস্যা বা দানের কথা বলছেন না। তিনি বলছেন সেই সব কাজে যে স্থিতি রয়েছে তাকেই সৎ বলা হয়। অর্থাৎ কোনো ভালো কাজ একবার সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়। সত্য ও কল্যাণের আদর্শে স্থির থাকা প্রয়োজন। একজন মানুষ একদিন দান করতে পারে কিন্তু তার মধ্যে যদি দানের চেতনা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে সেই দান তার চরিত্রকে গভীরভাবে পরিবর্তন নাও করতে পারে। একজন ব্যক্তি একদিন তপস্যা করতে পারে কিন্তু যদি তার অন্তরে আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির স্থিতি তৈরি না হয় তাহলে সেই তপস্যা কেবল সাময়িক আচরণ হয়ে থাকতে পারে। গীতার শিক্ষা হলো সত্যিকারের মহত্ত্ব তখনই জন্ম নেয় যখন মানুষ ভালো কাজের মধ্যে স্থির হয়ে যায় এবং সেই ভালোত্ব তার জীবনের স্বাভাবিক চরিত্রে পরিণত হয়।
এই জায়গাতেই সৎ শব্দটি মানুষের চরিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। মানুষ কী করছে তার চেয়ে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সে কেন করছে। একই দান একজন মানুষ করতে পারে নিজের খ্যাতির জন্য এবং অন্য একজন করতে পারে নিঃস্বার্থভাবে কোনো মানুষের জীবনকে সুন্দর করার জন্য। বাহ্যিকভাবে উভয়ের কাজ একই হলেও তাদের অন্তরের উদ্দেশ্য এক নয়। গীতার দৃষ্টিতে কর্মের মূল্য কেবল বাহ্যিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এবং চেতনা তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন কর্ম সত্য ও কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয় তখন সেই কর্ম সৎ হয়ে ওঠে।
যজ্ঞের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। যজ্ঞের বাহ্যিক রূপ হলো নিবেদন কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো নিজের কিছু বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা। মানুষ যখন নিজের সময় শ্রম জ্ঞান সম্পদ বা সামর্থ্যকে বৃহত্তর জীবনের কল্যাণে নিবেদন করে তখন তার কর্মের মধ্যে যজ্ঞের চেতনা প্রকাশ পায়। সেই নিবেদনের মধ্যে যদি স্বার্থপরতার পরিবর্তে কর্তব্যবোধ থাকে এবং ব্যক্তিগত অহংকারের পরিবর্তে বৃহত্তর সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে তবে সেই স্থিতিই সৎ।
তপস্যার ক্ষেত্রেও সৎ ধারণাটি গভীরভাবে প্রযোজ্য। তপস্যা শুধু কষ্ট সহ্য করার নাম নয়। তপস্যার প্রকৃত অর্থ আত্মসংযম আত্মশুদ্ধি এবং নিজের নিম্নতর প্রবৃত্তির ওপর উচ্চতর চেতনার প্রতিষ্ঠা। মানুষ যখন নিজের ইচ্ছা লোভ ক্রোধ অহংকার ও আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে সত্য ও কল্যাণের পথে নিজেকে স্থির রাখে তখন তার জীবনে সৎ চেতনা প্রকাশিত হয়। তপস্যার উদ্দেশ্য যদি মানুষের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে তবে তার বাহ্যিক কঠোরতা থাকলেও অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট হতে পারে। কিন্তু তপস্যা যদি মানুষকে বিনয়ী সংযত ও সত্যনিষ্ঠ করে তোলে তবে তা সৎ এর পথে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
দানের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। দান শুধু সম্পদ অন্যকে দিয়ে দেওয়ার নাম নয়। দানের মধ্যে রয়েছে নিজের প্রাচুর্যকে অন্যের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার এক মানবিক চেতনা। একজন মানুষ যদি দান করে নিজের নাম প্রচার করার জন্য তবে তার দানের সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্ক থেকে যায়। কিন্তু যখন মানুষ দান করে অন্যের দুঃখ লাঘব করার জন্য এবং বিনিময়ে কোনো প্রশংসা প্রত্যাশা করে না তখন সেই দানের মধ্যে এক গভীর মহত্ত্ব জন্ম নেয়। এই মহত্ত্বই সৎ ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
