ভগবদ্গীতা ১৭.৫ — শাস্ত্রবিরুদ্ধ উগ্র তপস্যা, দম্ভ-অহংকার ও কামাসক্তির বিপদ
অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ।
দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ কামরাগবলান্বিতাঃ।।৫।।
অনুবাদঃ দম্ভ ও অহঙ্কারযুক্ত এবং কামনা ও আসক্তির প্রভাবে বলান্বিত হয়ে যে সমস্ত অবিবেকী ব্যক্তি তাদের দেহস্থ ভূতসমূহকে এবং অন্তরস্থ পরমাত্মাকে ক্লেশ প্রদান করে শাস্ত্রবিরুদ্ধ ঘোর তপস্যার অনুষ্ঠান করে, তাদেরকে নিশ্চিতভাবে আসুরিক বলে জানবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের সাধনা ও তপস্যার একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ কামরাগবলান্বিতাঃ। অর্থাৎ যে সকল মানুষ শাস্ত্রসম্মত নয় এমন উগ্র তপস্যা করে এবং যারা দম্ভ ও অহঙ্কারে যুক্ত হয়ে কামনা ও আসক্তির শক্তিতে পরিচালিত হয়, তাদের সেই তপস্যা প্রকৃত আত্মশুদ্ধির পথ নয়। এই শ্লোকের মধ্যে কেবল তপস্যার সমালোচনা করা হয়নি, বরং মানুষের অন্তরের উদ্দেশ্য, মানসিক প্রবণতা, আত্মপরিচয় এবং আধ্যাত্মিক সাধনার প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে একটি গভীর দর্শন প্রকাশ পেয়েছে।
অশাস্ত্রবিহিতং শব্দটির মধ্যে রয়েছে অ, শাস্ত্র এবং বিহিত এই ভাবগত উপাদান। অ অর্থ নয় বা বর্জিত। শাস্ত্র শব্দটি সংস্কৃত শাস ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে শাসন, শিক্ষা, নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক পথে পরিচালনার ভাব নিহিত রয়েছে। তাই শাস্ত্র কেবল কোনো ধর্মগ্রন্থের নাম নয়। গভীর অর্থে শাস্ত্র হলো এমন জ্ঞান ও নির্দেশনা যা মানুষকে সত্য, সংযম, কর্তব্য এবং কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। বিহিত অর্থ নির্ধারিত, বিধিবদ্ধ বা যথাযথভাবে অনুমোদিত। ফলে অশাস্ত্রবিহিতং বলতে এমন কিছু বোঝায় যা শাস্ত্রসম্মত বিধান ও কল্যাণকর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শাস্ত্রে কোনো একটি কাজের উল্লেখ আছে কি নেই, সেই সংকীর্ণ অর্থে শব্দটি বোঝা উচিত নয়। বরং যে সাধনা বিবেচনা, সংযম, আত্মশুদ্ধি ও কল্যাণের নীতিকে অতিক্রম করে এবং নিজের ইচ্ছাকে আধ্যাত্মিকতার নামে প্রতিষ্ঠা করে, সেটিই এখানে অশাস্ত্রবিহিত ভাবের অন্তর্ভুক্ত।
ঘোরং শব্দটি এসেছে ঘোর থেকে। এর অর্থ ভয়ংকর, উগ্র, কঠোর, তীব্র বা কষ্টদায়ক। তপস্যার সঙ্গে ঘোর শব্দটি যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে এমন সাধনা যা অত্যন্ত কঠোর এবং কখনও কখনও স্বাভাবিক সামঞ্জস্যকেও অতিক্রম করে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য এই নয় যে কঠোর তপস্যা নিজেই ভুল। বরং তিনি বোঝাচ্ছেন যে কেবল কঠোরতা কোনো সাধনার আধ্যাত্মিক মহত্ত্বের প্রমাণ নয়। তপ্যন্তে শব্দটি সংস্কৃত তপ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। তপের মধ্যে উত্তাপ, দহন, কষ্টসহিষ্ণুতা এবং সাধনার ভাব রয়েছে। তপস্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অন্তরের অশুদ্ধতা দূর করা এবং মানুষকে আরও সংযত, সত্যনিষ্ঠ, শান্ত ও সচেতন করে তোলা। তাই শরীরকে কষ্ট দেওয়া এবং আত্মাকে শুদ্ধ করা একই বিষয় নয়। কোনো সাধনা যদি মানুষের অহঙ্কার, কামনা ও আসক্তিকে আরও শক্তিশালী করে, তাহলে তার বাহ্যিক কঠোরতা সত্ত্বেও তার আধ্যাত্মিক মূল্য প্রশ্নের মুখে পড়ে।
