ভগবদ্গীতা ১৮.১২ — কর্মফলের তিন রূপ ও ত্যাগীর কর্মবন্ধনমুক্তির তত্ত্ব
অনিষ্টমিষ্টং মিশ্রং চ ত্রিবিধং কর্মণঃ ফলম্।
ভবত্যত্যাগিনাং প্রেত্য ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্কচিৎ।।১২।।
অনুবাদঃ যাঁরা কর্মফল ত্যাগ করেননি, তাঁদের পরলোকে অনিষ্ট, ইষ্ট ও মিশ্র-এই তিনি প্রকার কর্মফল ভোগ হয়। কিন্তু সন্ন্যাসীদের কখনও ফলভোগ করতে হয় না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের দ্বাদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কর্মের ফল, কর্মের প্রতি আসক্তি এবং ত্যাগ ও সন্ন্যাসের প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো “অনিষ্টমিষ্টং মিশ্রং চ ত্রিবিধং কর্মণঃ ফলম্। ভবত্যত্যাগিনাং প্রেত্য ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্বচিৎ।” এর সরল অর্থ হলো কর্মের ফল তিন প্রকার। অনিষ্ট, ইষ্ট এবং মিশ্র। যারা কর্মফলের প্রতি আসক্ত এবং ত্যাগের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারেনি, মৃত্যুর পরে তাদের এই তিন প্রকার কর্মফল ভোগ করতে হয়। কিন্তু প্রকৃত সন্ন্যাসী কর্মফলের বন্ধনে আবদ্ধ হন না। এই শ্লোকের মধ্যে শুধু কর্মফলের একটি সাধারণ ব্যাখ্যা নেই, বরং মানুষের কর্মজীবন, মানসিক প্রবণতা, আত্মপরিচয়, আসক্তি এবং মুক্তির পথ সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক শিক্ষা নিহিত রয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অনিষ্ট। সংস্কৃত অনিষ্টম্ শব্দটি অন এবং ইষ্ট এই দুই ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। ইষ্ট শব্দটি সংস্কৃত ইষ্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ চাওয়া, কামনা করা বা আকাঙ্ক্ষা করা। ইষ্ট বলতে বোঝায় যা মানুষ চায়, যা তার কাছে প্রিয় বা কাম্য। তার বিপরীত হলো অনিষ্ট। অর্থাৎ যা মানুষ চায় না, যা অপ্রিয়, অকল্যাণকর বা দুঃখদায়ক। কর্মের ক্ষেত্রে অনিষ্ট ফল বলতে এমন ফলকে বোঝানো হয়েছে যা জীবের কাছে অপ্রিয় অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। অন্যায় কাজের ফলে অনুশোচনা, লোভের ফলে অশান্তি, অহংকারের ফলে পতন অথবা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার ফলে সম্পর্কের বিচ্ছেদ অনিষ্ট ফলের বাস্তব উদাহরণ হতে পারে। অনিষ্ট তাই শুধু বাহ্যিক ক্ষতি নয়। অনেক সময় এমন ফলও অনিষ্ট হতে পারে যা মানুষের অন্তরে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং তাকে নিজের কর্মের প্রকৃত পরিণতির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
এরপর এসেছে ইষ্ট শব্দটি। ইষ্ট অর্থ প্রিয়, কাম্য, আকাঙ্ক্ষিত বা মনোরম। মানুষ সাধারণত যে ফলকে নিজের জন্য সুখকর ও লাভজনক মনে করে, সেটিই ইষ্ট ফল। অর্থ, সম্মান, সাফল্য, প্রশংসা, ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা কাঙ্ক্ষিত কোনো অর্জন ইষ্ট ফলের উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু গীতার শিক্ষা এখানে আরও গভীর। ইষ্ট ফল সুখকর হলেও তার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের জন্য বন্ধনের কারণ হতে পারে। কারণ মানুষ যখন কোনো সুখকর ফল লাভ করে, তখন সেই সুখ পুনরায় পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। আকাঙ্ক্ষা থেকে আসক্তি তৈরি হয়, আসক্তি থেকে পুনরায় কর্মের প্রবণতা সৃষ্টি হয় এবং এইভাবে মানুষ কর্ম ও ফলের এক অবিরাম চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই শুধু অনিষ্ট ফলই নয়, ইষ্ট ফলের প্রতিও আসক্তি মানুষের আধ্যাত্মিক স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
তৃতীয় শব্দ হলো মিশ্র। সংস্কৃত মিশ্র শব্দটি মিশ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মূল ভাব হলো একত্র করা বা মিশিয়ে দেওয়া। মিশ্র অর্থ হলো যেখানে একাধিক উপাদান একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কর্মফলের ক্ষেত্রে মিশ্র বলতে এমন ফল বোঝায় যেখানে সুখ ও দুঃখ উভয়ই উপস্থিত থাকে। বাস্তব জীবনের অধিকাংশ ফলই আসলে মিশ্র প্রকৃতির। একটি মানুষ অর্থ উপার্জন করে নিরাপত্তা পেতে পারে, কিন্তু সেই অর্থ রক্ষার জন্য তাকে উদ্বেগও বহন করতে হয়। একজন মানুষ খ্যাতি অর্জন করলে সম্মান পায়, কিন্তু একই সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কিছু অংশ হারাতে পারে। সন্তান মানুষের জীবনে অপরিসীম আনন্দ নিয়ে আসে, আবার তার সঙ্গে দায়িত্ব, উদ্বেগ ও চিন্তাও আসে। কোনো সাফল্যের মধ্যেও পরবর্তী সাফল্যের চাপ থাকতে পারে। এই কারণেই মিশ্র ফল মানবজীবনের একটি অত্যন্ত বাস্তব প্রতিচ্ছবি। জাগতিক জীবন সাধারণত সম্পূর্ণ সুখ বা সম্পূর্ণ দুঃখের নয়। সুখ ও দুঃখ পরস্পরের সঙ্গে মিশে থেকেই জীবনের অভিজ্ঞতাকে গঠন করে।
এরপর শ্লোকে এসেছে ত্রিবিধং শব্দটি। ত্রি অর্থ তিন এবং বিধ অর্থ প্রকার বা ধরন। সুতরাং ত্রিবিধ অর্থ তিন প্রকার। শ্রীকৃষ্ণ কর্মের ফলকে অনিষ্ট, ইষ্ট এবং মিশ্র এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। এই তিনটি শ্রেণি মানুষের জাগতিক অভিজ্ঞতার একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি করে। মানুষ যে কর্মই করুক না কেন, তার ফল কোনো না কোনোভাবে আনন্দদায়ক, দুঃখদায়ক অথবা আনন্দ ও দুঃখের সংমিশ্রিত রূপে প্রকাশিত হতে পারে। কিন্তু গীতার আলোচনার মূল বিষয় কেবল ফলের এই শ্রেণিবিভাগ নয়। আসল বিষয় হলো মানুষ সেই ফলের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক স্থাপন করছে।
কর্মণঃ শব্দটি এসেছে কর্ম শব্দ থেকে। কর্ম শব্দের মূল সংস্কৃত ধাতু হলো কৃ, যার অর্থ করা, সম্পাদন করা, সৃষ্টি করা বা কোনো কাজ সম্পন্ন করা। এই ধাতু থেকেই কর্ম, কার্য এবং ক্রিয়া প্রভৃতি শব্দের উৎপত্তি। কর্মণঃ অর্থ হলো কর্মের। আর ফলম্ অর্থ হলো ফল বা পরিণতি। ফল শব্দটি এখানে একটি অত্যন্ত গভীর প্রতীক বহন করে। যেমন একটি বীজ থেকে গাছ জন্মায় এবং গাছ থেকে ফল উৎপন্ন হয়, তেমনি মানুষের কর্ম থেকেও তার পরিণতি সৃষ্টি হয়। কর্ম হলো কারণ এবং ফল হলো সেই কারণের পরিণতি। কোনো কর্মের ফল কখনো তৎক্ষণাৎ প্রকাশিত হয়, আবার কখনো দীর্ঘ সময় পরে প্রকাশ পায়। এই কারণে কর্মফলকে শুধু তাৎক্ষণিক লাভ বা ক্ষতির দৃষ্টিতে দেখলে গীতার কর্মদর্শনের গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না।
শ্লোকে ব্যবহৃত ভবতি শব্দটির মূল ধাতু হলো ভূ। ভূ ধাতুর অর্থ হওয়া, উৎপন্ন হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। ভবতি অর্থ হয় বা উৎপন্ন হয়। এর মাধ্যমে কর্ম এবং ফলের মধ্যে একটি কারণ ও পরিণতির সম্পর্ক নির্দেশ করা হয়েছে। মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে জীবনের নানা সম্ভাবনার বীজ বপন করে। চিন্তা, কথা এবং কাজ সবই এক অর্থে কর্মের অন্তর্ভুক্ত। একজন মানুষ যেমন চিন্তা করে, তেমন কথা বলে এবং যেমন কথা বলে তেমন কাজের দিকে অগ্রসর হয়। সেই কাজ আবার তার চরিত্র, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। এই অর্থে কর্মফল কেবল বাইরের কোনো শাস্তি বা পুরস্কার নয়। কর্মের মধ্যেই অনেক সময় তার ফলের বীজ নিহিত থাকে।
এই শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অত্যাগিনাং। এটি অ এবং ত্যাগী এই দুই ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। ত্যাগ শব্দটি সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ত্যজ্ অর্থ ছেড়ে দেওয়া, পরিত্যাগ করা বা দূরে সরিয়ে রাখা। ত্যাগী হলেন যিনি ত্যাগ করেছেন এবং অত্যাগী হলেন যিনি ত্যাগ করেননি। তবে গীতার আলোচনায় ত্যাগ বলতে কেবল কর্ম পরিত্যাগ করা বোঝায় না। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শ্রীকৃষ্ণ কর্ম ছেড়ে দেওয়াকে মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে শিক্ষা দেননি। বরং কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি, ফলের ওপর অহংকেন্দ্রিক অধিকারবোধ এবং নিজের কর্মকে কেবল ব্যক্তিগত লাভের জন্য সম্পাদন করার মানসিকতা ত্যাগ করাকেই প্রকৃত ত্যাগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখিয়েছেন।
মানুষ সাধারণত মনে করে, আমি কাজ করেছি তাই ফলও আমার হওয়া উচিত। এই ভাবনা থেকেই আমি কর্তা এবং আমিই ফলের অধিকারী এই অহংবোধ তৈরি হয়। সাফল্য এলে মানুষ বলে আমি করেছি। ব্যর্থতা এলে সে বলে আমি ব্যর্থ হয়েছি। প্রশংসা পেলে নিজের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হয় এবং সমালোচনা এলে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এভাবে মানুষ নিজের আত্মপরিচয়কে কর্মের ফলের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। গীতার কর্মযোগ এই মানসিক বন্ধন থেকে মুক্ত হতে শিক্ষা দেয়। কর্তব্য পালন করতে হবে, সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু ফলের ওপর সম্পূর্ণ অধিকার নিজের বলে মনে করা যাবে না।
প্রেত্য শব্দটির অর্থ হলো চলে যাওয়ার পরে বা দেহত্যাগের পরে। গীতার কর্মদর্শনের বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে এটি মৃত্যুর পরবর্তী কর্মফলের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে শ্রীকৃষ্ণ কর্মের ফলকে কেবল বর্তমান জীবনের সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। কর্মের প্রভাব দেহের বর্তমান অস্তিত্বের সীমা অতিক্রম করতে পারে এমন একটি আধ্যাত্মিক ধারণার দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন। ভারতীয় দর্শনে কর্ম এবং পুনর্জন্মের ধারণা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বর্তমান কর্ম ভবিষ্যৎ অভিজ্ঞতার কারণ হতে পারে এবং জীবের কর্মসংস্কার তার অস্তিত্বের ধারাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এরপর এসেছে সন্ন্যাসিনাং শব্দটি। সন্ন্যাসী শব্দটি সন্ন্যাস থেকে এসেছে এবং সন্ন্যাসের গভীর অর্থ হলো সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ বা ত্যাগ। এখানে সন্ন্যাসকে শুধু বাহ্যিক পোশাক, সামাজিক পরিচয় বা সংসার পরিত্যাগের মাধ্যমে বোঝা যথেষ্ট নয়। গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত সন্ন্যাস হলো অহংকার, আসক্তি এবং ফলের ওপর ব্যক্তিগত অধিকারবোধ অতিক্রম করা। একজন মানুষ সংসারের মধ্যে থেকেও অন্তরে ত্যাগী হতে পারেন। আবার কেউ বাহ্যিকভাবে সংসার থেকে দূরে থাকলেও যদি তার মনে কামনা, অহংকার এবং ফলের আকাঙ্ক্ষা প্রবল থাকে, তবে তার অন্তরের বন্ধন দূর হয়নি। তাই গীতার সন্ন্যাস মূলত একটি অন্তরের অবস্থা।
ক্বচিৎ শব্দের অর্থ কখনো বা কোনো অবস্থাতেই। ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্বচিৎ এই অংশে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে প্রকৃত সন্ন্যাসীর ক্ষেত্রে কর্মফল আগের মতো বন্ধন সৃষ্টি করে না। কারণ তিনি কর্মকে নিজের অহংকারের কেন্দ্র করে তোলেন না। তিনি কর্তব্য পালন করেন কিন্তু ফলকে নিজের ব্যক্তিগত অস্তিত্বের মাপকাঠি বানান না। তিনি সাফল্যে অহংকারে ভেসে যান না এবং ব্যর্থতায় নিজের আত্মমূল্য হারান না। তার কাছে কর্ম একটি কর্তব্য এবং ফল একটি সমর্পিত বিষয়।
এই শিক্ষা আধুনিক মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ যখন নিজের সুখকে সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক ফলের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, তখন তার মানসিক স্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে সে নিজেকে যোগ্য মনে করে এবং ব্যর্থ হলে নিজেকে অযোগ্য মনে করে। চাকরিতে পদোন্নতি পেলে নিজেকে সফল ভাবে এবং পদোন্নতি না হলে নিজের মূল্য নিয়ে সন্দেহ করে। অন্যের প্রশংসা তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সমালোচনা তার আত্মসম্মানকে ভেঙে দেয়। এই অবস্থায় মানুষ নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রক না হয়ে ফলের প্রতিক্রিয়ার দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে। কর্মযোগ তাকে শেখায় যে মানুষের হাতে রয়েছে তার প্রচেষ্টা, মনোভাব এবং কর্তব্য পালন। কিন্তু সমস্ত বাহ্যিক ফল তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। এই উপলব্ধি মানুষকে গভীর মানসিক স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
একজন কৃষকের জীবন এই শিক্ষার সুন্দর উদাহরণ। কৃষক জমি প্রস্তুত করেন, বীজ বপন করেন, জল দেন এবং আগাছা পরিষ্কার করেন। কিন্তু বৃষ্টি কখন হবে, প্রকৃতি কেমন আচরণ করবে এবং ফসলের ফলন কতটা হবে, তার সবকিছু তিনি নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। তবুও তিনি কৃষিকর্ম বন্ধ করেন না। তিনি নিজের কর্তব্য করেন এবং প্রকৃতির বৃহত্তর নিয়মকে মেনে নেন। কর্মযোগী মানুষের অবস্থাও অনেকটা এমন। তার হাতে রয়েছে কর্ম, কিন্তু ফলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই। তাই সে কর্মে আন্তরিক থাকে এবং ফলের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখার চেষ্টা করে।
এই শ্লোকের মধ্যে একটি গভীর প্রতীকও রয়েছে। কর্মকে যদি বীজ ধরা হয়, তবে কর্মফল হলো সেই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া ফল। মানুষের প্রতিটি চিন্তা, কথা ও কাজ যেন জীবনের মাটিতে কোনো না কোনো বীজ বপন করে। রাগের বীজ সম্পর্কের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। করুণার বীজ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করতে পারে। লোভের বীজ অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। সত্যের বীজ বিশ্বাস তৈরি করতে পারে। এই দৃষ্টিতে কর্মফল কেবল বাইরের কোনো রহস্যময় শক্তি নয়। অনেক সময় আমাদের কর্মের প্রকৃতিই তার ফলের ভিত তৈরি করে।
এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সুখকর ফলও বন্ধনের কারণ হতে পারে। আমরা সাধারণত দুঃখকে বন্ধন এবং সুখকে মুক্তি বলে মনে করি। কিন্তু গীতা আরও সূক্ষ্ম সত্যের দিকে নিয়ে যায়। দুঃখের প্রতি যেমন বিরাগ জন্মায়, তেমনি সুখের প্রতি আসক্তিও জন্মায়। মানুষ যখন কোনো সুখকর অভিজ্ঞতা লাভ করে, তখন সেটিকে ধরে রাখতে চায়। হারানোর ভয় জন্মায়। আবার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এই আকাঙ্ক্ষা তাকে পুনরায় কর্মে চালিত করে। ফলে সুখও আসক্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই মুক্তির জন্য শুধু দুঃখকে অতিক্রম করাই যথেষ্ট নয়। সুখের প্রতিও সমতা অর্জন করতে হয়।
এই কারণেই মিশ্র ফলের ধারণাটি এত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবন সম্পূর্ণ সুখের নয় এবং সম্পূর্ণ দুঃখেরও নয়। সুখ ও দুঃখ পাশাপাশি চলতে থাকে। সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব আসে। সম্পদের সঙ্গে নিরাপত্তার পাশাপাশি চিন্তাও আসে। ভালোবাসার সঙ্গে বিচ্ছেদের আশঙ্কা থাকে। ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব থাকে। খ্যাতির সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তাই জাগতিক জীবনের অধিকাংশ ফলই মিশ্র। এই সত্য উপলব্ধি করলে মানুষ জীবনের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতাগুলোর প্রতি আরও সমতা অর্জন করতে পারে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোককে আরও গভীরভাবে দেখা যায়। মানুষ যখন নিজেকে কর্তা এবং ভোক্তা হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন কর্মফল তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। আমি করলাম এবং আমিই ভোগ করব এই দ্বৈত অহংবোধ কর্মবন্ধনের একটি প্রধান ভিত্তি। আত্মজ্ঞান মানুষকে এই সীমিত পরিচয়ের বাইরে নিয়ে যেতে চায়। তখন মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে তার প্রকৃত আত্মস্বরূপ কর্মের ফলের পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার চেয়ে গভীর। কর্ম চলতে পারে, কিন্তু আত্মস্বরূপকে কর্মফলের ওঠানামার সঙ্গে এক করে দেখতে হয় না।
ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোকের অর্থ আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। ভক্ত নিজের কর্মের ফল ঈশ্বরকে সমর্পণ করেন। তিনি কাজ করেন ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে এবং ফলকে নিজের অহংকারের সম্পত্তি মনে করেন না। তখন কর্ম কেবল জীবিকা বা ব্যক্তিগত লাভের উপায় থাকে না। কর্ম উপাসনার রূপ নিতে পারে। একজন শিক্ষক যখন শিক্ষাদানকে সেবা মনে করেন, একজন চিকিৎসক যখন চিকিৎসাকে মানবসেবার অংশ মনে করেন, একজন কৃষক যখন নিজের শ্রমকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং একজন গৃহস্থ যখন পরিবারের প্রতি দায়িত্বকে ভালোবাসা ও সেবার রূপ দেন, তখন কর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ পরিবর্তিত হয়।
সুতরাং এই শ্লোকের মূল শিক্ষা কর্মবিমুখতা নয়। এটি কর্মের প্রতি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষা দেয়। মানুষকে কাজ করতে হবে, কর্তব্য পালন করতে হবে, নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করতে হবে। কিন্তু ফলকে নিজের অহংকারের মাপকাঠি বানানো যাবে না। সাফল্য এলে অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা আসবে। ব্যর্থতা এলে আত্মধ্বংস নয়, শিক্ষা গ্রহণের মানসিকতা আসবে। প্রশংসা এলে আসক্তি নয়, বিনয় আসবে। সমালোচনা এলে ভেঙে পড়া নয়, আত্মপর্যালোচনা আসবে। এই অবস্থাই কর্মকে ধীরে ধীরে যোগে পরিণত করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক তাই মানুষের কর্মজীবনের পাশাপাশি তার অন্তর্জগতেরও একটি গভীর শিক্ষা। অনিষ্ট, ইষ্ট এবং মিশ্র এই তিন ধরনের ফল জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন ফল ভালো না খারাপ তা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো মানুষ সেই ফলের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক স্থাপন করছে। ফলকে আঁকড়ে ধরলে সুখও বন্ধন হয়ে ওঠে এবং ফল থেকে পালাতে চাইলে দুঃখও আরও গভীর হয়ে ওঠে। কিন্তু কর্তব্যের সঙ্গে নিষ্ঠা এবং ফলের সঙ্গে সমতা স্থাপন করতে পারলে মানুষ ধীরে ধীরে কর্মের বন্ধন অতিক্রম করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত সত্য হলো কর্ম মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু কর্মফলের প্রতি অহংকেন্দ্রিক আসক্তি মানুষের বন্ধনের মূল কারণগুলোর একটি। অনিষ্ট ফল আমাদের কর্মের নেতিবাচক পরিণতি দেখায়, ইষ্ট ফল আমাদের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি প্রকাশ করে এবং মিশ্র ফল আমাদের জাগতিক জীবনের বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। ত্যাগ আমাদের শেখায় ফলের ওপর অন্ধ অধিকারবোধ ছেড়ে দিতে এবং সন্ন্যাস আমাদের নিয়ে যায় সম্পূর্ণ সমর্পণের দিকে। তাই প্রকৃত মুক্তি কর্ম ত্যাগে নয়, কর্মের মধ্যে থেকেও আসক্তিকে অতিক্রম করার মধ্যে। মানুষ যখন নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালন করে, ফলকে নিজের অহংকারের সম্পত্তি মনে করে না এবং কর্মকে উচ্চতর সত্যের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করতে শেখে, তখন তার কর্ম আর কেবল বন্ধনের কারণ থাকে না। কর্ম তখন আত্মশুদ্ধির পথ হয়ে ওঠে এবং জীবনের প্রতিটি কাজ ধীরে ধীরে মুক্তির সাধনায় পরিণত হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!