ভগবদ্গীতা ১৮.১০ — সাত্ত্বিক ত্যাগীর সমভাব: প্রিয়-অপ্রিয় কর্মে অনাসক্তি ও সংশয়মুক্ত বুদ্ধি
ন দ্বেষ্ট্যকুশলং কর্ম কুশলে নানুষজ্জতে।
ত্যাগী সত্ত্বসমাবিষ্টো মেধাবী ছিন্নসংশয়ঃ।।১০।।
অনুবাদঃ সত্ত্বগুণে আবিষ্ট, মেধাবী ও সমস্ত সংশয়-ছিন্ন ত্যাগী অশুভ কর্মে বিদ্বেষ করেন না এবং শুভ কর্মে আসক্ত হন না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের দশম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ত্যাগের প্রকৃত স্বরূপ অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। শ্লোকটি হলো
এই শ্লোকে মানুষের কর্মজীবন, মানসিক প্রবণতা, ত্যাগ, জ্ঞান, বুদ্ধি এবং সংশয়মুক্ত চেতনার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণভাবে মানুষ যে কাজ করতে ভালোবাসে তার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং যে কাজ করতে কষ্ট হয় বা আনন্দ পায় না তার প্রতি বিরক্ত হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো প্রকৃত ত্যাগী ব্যক্তি এই দুই মানসিক প্রবণতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। তিনি অপ্রিয় বা কষ্টকর কর্মকে ঘৃণা করেন না এবং প্রিয় বা সুখকর কর্মের প্রতিও অতিরিক্ত আসক্ত হন না। তাঁর কাছে কর্মের মূল্য নির্ধারিত হয় কর্তব্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ভিত্তিতে নয়।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ন। সংস্কৃত ন শব্দের অর্থ না বা নয়। এখানে এই শব্দটি নিষেধ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। শ্লোকে ন শব্দটি দুবার এসেছে এবং এর মাধ্যমে মানুষের দুটি বিপরীত মানসিক প্রবণতাকে অতিক্রম করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। প্রথমটি হলো দ্বেষ এবং দ্বিতীয়টি হলো আসক্তি। মানুষ সাধারণত যা পছন্দ করে তার দিকে এগিয়ে যায় এবং যা অপছন্দ করে তা থেকে দূরে সরে যেতে চায়। কৃষ্ণ দেখাচ্ছেন যে প্রকৃত ত্যাগী ব্যক্তি এই পছন্দ ও অপছন্দের দ্বারা পরিচালিত হন না।
দ্বেষ্টি শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু হলো দ্বিষ্। এর অর্থ ঘৃণা করা, বিদ্বেষ করা, বিরাগ পোষণ করা বা কোনো কিছুকে দূরে সরিয়ে দিতে চাওয়া। বাংলায় দ্বেষ, বিদ্বেষ এবং দ্বেষী শব্দগুলোর সঙ্গে এই ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। এখানে দ্বেষ্টি বলতে শুধু সাধারণ ঘৃণা বোঝানো হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে এমন এক মানসিক বিরাগ যার কারণে মানুষ কোনো কর্মকে কঠিন বা অপ্রিয় মনে করে সেটি এড়িয়ে যেতে চায়। জীবনে এমন অনেক কাজ রয়েছে যা আনন্দদায়ক নয়, কিন্তু কর্তব্যের কারণে সেগুলো সম্পন্ন করতে হয়। প্রকৃত ত্যাগী ব্যক্তি কষ্টকর বলে সেই কর্মকে ঘৃণা করেন না।
অকুশলম্ শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং কুশল থেকে। অ একটি নিষেধাত্মক উপসর্গ এবং কুশল শব্দের অর্থ কল্যাণকর, অনুকূল, শুভ, দক্ষ বা সুখকর। তাই অকুশলম্ আক্ষরিকভাবে এমন কিছু বোঝায় যা কুশল নয়। এই শ্লোকের প্রেক্ষাপটে অকুশল কর্ম বলতে এমন কর্মকে বোঝানো হয়েছে যা ব্যক্তির কাছে কষ্টকর, অপ্রিয়, শ্রমসাধ্য বা অনুকূল নয়। তবে একে শুধু খারাপ কর্ম হিসেবে বোঝা উচিত নয়। কোনো কাজ ব্যক্তিগতভাবে কষ্টকর হলেও তা নৈতিকভাবে সঠিক এবং কর্তব্যসঙ্গত হতে পারে। তাই অকুশল কর্মের প্রতি দ্বেষ না থাকার শিক্ষা মূলত প্রতিকূলতার মধ্যেও কর্তব্য পালনের শিক্ষা।
কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে এসেছে। কৃ অর্থ করা, সম্পাদন করা বা কোনো কার্য সম্পন্ন করা। কর্ম অর্থ কাজ, কার্য বা সম্পাদিত ক্রিয়া। ভারতীয় দর্শনে কর্ম শব্দটির অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। এটি শুধু বাহ্যিক কাজ নয়, মানুষের উদ্দেশ্য, আচরণ এবং কর্মফলের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গভীর দার্শনিক ধারণা। গীতার শিক্ষা অনুসারে কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া মুক্তির পথ নয়। বরং কর্মের মধ্যে থেকেই কর্মফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা মুক্তির পথে নিয়ে যায়। এই কারণে গীতার কর্মদর্শন কর্মপরিত্যাগের পরিবর্তে আসক্তিহীন কর্মের ওপর গুরুত্ব দেয়।
এরপর এসেছে কুশলে শব্দটি। কুশল অর্থ শুভ, কল্যাণকর, অনুকূল, সুখকর বা ভালো। কুশলে বলতে এমন কর্মকে বোঝানো হয়েছে যা ব্যক্তির কাছে আনন্দদায়ক বা সুবিধাজনক। সাধারণ মানুষ সুখকর কাজের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়। সে এমন কাজ করতে চায় যেখানে প্রশংসা, সাফল্য, আনন্দ বা লাভ রয়েছে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে ত্যাগী ব্যক্তি কুশল কর্মের প্রতিও নানুষজ্জতে অর্থাৎ অতিরিক্তভাবে আসক্ত হন না।
অনুষজ্জতে শব্দটির মধ্যে সংযুক্ত হয়ে যাওয়া বা কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে থাকার ধারণা রয়েছে। এর সঙ্গে সঞ্জ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে এবং অনু উপসর্গের মাধ্যমে অনুসরণ বা সংযুক্ত থাকার ভাব প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় এর গভীর অর্থ হলো আসক্ত হওয়া। আসক্তি শুধু কোনো কিছু ভালো লাগার নাম নয়। আসক্তি তখন সৃষ্টি হয় যখন মানুষ কোনো বস্তু, কর্ম, সম্পর্ক বা ফলের সঙ্গে নিজের সুখ ও পরিচয়কে এমনভাবে যুক্ত করে ফেলে যে সেটি ছাড়া নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে হয়। তখন মানুষ স্বাধীন থাকে না। সে নিজের আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হয়।
এই কারণে দ্বেষ এবং আসক্তি একই মুদ্রার দুই দিক। আসক্তি বলে আমি এটি চাই এবং দ্বেষ বলে আমি এটি চাই না। উভয়ের কেন্দ্রেই রয়েছে ব্যক্তিগত পছন্দ ও অপছন্দ। ত্যাগী ব্যক্তি এই দুই অবস্থার ঊর্ধ্বে উঠে কর্তব্যকে কেন্দ্র করে জীবন পরিচালনা করেন। তিনি প্রশ্ন করেন না যে কাজটি আমার ভালো লাগছে কি না। তিনি প্রথমে দেখেন কাজটি আমার কর্তব্য কি না এবং ন্যায়সঙ্গত কি না। এই মানসিক পরিবর্তনই গীতার ত্যাগের প্রকৃত অর্থকে প্রকাশ করে।
ত্যাগী শব্দটি এসেছে ত্যাগ থেকে এবং ত্যাগের মূল ধাতু হলো ত্যজ্। ত্যজ্ অর্থ ছেড়ে দেওয়া, পরিত্যাগ করা বা বর্জন করা। কিন্তু গীতার দর্শনে ত্যাগী মানে কাজ ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তি নয়। ত্যাগী সেই ব্যক্তি যিনি কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি, কর্মের প্রতি অহংকার এবং অপ্রিয় কর্মের প্রতি দ্বেষ পরিত্যাগ করেছেন। তিনি কর্ম করেন কিন্তু কর্মের ফলকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন না। তিনি সাফল্য পেলে অহংকারে ভেসে যান না এবং ব্যর্থ হলে ভেঙে পড়েন না। তাঁর কাছে কর্ম কর্তব্য এবং ফল ঈশ্বরের বিধানের অংশ।