শ্লোকের দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ শব্দটি তপস্যার অন্তর্নিহিত মানসিক অবস্থাকে প্রকাশ করে। দম্ভ অর্থ ভণ্ডামি, আত্মপ্রদর্শন, লোকদেখানো ধার্মিকতা এবং নিজের মহত্ত্ব প্রকাশের প্রবণতা। অহঙ্কার শব্দের মধ্যে রয়েছে অহম্ অর্থাৎ আমি এবং কার অর্থ নির্মাণ বা করা। ফলে অহঙ্কার হলো এমন এক মানসিক নির্মাণ যার কেন্দ্রে থাকে আমি। আমি কর্তা, আমি শ্রেষ্ঠ, আমি জ্ঞানী, আমি ত্যাগী, আমি সাধক, আমি অন্যদের চেয়ে উন্নত এই ধরনের আত্মপরিচয় যখন মানুষের সাধনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সাধনা আত্মশুদ্ধির পথ থেকে আত্মপ্রতিষ্ঠার পথে চলে যায়। সংযুক্ত অর্থ যুক্ত বা সংশ্লিষ্ট। সুতরাং দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয়েছে যার সাধনার সঙ্গে আত্মপ্রদর্শন ও অহঙ্কার গভীরভাবে যুক্ত।
এর পরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কামরাগবলান্বিতাঃ। কাম অর্থ আকাঙ্ক্ষা, বাসনা বা কোনো কিছু লাভ করার প্রবল ইচ্ছা। রাগ অর্থ কোনো বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ বা আসক্তি। সংস্কৃত রঞ্জ্ ধাতুর সঙ্গে রাগ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে এবং এর মধ্যে রঙিন হয়ে যাওয়ার একটি গভীর প্রতীকী ভাব আছে। মন যখন কোনো বিষয়ের প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হয়ে যায় যে সেই বিষয়ের সঙ্গে নিজের সুখ ও পরিচয়কে যুক্ত করে ফেলে, তখন সেই আকর্ষণ আসক্তিতে পরিণত হয়। বল অর্থ শক্তি এবং অন্বিত অর্থ যুক্ত বা সমৃদ্ধ। ফলে কামরাগবলান্বিতাঃ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন মানুষ যারা কামনা ও আসক্তির শক্তি দ্বারা পরিচালিত। এই কামনা কেবল ইন্দ্রিয়ভোগের আকাঙ্ক্ষা নয়। খ্যাতি, সম্মান, ক্ষমতা, অলৌকিক শক্তি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা অন্যের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এইভাবে পুরো শ্লোকটি একত্রে পড়লে একটি গভীর মানসিক চিত্র ফুটে ওঠে। একজন মানুষ কঠোর তপস্যা করছে, কিন্তু তার তপস্যার ভিত্তি শাস্ত্রসম্মত বিবেচনা নয়। তার মধ্যে রয়েছে দম্ভ ও অহঙ্কার এবং তার সাধনাকে চালিত করছে কোনো না কোনো কামনা ও আসক্তি। বাইরে থেকে সে অত্যন্ত সাধক বা তপস্বী বলে মনে হতে পারে, কিন্তু ভিতরে তার চেতনা এখনও আকাঙ্ক্ষা ও আত্মকেন্দ্রিকতার দ্বারা আবদ্ধ। এখানেই শ্রীকৃষ্ণ বাহ্যিক সাধনা এবং অন্তরের সাধনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নির্দেশ করেছেন।
এই শিক্ষা মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধর্মীয় সাধনার ক্ষেত্রেই শুধু নয়, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ বাহ্যিক কাজের মাধ্যমে নিজের একটি বিশেষ পরিচয় নির্মাণ করতে পারে। কেউ দান করতে পারে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য। কেউ জ্ঞান অর্জন করতে পারে অন্যদের ছোট করার জন্য। কেউ উপবাস করতে পারে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য। কেউ কঠোর নিয়ম পালন করতে পারে নিজের পবিত্রতার প্রদর্শনের জন্য। আবার কেউ আধ্যাত্মিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষমতা ও প্রভাব অর্জন করতে পারে। বাহ্যিক আচরণ ধর্মীয় বা নৈতিক হলেও অন্তরের উদ্দেশ্য যদি আত্মপ্রদর্শন ও আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে সেই আচরণের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায়।
