ভগবদ্গীতা ১৮.১ — সন্ন্যাস ও ত্যাগের তত্ত্ব: কর্মপরিত্যাগ নাকি ফলাসক্তি ত্যাগ
অর্জুন উবাচ
সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্।
ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক্কেশিনিসূদন।।১।।
অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে মহাবাহো! হে হৃষীকেশ! হে কেশিনিসূদন! আমি সন্ন্যাস ও ত্যাগের তত্ত্ব পৃথকভাবে জানতে ইচ্ছা করি।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের সূচনাতেই অর্জুন এমন একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন, যার মধ্যে সমগ্র গীতার কর্মদর্শন, আত্মজ্ঞান এবং মুক্তির পথের একটি গভীর অনুসন্ধান নিহিত রয়েছে। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বলেন, হে মহাবাহু, আমি সন্ন্যাসের তত্ত্ব জানতে চাই এবং ত্যাগের তত্ত্বও পৃথকভাবে জানতে চাই। এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে অর্জুন আসলে জানতে চাইছেন মানুষের মুক্তির জন্য কি কর্মকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হয়, নাকি কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করাই প্রকৃত ত্যাগ। শ্লোকটি হলো সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্ ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক্কেশিনিসূদন। বাংলা অর্থ হলো, হে মহাবাহু, আমি সন্ন্যাসের প্রকৃত তত্ত্ব এবং ত্যাগের প্রকৃত তত্ত্ব পৃথকভাবে জানতে ইচ্ছা করি।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সন্ন্যাস। সংস্কৃত সন্ন্যাস শব্দের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে স্থাপন করা, অর্পণ করা অথবা পরিত্যাগ করার গভীর ধারণা নিহিত রয়েছে। সাধারণ অর্থে সন্ন্যাস বলতে সংসার পরিত্যাগ, পার্থিব আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে সন্ন্যাসের অর্থ কেবল বাহ্যিকভাবে সংসার ছেড়ে দেওয়া নয়। মানুষের অন্তরে যে কামনা, স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত ভোগের উদ্দেশ্যে কর্ম করার প্রবণতা রয়েছে, সেই প্রবণতা থেকে মুক্ত হওয়ার বিষয়ও সন্ন্যাসের সঙ্গে যুক্ত। তাই সন্ন্যাসের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে শুধু বাহ্যিক জীবনযাত্রার দিকে তাকালে চলবে না। মানুষের কর্মের উদ্দেশ্য এবং অন্তরের অবস্থাকেও বিবেচনা করতে হবে।
শ্লোকে সন্ন্যাস শব্দের সঙ্গে ত্যাগ শব্দটি পাশাপাশি এসেছে। ত্যাগ শব্দটি সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতু থেকে উৎপন্ন এবং এর মূল অর্থ হলো ছেড়ে দেওয়া, পরিত্যাগ করা বা বর্জন করা। কিন্তু গীতার দর্শনে ত্যাগের অর্থ সাধারণ পরিত্যাগের চেয়ে অনেক গভীর। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে অনেক কিছু ছেড়ে দিতে পারেন, কিন্তু তার অন্তরে যদি সেই বস্তুগুলোর প্রতি আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়, তাহলে প্রকৃত ত্যাগ সম্পন্ন হয় না। বিপরীতভাবে একজন মানুষ সংসারে থেকেই নিজের কর্তব্য পালন করতে পারেন, কিন্তু সেই কর্মের ফলের প্রতি যদি তাঁর গভীর আসক্তি না থাকে, তাহলে তাঁর জীবনেও ত্যাগের আদর্শ প্রকাশিত হতে পারে। এই কারণে গীতার ত্যাগ মূলত অন্তরের একটি অবস্থার নাম।
অর্জুন যখন বলেন তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্, তখন তাঁর প্রশ্নটি কেবল সংজ্ঞা জানার প্রশ্ন নয়। তত্ত্ব শব্দটি কোনো বিষয়ের বাহ্যিক পরিচয় নয়, বরং তার প্রকৃত স্বরূপকে নির্দেশ করে। অর্জুন তাই জানতে চাইছেন সন্ন্যাসের আসল সত্য কী এবং ত্যাগের প্রকৃত স্বরূপ কী। এই অনুসন্ধান একজন সত্যসন্ধানী মানুষের মানসিকতার পরিচয় দেয়। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক প্রশ্ন করা। অর্জুন বুঝতে পারছেন যে সন্ন্যাস ও ত্যাগ শব্দ দুটি কাছাকাছি হলেও তাদের মধ্যে কোনো সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। তাই তিনি ভগবান কৃষ্ণের কাছে সেই পার্থক্যের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে চাইছেন।
শ্রীকৃষ্ণকে অর্জুন এই শ্লোকে তিনটি বিশেষ নামে সম্বোধন করেছেন। তিনি বলেছেন মহাবাহু, হৃষীকেশ এবং কেশিনিসূদন। মহাবাহু শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো মহান বা শক্তিশালী বাহুর অধিকারী। অর্জুনকে মহাবাহু বলে সম্বোধন করার মধ্যে তাঁর শক্তি, সাহস এবং কর্মক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। এর সঙ্গে শ্লোকের বিষয়বস্তুর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অর্জুন একজন যোদ্ধা এবং তাঁর জীবন কর্মের সঙ্গে যুক্ত। তাই তাঁর জন্য কর্ম থেকে সম্পূর্ণভাবে পালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নের চেয়ে কর্মের প্রকৃতি এবং কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রশ্ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
হৃষীকেশ শব্দের অর্থ ইন্দ্রিয়সমূহের অধীশ্বর। হৃষীক অর্থ ইন্দ্রিয় এবং ঈশ অর্থ প্রভু বা নিয়ন্তা। কৃষ্ণকে হৃষীকেশ বলে সম্বোধন করার মধ্যে একটি গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। মানুষ যতক্ষণ নিজের ইন্দ্রিয়, মন এবং আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হয়, ততক্ষণ তার কর্মের মধ্যে আসক্তি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ মানুষকে বস্তু, ভোগ, সম্মান এবং সাফল্যের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই প্রকৃত ত্যাগের জন্য বাহ্যিক বস্তু ত্যাগের পাশাপাশি অন্তরের ইন্দ্রিয়াসক্তিকে অতিক্রম করাও প্রয়োজন। হৃষীকেশ নামটি সেই অন্তর্নিয়ন্ত্রণের প্রতীক।
কেশিনিসূদন শব্দটি কৃষ্ণের কেশী অসুর বধের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। কেশী ছিল এক অসুর, যাকে শ্রীকৃষ্ণ বধ করেছিলেন। সূদন অর্থ বিনাশকারী। তাই কেশিনিসূদন অর্থ কেশী অসুরের বিনাশকারী। আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় এই নামটি মানুষের অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তির বিনাশের প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে। মানুষের মধ্যে অহংকার, উন্মত্ততা, লোভ, ক্রোধ এবং নিয়ন্ত্রণহীন আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় কেশীর মতোই তাকে অস্থির করে তোলে। যে চেতনা এই প্রবৃত্তিকে জয় করতে পারে, সেই চেতনার কাছেই অর্জুন সন্ন্যাস ও ত্যাগের প্রকৃত জ্ঞান জানতে চাইছেন।
সন্ন্যাস ও ত্যাগের পার্থক্য বোঝার জন্য গীতার কর্মদর্শন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ধারণায় মনে হতে পারে যে কাজ না করাই সন্ন্যাস এবং সবকিছু ছেড়ে দেওয়াই ত্যাগ। কিন্তু গীতা মানুষের এই সরল ধারণাকে গভীরভাবে সংশোধন করে। মানুষ প্রকৃতির দ্বারা কর্ম করতে বাধ্য। শরীর আছে, মন আছে, সমাজ আছে, সম্পর্ক আছে এবং কর্তব্য আছে। তাই কর্মকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে সহজ বা স্বাভাবিক নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো মানুষ কীভাবে কর্ম করবে এবং সেই কর্ম তাকে বন্ধনে আবদ্ধ করবে কি না।
গীতার দৃষ্টিতে কর্মের সঙ্গে মানুষের বন্ধন অনেক সময় কর্মের কারণে সৃষ্টি হয় না, বরং কর্মফলের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষার কারণে সৃষ্টি হয়। একজন মানুষ কোনো কাজ করে এবং তার বিনিময়ে নির্দিষ্ট ফল প্রত্যাশা করে। ফল তার ইচ্ছামতো হলে সে আনন্দিত হয় এবং ফল প্রত্যাশামতো না হলে দুঃখিত হয়। এভাবে তার মানসিক শান্তি বাইরের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সে নিজের মূল্যবোধকেও সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে। এখানেই কর্মফলের আসক্তি মানুষের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে।
এই কারণে ত্যাগের প্রকৃত অর্থ হলো কর্মের ফলকে নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্র না বানানো। এর অর্থ এই নয় যে মানুষ কাজের ফল নিয়ে একেবারেই চিন্তা করবে না বা দায়িত্বহীন হয়ে পড়বে। বরং মানুষ নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে কর্তব্য পালন করবে, কিন্তু ফলাফলকে নিজের অহংকার, সুখ এবং আত্মপরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি বানাবে না। সে জানবে যে তার কর্তব্য পালন তার হাতে, কিন্তু প্রতিটি ফলাফল সম্পূর্ণভাবে তার নিয়ন্ত্রণে নয়। এই উপলব্ধি কর্মের মধ্যে এক ধরনের স্বাধীনতা সৃষ্টি করে।
বাস্তব জীবনে একজন শিক্ষককে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। একজন শিক্ষক আন্তরিকভাবে ছাত্রদের শিক্ষা দেন। যদি তিনি মনে করেন প্রত্যেক ছাত্রকে অবশ্যই তাঁকে প্রশংসা করতে হবে এবং তাঁর সাফল্য তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদার একমাত্র প্রমাণ, তাহলে তাঁর কর্মের সঙ্গে ফলের আসক্তি যুক্ত হয়েছে। কিন্তু যদি তিনি আন্তরিকভাবে নিজের কর্তব্য পালন করেন এবং ছাত্রদের উন্নতিকে নিজের সাধনার অংশ মনে করেন, অথচ প্রশংসা বা স্বীকৃতিকে নিজের অন্তরের শান্তির শর্ত না বানান, তাহলে তাঁর কর্মে ত্যাগের ভাব প্রকাশ পেতে পারে। একইভাবে একজন চিকিৎসক, কৃষক, শিল্পী, ব্যবসায়ী কিংবা গৃহস্থ নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারেন এবং একই সঙ্গে ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।
এই শিক্ষা মানুষের মনোজগতের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ প্রায়ই নিজের পরিচয়কে বাইরের সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করে। সে ভাবে আমি সফল হলে আমি মূল্যবান এবং ব্যর্থ হলে আমি মূল্যহীন। কেউ প্রশংসা করলে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং কেউ সমালোচনা করলে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে। এই মানসিক নির্ভরতা তাকে ক্রমাগত অস্থির করে রাখে। গীতার ত্যাগের শিক্ষা মানুষকে এই নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হতে সাহায্য করে। মানুষ তখন বুঝতে পারে তার মূল্য কেবল কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল দ্বারা নির্ধারিত নয়। তার কর্তব্য, চরিত্র, সততা এবং অন্তরের সত্যও তার জীবনের মূল্য বহন করে।
এই শ্লোকের আরেকটি গভীর দার্শনিক দিক হলো কর্ম এবং অহংকারের সম্পর্ক। মানুষ যখন বলে আমি করেছি, আমিই কর্তা, আমার জন্যই এই ফল এসেছে, তখন কর্মের সঙ্গে অহংকার যুক্ত হয়। আবার ব্যর্থ হলে সে ভাবে আমার সব শেষ হয়ে গেল। গীতার দর্শন মানুষকে কর্মের মধ্যে থেকেও এই সংকীর্ণ কর্তৃত্ববোধ অতিক্রম করতে শেখায়। মানুষ তার কর্তব্য করবে, কিন্তু নিজেকে সমগ্র কর্মব্যবস্থার একমাত্র নিয়ন্তা মনে করবে না। এই উপলব্ধি ধীরে ধীরে অহংকারকে হ্রাস করে এবং কর্মকে আত্মশুদ্ধির পথে পরিণত করে।
এই কারণে সন্ন্যাস এবং ত্যাগকে কেবল ধর্মীয় আচরণ হিসেবে দেখলে শ্লোকটির গভীরতা বোঝা যায় না। এগুলো মানুষের চেতনার বিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত ধারণা। সন্ন্যাস মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় সে কোন আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। ত্যাগ তাকে শেখায় কীভাবে সেই আকাঙ্ক্ষার বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়। কর্ম মানুষকে জগতে সক্রিয় রাখে এবং ত্যাগ সেই কর্মকে অন্তরের স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করে। এই দৃষ্টিতে গীতা জীবন থেকে পালানোর শিক্ষা দেয় না। বরং জীবনকে সঠিকভাবে গ্রহণ করার শিক্ষা দেয়।
শ্লোকটির মধ্যে একটি সুন্দর প্রতীকী কাঠামোও রয়েছে। মহাবাহু কর্মশক্তির প্রতীক, হৃষীকেশ ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের প্রতীক এবং কেশিনিসূদন অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তি বিনাশের প্রতীক। অর্থাৎ মানুষের জীবনে শক্তি আছে, কিন্তু সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কর্ম করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই কর্মকে সঠিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত করতে হবে। মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার দ্বারা নিজের চেতনা যেন নিয়ন্ত্রিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এই তিনটি স্তর অতিক্রম করেই ত্যাগের প্রকৃত উপলব্ধি সম্ভব।
একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যায়। নদী পার হওয়ার জন্য একটি নৌকার প্রয়োজন। নৌকা ছাড়া নদী পার হওয়া কঠিন, কিন্তু নৌকাটিকে গন্তব্য মনে করাও ভুল। তেমনি কর্ম মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় উপায়। কর্মকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করলে জীবনযাত্রার স্বাভাবিক কর্তব্য ব্যাহত হতে পারে। আবার কর্মফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র লক্ষ্য বানালে মানুষ কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সঠিক পথ হলো কর্মকে গ্রহণ করা, কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি এমনভাবে আসক্ত না হওয়া যাতে নিজের অন্তরের স্বাধীনতা হারিয়ে যায়।
অর্জুনের এই প্রশ্ন তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংশয়ের প্রশ্ন নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের প্রশ্ন। আমরা কাজ করব কেন, কতটা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাজ করব, সাফল্য ও ব্যর্থতাকে কীভাবে গ্রহণ করব এবং কখন বুঝব যে কোনো কিছু ত্যাগ করা সত্যিই ত্যাগ হয়েছে। এই প্রশ্নগুলো মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, পেশাগত জীবন এবং আধ্যাত্মিক জীবন সব ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের একটি গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায়। বাহ্যিকভাবে অনেক কিছু ছেড়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু অন্তরের আসক্তি ছেড়ে দেওয়া অনেক কঠিন। একজন মানুষ সংসারে থেকেও ত্যাগী হতে পারেন এবং বাহ্যিকভাবে সংসার পরিত্যাগ করেও অন্তরে আসক্ত থাকতে পারেন। তাই প্রকৃত ত্যাগ কোনো পোশাক, স্থান বা বাহ্যিক পরিচয়ের বিষয় নয়। এটি চেতনার একটি পরিণত অবস্থা। যখন মানুষ কর্তব্য থেকে পালায় না, কিন্তু কর্মফলের দাসও হয় না, যখন সে কাজ করে কিন্তু অহংকারে নিজেকে কাজের একমাত্র কর্তা মনে করে না, যখন সে সাফল্যে অহংকারে ভেসে যায় না এবং ব্যর্থতায় নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না, তখন তার জীবনে গীতার ত্যাগের আদর্শ প্রকাশ পেতে শুরু করে।
সুতরাং সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্ ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক্কেশিনিসূদন এই শ্লোকটি শুধু সন্ন্যাস ও ত্যাগের সংজ্ঞা জানার একটি প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের অন্তরের স্বাধীনতার অনুসন্ধান। সন্ন্যাস আমাদের শেখায় কোন আকাঙ্ক্ষা ও কর্মের প্রকৃতি পরিত্যাগযোগ্য, আর ত্যাগ আমাদের শেখায় কর্মের মধ্যেই কীভাবে আসক্তিহীনতা অর্জন করা যায়। তত্ত্ব আমাদের বাহ্যিক রূপের আড়ালে প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান করতে শেখায়। হৃষীকেশ আমাদের ইন্দ্রিয় ও মনকে নিয়ন্ত্রণের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং কেশিনিসূদন আমাদের অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তিকে জয় করার আহ্বান জানান। এইভাবে শ্লোকটি মানুষের সামনে এমন এক জীবনের আদর্শ স্থাপন করে যেখানে কর্ম আছে কিন্তু কর্মবন্ধন নেই, দায়িত্ব আছে কিন্তু অহংকার নেই, প্রচেষ্টা আছে কিন্তু ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি নেই এবং জীবন আছে কিন্তু সেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আত্মিক স্বাধীনতা। এই উপলব্ধিই শেষ পর্যন্ত গীতার ত্যাগ দর্শনের গভীরতম তাৎপর্য।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!