সত্ত্বসমাবিষ্ট শব্দটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সত্ত্ব এবং সমাবিষ্ট এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। সত্ত্ব অর্থ অস্তিত্ব, স্বচ্ছতা, পবিত্রতা, স্থিতি ও জ্ঞানময়তা। সাংখ্য দর্শনে সত্ত্ব প্রকৃতির তিন গুণের একটি। অন্য দুটি হলো রজঃ এবং তমঃ। সত্ত্বের বৈশিষ্ট্য হলো জ্ঞান, শান্তি, স্বচ্ছতা এবং সাম্য। সমাবিষ্ট অর্থ সম্পূর্ণভাবে পরিব্যাপ্ত বা প্রতিষ্ঠিত। তাই সত্ত্বসমাবিষ্ট অর্থ এমন ব্যক্তি যার চেতনা সত্ত্বগুণ দ্বারা গভীরভাবে পরিব্যাপ্ত। তাঁর মন অস্থির আকাঙ্ক্ষা ও অজ্ঞানতার দ্বারা পরিচালিত হয় না। তাঁর মধ্যে বিচারবুদ্ধি, শান্তি এবং আত্মসংযম বৃদ্ধি পায়।
মেধাবী শব্দটি মেধা থেকে এসেছে। মেধা অর্থ ধারণক্ষমতা, জ্ঞানগ্রহণের শক্তি, বিচক্ষণতা এবং সূক্ষ্ম বুদ্ধি। সাধারণ অর্থে মেধাবী মানে বুদ্ধিমান। কিন্তু এই শ্লোকে মেধাবী শব্দের অর্থ আরও গভীর। এখানে মেধা শুধু অনেক তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা নয়। প্রকৃত মেধা হলো কোন পরিস্থিতিতে কী কর্তব্য, কোন কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং কোন বিষয় মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে তা উপলব্ধি করার ক্ষমতা। যে ব্যক্তি নিজের পছন্দ ও অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে বিচার করতে পারেন, গীতার অর্থে তিনিই প্রকৃত মেধাবী।
শ্লোকটির শেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ছিন্নসংশয়ঃ। এটি ছিন্ন এবং সংশয় এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ছিন্ন শব্দের সঙ্গে ছিদ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে যার অর্থ কাটা বা বিচ্ছিন্ন করা। সংশয় অর্থ সন্দেহ, দ্বিধা, অনিশ্চয়তা বা সিদ্ধান্তহীনতা। তাই ছিন্নসংশয় অর্থ যার সংশয় ছিন্ন হয়েছে বা যার অন্তরের দ্বিধা দূর হয়েছে। এখানে সংশয়মুক্তি অন্ধ বিশ্বাসের ফল নয়। বরং জ্ঞান, বিচার এবং অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধি করার ফলে যে দৃঢ়তা জন্মায় সেটিই ছিন্নসংশয়ের প্রকৃত অর্থ।
এই শ্লোকের মধ্যে একটি সুন্দর মানসিক ও আধ্যাত্মিক অগ্রগতির ধারা রয়েছে। প্রথমে মানুষকে দ্বেষ থেকে মুক্ত হতে বলা হয়েছে। এরপর তাকে আসক্তি থেকে মুক্ত হতে বলা হয়েছে। এই দ্বেষ ও আসক্তি কমে গেলে মন ধীরে ধীরে শান্ত ও স্বচ্ছ হয়। সেই স্বচ্ছতা সত্ত্বগুণকে শক্তিশালী করে। সত্ত্বের প্রাধান্য মেধাকে পরিশুদ্ধ করে। পরিশুদ্ধ মেধা সত্য ও কর্তব্যকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। আর সেই উপলব্ধির মাধ্যমে সংশয় ধীরে ধীরে দূর হয়ে যায়। অর্থাৎ দ্বেষহীনতা থেকে আসক্তিহীনতা, আসক্তিহীনতা থেকে ত্যাগ, ত্যাগ থেকে চিত্তশুদ্ধি, চিত্তশুদ্ধি থেকে প্রজ্ঞা এবং প্রজ্ঞা থেকে সংশয়মুক্তি আসে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক কর্মযোগের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে। মানুষ কর্ম না করে থাকতে পারে না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই মানুষ কোনো না কোনোভাবে কাজ করছে। তাই কর্ম থেকে সম্পূর্ণভাবে পালিয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। সমস্যাটি কর্মে নয়, কর্মের সঙ্গে মানুষের মানসিক সম্পর্কের মধ্যে। যখন মানুষ কাজের ফলকে নিজের সুখের একমাত্র উৎস মনে করে, তখন কর্ম বন্ধনে পরিণত হয়। আবার যখন কোনো কঠিন কাজকে শুধু কষ্টকর বলে ঘৃণা করে এবং তা থেকে পালিয়ে যায়, তখনও সে নিজের পছন্দ অপছন্দের কাছে পরাধীন হয়ে পড়ে। ত্যাগী ব্যক্তি এই উভয় বন্ধন থেকে মুক্ত থাকেন।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে দেখলে সত্ত্বসমাবিষ্ট ত্যাগী এমন এক চেতনার প্রতীক যেখানে জ্ঞান ও স্বচ্ছতা প্রাধান্য লাভ করেছে। রজোগুণ মানুষকে আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা এবং ফলের প্রতি তীব্র আকর্ষণের দিকে নিয়ে যায়। তমোগুণ মানুষকে অজ্ঞানতা, জড়তা এবং মোহের দিকে নিয়ে যায়। সত্ত্ব মানুষের চিত্তকে স্বচ্ছ করে এবং সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য প্রস্তুত করে। তাই ত্যাগী ব্যক্তির সঙ্গে সত্ত্বের সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ সাধারণত সুখের দিকে এগিয়ে যায় এবং কষ্ট থেকে দূরে সরে যায়। এই স্বাভাবিক প্রবণতা যখন মাত্রাতিরিক্ত হয় তখন মানুষ নিজের স্বাধীনতা হারায়। সে বলে যে আমি শুধু সেই কাজ করব যা আমার ভালো লাগে। আবার যে কাজ কঠিন তাকে সে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ আনন্দদায়ক নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, পেশা এবং নৈতিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে এমন অনেক কর্তব্য রয়েছে যা কখনো কখনো কষ্টকর হলেও পালন করতে হয়। ত্যাগী ব্যক্তি আনন্দ ও কষ্টকে অস্বীকার করেন না। তিনি উভয়কেই গ্রহণ করে নিজের কর্তব্য সম্পন্ন করেন।
এই সত্যকে একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। একজন শিক্ষককে কল্পনা করা যাক। কোনো কোনো ছাত্র অত্যন্ত মেধাবী এবং তাদের পড়ানো আনন্দদায়ক। আবার কোনো কোনো ছাত্র দুর্বল এবং তাদের পড়াতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। একজন সাধারণ শিক্ষক হয়তো মেধাবী ছাত্রদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হবেন এবং দুর্বল ছাত্রদের প্রতি বিরক্ত হবেন। কিন্তু একজন কর্তব্যনিষ্ঠ শিক্ষক উভয়কেই শিক্ষাদানের অধিকারী মনে করেন। তিনি দুর্বল ছাত্রের প্রতি দ্বেষ পোষণ করেন না এবং মেধাবী ছাত্রের প্রশংসার প্রতিও অতিরিক্ত আসক্ত হন না। তাঁর কাছে শিক্ষকতার কর্তব্যই মুখ্য। এই মানসিক অবস্থাই শ্লোকের ত্যাগের একটি বাস্তব উদাহরণ।
জীবনকে একটি সমুদ্রযাত্রার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সমুদ্র কখনো শান্ত থাকে আবার কখনো উত্তাল হয়ে ওঠে। একজন নাবিক যদি শুধু শান্ত সমুদ্র চান এবং ঝড় দেখলেই নৌকা চালানো বন্ধ করে দেন, তবে তিনি প্রকৃত নাবিক নন। প্রকৃত নাবিক সমুদ্রের অবস্থার ওপর নির্ভর করে নিজের দক্ষতা ও কর্তব্য অনুযায়ী পথ নির্ধারণ করেন। একইভাবে জীবনে সুখ ও দুঃখ, লাভ ও ক্ষতি, সাফল্য ও ব্যর্থতা আসতেই পারে। প্রকৃত ত্যাগী ব্যক্তি এসব পরিবর্তনের দ্বারা নিজের কর্তব্যবোধকে পরিবর্তিত হতে দেন না।
এই শ্লোকের একটি বিশেষ সাহিত্যিক সৌন্দর্য হলো এর মধ্যে বিপরীত ধারণার যুগল ব্যবহার। একদিকে রয়েছে অকুশল এবং কুশল। অন্যদিকে রয়েছে দ্বেষ এবং আসক্তি। এই বিপরীত শব্দগুলোর মাধ্যমে মানুষের মন যে দুই প্রান্তের মধ্যে দোলায়িত হয় তা প্রকাশ করা হয়েছে। মানুষ কখনো কোনো কিছুকে অতিরিক্ত ভালোবাসে এবং কখনো কোনো কিছুকে অতিরিক্ত ঘৃণা করে। কৃষ্ণের শিক্ষা হলো এই দোলাচলের বাইরে একটি স্থির অবস্থান তৈরি করা। এই স্থিরতাই ত্যাগীর মানসিক স্বাধীনতা।
এখানে ত্যাগকে বাহ্যিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হিসেবেও দেখা উচিত নয়। কেউ সংসারে থেকেও ত্যাগী হতে পারেন এবং কেউ বাহ্যিকভাবে সবকিছু পরিত্যাগ করেও আসক্ত থাকতে পারেন। প্রকৃত ত্যাগ চেহারা, পোশাক বা বাহ্যিক অবস্থার বিষয় নয়। এটি চেতনার বিষয়। মানুষ যখন নিজের কর্মের ফল, প্রশংসা, সাফল্য এবং সুবিধাকে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে এক করে দেখে না, তখন তার মধ্যে ত্যাগের জন্ম হয়। একইভাবে যখন সে কঠিন কর্মকে কেবল কষ্টকর বলে ঘৃণা করে না, তখনও তার মধ্যে ত্যাগের প্রকাশ ঘটে।
মানবজীবনের জন্য এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। জীবনে সব কাজ আনন্দদায়ক হবে না এবং সব ফল নিজের ইচ্ছামতো হবে না। তাই শুধু আনন্দের জন্য কাজ করলে মানুষ হতাশ হবে এবং শুধু কষ্ট এড়ানোর চেষ্টা করলে মানুষ কর্তব্য থেকে দূরে সরে যাবে। জীবনের পরিণত অবস্থান হলো নিজের কর্তব্যকে গ্রহণ করা এবং ফলের ওঠানামার দ্বারা অন্তরকে অস্থির হতে না দেওয়া। এই অবস্থায় মানুষ কাজ করে কিন্তু কাজের দ্বারা আবদ্ধ হয় না।
এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত সত্যকে একটি বাক্যে প্রকাশ করা যায়। কর্ম করো, কিন্তু কর্মের সুখ ও দুঃখের দ্বারা নিজের পরিচয় নির্ধারণ করো না। যা কর্তব্য তা করো, কিন্তু ফলকে নিজের অহংকারের ভিত্তি করো না। যা কঠিন তাকে ঘৃণা করো না এবং যা আনন্দদায়ক তাকে আঁকড়ে ধরো না। কারণ মানুষ যখন নিজের পছন্দ ও অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে কর্তব্যের পথে স্থির হতে পারে, তখনই তার কর্ম ধীরে ধীরে যোগে পরিণত হয়।
অতএব ন দ্বেষ্ট্যকুশলং কর্ম কুশলে নানুষজ্জতে ত্যাগী সত্ত্বসমাবিষ্টো মেধাবী ছিন্নসংশয়ঃ শ্লোকটি কেবল ত্যাগীর একটি সংজ্ঞা নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতকে শুদ্ধ করার একটি গভীর পথনির্দেশ। দ্বেষ থেকে মুক্ত হওয়া, আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়া, কর্তব্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, চিত্তকে সত্ত্বময় করা, মেধাকে পরিশুদ্ধ করা এবং সংশয়কে অতিক্রম করা এই ধারার মধ্য দিয়েই মানুষ অন্তরের স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যায়। এই শিক্ষার চূড়ান্ত তাৎপর্য হলো বাহ্যিক কর্মকে পরিত্যাগ করা নয়, বরং কর্মের মধ্যেই এমন এক অন্তর্গত স্বাধীনতা অর্জন করা যেখানে মানুষ সুখে উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজেকে হারায় না এবং দুঃখে ভেঙে পড়ে নিজের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয় না। এই অবস্থাই গীতার প্রকৃত ত্যাগ, যেখানে কর্ম থাকে কিন্তু কর্মবন্ধন থাকে না, বুদ্ধি থাকে কিন্তু সংশয় থাকে না এবং জীবন থাকে কিন্তু জীবনের প্রতি অন্ধ আসক্তি থাকে না।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!