সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.১৬ — আত্মাকে একমাত্র কর্তা ভাবার ভ্রান্তি ও কর্মের প্রকৃত কারণের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
তত্রৈবং সতি কর্তারমাত্মনং কেবলং তু যঃ।পশ্যত্যকৃতবুদ্ধিত্বান্ন স পশ্যতি দুর্মতিঃ।।১৬।।
তত্রৈবং সতি কর্তারমাত্মনং কেবলং তু যঃ।
পশ্যত্যকৃতবুদ্ধিত্বান্ন স পশ্যতি দুর্মতিঃ।।১৬।। 

অনুবাদঃ অতএব, কর্মের পাঁচটি কারণের কথা বিবেচনা না করে যে নিজেকে কর্তা বলে মনে করে, বুদ্ধির অভাববশত সেই দুর্মতি যথাযথভাবে দশন করতে পারে না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের কর্মবোধ, আত্মপরিচয় এবং কর্তৃত্ববোধের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম দার্শনিক সত্য তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো

এই শ্লোকের সরল অর্থ হলো, যে ব্যক্তি আত্মাকেই একমাত্র কর্তা বলে মনে করে, তার বুদ্ধি যথাযথভাবে পরিশীলিত না হওয়ার কারণে সে প্রকৃত সত্যকে দেখতে পায় না। সেই ব্যক্তি দুর্মতি বা ভ্রান্তবুদ্ধিসম্পন্ন। শ্লোকটির গভীর তাৎপর্য বুঝতে হলে কর্তা, আত্মা, কেবল, বুদ্ধি এবং দুর্মতি এই কয়েকটি শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ এখানে সাধারণ মানুষের কর্ম সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে অস্বীকার না করে তার গভীরতর দর্শন ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সংস্কৃত কর্তারম শব্দটি এসেছে কৃ ধাতু থেকে। কৃ অর্থ করা, সম্পাদন করা বা কোনো কাজ সম্পন্ন করা। এই ধাতু থেকেই কর্তা অর্থাৎ যিনি করেন এবং কর্ম অর্থাৎ যা করা হয় এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ শব্দের উৎপত্তি। কর্তা শব্দের মধ্যে তাই কার্যসম্পাদনের ধারণা নিহিত রয়েছে। কিন্তু গীতার আলোচনায় কর্তা শব্দটি কেবল কোনো কাজ সম্পাদনকারী ব্যক্তিকে বোঝায় না। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে কর্মের প্রকৃত কর্তা কে এবং কর্মের পেছনে কতগুলি কারণ কাজ করে। একজন মানুষ যখন বলে আমি কাজটি করেছি, তখন দৈনন্দিন জীবনের দৃষ্টিতে কথাটি স্বাভাবিক। কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যায় যে একটি কাজ কখনোই কেবল একজন ব্যক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয় না। শরীর, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অভ্যাস, পরিবেশ, পরিস্থিতি, পূর্বপ্রবণতা এবং আরও বহু কারণ কর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

আত্মানম শব্দটি আত্মন শব্দের রূপ। আত্মা ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীরতম ধারণা। সাধারণ অর্থে আত্মা বলতে নিজের সত্তা, নিজস্ব অস্তিত্ব বা অন্তর্নিহিত চৈতন্যকে বোঝানো হয়। উপনিষদীয় এবং বেদান্তীয় চিন্তায় আত্মা কোনো সাধারণ ব্যক্তিত্বের নাম নয়। শরীর পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয় এবং বুদ্ধির অবস্থাও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যে চৈতন্যের উপস্থিতিতে এই সমস্ত পরিবর্তনকে জানা যায়, তাকে আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়। তাই আত্মাকে কেবল শরীর বা মন হিসেবে গ্রহণ করলে গীতার বক্তব্যের গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না।

