সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.১১ — কর্মফল ত্যাগই প্রকৃত ত্যাগ: দেহধারী মানুষের কর্ম ও অনাসক্তির তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণ্যশেষতঃ।যন্ত কর্মফলত্যাগী স ত্যাগীত্যভিধীয়তে।।১১।।
ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণ্যশেষতঃ।
যন্ত কর্মফলত্যাগী স ত্যাগীত্যভিধীয়তে।।১১।।

অনুবাদঃ অবশ্যই দেহধারী জীবের পক্ষে সমস্ত কর্ম পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়, কিন্তু যিনি সমস্ত কর্মফল পরিত্যাগী, তিনিই বাস্তবিক ত্যাগী বলে অভিহিত হন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একাদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ত্যাগের প্রকৃত স্বরূপ অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। শ্লোকটি হলো “ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণ্যশেষতঃ। যন্ত কর্মফলত্যাগী স ত্যাগীত্যভিধীয়তে।। ১৮.১১।। ” এর সহজ অর্থ হলো দেহধারী মানুষের পক্ষে সমস্ত কর্ম সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করেন, তাকেই প্রকৃত ত্যাগী বলা হয়। এই বক্তব্যের মধ্যে গীতার কর্মযোগ, ত্যাগের দর্শন এবং মানুষের অন্তর্গত স্বাধীনতার একটি গভীর সূত্র নিহিত রয়েছে।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো দেহভৃতা। দেহভৃত শব্দটি দেহ এবং ভৃত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। দেহ অর্থ শরীর এবং ভৃত অর্থ যে ধারণ করে বা বহন করে। সুতরাং দেহভৃতা বলতে বোঝানো হয়েছে দেহধারী মানুষকে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বিশেষভাবে দেহধারী মানুষের কথা বলেছেন, কারণ যতক্ষণ মানুষ দেহ ধারণ করে আছে ততক্ষণ তার পক্ষে কোনো না কোনো কর্ম থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। মানুষ শ্বাস নেয়, চিন্তা করে, কথা বলে, চলাফেরা করে, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এবং নিজের জীবনধারণের জন্য নানা কাজ সম্পাদন করে। তাই কর্ম মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো শক্যম্। এই শব্দটি সংস্কৃত শক্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ সক্ষম হওয়া বা কোনো কাজ করার সামর্থ্য থাকা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ন হি, যার অর্থ নিশ্চয়ই নয় বা প্রকৃতপক্ষে নয়। ফলে ন হি দেহভৃতা শক্যম্ বলতে বোঝানো হয়েছে যে দেহধারী মানুষের পক্ষে সমস্ত কর্ম সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা প্রকৃতপক্ষে সম্ভব নয়। এখানে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের কর্মময় অস্তিত্বের একটি বাস্তব সত্য তুলে ধরেছেন। মানুষ চাইলে নির্দিষ্ট কোনো কাজ ছেড়ে দিতে পারে, কোনো পেশা থেকে সরে আসতে পারে কিংবা বাহ্যিকভাবে সংসার থেকে দূরে যেতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ সে দেহধারী ততক্ষণ কর্মের কোনো না কোনো রূপ তার সঙ্গে যুক্ত থাকবেই।

ত্যক্তুং শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতু থেকে। ত্যজ্ ধাতুর অর্থ হলো পরিত্যাগ করা, ছেড়ে দেওয়া বা বর্জন করা। এই ধাতু থেকেই ত্যাগ শব্দের উৎপত্তি। সাধারণ অর্থে ত্যাগ বলতে কোনো বস্তু, সম্পর্ক, সম্পদ, কাজ বা অবস্থাকে ছেড়ে দেওয়াকে বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে ত্যাগ শব্দটি আরও গভীর অর্থ লাভ করেছে। এখানে ত্যাগ মানে কেবল বাহ্যিকভাবে কোনো কিছু পরিত্যাগ করা নয়। বরং মানুষের অন্তরে যে আসক্তি, অধিকারবোধ, অহংকার এবং ফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়, সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই প্রকৃত ত্যাগ।