সৎ শব্দের দার্শনিক অর্থ আরও গভীর হয় বেদান্তের আলোচনায়। ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় ব্রহ্মকে সৎ চিৎ আনন্দ হিসেবে উপলব্ধি করার কথা বলা হয়। এখানে সৎ অস্তিত্বের পরম সত্যের দিকে নির্দেশ করে। চিৎ হলো চেতনা এবং আনন্দ হলো পরম পূর্ণতার অভিজ্ঞতা। এই দৃষ্টিতে সৎ কোনো ক্ষণস্থায়ী গুণ নয় বরং অস্তিত্বের গভীরতম সত্যের একটি প্রকাশ। মানুষ যখন নিজের জীবনে সত্যকে অনুসরণ করে তখন সে ধীরে ধীরে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে অস্তিত্বের গভীরতর সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যায়।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিতেও সৎ একটি শক্তিশালী ধারণা। সৎ মানুষ বলতে শুধু এমন মানুষকে বোঝানো হয় না যে অন্যায় করে না। সৎ মানুষ সেই ব্যক্তি যার জীবনে সত্যনিষ্ঠা ন্যায়বোধ সহমর্মিতা আত্মসংযম উদারতা এবং মহত্ত্ব একত্রে প্রকাশ পায়। সৎ তাই মানুষের অন্তরের আলো। যেমন একটি প্রদীপের বাহ্যিক পাত্র তেল ও সলতে তার সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে না যতক্ষণ না তার মধ্যে আলো জ্বলে ওঠে তেমনি মানুষের কর্মের বাহ্যিক রূপ তার প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ করতে পারে না যতক্ষণ না তার অন্তরে সত্যের আলো জ্বলে ওঠে। সৎ সেই অন্তরের আলো যা সাধারণ কর্মকে অর্থপূর্ণ সাধনায় পরিণত করে।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও সৎ ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ জীবনে অর্থ সম্পদ খ্যাতি ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করতে পারে কিন্তু এসব অর্জন নিজেরাই জীবনকে মহৎ করে না। জীবনের প্রকৃত মহত্ত্ব নির্ভর করে মানুষ কোন আদর্শের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে তার ওপর। একজন মানুষ অনেক সম্পদের অধিকারী হয়েও যদি স্বার্থপরতা ও অহংকারে আবদ্ধ থাকে তবে তার বাহ্যিক সাফল্য অন্তরের পূর্ণতার নিশ্চয়তা দেয় না। অন্যদিকে একজন সাধারণ মানুষ যদি সত্যনিষ্ঠা সহমর্মিতা দায়িত্ববোধ এবং কল্যাণের চেতনায় জীবন পরিচালনা করে তবে তার জীবন গভীর অর্থ লাভ করতে পারে। এই অন্তর্নিহিত মহত্ত্বের নামই সৎ।
সৎ তাই কেবল একটি শব্দ নয় বরং একটি জীবনদর্শন। এটি মানুষকে বাহ্যিক কাজের চেয়ে অন্তরের উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দিতে শেখায়। এটি শেখায় সত্যের মধ্যে স্থির থাকতে এবং কল্যাণের পথে অবিচল থাকতে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে ভালো কাজের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রকাশ পায় যখন সেই কাজ মানুষের চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠে। যজ্ঞে নিবেদন তপস্যায় সংযম এবং দানে উদারতা তখনই সত্যিকার অর্থে সৎ হয়ে ওঠে যখন সেগুলো ব্যক্তিগত অহংকার ও স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে উচ্চতর সত্যের প্রতি নিবেদিত হয়।
সবশেষে বলা যায় সৎ শব্দের গভীরতম তাৎপর্য হলো সত্য অস্তিত্ব এবং কল্যাণের মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত ঐক্য। ভাষার দিক থেকে এটি অস্তিত্বশীলতার ধারণা থেকে উদ্ভূত। নৈতিকতার দিক থেকে এটি শুভতা ও মহত্ত্বের প্রতীক। দর্শনের দিক থেকে এটি বাস্তবতার অনুসন্ধান। আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে এটি পরম সত্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আহ্বান। আর মানবজীবনের দিক থেকে এটি এমন এক অন্তর্চেতনা যা মানুষকে নিজের সীমিত স্বার্থ অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্য ও কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। তাই ভগবদ্গীতার এই শ্লোকে সৎ মানে শুধু ভালো নয়। সৎ হলো এমন এক সত্যনিষ্ঠ অস্তিত্বচেতনা যার মধ্যে কর্ম পবিত্র হয় উদ্দেশ্য মহৎ হয় চরিত্র দৃঢ় হয় এবং জীবন ধীরে ধীরে সত্যের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের জীবনে যখন সত্য চিন্তা সত্য উদ্দেশ্য এবং সত্য কর্ম একত্রিত হয় তখন তার জীবনেই সৎ এর প্রকৃত প্রকাশ ঘটে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!