এই শ্লোকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শব্দগুলির একটি হলো কেবলম। কেবল অর্থ একমাত্র, শুধু বা অন্য সবকিছুকে বাদ দিয়ে একা। ফলে আত্মানং কেবলং কর্তারম অর্থ দাঁড়ায় আত্মাকেই একমাত্র কর্তা বলে দেখা। এখানেই শ্লোকটির মূল সমস্যা নির্দেশিত হয়েছে। গীতা এমন নয় যে মানুষকে কর্তা হিসেবে একেবারেই অস্বীকার করছে। বরং মানুষ যখন নিজের ভূমিকা অতিক্রম করে নিজেকে সমস্ত কর্মের একমাত্র এবং সম্পূর্ণ কারণ বলে মনে করে, তখন সেই ধারণাকে ভ্রান্ত বলা হচ্ছে। একজন মানুষ নিজের শ্রমের জন্য গর্ব করতে পারে, নিজের দায়িত্ব স্বীকার করতে পারে এবং নিজের কর্মের ফলের জন্য দায়বদ্ধও হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সেই কর্মের পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই।

পশ্যতি শব্দটি এসেছে দৃশ ধাতু থেকে, যার অর্থ দেখা। কিন্তু সংস্কৃত দর্শনের ভাষায় দেখা মানে কেবল চোখ দিয়ে কোনো দৃশ্য উপলব্ধি করা নয়। দেখা মানে বোঝা, উপলব্ধি করা এবং সত্যকে চিনতে পারা। তাই যখন বলা হচ্ছে ন স পশ্যতি, তখন তার অর্থ এই নয় যে সেই ব্যক্তি চোখ দিয়ে কিছু দেখতে পারে না। সে বাহ্যিক ঘটনা দেখতে পারে, কিন্তু ঘটনার অন্তর্নিহিত সত্য দেখতে পারে না। সে কর্ম দেখতে পারে, কিন্তু কর্মের বহুমাত্রিক কারণ দেখতে পারে না। সে নিজের প্রচেষ্টা দেখতে পারে, কিন্তু সেই প্রচেষ্টার পেছনে থাকা অসংখ্য সহায়ক কারণ দেখতে ব্যর্থ হয়।

অকৃতবুদ্ধিত্বাত শব্দটিও অত্যন্ত গভীর। এখানে বুদ্ধি শব্দের মূল সম্পর্ক বুধ ধাতুর সঙ্গে। বুধ অর্থ জাগা, জ্ঞান লাভ করা বা বোধ করা। তাই বুদ্ধি কেবল তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা নয়। বুদ্ধি হলো বিচার করার, সত্য ও অসত্য পৃথক করার এবং বাস্তবতার প্রকৃতি বোঝার ক্ষমতা। অকৃতবুদ্ধিত্ব বলতে এমন এক বুদ্ধির অবস্থা বোঝানো হয়েছে যা যথেষ্ট পরিশীলিত বা পরিণত হয়নি। এই শব্দের অর্থ বুদ্ধিহীনতা নয়। একজন মানুষের বুদ্ধি থাকতে পারে, জ্ঞান থাকতে পারে, শিক্ষা থাকতে পারে এবং অসাধারণ দক্ষতাও থাকতে পারে, তবু তার বুদ্ধি যদি আত্মপরিচয় এবং কর্মের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সঠিক বিচার করতে না পারে, তাহলে গীতার ভাষায় সেই বুদ্ধি এখনও পরিশীলিত নয়।

শ্লোকের শেষ শব্দ দুর্মতি। দুর্মতি শব্দটি দুর এবং মতি এই দুই অংশে গঠিত। দুর অর্থ বিকৃত, প্রতিকূল বা ভুল এবং মতি অর্থ চিন্তা, বিচার, মনোভাব বা বোধ। তাই দুর্মতি বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যার বিচারবোধ বাস্তবতাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না। এখানে দুর্মতি কোনো ব্যক্তিকে অপমান করার জন্য ব্যবহৃত শব্দ নয়। বরং তার ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণ নির্দেশ করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। সে মন্দ মানুষ বলেই ভুল দেখছে এমন নয়। তার বুদ্ধি কর্মের প্রকৃত কারণ এবং আত্মার প্রকৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিশীলিত না হওয়ায় তার দর্শন অসম্পূর্ণ হয়ে পড়েছে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো পশ্যতি এবং ন স পশ্যতি এই দুইয়ের আপাত বিরোধ। যে দেখে, সে দেখে না। এই বক্তব্যের মধ্যে গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক সত্য রয়েছে। মানুষ চোখ দিয়ে অনেক কিছু দেখতে পারে, কিন্তু সবকিছুর সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। যেমন একজন মানুষ একটি নদীর স্রোত দেখতে পারে, কিন্তু স্রোতের পেছনে থাকা মাধ্যাকর্ষণ, ভূপ্রকৃতি এবং জলের প্রবাহের জটিল কারণসমূহ দেখতে নাও পারে। তেমনি একজন মানুষ নিজের কর্ম দেখতে পারে এবং বলতে পারে আমি করেছি, কিন্তু সেই কর্মের পেছনে থাকা শরীর, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, শিক্ষা, পরিবেশ, সুযোগ, পরিস্থিতি এবং প্রকৃতির কার্যকলাপকে বিবেচনা না করলে তার দেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এই কারণে গীতার এই শিক্ষা অহংকারের বিরুদ্ধে একটি গভীর সতর্কবার্তা। মানুষ যখন সফল হয় তখন সহজেই বলে ওঠে সবকিছু আমি করেছি। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। একজন ব্যবসায়ীর সাফল্যের পেছনে তার পরিশ্রম অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে রয়েছে শিক্ষা, পরিবার, সহকর্মী, কর্মচারী, গ্রাহক, বাজার, প্রযুক্তি, সামাজিক পরিবেশ এবং সময়ের সুযোগ। নিজের পরিশ্রমকে অস্বীকার করা যেমন ভুল, তেমনি অন্য সব কারণ অস্বীকার করে নিজেকেই একমাত্র কারণ মনে করাও ভুল। গীতা এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দিকে মানুষকে নিয়ে যেতে চায়।

সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই বক্তব্য আরও পরিষ্কার হয়। সাংখ্য দর্শনে পুরুষকে চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতিকে পরিবর্তনশীল কার্যকারণ জগতের ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। বুদ্ধি, অহংকার, মন, ইন্দ্রিয় এবং জগতের বিভিন্ন পরিবর্তন প্রকৃতির পরিসরের অন্তর্ভুক্ত। এই দৃষ্টিতে চৈতন্যস্বরূপ আত্মাকে প্রকৃতির সব কার্যকলাপের সরল কর্তা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। মানুষের মধ্যে কর্মের যে অনুভূতি সৃষ্টি হয় তার সঙ্গে অহংকার, মন এবং বুদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। তাই আমি কর্তা এই অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় যে এখানে আত্মপরিচয় এবং অহংকারের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক কাজ করছে।

বেদান্তীয় চিন্তায় এই পার্থক্য আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। আত্মাকে সাক্ষী চৈতন্য হিসেবে দেখা হলে শরীর, মন এবং বুদ্ধির সমস্ত পরিবর্তন সেই চৈতন্যের সামনে প্রকাশিত হয়। কিন্তু মানুষ যখন শরীর, মন এবং অহংকারের সঙ্গে আত্মাকে সম্পূর্ণ এক করে দেখে, তখন তার মধ্যে আমি কর্তা এই ধারণা শক্তিশালী হয়। এই আমি সাধারণ জীবনের ক্ষেত্রে ব্যবহারিকভাবে প্রয়োজনীয় হলেও যখন তা পরম সত্য বলে গ্রহণ করা হয় তখন সমস্যা সৃষ্টি হয়। ব্যবহারিক স্তরে মানুষ কর্ম করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু আধ্যাত্মিক স্তরে আত্মার প্রকৃতি সম্পর্কে বিচার করলে দেখা যায় যে আত্মাকে সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত অহংকারের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।

