ভগবদ্গীতা ১৮.১৫ — শরীর, বাক্য ও মনের কর্ম এবং কর্মের পেছনে পাঁচ কারণের তত্ত্ব
শরীরবাঙ্মনোভির্যৎ কর্ম প্রারভতে নরঃ।
ন্যায্যং বা বিপরীতং বা পঞ্চৈতে তস্য হেতবঃ।।১৫।।
অনুবাদঃ শরীর, বাক্য ও মনের দ্বারা মানুষ যে কর্ম আরম্ভ করে, তা ন্যায্যই হোক অথবা অন্যায্যই হোক, এই পাঁচটি তার কারণ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানবকর্মের প্রকৃতি এবং কর্মের অন্তর্নিহিত কারণ সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো শরীরবাঙ্মনোভির্যৎ কর্ম প্রারভতে নরঃ। ন্যায্যং বা বিপরীতং বা পঞ্চৈতে তস্য হেতবঃ।। এর সরল অর্থ হলো মানুষ শরীর বাক্ ও মন দ্বারা যে কর্ম আরম্ভ করে তা ন্যায়সংগত হোক অথবা অন্যায় হোক সেই কর্মের পেছনে পাঁচটি কারণ কাজ করে। এই ছোট্ট শ্লোকের মধ্যে মানুষের কর্মজীবন নৈতিকতা কর্তৃত্ববোধ অহংকার স্বাধীনতা এবং আধ্যাত্মিকতার একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। মানুষ সাধারণত কোনো কাজ করার পরে বলে আমি কাজটি করেছি। কিন্তু গীতা আমাদের একটু গভীরভাবে দেখতে শেখায় এবং প্রশ্ন করতে বলে যে একটি কাজ কি সত্যিই একজন মানুষের একক প্রচেষ্টার ফল। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শ্রীকৃষ্ণ কর্মের বহুমাত্রিক কারণের কথা বলেছেন।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো শরীর। সংস্কৃত শরীর শব্দটি মানুষের দেহকে নির্দেশ করে। মানুষের পার্থিব কর্মের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো এই শরীর। আমরা হাত দিয়ে কাজ করি পা দিয়ে চলি চোখ দিয়ে দেখি জিহ্বা দিয়ে কথা বলি এবং বিভিন্ন অঙ্গের সাহায্যে পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি। তাই শরীর শুধু একটি জৈবিক কাঠামো নয় বরং কর্মপ্রকাশের একটি প্রধান মাধ্যম। মানুষের চিন্তা যতই মহৎ হোক শরীরের মাধ্যমে তার বাস্তব প্রকাশ ঘটে। একজন মানুষের মনে যদি দয়ার অনুভূতি জন্মায় তবে সে হাত বাড়িয়ে সাহায্য করতে পারে। আবার মনে যদি ক্রোধ জন্মায় তবে সেই ক্রোধ শরীরের আচরণে প্রকাশ পেতে পারে। এই কারণে শরীর মানুষের অন্তর্জগতকে বাহ্যিক জগতে প্রকাশ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এরপর এসেছে বাক্ শব্দটি। বাক্ অর্থ কথা ভাষা বা উচ্চারিত শব্দ। সংস্কৃত বাক্ শব্দের সঙ্গে কথা বলা এবং প্রকাশ করার ধারণা গভীরভাবে যুক্ত। মানুষ শুধু শরীর দিয়ে কর্ম করে না। কথার মাধ্যমেও মানুষ অসংখ্য কর্ম সম্পন্ন করে। একটি স্নেহপূর্ণ বাক্য মানুষের মনে সাহস সৃষ্টি করতে পারে আবার একটি কঠোর বাক্য মানুষের হৃদয়ে গভীর আঘাত সৃষ্টি করতে পারে। একটি সত্য কথা সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে আবার একটি মিথ্যা কথা বহু মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাক্যকে শুধু শব্দের সমষ্টি হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত শক্তিকে বোঝা যায় না। বাক্য নিজেই একটি কার্যকর কর্ম। মানুষ তার কথার মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দেয় নির্দেশ দেয় উপদেশ দেয় ভালোবাসা প্রকাশ করে বিরোধ সৃষ্টি করে এবং কখনো কখনো মানুষের জীবন পরিবর্তন করে দেয়।
শ্লোকের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো মন। সংস্কৃত মন শব্দের সঙ্গে চিন্তা মনন ইচ্ছা অনুভূতি এবং মানসিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। বাহ্যিক কর্মের আগে মানুষের অন্তরে অনেক সময় একটি চিন্তার জন্ম হয়। সেই চিন্তা থেকে ইচ্ছা তৈরি হয় ইচ্ছা থেকে সিদ্ধান্ত এবং সিদ্ধান্ত থেকে কর্মের সৃষ্টি হতে পারে। এই কারণে মনকে কর্মের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র বলা যায়। মানুষ বাইরে যা করে তার অনেকটাই তার অন্তর্জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন মানুষ যদি মনে সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা ধারণ করে তবে তার কথায় এবং কাজে সত্যের প্রকাশ ঘটতে পারে। আবার মনে যদি হিংসা লোভ বা প্রতিহিংসা জন্ম নেয় তবে তা কোনো না কোনোভাবে তার আচরণে প্রকাশ পেতে পারে। তাই মানুষের চরিত্র বোঝার জন্য শুধু তার বাহ্যিক কাজ দেখলেই হয় না। তার মনোজগতের দিকেও তাকাতে হয়।
শরীর বাক্ ও মনকে একত্রে দেখলে মানবকর্মের একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া যায়। মন হলো অভ্যন্তরীণ চিন্তা ও অভিপ্রায়ের ক্ষেত্র। বাক্ হলো সেই অন্তর্জগতের প্রকাশের একটি মাধ্যম। শরীর হলো তার বাস্তবায়নের প্রধান ক্ষেত্র। যদিও বাস্তব জীবনে এই তিনটির সম্পর্ক সবসময় সরল ধারায় ঘটে না তবুও মানুষের কর্মকে বোঝার ক্ষেত্রে এই তিনটি স্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ মনে একটি বিষয় চিন্তা করতে পারে মুখে অন্য কথা বলতে পারে এবং কাজে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু করতে পারে। আবার কখনো তার চিন্তা বাক্য ও কর্মের মধ্যে পূর্ণ সামঞ্জস্য থাকে। এই সামঞ্জস্যই মানুষের চরিত্রে সত্যনিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা সৃষ্টি করে।
শ্লোকে এরপর এসেছে কর্ম শব্দটি। কর্ম শব্দের মূল সংস্কৃত ধাতু হলো কৃ যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। সেই অর্থে কর্ম হলো যা করা হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে কর্মের অর্থ কেবল দৈনন্দিন কাজ নয়। মানুষের শারীরিক কাজ মানসিক কাজ এবং বাচিক কাজ সবই কর্মের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মানুষের চিন্তা তার কথাকে প্রভাবিত করে এবং কথা তার আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই কর্ম মানুষের সমগ্র জীবনপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। কর্মের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের চরিত্র প্রকাশ করে এবং নিজের জীবন ও সমাজের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে।
প্রারভতে শব্দটির অর্থ হলো আরম্ভ করে বা কোনো কাজে প্রবৃত্ত হয়। এই শব্দের মধ্যে কর্মের সূচনার ধারণা রয়েছে। মানুষ কোনো কাজ শুরু করার আগে তার অন্তরে একটি প্রেরণা কাজ করে। কখনো সেই প্রেরণা আসে কর্তব্যবোধ থেকে কখনো ইচ্ছা থেকে কখনো প্রয়োজন থেকে আবার কখনো লোভ ক্রোধ ভয় বা অহংকার থেকেও আসে। তাই কর্মের বাহ্যিক রূপ দেখার পাশাপাশি কর্মের সূচনাকারী অন্তর্গত প্রেরণাকেও বোঝা দরকার। একই কাজ দুই ব্যক্তি করতে পারে কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। একজন দান করতে পারে মানুষের কল্যাণের জন্য এবং অন্যজন দান করতে পারে নিজের খ্যাতির জন্য। বাহ্যিকভাবে কাজ একই হলেও অন্তর্গত প্রেরণা আলাদা। এখানেই কর্মের গভীর নৈতিকতা নিহিত।
নরঃ শব্দের অর্থ মানুষ। শ্লোকে মানুষকে কর্মের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। মানুষ কর্ম করে এবং কর্মের ফলের সঙ্গে তার জীবনও যুক্ত হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ একই সঙ্গে জানিয়ে দিচ্ছেন যে মানুষ কর্মের একমাত্র কারণ নয়। এই কথাটিই শ্লোকটির দার্শনিক কেন্দ্র। মানুষ অবশ্যই কর্ম করে এবং তার প্রচেষ্টার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একটি কর্মের পেছনে শরীর কর্তার ধারণা কর্মের উপকরণ বিভিন্ন প্রচেষ্টা এবং দৈব বা পরিস্থিতিগত উপাদান কাজ করে। তাই আমি একাই সব করেছি এই অহংকারপূর্ণ ধারণা সম্পূর্ণ সত্য নয়।
শ্লোকে ন্যায্যং শব্দের অর্থ ন্যায়সংগত যথোচিত বা সঠিক। অন্যদিকে বিপরীতং শব্দের অর্থ বিপরীত অনুচিত বা ন্যায়ের বিরুদ্ধ। এই দুটি শব্দের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ কর্মের নৈতিক দুই সম্ভাবনাকে সামনে এনেছেন। মানুষের কর্ম ভালোও হতে পারে আবার অন্যায়ও হতে পারে। কিন্তু ভালো এবং মন্দ উভয় কর্মের পেছনেই একটি কার্যকারণ কাঠামো রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে ভালো ও মন্দের পার্থক্য নেই। বরং এর অর্থ হলো নৈতিক মূল্যায়নের পাশাপাশি কর্মের কারণগুলোও বোঝা প্রয়োজন। কোনো অন্যায় কাজের কারণ বোঝা মানে সেই অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। বরং কারণ বোঝার মাধ্যমে মানুষ নিজের দুর্বলতা এবং ভুলের প্রকৃতি উপলব্ধি করতে পারে।
এরপর এসেছে পঞ্চ শব্দ। পঞ্চ অর্থ পাঁচ। এই পাঁচটি কারণ পূর্ববর্তী শ্লোকে বিশদভাবে বলা হয়েছে। সেগুলো হলো অধিষ্ঠান কর্তা করণ বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা এবং দৈব। অধিষ্ঠান হলো কর্মের ক্ষেত্র বা ভিত্তি যা মানুষের দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত। কর্তা হলো কর্ম সম্পাদনকারী ব্যক্তি বা কর্তার অনুভূতি। করণ হলো কর্ম সম্পাদনের বিভিন্ন উপকরণ এবং ইন্দ্রিয়। চেষ্টা হলো কর্ম সম্পাদনের বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা। আর দৈব হলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতি বা বৃহত্তর কার্যকারণ শক্তি। এই পাঁচটি একত্রে একটি কর্মকে বাস্তব রূপ দেয়।
এই পাঁচ কারণের ধারণা মানুষের অহংকারকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রশ্ন করে। একজন মানুষ কোনো সাফল্য অর্জন করে যদি বলে এই সাফল্য সম্পূর্ণ আমার নিজের তাহলে সে নিজের কর্মের পেছনে থাকা অসংখ্য সহায়ক কারণকে ভুলে যায়। তার শরীর ছিল তার শিক্ষার সুযোগ ছিল অন্য মানুষের সাহায্য ছিল একটি নির্দিষ্ট সময় ও পরিবেশ ছিল এবং তার নিজের প্রচেষ্টাও ছিল। এই সবকিছুর সমন্বয়েই সাফল্য এসেছে। তাই গীতার শিক্ষা সাফল্যকে অস্বীকার করা নয় বরং সাফল্যের মধ্যে নিজের ভূমিকা স্বীকার করেও অহংকার থেকে মুক্ত থাকা।
একই শিক্ষা ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো মানুষ ব্যর্থ হলে সে যদি মনে করে সব দোষ শুধু আমার তবে সে কর্মের বহুমাত্রিক কারণকে অস্বীকার করে। নিজের ভুল বিশ্লেষণ করা অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু সব ফলাফলকে কেবল নিজের একক ক্ষমতা বা অক্ষমতার ফল হিসেবে দেখা যথার্থ নয়। মানুষের জীবনে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি পরিস্থিতি পরিবেশ সুযোগ সময় এবং বহু অদৃশ্য কারণ কাজ করে। এই উপলব্ধি মানুষকে দায়িত্বহীন করে না বরং আরও বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে।
এই শ্লোকের একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন হলো মানুষ কি সত্যিই স্বাধীনভাবে সবকিছু করে। আধুনিক ভাষায় আমরা বলতে পারি মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর তার শরীর মন শিক্ষা অভ্যাস স্মৃতি পরিবেশ সমাজ এবং পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে। তাহলে মানুষ কতটা স্বাধীন এবং কতটা পরিস্থিতির দ্বারা পরিচালিত। গীতা এই প্রশ্নের সরল উত্তর না দিয়ে কর্মের বহু কারণের কথা বলে। মানুষ কর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার কিন্তু সমস্ত কারণের একমাত্র উৎস নয়। এখানেই গীতার কর্মদর্শনের সূক্ষ্মতা।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই বিষয়টি আরও গভীর হয়। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান এবং মানসিক ও শারীরিক শক্তির সমন্বয়ে কর্মের প্রকাশ ঘটে। আত্মা বা পুরুষকে সাংখ্য দর্শনে মূলত সাক্ষীস্বরূপ বলা হয়। মানুষের সমস্যা তখন শুরু হয় যখন সে প্রকৃতির কার্যকলাপকে নিজের চূড়ান্ত স্বরূপের সঙ্গে এক করে দেখে এবং বলে আমি সবকিছুর কর্তা। এই কর্তা ভাবের সঙ্গে অহংকার যুক্ত হয়। বেদান্তীয় ব্যাখ্যাতেও এই প্রশ্ন আরও গভীর হয়ে ওঠে। দেহ কাজ করে ইন্দ্রিয় কাজ করে মন চিন্তা করে বুদ্ধি সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু আত্মা কি সত্যিই এই সমস্ত কার্যকলাপের কর্তা। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে আত্মা স্বরূপত চৈতন্য এবং সাক্ষী। কর্তৃত্বের অনুভূতি দেহ মন ও অহংকারের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের ফলে সৃষ্টি হয়।
এই কারণে শ্লোকটি কর্মযোগের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মযোগ মানুষকে কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে শেখায় না। বরং কর্মের মধ্যে থেকেই অহংকার কমাতে শেখায়। মানুষ তার কর্তব্য পালন করবে নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দেবে কিন্তু ফলাফল ও কর্মের সমস্ত কারণকে নিজের একক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে দেখবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে একদিকে কর্মঠ রাখে এবং অন্যদিকে অহংকার থেকে রক্ষা করে।
শরীর বাক্ ও মনকে প্রতীক হিসেবে দেখলেও শ্লোকটির একটি সুন্দর অর্থ পাওয়া যায়। শরীর প্রতীক কর্মের। বাক্ প্রতীক প্রকাশের। মন প্রতীক উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়ের। মানুষের প্রকৃত চরিত্র তখনই সুন্দর হয় যখন তার মন বাক্য এবং কর্মের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে। যে মানুষ মনে এক কথা ভাবছে মুখে অন্য কথা বলছে এবং কাজে তৃতীয় কিছু করছে তার মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়। কিন্তু যার চিন্তা বাক্য ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে তার চরিত্রে সত্যনিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা প্রকাশ পায়।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের আচরণের পেছনে চিন্তা অভিপ্রায় অনুভূতি সিদ্ধান্ত এবং অভ্যাস কাজ করে। একটি রাগের ঘটনা লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রথমে কোনো অনুভূতি বা চিন্তা জন্ম নেয় তারপর মানুষ কঠিন কথা বলে এবং পরে তার আচরণে রাগ প্রকাশ পায়। আবার একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি কোনো মানুষের কষ্ট দেখে মনে সহানুভূতি অনুভব করতে পারেন তারপর সান্ত্বনার কথা বলতে পারেন এবং শেষে বাস্তবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। অর্থাৎ মন বাক্য ও শরীরের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যায়। ধরা যাক একজন মানুষ একজন অসহায় ব্যক্তিকে সাহায্য করল। বাইরে থেকে মনে হতে পারে সে একাই কাজটি করেছে। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তার শরীর ছিল বলেই সে এগিয়ে যেতে পেরেছে। তার ইন্দ্রিয় তাকে পরিস্থিতি দেখতে সাহায্য করেছে। তার মন অন্যের কষ্ট অনুভব করেছে। তার জ্ঞান তাকে সাহায্যের উপায় বুঝতে সাহায্য করেছে। তার নিজের প্রচেষ্টা তাকে কাজটি সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছে এবং পরিস্থিতিও তাকে সুযোগ দিয়েছে। ফলে একটি ছোট কাজের পেছনেও বহু কারণ কাজ করেছে।
আবার একজন মানুষ রাগের বশে কাউকে কঠিন কথা বলল। এখানেও শরীর বাক্ ও মন একসঙ্গে কাজ করেছে। মনে ক্রোধ সৃষ্টি হয়েছে। বাক্যের মাধ্যমে তা প্রকাশ পেয়েছে এবং শরীরের আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটতে পারে। কিন্তু সেই ক্রোধের পেছনে থাকতে পারে পুরনো অভিজ্ঞতা ভুল ধারণা মানসিক চাপ ক্লান্তি অথবা কোনো তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি। এইভাবে একটি কর্মের কারণ অনুসন্ধান করলে আমরা মানুষের আচরণকে আরও গভীরভাবে বুঝতে পারি।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা হলো কারণ বোঝা এবং দায়িত্ব অস্বীকার করা এক জিনিস নয়। মানুষ যদি বলে যেহেতু কর্মের পেছনে অনেক কারণ আছে তাই আমার কোনো দায়িত্ব নেই তাহলে সে গীতার শিক্ষা বুঝতে পারেনি। আবার যদি বলে আমি একাই সবকিছুর কর্তা তাহলে তাও অসম্পূর্ণ উপলব্ধি। প্রকৃত জ্ঞান হলো নিজের ভূমিকা স্বীকার করা এবং একই সঙ্গে উপলব্ধি করা যে কর্ম একটি বৃহত্তর কার্যকারণ ব্যবস্থার অংশ।
এই উপলব্ধি মানুষের জীবনে বিনয় সৃষ্টি করে। সাফল্যের সময় মানুষ বুঝতে পারে যে তার নিজের প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সে একা নয়। ব্যর্থতার সময় সে বুঝতে পারে যে নিজের ভুল সংশোধন করা দরকার হলেও সমস্ত ব্যর্থতার ভার নিজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে সে বুঝতে পারে যে তার চিন্তা বাক্য ও কাজ একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া দরকার। নৈতিক জীবনে সে বুঝতে পারে যে কর্মের আগে নিজের উদ্দেশ্যকে পরীক্ষা করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায় শরীরবাঙ্মনোভির্যৎ কর্ম প্রারভতে নরঃ এই শ্লোক মানুষের কর্মজীবনের একটি গভীর মানচিত্র তুলে ধরে। শরীর মানুষের কর্মের বাহ্যিক ক্ষেত্র। বাক্ মানুষের ভাবের প্রকাশ। মন কর্মের অভ্যন্তরীণ ভূমি। কর্ম মানুষের জীবনকে প্রকাশ করে। ন্যায়্য ও বিপরীত কর্ম মানুষের নৈতিক অবস্থানকে প্রকাশ করে। আর পাঁচটি কারণ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে কোনো কর্মই একক ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনে থাকে দেহ মন ইন্দ্রিয় কর্তা ভাব প্রচেষ্টা পরিস্থিতি এবং বৃহত্তর কার্যকারণের সমন্বয়।
এই শ্লোকের চূড়ান্ত শিক্ষা তাই হলো মানুষকে কর্ম থেকে দূরে সরে যেতে হবে না বরং কর্মের প্রকৃতি বুঝে কর্ম করতে হবে। নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে নিজের প্রচেষ্টাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু নিজের মধ্যে এমন অহংকার সৃষ্টি করা উচিত নয় যে সবকিছুর একমাত্র কর্তা আমি। কর্মের মধ্যে নিজের ভূমিকা স্বীকার করা যেমন প্রয়োজন তেমনি কর্মের বহুমাত্রিক কারণ উপলব্ধি করাও প্রয়োজন। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে নিয়ে যায়। অন্ধ আত্মদোষ থেকে প্রজ্ঞার দিকে নিয়ে যায় এবং কর্মের বাহ্যিক জগত থেকে আত্মজিজ্ঞাসার গভীর জগতে প্রবেশের পথ খুলে দেয়। গীতার এই শিক্ষা তাই শুধু একটি প্রাচীন শ্লোকের ব্যাখ্যা নয়। এটি মানুষের চিন্তা বাক্য ও কর্মকে বুঝে আরও সচেতন নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের একটি গভীর নির্দেশনা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!