এই কারণেই গীতার এই শিক্ষা একটি গভীর আত্মপরীক্ষার আহ্বান। মানুষকে নিজেকে প্রশ্ন করতে হয় আমি কেন এই সাধনা করছি, আমি কেন এই নিয়ম পালন করছি, আমি কেন এই ত্যাগ করছি এবং এর মাধ্যমে আমি কী অর্জন করতে চাই। যদি উত্তর হয় সত্য ও আত্মশুদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া, তবে সাধনার মধ্যে নির্মলতার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু যদি অন্তরের গোপন আকাঙ্ক্ষা হয় অন্যের প্রশংসা, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতা অর্জন অথবা কোনো ব্যক্তিগত লাভ, তবে সেই সাধনার মধ্যে দম্ভ ও কামনার প্রভাব প্রবল হতে পারে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের গুরুত্ব আরও গভীর। বেদান্তীয় ভাবনায় অহঙ্কার মানুষের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে সীমাবদ্ধ করে। মানুষ যখন শরীর, মন, বুদ্ধি, সামাজিক পরিচয় এবং কর্মের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে এক করে দেখে, তখন আমি ও আমার ধারণা প্রবল হয়ে ওঠে। প্রকৃত আধ্যাত্মিক সাধনার উদ্দেশ্য এই সীমাবদ্ধ আত্মপরিচয়কে অতিক্রম করা। কিন্তু যদি সাধনার ফলেই আমি আরও বড় সাধক, আমি আরও পবিত্র, আমি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এই ধারণা জন্ম নেয়, তাহলে সাধনা অহঙ্কারকে দূর করার পরিবর্তে আরও সূক্ষ্মভাবে তাকে শক্তিশালী করে। তাই আধ্যাত্মিক অহঙ্কার অনেক সময় সাধারণ অহঙ্কারের চেয়েও বিপজ্জনক, কারণ এটি নিজেকে পবিত্রতার আবরণে আড়াল করতে পারে।
সাংখ্য দর্শনের আলোতেও এই শ্লোকের তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। মানুষের প্রকৃতিতে সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই তিন গুণের বিভিন্ন প্রকাশ দেখা যায়। সত্ত্বের মধ্যে থাকে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, সামঞ্জস্য ও শান্তি। রজঃ মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা, কর্মস্পৃহা, অর্জনের বাসনা ও ফলের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। তমঃ অজ্ঞান, অসংযম, অন্ধতা ও বিবেচনাহীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। দম্ভ, অহঙ্কার, কামনা ও আসক্তি দ্বারা চালিত উগ্র সাধনার মধ্যে রজঃ এবং তমঃ প্রবল হয়ে উঠতে পারে। ফলে বাহ্যিকভাবে সাধনা থাকলেও অন্তরের চেতনা মুক্তির দিকে না গিয়ে আরও বন্ধনের দিকে যেতে পারে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিক থেকেও তপস্যা একটি শক্তিশালী প্রতীক। ভারতীয় সাহিত্যে তপস্যা কখনও জ্ঞান ও আত্মসংযমের প্রতীক, কখনও আত্মত্যাগের প্রতীক, আবার কখনও শক্তি অর্জনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে এসেছে। এই দ্বৈততা গীতার আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। তপস্যা নিজে শুভ বা অশুভ নয়। তপস্যার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং অন্তরের চেতনা তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে। যে তপস্যা মানুষকে নম্র, সংযত, সত্যনিষ্ঠ ও করুণাময় করে, তা আত্মশুদ্ধির পথে সহায়ক। আর যে তপস্যা মানুষকে অহঙ্কারী, কঠোর, আত্মপ্রদর্শনকারী ও অন্যের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ করে তোলে, তা তার অন্তর্গত দুর্বলতাকেই প্রকাশ করতে পারে।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি গাছ বাইরে থেকে যতই সুন্দর হোক, তার শিকড় যদি পচে যায় তবে তার বাহ্যিক সৌন্দর্য স্থায়ী হবে না। একইভাবে মানুষের সাধনার বাহ্যিক রূপ যতই কঠোর ও চমকপ্রদ হোক, অন্তরের শিকড়ে যদি দম্ভ, অহঙ্কার, কামনা ও আসক্তি থাকে তবে সেই সাধনা প্রকৃত মুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে না। বিপরীতে একটি সাধারণ ও নিরাভরণ সাধনাও গভীরভাবে মূল্যবান হতে পারে, যদি তার মধ্যে থাকে সত্যনিষ্ঠা, আত্মসংযম, নম্রতা এবং অন্তরশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কষ্ট এবং তপস্যা এক বিষয় নয়। মানুষ নিজের শরীরকে কষ্ট দিতে পারে, কিন্তু তাতে নিজের অহঙ্কার নষ্ট নাও হতে পারে। সে দীর্ঘ সময় নীরব থাকতে পারে, কিন্তু তার অন্তরের আকাঙ্ক্ষা নীরব নাও হতে পারে। সে অনেক কিছু ত্যাগ করতে পারে, কিন্তু নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি ত্যাগ নাও করতে পারে। তাই প্রকৃত তপস্যার মাপকাঠি বাহ্যিক কষ্ট নয়, বরং অন্তরের রূপান্তর। সাধনার ফলে যদি মানুষের কামনা কমে, আসক্তি শিথিল হয়, অহঙ্কার ক্ষীণ হয়, সত্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতি গভীর হয়, তবে সেই সাধনা তার চেতনাকে উন্নত করছে বলা যায়।
এই অর্থে শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা অত্যন্ত মানবিক এবং সর্বকালীন। তিনি মানুষকে শুধু ধর্মীয় আচরণ করতে বলছেন না, বরং আচরণের অন্তর্নিহিত চেতনাকে পরীক্ষা করতে বলছেন। কোনো কাজ কত বড় দেখাচ্ছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই কাজের ভিতরে কী উদ্দেশ্য কাজ করছে। মানুষের প্রকৃত উন্নতি তখনই ঘটে যখন তার সাধনা তাকে নিজের কাছে সত্য করে তোলে। অন্যের চোখে মহান হওয়া আধ্যাত্মিকতার লক্ষ্য নয়। বরং নিজের অহঙ্কারকে চিনতে পারা, নিজের কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা এবং নিজের অন্তরকে সত্য ও কল্যাণের দিকে পরিচালিত করতে পারাই প্রকৃত সাধনার লক্ষণ।
অতএব অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ শ্লোকটি কেবল কঠোর তপস্যার সমালোচনা নয়, এটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি গভীর বিশ্লেষণ। অশাস্ত্রবিহিতং আমাদের শেখায় যে সাধনার একটি সঠিক নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক পথ থাকা প্রয়োজন। ঘোরং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাহ্যিক কঠোরতা নিজে আধ্যাত্মিকতার প্রমাণ নয়। দম্ভ আমাদের সতর্ক করে আত্মপ্রদর্শনের বিপদ সম্পর্কে। অহঙ্কার আমাদের দেখায় আমি কেন্দ্রিকতার বন্ধন। কাম আমাদের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি বুঝতে শেখায় এবং রাগ আমাদের আসক্তির শিকড় চিনতে সাহায্য করে। এই সমস্ত শব্দ একত্রে মানুষের একটি গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে যেখানে সে মুক্তি চায়, কিন্তু নিজের অহঙ্কার ও আকাঙ্ক্ষাকেও আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের একটি অত্যন্ত গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমি যে সাধনা করছি তা কি আমাকে সত্যিই মুক্ত করছে, নাকি আমার নিজের একটি মহান পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করছে। আমার ত্যাগ কি আমাকে নম্র করছে, নাকি অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করাচ্ছে। আমার ধর্মাচরণ কি আমার অন্তরকে নির্মল করছে, নাকি কেবল বাহ্যিক পরিচয়কে সুন্দর করছে। এই প্রশ্নগুলোর প্রতি সৎ হওয়াই শ্লোকটির প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধির প্রথম ধাপ। শ্রীকৃষ্ণের দৃষ্টিতে প্রকৃত তপস্যা সেই তপস্যা যা মানুষকে নিজের অহঙ্কারের দুর্গ থেকে বের করে সত্য, সংযম, শান্তি, জ্ঞান ও কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়। তাই এই শ্লোকের সারকথা হলো বাহ্যিক কষ্ট নয়, অন্তরের শুদ্ধতাই সাধনার প্রকৃত পরিচয় এবং আত্মপ্রদর্শন নয়, আত্মজয়ই তপস্যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!