এই শিক্ষা কর্মযোগের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কর্মযোগ মানুষকে কর্ম থেকে পালাতে বলে না। বরং কর্তব্য পালন করতে বলে। কিন্তু কর্মের সঙ্গে অহংকারের বন্ধন তৈরি না করাই কর্মযোগের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একজন মানুষকে নিজের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করতে হবে, কিন্তু কাজের সাফল্যকে নিজের ব্যক্তিগত অহংকারের সম্পূর্ণ সম্পত্তি মনে করা উচিত নয়। আবার ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও সবকিছুর জন্য নিজেকে একমাত্র দোষী মনে করা উচিত নয়। নিজের কর্তব্য এবং নিজের প্রচেষ্টা স্বীকার করার পাশাপাশি জীবনের বৃহত্তর কার্যকারণকে উপলব্ধি করাই পরিণত বুদ্ধির লক্ষণ।

এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কর্তৃত্ব এবং অহংকর্তৃত্বের মধ্যে পার্থক্য করা। কর্তৃত্বের অর্থ হতে পারে আমি আমার কাজের জন্য দায়ী এবং আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী কাজ করছি। কিন্তু অহংকর্তৃত্বের অর্থ হলো আমি একাই সবকিছুর স্বাধীন এবং সম্পূর্ণ কারণ। গীতার সমালোচনা দ্বিতীয় ধারণাটির বিরুদ্ধে। কারণ মানুষ নিজের জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে না। জন্ম, পরিবার, সময়, পরিবেশ, শরীর, অসংখ্য সম্পর্ক, সামাজিক পরিস্থিতি এবং আকস্মিক ঘটনাও জীবনের গতিপথকে প্রভাবিত করে। তাই নিজের ভূমিকা অস্বীকার না করেও নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা সম্ভব।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষ অনেক সময় সাফল্যের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব নিজের বলে মনে করে এবং ব্যর্থতার সম্পূর্ণ ভারও নিজের ওপর চাপিয়ে দেয়। উভয় ক্ষেত্রেই বাস্তবতার একটি অংশকে সম্পূর্ণ সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। গীতার এই শ্লোক মানুষকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দিকে নিয়ে যায়। নিজের চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নয়। এই উপলব্ধি অহংকার কমায় এবং একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আত্মদহন থেকেও মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

একটি প্রদীপের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যায়। একটি প্রদীপ ঘরে আলো দেয়। কিন্তু আলো জ্বলার জন্য প্রদীপের পাশাপাশি তেল, সলতে, আগুন এবং পরিবেশেরও প্রয়োজন হয়। তাই প্রদীপ গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। একইভাবে একজন মানুষ একটি কর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, কিন্তু কর্মের সম্পূর্ণ কার্যকারণকে কেবল তার ব্যক্তিগত আমি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এই উপমার মাধ্যমে কেবল কর্তা ধারণাটির সীমাবদ্ধতা সহজেই বোঝা যায়।

শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও গভীর। এখানে কর্তা অহংকারের প্রতীক, আত্মা প্রকৃত সত্তার প্রতীক, কেবল একমাত্রত্বের সংকীর্ণতার প্রতীক, অকৃতবুদ্ধি অপরিণত বিচারশক্তির প্রতীক এবং দুর্মতি ভুল দর্শনের প্রতীক। আর পশ্যতি সত্য উপলব্ধির প্রতীক। ফলে শ্লোকটি যেন মানুষের অন্তর্জীবনের একটি পথ নির্দেশ করে। অপরিণত বুদ্ধি মানুষকে অহংকর্তৃত্বের দিকে নিয়ে যায়। অহংকর্তৃত্ব মানুষকে বাস্তবতার সীমিত ব্যাখ্যা দেয়। আর পরিশীলিত বুদ্ধি সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে কর্মের প্রকৃত কারণ এবং আত্মার প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।