কর্মাণি শব্দটি কর্ম শব্দের বহুবচন। কর্ম শব্দটির উৎস সংস্কৃত কৃ ধাতু, যার অর্থ করা, সম্পাদন করা বা সৃষ্টি করা। কর্ম অর্থ যা করা হয়। মানুষের জীবনের প্রতিটি সচেতন কাজ কোনো না কোনো অর্থে কর্ম। কর্মের মধ্যে শুধু ধর্মীয় আচার বা সামাজিক দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত নয়। মানুষের চিন্তা, কথা, আচরণ, পেশাগত কাজ, পারিবারিক কর্তব্য এবং সামাজিক দায়িত্বও কর্মের বিস্তৃত ধারণার অন্তর্ভুক্ত। অশেষতঃ শব্দটি বোঝায় সম্পূর্ণভাবে বা কোনো কিছু অবশিষ্ট না রেখে। ফলে কর্মাণি অশেষতঃ ত্যক্তুং অর্থ দাঁড়ায় সমস্ত কর্ম একেবারে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে এমন সম্পূর্ণ কর্মত্যাগ দেহধারী মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

এরপর শ্লোকের কেন্দ্রীয় ধারণা হিসেবে আসে কর্মফলত্যাগী শব্দটি। এটি কর্মফল এবং ত্যাগী শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। কর্মফল অর্থ কর্মের ফল বা কর্মের পরিণাম। ত্যাগী অর্থ যিনি ত্যাগ করেন। তাই কর্মফলত্যাগী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি নিজের কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করেছেন। এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কর্ম ত্যাগ করা এবং কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ কাজ না করেও ফলের চিন্তায় নিমগ্ন থাকতে পারেন। আবার একজন মানুষ নিজের কর্তব্য অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেও ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হয়ে থাকতে পারেন। গীতার দৃষ্টিতে দ্বিতীয় ব্যক্তিই প্রকৃত ত্যাগের পথে রয়েছেন।

সাধারণ মানুষের কাছে ত্যাগ বলতে প্রায়ই সবকিছু ছেড়ে দেওয়াকে বোঝানো হয়। মনে করা হয় সংসার ত্যাগ করা, সম্পদ ত্যাগ করা, পেশা ত্যাগ করা অথবা সামাজিক জীবন থেকে সরে যাওয়াই ত্যাগের চূড়ান্ত রূপ। কিন্তু গীতার এই শ্লোক সেই ধারণাকে অনেক গভীর ও অন্তর্মুখী করে তোলে। বাহ্যিকভাবে কোনো কিছু ছেড়ে দেওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু নিজের কর্মের ফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, অধিকারবোধ এবং অহংকার ত্যাগ করা অনেক বেশি কঠিন। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে সবকিছু ত্যাগ করেও নিজের পরিচয়, সম্মান, প্রশংসা কিংবা আধ্যাত্মিক সাফল্যের প্রতি আসক্ত থাকতে পারেন। তাই প্রকৃত ত্যাগ বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে অন্তরের পরিবর্তনের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।

এই শিক্ষার সঙ্গে কর্মযোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গীতার কর্মযোগ মানুষকে কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে শেখায় না। বরং কর্মের মধ্যেই থেকে কীভাবে আসক্তিমুক্ত হওয়া যায়, সেই পথ দেখায়। মানুষকে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে। কিন্তু কর্তব্য পালন করার সময় তার মন যেন কেবল ফলের প্রত্যাশায় আবদ্ধ না হয়ে পড়ে। কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকবে, কিন্তু ফলের প্রতি দাসত্ব থাকবে না। এই অবস্থায় কর্ম মানুষের বন্ধনের কারণ না হয়ে আত্মশুদ্ধির উপায়ে পরিণত হয়।

কর্ম এবং কর্মফলের পার্থক্যটি বোঝার জন্য কৃষকের উদাহরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন কৃষক জমি প্রস্তুত করেন, বীজ বপন করেন, সেচ দেন এবং ফসলের যত্ন নেন। এগুলো তাঁর কর্ম। কিন্তু বৃষ্টি কখন হবে, প্রাকৃতিক পরিবেশ কেমন থাকবে, রোগবালাই দেখা দেবে কি না কিংবা বাজারে ফসলের দাম কত হবে, এসব বিষয় তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই তাঁর কর্তব্য হলো নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করা। কিন্তু ফলাফলের প্রতিটি বিষয়কে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন মনে করলে তার মনে উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। কর্মফলত্যাগের শিক্ষা তাকে মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের অধিকার কর্মে, কিন্তু সমস্ত ফলাফলের উপর তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।

এই সত্য মানুষের মানসিক জীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন মানুষ নিজের সুখকে সম্পূর্ণভাবে ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে, তখন তার মানসিক শান্তি বাইরের পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একজন ছাত্র যদি মনে করে যে পরীক্ষায় প্রথম না হলে তার জীবন সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তাহলে তার পড়াশোনা জ্ঞান অর্জনের আনন্দের পরিবর্তে ভয় ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সে যদি নিজের মনকে এইভাবে পরিচালিত করে যে তার কর্তব্য হলো আন্তরিকভাবে অধ্যয়ন করা, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া এবং ফলাফলকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা, তাহলে তার মানসিক স্থিতি অনেক বেশি দৃঢ় হতে পারে। এখানে কর্মফলত্যাগ মানে ফলকে অস্বীকার করা নয়, বরং ফলকে নিজের আত্মমূল্যের একমাত্র মাপকাঠি না বানানো।

দার্শনিকভাবে বিচার করলে এই শ্লোক মানুষের কর্তা হওয়ার অহংকারকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। মানুষ প্রায়ই মনে করে যে সবকিছু তার নিজের শক্তি ও নিয়ন্ত্রণের ফল। সে বলে আমি করেছি, আমি অর্জন করেছি, আমি সফল হয়েছি। কিন্তু বাস্তবে মানুষের প্রতিটি কর্মের ফল বহু কারণের সমন্বয়ে তৈরি হয়। তার নিজের প্রচেষ্টার পাশাপাশি সময়, পরিবেশ, অন্য মানুষের সহযোগিতা, সামাজিক পরিস্থিতি এবং অসংখ্য অদৃশ্য কারণ ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই কর্মফলের উপর সম্পূর্ণ অধিকারবোধ আসলে মানুষের সীমাবদ্ধতার প্রতি অজ্ঞতা সৃষ্টি করতে পারে। কর্মফলত্যাগ মানুষকে বিনয়ী করে এবং নিজের কর্তৃত্বের সীমা বুঝতে সাহায্য করে।

ভক্তির দৃষ্টিতে কর্মফলত্যাগের আরেকটি গভীর অর্থ রয়েছে। মানুষ নিজের কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে পারে। সে নিজের কর্তব্যকে সেবা হিসেবে গ্রহণ করে এবং ফলাফলকে ঈশ্বরের হাতে সমর্পণ করে। তখন কর্ম কেবল ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে আত্মনিবেদন। এই মনোভাবের মধ্যে ব্যক্তিগত অহংকার ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয় এবং কর্মের মধ্যে ভক্তির অনুভূতি জন্ম নিতে পারে।

অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ত্যাগ আরও গভীর। মানুষের মধ্যে আমি কর্তা এবং আমি ভোক্তা এই দুটি ধারণা তার কর্মের সঙ্গে অহংকারের বন্ধন সৃষ্টি করে। আমি কাজ করেছি এবং আমিই তার ফল ভোগ করব এই ধারণা যত প্রবল হয়, ততই মানুষ কর্মফলের সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ করে। আত্মজ্ঞান এই অহংবোধকে অতিক্রম করার শিক্ষা দেয়। তখন মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তার প্রকৃত আত্মস্বরূপ কর্মের পরিবর্তনশীল ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই উপলব্ধি কর্মফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্তির পথ তৈরি করে।

সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থেও ত্যাগ একটি গভীর মানবিক প্রতীক। কর্ম এখানে জীবনের দায়িত্বের প্রতীক, কর্মফল মানুষের প্রত্যাশার প্রতীক এবং ত্যাগ অন্তরের স্বাধীনতার প্রতীক। মানুষ জীবন থেকে সব দায়িত্ব সরিয়ে নিলে মুক্ত হয় না। বরং দায়িত্বের মধ্যেই থেকেও যদি সে নিজের অহংকার, লোভ এবং ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি অতিক্রম করতে পারে, তখন তার মধ্যে প্রকৃত স্বাধীনতা জন্ম নেয়। এই কারণে গীতার ত্যাগ জীবনবিমুখতার প্রতীক নয়। এটি জীবনের গভীরে প্রবেশ করে জীবনকে সঠিকভাবে গ্রহণ করার প্রতীক।

একজন শিক্ষক আন্তরিকভাবে শিক্ষা দেন, একজন চিকিৎসক নিষ্ঠার সঙ্গে রোগীর সেবা করেন, একজন কৃষক পরিশ্রম করে জমিতে ফসল ফলান, একজন অভিভাবক সন্তানের কল্যাণের জন্য নিজের কর্তব্য পালন করেন এবং একজন সমাজসেবী মানুষের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁদের প্রত্যেকেই কর্মের মধ্যে রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কর্মের উদ্দেশ্য যদি কেবল ব্যক্তিগত প্রশংসা, অর্থ, ক্ষমতা বা স্বীকৃতি অর্জন না হয়ে কর্তব্যবোধ, সেবা এবং আন্তরিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তাঁদের কর্মের মধ্যে কর্মফলত্যাগের আদর্শ প্রকাশ পেতে পারে।

এই শ্লোকের একটি সুন্দর উপমা হতে পারে একজন তীরন্দাজের উপমা। একজন দক্ষ তীরন্দাজের হাতে ধনুক আছে, তীর আছে এবং লক্ষ্য আছে। তার কর্তব্য হলো নিজের মনকে স্থির করা, সঠিকভাবে ধনুক টানা এবং যথাযথভাবে তীর ছোড়া। কিন্তু তীর ছোড়ার পর তার ফলাফল বহু বাহ্যিক কারণে প্রভাবিত হতে পারে। সে যদি তীর ছোড়ার আগেই ফলাফলের ভয়ে কাঁপতে থাকে, তাহলে তার লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সে যদি নিজের কর্তব্য এবং দক্ষতার উপর সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয়, তাহলে তার কর্ম আরও নিখুঁত হয়। মানুষের জীবনেও একই সত্য প্রযোজ্য। আমাদের কর্তব্য হলো সৎভাবে কাজ করা, কিন্তু ফলাফলের প্রতি এমন আসক্ত হওয়া নয় যাতে সেই আসক্তিই আমাদের কর্মক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।

এই কারণে ত্যাগী হওয়া মানে নিষ্ক্রিয় হওয়া নয়। ত্যাগী ব্যক্তি কর্ম থেকে পালিয়ে যান না। বরং তিনি কর্মের প্রকৃতি বুঝে কর্ম করেন। তিনি জানেন যে জীবন মানেই কর্ম। তিনি জানেন যে দেহধারী অবস্থায় সমস্ত কর্ম সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি কর্মকে অস্বীকার না করে কর্মের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে পরিবর্তন করেন। তিনি কর্ম করেন কিন্তু কর্মফলের অহংকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন না। সাফল্য এলে অহংকারে ভেসে যান না এবং ব্যর্থতা এলে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েন না। তাঁর মন ধীরে ধীরে ফলের পরিবর্তনশীলতার ঊর্ধ্বে উঠে কর্তব্যের স্থিরতার দিকে অগ্রসর হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শিক্ষা আজকের মানুষের জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান জীবনে মানুষ কর্মক্ষেত্রের সাফল্য, সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক অর্জন, প্রশংসা এবং স্বীকৃতির সঙ্গে নিজের আত্মমূল্যকে ক্রমাগত যুক্ত করে ফেলছে। ফলে সাফল্য তার অহংকারের কারণ হচ্ছে এবং ব্যর্থতা তার আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করছে। কর্মফলত্যাগের শিক্ষা এই মানসিক নির্ভরতার পরিবর্তে একটি স্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবোধের দিকে আহ্বান জানায়। নিজের কাজকে গুরুত্ব দিতে হবে, কিন্তু নিজের সমগ্র অস্তিত্বকে কাজের ফলাফলের সঙ্গে এক করে ফেললে চলবে না।

অতএব এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো কর্ম ত্যাগ নয়, কর্মের বন্ধন ত্যাগ। মানুষ দেহধারী অবস্থায় কর্ম থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে পারে না। কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি অন্ধ আকাঙ্ক্ষা, অহংকার এবং অধিকারবোধ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। ত্যাগের প্রকৃত অর্থ তাই বাহ্যিকভাবে সবকিছু ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং অন্তরের আসক্তিকে অতিক্রম করা। যে ব্যক্তি নিজের কর্তব্য পালন করে, কর্মে আন্তরিক থাকে, কিন্তু কর্মফলের দ্বারা নিজের মনকে দাসত্বে আবদ্ধ হতে দেয় না, গীতার ভাষায় সেই প্রকৃত ত্যাগী। এই ত্যাগ মানুষের কর্মকে নিষ্কলুষ করে, মনকে স্থির করে, অহংকারকে ক্ষীণ করে এবং জীবনের প্রতি গভীর স্বাধীনতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে জীবনের সত্যিকারের মুক্তি কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়, বরং কর্মের মধ্যেই আসক্তিমুক্ত চেতনা অর্জনের মধ্যে নিহিত।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি