ভগবদ্গীতা ১৮.১৪ — কর্মের পাঁচ কারণ: অধিষ্ঠান, কর্তা, করণ, চেষ্টা ও দৈবের গভীর তত্ত্ব
অধিষ্ঠানং তথা কর্তা করণং চ পৃথগবিধম্।
বিবিধাশ্চ পৃথক্ চেষ্টা দৈবং চৈবাত্র পঞ্চমম্।।১৪।।
অনুবাদঃ অধিষ্ঠান অর্থাৎ দেহ, কর্তা, নানা প্রকার কারণ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহ, বিবিধ প্রচেষ্টা ও দৈব অর্থাৎ পরমাত্মা এই পাঁচটি হচ্ছে কারণ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের চতুর্দশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কর্ম সংঘটনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের কথা বলেছেন। শ্লোকটি হলো
এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের কর্মজীবন, কর্তৃত্ববোধ, আত্মপরিচয়, প্রচেষ্টা, উপকরণ এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের অতীত বৃহত্তর শক্তি সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে। সাধারণভাবে মানুষ কোনো একটি কাজ সম্পন্ন হলে বলে আমি কাজটি করেছি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এই সরল ধারণাটিকে আরও গভীরভাবে বিচার করতে শেখাচ্ছেন। তিনি দেখাচ্ছেন যে কোনো কর্মের প্রকাশ কেবল একজন ব্যক্তির ইচ্ছা বা প্রচেষ্টার ফল নয়। এর পেছনে থাকে কর্মের ক্ষেত্র, কর্মকারী, কর্মসাধনের উপকরণ, বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের অতীত দৈব উপাদান। এই পাঁচটি কারণকে উপলব্ধি করতে পারলে মানুষের মধ্যে অহংকার কমে এবং কর্ম সম্পর্কে একটি অধিক বাস্তব ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নেয়।
শ্লোকের প্রথম শব্দ হলো অধিষ্ঠানং। অধিষ্ঠান শব্দটি সংস্কৃত অধি উপসর্গ এবং স্থা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। স্থা ধাতুর মূল অর্থ হলো দাঁড়ানো, অবস্থান করা বা স্থিত হওয়া। অধি অর্থ কোনো কিছুর উপর বা কোনো কিছুকে আশ্রয় করে। সেই অর্থে অধিষ্ঠান বলতে বোঝায় এমন একটি ভিত্তি বা ক্ষেত্র যার উপর কোনো কার্যকলাপ প্রতিষ্ঠিত হয়। গীতার এই প্রসঙ্গে অধিষ্ঠান প্রধানত দেহকে বোঝায়। মানুষের সমস্ত পার্থিব কর্ম দেহকে আশ্রয় করেই প্রকাশিত হয়। মানুষ চিন্তা করে, কথা বলে, চলাফেরা করে, কাজ করে এবং বিভিন্ন কর্ম সম্পাদন করে দেহ ও তার সঙ্গে যুক্ত মানসিক ও ইন্দ্রিয়গত ব্যবস্থার মাধ্যমে। তাই দেহকে কর্মের ক্ষেত্র বলা যায়। যেমন একজন অভিনেতার অভিনয়ের জন্য একটি মঞ্চের প্রয়োজন হয়, তেমনি জীবনের কর্ম প্রকাশের জন্য দেহ একটি মঞ্চের মতো কাজ করে। এই কারণে অধিষ্ঠান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে কোনো কর্মই শূন্যের মধ্যে ঘটে না। প্রত্যেক কর্মের একটি ক্ষেত্র ও ভিত্তি থাকে।
এরপর এসেছে কর্তা শব্দটি। কর্তা শব্দের মূল সংস্কৃত ধাতু হলো কৃ, যার অর্থ করা, সম্পাদন করা বা সৃষ্টি করা। যে ব্যক্তি কোনো কাজ করে তাকে বলা হয় কর্তা। এখানে কর্তা বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যার মাধ্যমে কর্মের সচেতন উদ্যোগ প্রকাশ পায়। মানুষ তার ইচ্ছা, বুদ্ধি, সংকল্প ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কাজের দিকে এগিয়ে যায়। তাই মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগকে অস্বীকার করা হয়নি। বরং তাকে কর্মপ্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই গীতার সূক্ষ্ম শিক্ষা শুরু হয়। কর্তা থাকা এবং নিজেকে সমস্ত কর্মের একমাত্র কর্তা মনে করা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ বাস্তবে কোনো কাজ করতে পারেন, কিন্তু সেই কাজের সম্পূর্ণ কারণ তিনি একা নন। এই পার্থক্যটি উপলব্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের মধ্যে যে আমি করেছি বা আমিই করেছি ধরনের বোধ জন্মায়, সেখান থেকেই অনেক সময় অহংকারের সৃষ্টি হয়।
কর্তার পরে এসেছে করণং। করণ শব্দটিও কৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ হলো যার দ্বারা কোনো কাজ সম্পাদিত হয়। অর্থাৎ কর্তা হলো যে কাজ করে এবং করণ হলো যে উপায় বা মাধ্যমের সাহায্যে কাজটি সম্পন্ন হয়। মানুষের দেহ, ইন্দ্রিয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং বিভিন্ন বাহ্যিক উপকরণ কর্মসাধনের ক্ষেত্রে করণ হিসেবে কাজ করে। একজন লেখক বই লেখেন। এখানে লেখক কর্তা হলেও তার হাত, চোখ, মস্তিষ্ক, কলম বা কম্পিউটার সবই কর্মসম্পাদনের বিভিন্ন মাধ্যম। একজন কৃষক জমিতে চাষ করেন। তার নিজের শরীরের পাশাপাশি লাঙল, যন্ত্রপাতি, জমি, পানি এবং অন্যান্য উপকরণও তার কর্মের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে করণ শব্দটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে কোনো কর্ম কেবল ইচ্ছার দ্বারা সম্পন্ন হয় না। ইচ্ছাকে বাস্তব কর্মে রূপ দিতে উপযুক্ত মাধ্যমের প্রয়োজন হয়।
এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে পৃথগ্বিধম্। পৃথক অর্থ আলাদা এবং বিধ অর্থ প্রকার বা ধরন। পৃথগ্বিধম্ অর্থ বিভিন্ন প্রকারের বা পৃথক পৃথক ধরনের। এখানে করণ যে একটিমাত্র উপকরণ নয় তা স্পষ্ট করা হয়েছে। মানুষের কর্মজগতে অসংখ্য উপকরণ ও ক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করে। চোখ দেখা কাজে সাহায্য করে, কান শোনার কাজে সাহায্য করে, হাত বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করে, বাকশক্তি ভাব প্রকাশ করে এবং মন ও বুদ্ধি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে। বাহ্যিক জগতেও বিভিন্ন ধরনের উপকরণ কর্মকে সহজ ও কার্যকর করে। এই কারণে কর্ম একটি বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া। একটি কাজের পেছনে একাধিক উপাদান সক্রিয় থাকে।
এরপর এসেছে বিবিধাশ্চ পৃথক্ চেষ্টা। চেষ্টা শব্দটি কর্মপ্রবণতা, উদ্যোগ, প্রয়াস ও কার্যকলাপের ধারণা প্রকাশ করে। কোনো একটি বড় কাজকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তার মধ্যে বহু ছোট ছোট কাজ ও প্রচেষ্টা যুক্ত থাকে। একটি বাড়ি নির্মাণের কথা ভাবলে প্রথমে পরিকল্পনা করতে হয়, তারপর জমি প্রস্তুত করতে হয়, নকশা করতে হয়, উপকরণ সংগ্রহ করতে হয়, শ্রম দিতে হয় এবং ধাপে ধাপে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে হয়। একইভাবে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে পড়াশোনা, অনুশীলন, স্মরণ, চিন্তা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিশ্রমের মতো অসংখ্য পৃথক চেষ্টা থাকে। তাই শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য হলো কর্মের পেছনে কেবল একটি সাধারণ চেষ্টা থাকে না। বিভিন্ন স্তরে নানা ধরনের প্রচেষ্টা কাজ করে।
এই অংশটি মানুষের জন্য একটি বিশেষ শিক্ষা বহন করে। অনেক সময় মানুষ কোনো সাফল্যকে একটি মুহূর্তের ঘটনা হিসেবে দেখে। কিন্তু বাস্তবে সাফল্যের পেছনে দীর্ঘদিনের অসংখ্য ছোট প্রচেষ্টা কাজ করে। একটি বৃক্ষের ফল দেখে যেমন কেবল ফলটিকে দেখা যায়, কিন্তু তার পেছনে থাকা বীজ, মাটি, পানি, আলো, সময় এবং পরিচর্যার দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি চোখে পড়ে না, তেমনি একটি কর্মের দৃশ্যমান ফলের পেছনে থাকা অসংখ্য কারণও মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকে। গীতা সেই অদৃশ্য কারণগুলোকে চিনতে শেখায়।
সবশেষে এসেছে দৈবং শব্দটি। এটি দেব শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সাধারণভাবে দেবীয়, ঈশ্বরীয় বা মানুষের নিয়ন্ত্রণের অতীত কোনো বৃহত্তর শক্তির ধারণা প্রকাশ করে। দৈবকে কেবল ভাগ্য বলে অনুবাদ করলে এর অর্থ কিছুটা সংকুচিত হয়ে যায়। দৈব বলতে এমন সব কারণকে বোঝানো যেতে পারে যা মানুষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকেও কর্মের ফলকে প্রভাবিত করে। প্রকৃতির নিয়ম, সময়, পরিস্থিতি, অদৃশ্য কার্যকারণ, পূর্বকর্মের ফল অথবা ঈশ্বরীয় বিধান বিভিন্ন দার্শনিক ব্যাখ্যায় দৈবের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মানুষের সমস্ত পরিকল্পনা সঠিক হলেও সব সময় প্রত্যাশিত ফল আসে না। আবার কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি কোনো কাজকে সহজ করে দেয়। এই অনিশ্চিত ও বৃহত্তর কার্যকারণকে দৈবের ধারণার মাধ্যমে বোঝা যায়।
তবে দৈবের উপস্থিতি মানুষের প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করে না। বরং শ্লোকটি স্পষ্টভাবে চেষ্টা বা প্রয়াসকে কর্মের একটি কারণ হিসেবে স্বীকার করেছে। তাই গীতার শিক্ষা কোনো নিষ্ক্রিয় ভাগ্যবাদ নয়। যদি সবকিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে মানুষ নিজের কর্তব্য ও প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করে, তাহলে সে শ্লোকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অস্বীকার করে। গীতার দৃষ্টিতে মানুষকে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে, নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে এবং নিজের ক্ষমতা ও উপকরণকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে বুঝতে হবে যে কর্মের ফলের উপর মানুষের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। এই উপলব্ধিই কর্মযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো মানুষের কর্তৃত্ববোধের সীমা উপলব্ধি করা। মানুষ কর্মের ক্ষেত্রে সক্রিয় হলেও কর্মের একমাত্র কারণ নয়। দেহ তাকে কর্মের ক্ষেত্র দেয়, করণ তাকে কর্মের উপায় দেয়, কর্তা তাকে সচেতন উদ্যোগ দেয়, চেষ্টা কর্মকে গতিশীল করে এবং দৈব মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বৃহত্তর কার্যকারণকে নির্দেশ করে। ফলে মানুষ যখন বলে আমি একাই সব করেছি, তখন সে বাস্তবতার একটি অংশকে দেখছে এবং অন্য অংশগুলোকে অদৃশ্য করে দিচ্ছে। এই কারণে শ্লোকটি অহংকারের বিরুদ্ধে একটি গভীর দার্শনিক শিক্ষা প্রদান করে।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই বক্তব্য আরও গভীর হয়। অদ্বৈত মতে আত্মা তার প্রকৃত স্বরূপে অকর্তা। কর্ম সংঘটিত হয় দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি এবং প্রকৃতির স্তরে। কিন্তু অজ্ঞানের কারণে মানুষ আত্মার সঙ্গে দেহ ও মনের পরিচয় এক করে ফেলে এবং তখন মনে করে আমিই কর্তা। এই কর্তার ধারণা থেকেই কর্মফল ভোগের বন্ধন তৈরি হয়। যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে দেহ ও মন কর্ম করছে এবং আত্মা সেই সমস্ত কার্যকলাপের সাক্ষী চৈতন্য, তখন তার মধ্যে একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি জন্ম নেয়। সে কর্ম থেকে পালায় না, কিন্তু কর্মের অহংকার থেকেও মুক্ত হতে শেখে।
ভক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দৈবের অর্থ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ নিজের শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করলেও তার জীবন, পরিবেশ, সুযোগ এবং ফলাফল সম্পূর্ণভাবে তার হাতে থাকে না। এই উপলব্ধি মানুষকে ঈশ্বরের প্রতি নির্ভরতা ও কৃতজ্ঞতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তখন মানুষ সাফল্যের জন্য অহংকার না করে কৃতজ্ঞ হয় এবং ব্যর্থতার সময় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে না পড়ে নিজের কর্তব্য ও প্রচেষ্টার দিকে ফিরে আসে। এইভাবে দৈবের ধারণা মানুষের মধ্যে বিনয়, বিশ্বাস এবং সমত্বের জন্ম দিতে পারে।
মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সাধারণত সাফল্যের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দিতে চায় এবং ব্যর্থতার জন্য কখনো নিজেকেই সম্পূর্ণ দোষী মনে করে। কিন্তু পাঁচটি কারণের ধারণা এই দুই চরম অবস্থাকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে সাহায্য করে। সাফল্যের সময় মানুষ বুঝতে পারে যে তার নিজের প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও বহু কারণ তার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আবার ব্যর্থতার সময় সে বুঝতে পারে যে নিজের যথাসাধ্য চেষ্টা করা তার দায়িত্ব হলেও সব পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এই উপলব্ধি আত্মগ্লানি ও অহংকার উভয়কেই কমাতে পারে।
শ্লোকটির একটি সুন্দর প্রতীকী ব্যাখ্যাও করা যায়। অধিষ্ঠান হলো জীবনের মঞ্চ, কর্তা হলো সেই মঞ্চের অভিনেতা, করণ হলো অভিনয়ের উপকরণ, চেষ্টা হলো অভিনয়ের কার্যকলাপ এবং দৈব হলো এমন বৃহত্তর পরিস্থিতি যা নাটকের সম্পূর্ণ পরিণতিকে প্রভাবিত করে। একজন অভিনেতা নিজের চরিত্রের সংলাপ ও অভিনয় যথাসাধ্য ভালোভাবে করতে পারেন, কিন্তু পুরো নাটকের পরিবেশ, অন্য অভিনেতাদের ভূমিকা এবং শেষ পরিণতি তার একার হাতে থাকে না। মানবজীবনও অনেকটা তেমন। আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করি, কিন্তু সমগ্র জীবনের সমস্ত কারণকে একা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
এই শ্লোকের সামাজিক তাৎপর্যও গভীর। একজন মানুষের সাফল্যের পেছনে শুধু তার নিজের শ্রম থাকে না। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ, পূর্ববর্তী প্রজন্ম, প্রকৃতি, প্রযুক্তি, সুযোগ এবং অসংখ্য মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান তার জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই এই শ্লোক মানুষকে কৃতজ্ঞ হতে শেখায়। নিজের প্রচেষ্টাকে ছোট না করেও অন্যের অবদানকে স্বীকার করা যায়। প্রকৃত বিনয় হলো নিজের শক্তিকে অস্বীকার করা নয়, বরং নিজের শক্তির সঙ্গে অন্য সব কারণের সম্পর্ককে উপলব্ধি করা।
বাস্তব জীবনে একজন কৃষকের উদাহরণ এই সত্যকে খুব সহজে বোঝায়। কৃষক জমি প্রস্তুত করেন, বীজ বপন করেন, পানি দেন এবং পরিশ্রম করেন। তিনি অবশ্যই কর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্তা। কিন্তু বীজের অঙ্কুরোদ্গম, সূর্যের আলো, বৃষ্টির নিয়ম, মাটির উর্বরতা এবং প্রকৃতির অসংখ্য প্রক্রিয়া তার একার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই তিনি বলতে পারেন যে তিনি চাষ করেছেন, কিন্তু তিনি একা সমস্ত ফসলের সৃষ্টিকর্তা নন। এই উপলব্ধি কর্মের মধ্যে বিনয় ও কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি করে।
একইভাবে একজন লেখক একটি বই রচনা করলে তার মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার শিক্ষা, ভাষা, পূর্ববর্তী সাহিত্য, শিক্ষক, পাঠক, প্রযুক্তি এবং প্রকাশনার সুযোগও তার কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাই লেখকের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা যেমন সত্য, তেমনি তার চারপাশের বৃহত্তর কার্যকারণও সত্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তির কৃতিত্বকে অস্বীকার করে না, বরং তাকে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার মধ্যে স্থাপন করে।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের কর্তব্য থেকে পিছিয়ে না গিয়ে নিজের কর্তৃত্বের সীমা উপলব্ধি করতে হবে। কর্মের ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা বাস্তব এবং তার চেষ্টা অপরিহার্য। কিন্তু কর্মের ফল সম্পূর্ণভাবে তার হাতে নয়। দেহ কর্মের ক্ষেত্র, কর্তা কর্মের সচেতন কার্যকারী, করণ কর্মের উপায়, পৃথক চেষ্টা কর্মের গতিশীল শক্তি এবং দৈব মানুষের নিয়ন্ত্রণের অতীত বৃহত্তর কার্যকারণ। এই পাঁচটি কারণকে উপলব্ধি করলে মানুষ সাফল্যে অহংকারী হয় না, ব্যর্থতায় অকারণে ভেঙে পড়ে না এবং নিজের কর্তব্য থেকে পালিয়ে যায় না।
অতএব অধিষ্ঠানং তথা কর্তা করণং চ পৃথগ্বিধম্ বিবিধাশ্চ পৃথক্ চেষ্টা দৈবং চৈবাত্র পঞ্চমম্ শ্লোকটি কেবল কর্মের পাঁচটি কারণের একটি তালিকা নয়। এটি মানুষের আত্মপরিচয় ও কর্তৃত্ববোধকে পুনর্বিবেচনা করার একটি গভীর দার্শনিক আহ্বান। এর শিক্ষা হলো নিজের সাধ্য অনুযায়ী আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা, কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা, নিজের দায়িত্ব পালন করা এবং একই সঙ্গে মনে রাখা যে কোনো কর্মই সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টার ফল নয়। মানুষ কর্ম করে, কিন্তু কর্মের সমগ্র জগত তার একার সৃষ্টি নয়। এই সত্য উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে বিনয়ে, আত্মগ্লানি থেকে সমত্বে এবং অন্ধ কর্তৃত্ববোধ থেকে জ্ঞান ও আত্মসচেতনতার দিকে নিয়ে যায়। কর্মের মধ্যে থেকেই অহংকারমুক্ত হওয়া এবং প্রচেষ্টার মধ্যেই বৃহত্তর বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা এই শ্লোকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!