এই শ্লোক আমাদের সাফল্য এবং ব্যর্থতা উভয়কেই নতুনভাবে দেখতে শেখায়। সাফল্যের সময় এটি বিনয় শেখায় এবং বলে যে নিজের শ্রমকে সম্মান করো, কিন্তু নিজেকে সমস্ত সাফল্যের একমাত্র কারণ মনে করো না। ব্যর্থতার সময় এটি ভারসাম্য শেখায় এবং বলে নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নাও, কিন্তু এমন ভাবো না যে সমগ্র বিশ্বপরিস্থিতি তোমার একার হাতে ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে দায়িত্বশীল করে, কিন্তু অহংকারী করে না। মানুষকে কর্মঠ করে, কিন্তু কর্মফলের অহংকারে আবদ্ধ করে না।

সবশেষে বলা যায়, তত্রৈবং সতি কর্তারমাত্মানং কেবলং তু যঃ এই শ্লোকটি কেবল আত্মা এবং কর্মের একটি দার্শনিক আলোচনা নয়। এটি মানুষের আত্মপরিচয়, অহংকার, দায়িত্ব, জ্ঞান এবং সত্যদর্শনের একটি গভীর শিক্ষা। কর্তা শব্দ আমাদের কর্মের দিকে নিয়ে যায়, আত্মা আমাদের প্রকৃত সত্তার দিকে নিয়ে যায়, কেবল শব্দটি আমাদের একমাত্রত্বের ভ্রান্তি দেখায়, বুদ্ধি আমাদের বিচারশক্তির কথা মনে করিয়ে দেয় এবং দুর্মতি আমাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গির পরিণতি প্রকাশ করে। শ্লোকটির মূল শিক্ষা হলো মানুষ কর্ম করবে, দায়িত্ব নেবে এবং নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কিন্তু নিজের সীমিত ব্যক্তিত্বকে সমস্ত কর্মের একমাত্র এবং পরম কর্তা বলে মনে করবে না। কারণ কর্মের জগৎ বহুকারণনির্ভর এবং আত্মার প্রকৃতি সাধারণ অহংকারের চেয়ে গভীর। যে ব্যক্তি এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তার দৃষ্টিতে বিনয় আসে, কর্মে পরিপক্বতা আসে এবং আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে গভীরতা আসে। আর যে ব্যক্তি নিজের সীমিত অহংকারকেই সম্পূর্ণ সত্য বলে গ্রহণ করে, সে বাহ্যিকভাবে অনেক কিছু দেখলেও কর্মের অন্তর্নিহিত সত্যকে দেখতে পারে না। এই কারণেই গীতার ভাষায় তার বুদ্ধি দুর্মতি এবং তার দর্শন অসম্পূর্ণ।

শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষকে কর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং কর্মের প্রকৃত অবস্থান বুঝতে শেখায়। নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে, নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করতে হবে, নিজের ভুলের দায় নিতে হবে এবং নিজের সাফল্যের জন্য কৃতজ্ঞ হতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে উপলব্ধি করতে হবে যে জীবনের কোনো ঘটনাই কেবল আমার একার সৃষ্টি নয়। এই উপলব্ধিই অহংকারকে নম্রতায়, অজ্ঞতাকে জ্ঞানে এবং সীমিত দৃষ্টিকে বিস্তৃত দর্শনে রূপান্তরিত করতে পারে। তাই এই শ্লোকের গভীরতম বাণী হলো, মানুষ কর্মের মধ্যে থাকবে কিন্তু অহংকারের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। সে নিজের ভূমিকা জানবে, নিজের সীমা জানবে এবং আত্মার প্রকৃতি সম্পর্কে অনুসন্ধান করবে। তখন তার দেখা শুধু বাহ্যিক দেখা থাকবে না, তা ধীরে ধীরে সত্যদর্শনে পরিণত হবে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি